আসিম মুনিরের ভূরাজনৈতিক 'সাফল্য' পাকিস্তানকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
পাকিস্তানের এই মিশ্র বা 'হাইব্রিড' ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সামরিক নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন ফিল্ড মার্শাল। সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তির মতে, বর্তমানে বেসামরিক সরকার বলতে অবশিষ্ট রয়েছে কেবল ‘একটি খোলস বা মুখোশ’। দিন দিন সেনাবাহিনীর এই একাধিপত্য এখন সবই স্বীকার করে নিচ্ছে প্রকাশ্যেই।
আলাপ ডেস্ক
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫৪ পিএমআপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১২ পিএম
সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছেন সেই ব্যক্তি, যাকে ট্রাম্প ডেকেছেন তার “প্রিয় ফিল্ড মার্শাল”।
একুশেএপ্রিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সময় শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। নতুন করে সংঘাত শুরুর হুমকির মুখে ডনাল্ড ট্রাম্প একটি ঘোষণা দেন। তিনি জানান যে, অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হবে, যাতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। আর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে পাকিস্তানের অনুরোধে।
এরপর যাই ঘটুক না কেন, পাকিস্তানের জন্য এটি কিছুটা হলেও গর্বের বিষয়। কয়েক দশক ধরে দেশটি মূলত আইএমএফ-এর অন্তহীন ঋণ সহায়তা এবং সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর বিদ্রোহের জন্যই পরিচিত ছিলো। কিন্তু সেই পাকিস্তান এখন বিশ্ব রাজনীতির একজন দক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে।
সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছেন সেই ব্যক্তি, যাকে ট্রাম্প ডেকেছেন তার “প্রিয় ফিল্ড মার্শাল”। এই সংকটের পুরোটা সময় পাকিস্তানের গোঁফওয়ালা সেনাপ্রধান আসিম মুনির ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাথে নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ রেখেছেন।
কূটনীতিকরা বলছেন, আসিম মুনির নজর দিচ্ছেন প্রতিটি বিষয়ের গভীরে। গত সপ্তাহে আলোচনার প্রথম রাউন্ডে দেখা গেছে যে, মূল নেতাদের মধ্যে একমাত্র তিনিই অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে নোট নিচ্ছেন।
সাবেক এই গোয়েন্দা প্রধান গত সপ্তাহে তেহরানে তিন দিন সময় কাটিয়েছেন। বোমাবর্ষণ থামার পর উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি হিসেবে তিনিই প্রথম সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। এর পরপরই ইরান জানায় যে, তারা হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে (যদিও পরে ট্রাম্পের অবরোধের প্রতিবাদে তারা সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে)।
কিছু পর্যবেক্ষক এই সামরিক শক্তিধরের এমন চটপটে কর্মকাণ্ড দেখে বেশ অবাক হয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তানের যারা তার দ্রুত উত্থান দেখেছেন, তাদের মতে তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, ধূর্ত, কঠোর হৃদয়ের এবং উচ্চাভিলাষী মানুষ। ২০২২ সালে সেনাপ্রধান হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি দ্রুতই পাকিস্তানের এই প্রজন্মের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হয়ে উঠেছেন। প্রথমে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করেন, এরপর বিরোধীদের কোণঠাসা করেন এবং সরকারের ওপর নিজের প্রভাব বিস্তার করেন। ধারণা করা হয়, সংবিধানের কিছু মারপ্যাঁচে তিনি এক দশক বা তারও বেশি সময়ের জন্য নিজের অবস্থান নিরাপদ করে নিয়েছেন। পাকিস্তানে এ নিয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ নেই যে, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ নন বরং দেশ চালাচ্ছেন আসলে আসিম মুনিরই।
বিশ্বের পঞ্চম জনবহুল দেশ এবং একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তার প্রাপ্য আসনে বসানোই ফিল্ড মার্শাল মুনিরের স্বপ্ন। যদিও পাকিস্তানের লক্ষ লক্ষ মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছেন। সাফল্যের চূড়ায় থাকার এই সূবর্ণ সুযোগকে কি তিনি ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারবেন? নাকি আবার একজন সামরিক শক্তিধরের আধিপত্য পাকিস্তানের সমস্যাগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলবে?
