তামিলনাড়ুর ‘থালাপাতি’: পর্দার বিজয় থেকে রাজনীতির বিজয়
রাহী নায়াব
প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএমআপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম
বাস্তব জগতের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড তার চলচ্চিত্রের ব্যক্তিত্বের সাথে মিলেও যায়। বিভিন্ন বক্তব্যে থালাপতি বিজয়কে শোনা যায় বিধানসভা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দল দ্রাভিড় মুন্নেত্রা কাজাগামের বিরুদ্ধে কথা বলতে। মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্তালিনকে ‘আংকেল’ ডেকে ব্যঙ্গ করেছেন, এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।
পর্দার আলো ঝলমলে নায়ক। বছরজুড়ে যিনি দখলে রাখেন বক্স অফিস। কখনো রোমান্টিক চাহনিতে নায়িকার মন জয়, কখনো শক্ত চোয়ালে শত্রুর সাথে মল্লযুদ্ধ।
তার সেই ‘হিরোইজম’ রাজনীতির ময়দানেও টিকে থাকলো, থালাপাতি হয়ে। থালাপতি তামিল শব্দ। এর অর্থ অধিনায়ক, সেনাপতি বা কমান্ডার।
বিজয় থালাপাতি রাজনীতিতে পা রাখার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, এটা হয়তো তার ‘স্টারডম’ প্রদর্শন। কিন্তু ভোটের ফল বলছে প্রথমবারেই বাজিমাত।
ভারতের তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ের পর এখন সেই অভিনেতাই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু, জোসেফ ‘থালাপতি’ বিজয় চন্দ্রশেখর।
বড় পর্দা থেকে রাজনীতির মাঠে যাত্রা তামিলনাড়ুতে নতুন নয়। এই রাজ্যে একাধিকবার অভিনেতারা পর্দা থেকে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। এম জি রামাচন্দ্রন এবং জয়ললিতা মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছেন।
এই তালিকায় সর্বশেষ নাম লিখিয়েছেন বড় পর্দার হিরো জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর বা থালাপতি বিজয়। যিনি ২০২৪ সালে চলচ্চিত্র ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন তার রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম (টিভিকে)।
তবে দল প্রতিষ্ঠাই রাজনীতির অঙ্গনে থালাপতি বিজয়ের যাত্রার শুরু নয়। ২০০৯ সালে তিনি ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কম’ নামে ফ্যানক্লাব চালু করেন। এই ফ্যানক্লাবের সদস্যরা ২০১১ সালে তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাভিড় মুন্নেত্রা কাজাগাম-কে সমর্থন জানান।
২০২২ সালের স্থানীয় নির্বাচনে ভোটে লড়ে ১৫টি আসনও জিতে যান এই ফ্যানক্লাবের সদস্যরা। ২০১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে পাস হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেছিলেন, এই আইনের কারণে ভারতের ‘সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে’।
২০২৪ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম প্রতিষ্ঠা করেন ও অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন ৫১ বছর বয়সী এই নায়ক। এ বছর মে মাসে মুক্তি পাবে তার ক্যারিয়ারের শেষ ছবি, “জানা নায়াগান” (জননায়ক)।
ফিল্ম ক্রিটিক প্রিতম কে চক্রবর্তী বিবিসিকে বলেন, থালাপতি বিজয়ের রাজনীতির মাঠে প্রবেশ কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। তিনি বলেন, “এর বীজ বুনেছিলেন তার বাবা, যিনি কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন ছিলেন এবং রাজনীতিতে যোগ দিতে উৎসুক ছিলেন।”
আশির দশকে শিশু অভিনেতা হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় থালাপতি বিজয়ের। ১৯৯২ সালে তার বাবা চলচ্চিত্র নির্মাতা এস এ চন্দ্রশেখরের নির্মিত ‘নালাইয়া থিরপু’-তে মুখ্য অভিনেতা হিসেবে আসেন বিজয়।
পরের তিন দশকে প্রায় ৭০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন বিজয়। রোমান্টিক নায়ক থেকে অ্যাংরি ইয়ং ম্যান, এবং পরে ন্যায়ের জন্য লড়াই করা হিরো হিসেবে পর্দায় দেখা যায় তাকে।
প্রিতম কে চক্রবর্তী বিবিসিকে বলেন, “পর্দায় তার দুর্নীতিহীন, সংযমী এবং নীতিবান ভাবমূর্তি দ্রাবিড় রাজনীতির নৈতিক আদর্শকেই প্রতিফলিত করত। এটি একটি সিনেম্যাটিক গ্রামার যা তামিল দর্শকরা সহজেই চিনতে পারেন।”
