সাংবাদিকদের জেলে পোরার ক্ষেত্রে এশিয়া-প্যাসিফিকের শীর্ষে বাংলাদেশ

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট বা সিপিজে একথা জানিয়েছে আলাপ’কে। সংস্থাটির ‘প্রিজন সেনসাস’ অনুযায়ী বিশ্বে সাংবাদিকদের কারান্তরীণ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১৪তম। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে চীন।

আপডেট : ০৭ মে ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম

চাঁদাবাজির মামলায় একাত্তর টিভির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবুর জামিন আবেদন মঙ্গলবার খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী মামলাটি দায়ের হয় ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০০৭ সালে বৈশাখী টিভির শেয়ারহোল্ডার হুমায়ুন কবিরকে বাসা থেকে অপহরণ করে জোরপূর্বক শেয়ার হস্তান্তর এবং ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা আদায় করা হয়। গণমাধ্যমের তথ্য মতে, মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে এখন মোট পাঁচটি মামলা চলছে। যার মধ্যে চারটি ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলনের সময় করা হত্যা মামলা।

মোজ্জামেল বাবু ছাড়াও সাংবাদিকদের মধ্যে এখনও কারাবন্দি রয়েছেন শ্যামল দত্ত, শাকিল আহমেদ এবং ফারজানা রুপা। এছাড়াও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেফতার আছেন সাংবাদিক শওকত মাহমুদও।

সাংবাদিক গ্রেফতারে বিশ্বজুড়ে চিত্র

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)-এর বার্ষিক প্রিজন সেনসাস অনুযায়ী ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে পঞ্চম বছরের মতো তিনশ’র বেশি সাংবাদিক কারাবন্দি ছিলেন। প্রতিবেদনে তারা জানায়, অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের নির্মম পরিবেশে আটক রাখা হয়। এই পরিবেশকে সিপিজে প্রতিবেদনে মুক্তি পাওয়া এক ফিলিস্তিনি বন্দীর ভাষায় উল্লেখ করেছে, “জীবিতদের কবরস্থান’ হিসেবে।

কোন দেশে কতজন সাংবাদিক কারাগারে আটক

সিপিজে’র প্রিজন সেনসাস অনুযায়ী, এসব নির্মমতা অনেক সাংবাদিককে দীর্ঘ সময় ধরে সহ্য করতে হচ্ছে। কারাবন্দি সাংবাদিকদের একটি চিত্র দিয়ে বলা হয়, ৩৩০ জনের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে কারবন্দি আছেন। যাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকেরই এখনো কোনো সাজা ঘোষণা হয়নি, এবং তাদের মধ্যে ২৬ শতাংশ পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় ধরে কোনো রায় ছাড়াই কারাগারে আছেন। এ ধরনের আটক আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন, যেখানে অযৌক্তিক বিলম্ব ছাড়া ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে।

প্রিজন সেনসাস অনুযায়ী বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে চীন। তাদের ৫০ জন সাংবাদিক ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কারাবন্দী অবস্থায় ছিলেন। এছাড়াও দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে মিয়ানমার ও ইসরায়েল। যার মধ্যে মিয়ানমারে ৩০ এবং ইসরায়েলে ২৯ জন সাংবাদিক কারাবন্দী অবস্থায় ছিলেন। 

সাংবাদিক গ্রেফতারে বাংলাদেশের অবস্থান

সাংবাদিক কারাবন্দিতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশ শীর্ষে আছে বলে আলাপ-কে জানিয়েছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)।

সংস্থাটির এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের সমন্বয়ক কুনাল মজুমদার আলাপকে জানান, “সাংবাদিকদের কারাবন্দি করার শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সিপিজে’র প্রিজন সেন্সাস অনুযায়ী বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪তম।”

বাংলাদেশের চারজন সাংবাদিকের গ্রেফতার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের ওপর গুরুতরভাবে প্রভাব ফেলছে জানিয়ে কুনাল মজুমদার আলাপ-কে জানান, “বিচার শুরু হয়নি, চার্জশিট দাখিল হয়নি। জামিন না দিয়ে ৬০০ দিন আটক রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতি কার্যত দন্ডিত হওয়ার আগেই শাস্তি ভোগ করার মতো উদ্বেগ তৈরি করে।”

সিপিজে মনে করে অভিযোগের ধরনগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শতশত মানুষের সঙ্গে সাংবাদিকদেরও হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট প্রমাণ অস্পষ্ট।

“এমন গুরুতর অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও আইনের অপব্যবহারের আশংকা তৈরি করেছ", বলেন কুনাল মজুমদার।

সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসান বলেন, “সিপিজে’র যেই ডেটা সেটা যদি রিসেন্ট হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে বাংলাদেশে ২০২৪ সালে যে পট-পরিবর্তন হয়েছে সেটারই একটা কনসিকোয়েন্স। জাতীয় বা ঢাকার সাংবাদিকদের মধ্যে চারজন জেলে আছেন। স্থানীয় পর্যায়েও অনেকেই জেলে আছেন। সেই সংখ্যাটা আমরা ঠিক মতো গণনা করিনি।”

সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার

বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের রাজনীতিতে জড়ানোর প্রবণতা বেশি বলে মনে করেন নাজমুল আহসান। এটিকেও গ্রেফতারের অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করতে চান তিনি।

“অনেক সাংবাদিক আছেন লোকাল রাজনৈতিক কর্মী কিংবা পদধারী। ফলে যখন রাজনৈতিক পালাবদল হয়, তখন তারা শুধু সাংবাদিক হিসেবে নয়, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেও বিবেচিত হন", বলেন তিনি।

এদিকে কুনালও মনে করেন রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাগুলো শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়, সাংবাদিকদের ওপরও ব্যবহার হচ্ছে।

তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা সরকার আমলে এ ধরনের প্রবণতা ছিল। ড. ইউনূস সরকারের সময়েও যা অব্যাহত ছিল। সমালোচনামূলক রিপোর্টের কারণে সাংবাদিকরা প্রতিশোধমূলক রাজনীতির মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন।“

সিপিজের তথ্য বিষয়ে সাংবাদিক সাহেদ আলম আলাপ-কে বলেন, ‘জেলে যাওয়ার যে বিষয় সেটা হলো পূববর্তী সরকারগুলোর রাষ্ট্র পরিচালনার যে রিপ্রেসিভ প্যাটার্ন সেটার একটা চিত্র। বিগত ১ বছরের কর্মকাণ্ডের উপর ভিত্তি করে তাদের প্রতিবেদনে এই তথ্যগুলো এসেছে। স্বাধীন মত প্রকাশের পক্ষের একজন মানুষ হিসেবে আমি চাই এই সংখ্যাটা নতুন করে যেন না বাড়ে”।   

পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিকতা ও গ্রেপ্তার নিয়ে যত প্রশ্ন

বাংলাদেশে একটা দীর্ঘ সময় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার অভিযোগ ছিল। সিপিজের কাছে জানতে চাওয়া হয়, পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিকতার অভিযোগকে খুনের মতো ফৌজদারি অভিযোগ থেকে কীভাবে আলাদা করে দেখা উচিত? এমন প্রশ্নের জবাবে সিপিজে’র এশিয়া প্যাসিফিক প্রোগ্রাম সমন্বয়ক কুনাল মজুমদার আলাপ-কে বলেন, সাংবাদিকতা পক্ষপাতদুষ্ট, ত্রুটিপূর্ণ বা বিতর্কিত হতে পারে। এসব কখনই ফৌজদারি অপরাধ নয়। ‘গ্রহণযোগ্য সাংবাদিকতা কী’- সেটি’র চূড়ান্ত নির্ধারক সরকার নয়। সুতরাং শুধুমাত্র মতবিরোধের কারণে আইন ব্যবহার করে সাংবাদিকদের শাস্তি দেয়া উচিত নয়।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, অতীতে পক্ষপাতদুষ্ট বা পার্টিজান রিপোর্টিংয়ের অভিযোগ এবং হত্যা মামলার মতো ফৌজদারি অপরাধকে আলাদা করে দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা।

এই চিত্রটা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পোলারাইজেশনকেই চিহ্নিত করে। সাংবাদিকদের উপর যেই প্রভাব, সেটা দেশের বা সমাজের সামগ্রিক পরিবর্তনের একটা অংশ মাত্র। নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসান সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা এবং গ্রেফতারের কারণ হিসেবে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পোলারাইজেশনের প্রতিফলন হিসেবে দেখেন। সাংবাদিকদের ওপর যেই প্রভাব, সেটি দেশের বা সমাজের সামগ্রিক পরিবর্তনের একটি অংশও মনে করেন তিনি।  

“যেখানে আওয়ামী লীগের মতো একটা পার্টি ক্রিমিনালাইজড হয়ে গেছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের মতো একটা বড় দল যদি ব্যানড হয়ে যায়, তখন আওয়ামী লীগপন্থি সাংবাদিকদের তো পরিস্থিতি ঠিক থাকে না। সেটার প্রভাবই পড়েছে", বলেন নাজমুল আহসান।