থালাপতি বিজয় তার রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করার অনেক আগেই চলচ্চিত্র দ্বারা তার রাজনীতির মতাদর্শিক ভিত্তি তৈরি করতে শুরু করেন। পর্দায় তার ব্যক্তিত্ব ছিল আদর্শ তামিল রাজনৈতিক হিরো, সিনেমা লঞ্চের ঘোষণার র্যালিতে থাকতো রাজনৈতিক আবহাওয়া, ফ্যানক্লাব কাজ করতো তৃণমূল নেটওয়ার্কের মতো।
বাস্তব জগতের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড তার চলচ্চিত্রের ব্যক্তিত্বের সাথে মিলেও যায়। বিভিন্ন বক্তব্যে থালাপতি বিজয়কে শোনা যায় বিধানসভা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দল দ্রাভিড় মুন্নেত্রা কাজাগামের বিরুদ্ধে কথা বলতে। মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্তালিনকে ‘আংকেল’ ডেকে ব্যঙ্গ করেছেন, এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।
২০২৫ সালে বিতর্কের মুখে পড়েন থালাপতি ও তার দল।
তামিলনাড়ুর কারুরে তামিলাগা ভেটরি কাজাগামের এক রাজনৈতিক সভায় হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে নিহত হন ৪০জন। ঘটনার পর দলটি সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং থালাপতি বিজয়ের নেতৃত্বের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নিহত ও ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিজয়।
দুর্নীতি দমন, সামাজিক ন্যায়বিচার, তামিল গর্ব ও বিজয়ের ভাষায় ‘কেন্দ্রীয় সরকারের স্বৈরাচারিতা’ প্রতিরোধের বয়ান হয়ে গেছে টিভিকে-র রাজনৈতিক ভিত্তি।
এতে দলটির রাজনৈতিক সভায় অনেক মানুষ এলেও, অঞ্চলটির বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা নির্বাচনের আগে থালাপতির বিজয়ের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। দ্রাভিড় মুন্নেত্রা কাজাগামের মুখপাত্র মানুরাজ শুনমুগাসুন্দরমের ভাষ্যে, ‘তামিলনাড়ু এর আগে অনেক বিজয় দেখেছে’।
তবে সব সমালোচনা ও সন্দেহের পরও প্রকাশ্যে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা থালাপতি বিজয় জিতে গেছেন তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে। জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর হতে চলেছেন তামিলনাড়ুর সম্ভাব্য ‘থালাপতি’।
তামিলনাড়ুর ‘থালাপাতি’: পর্দার বিজয় থেকে রাজনীতির বিজয়
পর্দার আলো ঝলমলে নায়ক। বছরজুড়ে যিনি দখলে রাখেন বক্স অফিস। কখনো রোমান্টিক চাহনিতে নায়িকার মন জয়, কখনো শক্ত চোয়ালে শত্রুর সাথে মল্লযুদ্ধ।
তার সেই ‘হিরোইজম’ রাজনীতির ময়দানেও টিকে থাকলো, থালাপাতি হয়ে। থালাপতি তামিল শব্দ। এর অর্থ অধিনায়ক, সেনাপতি বা কমান্ডার।
বিজয় থালাপাতি রাজনীতিতে পা রাখার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, এটা হয়তো তার ‘স্টারডম’ প্রদর্শন। কিন্তু ভোটের ফল বলছে প্রথমবারেই বাজিমাত।
ভারতের তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ের পর এখন সেই অভিনেতাই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু, জোসেফ ‘থালাপতি’ বিজয় চন্দ্রশেখর।
বড় পর্দা থেকে রাজনীতির মাঠে যাত্রা তামিলনাড়ুতে নতুন নয়। এই রাজ্যে একাধিকবার অভিনেতারা পর্দা থেকে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। এম জি রামাচন্দ্রন এবং জয়ললিতা মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছেন।
এই তালিকায় সর্বশেষ নাম লিখিয়েছেন বড় পর্দার হিরো জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর বা থালাপতি বিজয়। যিনি ২০২৪ সালে চলচ্চিত্র ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন তার রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম (টিভিকে)।
তবে দল প্রতিষ্ঠাই রাজনীতির অঙ্গনে থালাপতি বিজয়ের যাত্রার শুরু নয়। ২০০৯ সালে তিনি ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কম’ নামে ফ্যানক্লাব চালু করেন। এই ফ্যানক্লাবের সদস্যরা ২০১১ সালে তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাভিড় মুন্নেত্রা কাজাগাম-কে সমর্থন জানান।