যদিও কুনাল মজুমদার মনে করেন আইন ব্যবহার করে এভাবে সাংবাদিকদের দীর্ঘ সময় বিনা বিচারে জেলে আটকে রাখলে ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি করে, একই সঙ্গে সেলফ সেন্সরশিপ তৈরি হয়। তিনি বলেন, এসব ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসরকেও সংকুচিত করে তোলে। আইন এভাবে ব্যবহৃত হলে জবাবদিহিতাকে দুর্বল তো করেই, গণতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আদালতে ফারজানা রুপা ও শাকিল আহমেদ

বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে দ্বিধাবিভক্ত সাংবাদিকতা। পন্থাভিত্তিক সাংবাদিকতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। এই আদর্শগত বিভেদের কারণেও অনেক সময় সাংবাদিকরা নিজেদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হতে পারেন না।

বর্তমানে চারজন সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে সিপিজে’র কুনাল মজুমদার সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আলাপ-কে বলেন, “রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত ভিন্নতা থাকলেও আইনের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া জরুরি। যদি সাংবাদিকরা শুধু নিজেদের মতের মানুষের পক্ষে দাঁড়ান, তাহলে মূলনীতিই দুর্বল হয়ে পড়বে। নিশ্চিত করতে হবে ফৌজদারি আইন যেন সমালোচনামূলক কণ্ঠ দমন করার রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে।“

তবে সাহেদ আলম পক্ষপাতদুষ্ট কিংবা পোলারাজাইজেশনকে স্বাভাবিক  হিসেবে দেখতে চান। তিনি মনে করেন পৃথিবীজুড়েই এই প্র্যাকটিস আছে। তিনি বলেন, “এটা বাংলাদেশে নতুন না। তবে নতুন করে দৃশ্যমান হয়েছে। তবে আমাদের দেশে যৌক্তিক সমালোচনা অনেক সময় ব্যক্তি আক্রমণ হয়ে যায়। হামলা করা, হত্যার হুমকি দেয়া- এসব তো ক্রাইম। এসব ক্রাইম বাইরের দেশে হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে হচ্ছে।“

কোথা থেকে এলো পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিকতা

বাংলাদেশে পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিকতা কীভাবে এলো এমন প্রশ্নের উত্তরে নাজমুল জানান, সংবাদপত্র সরকারের উপর নির্ভরশীল। খালি চোখে দেখা না গেলেও বাস্তবতা হলো নিউজপ্রিন্টের শুল্কের জন্য, সরকারি বিজ্ঞাপনের জন্য, কর্মীদের ওয়েজবোর্ডের আগমন ঠেকানোর জন্য সরকারের সঙ্গে অনেকটা লবির মতো কাজ করে। ফলে সরকারের সঙ্গে তার নির্ভরতার সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।

এছাড়াও নাজমুল মনে করেন বিভিন্ন সময়ে সরকারগুলো সাংবাদিকদের ফ্ল্যাট-প্লট দিয়ে সুবিধা দিয়েছে। অনেক সময় ক্ষমতার সঙ্গে সু-সম্পর্ক রেখে অনেকে ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক স্বার্থ উদ্ধার করেছেন, কিংবা বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর হয়ে লবিস্টের মতো কাজ করেছেন। তখন সরকারের সঙ্গে, সরকারি বাহিনী বা আমলাতন্ত্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলতে হয়।

টেলিভিশনগুলোর মালিকানা প্রসঙ্গে নাজমুল বলেন, ব্যবসায়ীরা সৎ সাংবাদিকতা করার জন্য টেলিভিশন চ্যানেল দিচ্ছেন না। তারা প্রফিটের থেকেও ‘ব্যবসায়িক শিল্ড’ হিসেবে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করছেন।

টিভি ব্যবহার করে ব্যবসায়িক শত্রুকে ঘায়েল করা কিংবা প্রতিপক্ষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আক্রমণের কাছ থেকে নিজেকে রক্ষা করা কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর জন্য অনেকে টিভিকে ব্যবহার করেন বলে মনে করেন নাজমুল আহসান।

সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্টতা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে নাজমুল উল্লেখ করেন, যখনই ক্ষমতার পালাবদল হয় তখনই তারা আগের সরকারের ঘনিষ্ট সাংবাদিকদের সরিয়ে দেন এবং নতুন স্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে যারা ঘনিষ্ট তাদের পদে বসিয়ে দেন। তো, এই ধরনের পরিস্থিতিতে কেন সাংবাদিকতা পক্ষপাতদুষ্ট হবে না?

সাংবাদিক গ্রেপ্তারের সমাধান কী

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস-এর মতে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলার একটি স্বচ্ছ ও দ্রুত পর্যালোচনা।

বিশেষ করে যারা বর্তমানে আটক আছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দ্রুত প্রত্যাহার এবং ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া ছাড়া আটক থাকা ব্যক্তিদের মুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করে সিপিজে।

কুনাল মজুমদার আলাপ-কে জানান, “এ বিষয়ে আমি সম্প্রতি মাননীয় মন্ত্রীর কাছেও চিঠি লিখেছি।“

সিপিজে’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত চিঠিতে দেখা যায় ২৭এ এপ্রিল আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বরাবর চিঠি ইমেইলের মাধ্যমে পাঠান সিপিজে’র এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রাম সমন্বয়ক কুনাল মজুমদার। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীর সাথে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি।

সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার হয়েছেন সাংবাদিক শওকত মাহমুদ

কুনাল মজুমদার আলাপ-কে জানান, বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দমনমূলক আইন বাতিল, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার, সাংবাদিকদের সুরক্ষা জোরদার, এবং সহিংসতা ও ভয়ভীতি থেকে রক্ষা নিশ্চিত করা। এখন এই প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে সাংবাদিক সাহেদ আলম মনে করেন তথ্য মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় যৌথভাবে টাস্ক ফোর্স গঠন করে একটি ফাস্ট ট্র্যাক সার্ভিস চালু করতে পারে। যেখান থেকে এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ হতে পারে। সম্প্রতি একজন সাংবাদিকের বিদেশ যাত্রা আটকে দেয়ার প্রসঙ্গে টেনে তিনি আলাপ-কে বলেন,  “তথ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটা টাস্ক ফোর্স রাখলে এই সমস্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ক্ষেত্রে ওভার রিএক্ট করে ফেলছে। এই যেমন, একজন সাংবাদিককে দেশের বাইরে যেতে দেয়া হলো না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রেস ব্রিফিং দেখে মনে হলো তিনি তো এটা জানেনই না”।

কুনাল জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশকে এই চক্র থেকে বের হতে হবে।

“সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আশা করি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক চর্চা গড়ে তুলবেন। যেখানে প্রতিশোধমূলক রাজনীতি থেকে সরে এসে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা বন্ধ হবে”।  

এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গেও একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি।

যদিও মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে জহির উদ্দিন স্বপন সাংবাদিকদের বলেন, “আমি গণমাধ্যমকে সাক্ষী রেখে এই পবিত্র দিনে প্রতিশ্রুতি দিতে চাই, নীতিগতভাবে সমস্ত ধরনের সাংবাদিকদেরকে আইনের আওতায় যতটা সম্ভব তাকে পেশাগত সহযোগিতা দেওয়া হবে। একইসঙ্গে সাংবাদিক হই আর আমি মন্ত্রী হই, আমরা কেউ আইনের উর্ধ্বে উঠতে পারবো না”। 

কুনাল মজুমদারও মনে করেন, সাংবাদিকরা আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অন্য নাগরিকদের মতই তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে অবশ্যই তদন্ত ও বিচার হতে পারে। কিন্তু সেই প্রমাণের মানদন্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চার জন সাংবাদিককে প্রায় দুই বছর চার্জশিট ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে। হত্যা মামলার অভিযোগ থাকলেও আদালতে প্রমাণের উদ্যোগের অভাব অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি আলাপকে বলেছিলেন, “যারা একটা মাফিয়া সরকারকে ক্ষমতায় রাখার জন্য ন্যারেটিভ তৈরি করেছে, তাদের অপরাধ খুনের চেয়েও বেশি। কিন্তু যে মামলা করা হয়েছে, সেটা প্রবলেমেটিক। এটা সঠিক নয়। মনে রাখতে হবে সরকার বিচার বিভাগ না। সুতরাং সরকারের তরফ থেকে কী কী করা যায় সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে”। 

এদিকে কুনাল মজুমদার মনে করেন, আগের সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বয়ান হিসেবে এই গ্রেফতারগুলোকে দেখার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। জনমত কিংবা মিডিয়ার বর্ণনায় এসব ব্যাখ্যা থাকতে পারে, কিন্তু আইনি দৃষ্টিতে হত্যা মামলা গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ। যখন এসব অভিযোগ যথাযথ প্রক্রিয়া বা প্রমাণ ছাড়া দীর্ঘায়িত হয়, তখন রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় থাকা ব্যক্তিদের টার্গেট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।