২০২২ সালের স্থানীয় নির্বাচনে ভোটে লড়ে ১৫টি আসনও জিতে যান এই ফ্যানক্লাবের সদস্যরা। ২০১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে পাস হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেছিলেন, এই আইনের কারণে ভারতের ‘সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে’।
২০২৪ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম প্রতিষ্ঠা করেন ও অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন ৫১ বছর বয়সী এই নায়ক। এ বছর মে মাসে মুক্তি পাবে তার ক্যারিয়ারের শেষ ছবি, “জানা নায়াগান” (জননায়ক)।
ফিল্ম ক্রিটিক প্রিতম কে চক্রবর্তী বিবিসিকে বলেন, থালাপতি বিজয়ের রাজনীতির মাঠে প্রবেশ কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। তিনি বলেন, “এর বীজ বুনেছিলেন তার বাবা, যিনি কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন ছিলেন এবং রাজনীতিতে যোগ দিতে উৎসুক ছিলেন।”
আশির দশকে শিশু অভিনেতা হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় থালাপতি বিজয়ের। ১৯৯২ সালে তার বাবা চলচ্চিত্র নির্মাতা এস এ চন্দ্রশেখরের নির্মিত ‘নালাইয়া থিরপু’-তে মুখ্য অভিনেতা হিসেবে আসেন বিজয়।
পরের তিন দশকে প্রায় ৭০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন বিজয়। রোমান্টিক নায়ক থেকে অ্যাংরি ইয়ং ম্যান, এবং পরে ন্যায়ের জন্য লড়াই করা হিরো হিসেবে পর্দায় দেখা যায় তাকে।
প্রিতম কে চক্রবর্তী বিবিসিকে বলেন, “পর্দায় তার দুর্নীতিহীন, সংযমী এবং নীতিবান ভাবমূর্তি দ্রাবিড় রাজনীতির নৈতিক আদর্শকেই প্রতিফলিত করত। এটি একটি সিনেম্যাটিক গ্রামার যা তামিল দর্শকরা সহজেই চিনতে পারেন।”
থালাপতি বিজয় তার রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করার অনেক আগেই চলচ্চিত্র দ্বারা তার রাজনীতির মতাদর্শিক ভিত্তি তৈরি করতে শুরু করেন। পর্দায় তার ব্যক্তিত্ব ছিল আদর্শ তামিল রাজনৈতিক হিরো, সিনেমা লঞ্চের ঘোষণার র্যালিতে থাকতো রাজনৈতিক আবহাওয়া, ফ্যানক্লাব কাজ করতো তৃণমূল নেটওয়ার্কের মতো।
বাস্তব জগতের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড তার চলচ্চিত্রের ব্যক্তিত্বের সাথে মিলেও যায়। বিভিন্ন বক্তব্যে থালাপতি বিজয়কে শোনা যায় বিধানসভা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দল দ্রাভিড় মুন্নেত্রা কাজাগামের বিরুদ্ধে কথা বলতে। মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্তালিনকে ‘আংকেল’ ডেকে ব্যঙ্গ করেছেন, এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।
২০২৫ সালে বিতর্কের মুখে পড়েন থালাপতি ও তার দল।
তামিলনাড়ুর কারুরে তামিলাগা ভেটরি কাজাগামের এক রাজনৈতিক সভায় হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে নিহত হন ৪০জন। ঘটনার পর দলটি সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং থালাপতি বিজয়ের নেতৃত্বের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নিহত ও ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিজয়।
দুর্নীতি দমন, সামাজিক ন্যায়বিচার, তামিল গর্ব ও বিজয়ের ভাষায় ‘কেন্দ্রীয় সরকারের স্বৈরাচারিতা’ প্রতিরোধের বয়ান হয়ে গেছে টিভিকে-র রাজনৈতিক ভিত্তি।
এতে দলটির রাজনৈতিক সভায় অনেক মানুষ এলেও, অঞ্চলটির বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা নির্বাচনের আগে থালাপতির বিজয়ের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। দ্রাভিড় মুন্নেত্রা কাজাগামের মুখপাত্র মানুরাজ শুনমুগাসুন্দরমের ভাষ্যে, ‘তামিলনাড়ু এর আগে অনেক বিজয় দেখেছে’।
তবে সব সমালোচনা ও সন্দেহের পরও প্রকাশ্যে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা থালাপতি বিজয় জিতে গেছেন তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে। জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর হতে চলেছেন তামিলনাড়ুর সম্ভাব্য ‘থালাপতি’।