এই ধরনের “ঝুঁকিপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতি”তে পাকিস্তানের জড়িত হওয়া এবারই প্রথম না। দেশটির একজন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মতে, “বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে খেলার এক ধরনের নেশা” পাকিস্তানের সামরিক নেতাদের দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। ১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফরের আগে পাকিস্তান টানা তিন বছর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে গোপন যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছিলো। তিনি আরও বলেন, তবে এ ধরনের সূক্ষ্ম কাজগুলো দেশটির শাসকদের আত্মতৃপ্তি বাড়িয়েছে অথবা দেশের অভ্যন্তরে বিরোধীদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান শক্ত করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য তেমন কোনো সুফল বয়ে আনেনি।
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। ইরানের প্রসঙ্গ টেনেই এমনটা বলা যায়। সম্প্রতি সদিচ্ছা থাকলেও, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে একটি জটিল সম্পর্ক ছিল, যা সীমান্তের উভয় পাশের বিদ্রোহী তৎপরতার কারণে আরও খারাপের দিকে গেছে। পাকিস্তানের আশঙ্কা হলো, যুদ্ধ চলতে থাকলে শরণার্থীর ঢল নামবে এবং তাদের দেশের বিশাল শিয়া জনগোষ্ঠী অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু পাকিস্তান যদি সফলভাবে মধ্যস্থতা করতে পারে, তবে কূটনীতিকরা আশা করছেন যে, ইরানের পুনর্গঠন কাজে পাকিস্তান বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে। এটি দেশটির তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করবে। এছাড়া আলোচনার টেবিলে পাকিস্তানের এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে যে নিষেধাজ্ঞাগুলোর জন্য দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ‘ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন’ প্রকল্পটি আটকে আছে, সেগুলো উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।
ফিল্ড মার্শাল মুনির পাকিস্তানের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের আশাও রাখছেন। সাবেক সিনেটর মুশাহিদ হোসেনের মতে, যুদ্ধের পর উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের আগের চেয়ে বেশি অনিরাপদ মনে করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ওপর আর ভরসা করতে পারবে না। পাকিস্তানের সবচেয়ে, অনেকের মতে একমাত্র, কার্যকর প্রতিষ্ঠান হলো তাদের বিশাল এবং সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী। এ বছর দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত বছর সৌদি আরবের সাথে পারস্পরিক যে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছে, সেই চুক্তিকে মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে সৌদি আরবে পাকিস্তানের প্রায় ১৩ হাজার সৈন্য এবং ১৮টি যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। এই চুক্তির বিস্তারিত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন যে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিনিময়ে সৌদি আরব পাকিস্তানে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য মিশর, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং সম্ভবত আরও কিছু দেশকে নিয়ে এক ধরনের “ইসলামিক নেটো” তৈরির আলোচনাও বেশ জোরালো হচ্ছে।
পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খারের মতে, গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলিতে, ভারতের কাছেও আসল বাস্তবতা পরিষ্কার হয়েছে। ভারত দীর্ঘকাল ধরে পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করার চেষ্টা করে আসছে এবং গত বছর দুই দেশের মধ্যে হওয়া চার দিনের যুদ্ধের পর সেই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করেছিলো দেশটি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অবস্থান শক্ত করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের সাথেই সম্পর্ক উন্নত করেছে। অন্যদিকে ভারত শুধু পাশ থেকে দর্শক হয়ে তাকিয়ে আছে।
ফিল্ড মার্শাল মুনির যদিও ভালোই চাল চালছে, তবে এই ভূ-রাজনৈতিক সাফল্য দেশের ভেতরের সমস্যা সমাধানে খুব একটা কাজে নাও আসতে পারে। আইএমএফ-এর ঋণের বোঝা এবং সন্ত্রাসী বিদ্রোহের সেই পুরোনো আতঙ্কগুলো এখনও রয়ে গেছে। গত এক দশকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান খুব একটা বাড়েনি। দেশের অর্থনীতিকে সচল করতে ফিল্ড মার্শালের পরিকল্পনার বড় অংশ জুড়েই আছে অর্থনীতির ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো। তার সভাপতিত্বে গঠিত একটি ইনভেস্টমেন্ট কাউন্সিল বা বিনিয়োগ পরিষদ এখন পর্যন্ত খুব কম সুফল বয়ে এনেছে। পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী। তবে শাসকগোষ্ঠী বিরোধী দলগুলোকে কোনো ধরনের প্রতিবাদ না করতে দেওয়ায় মানুষের ক্ষোভ এখনও চাপা রয়েছে। বড় শহরগুলোতে গ্যাস সংকট ও লোডশেডিং চলছে এবং আগামী মাসগুলোতে খাবারের দাম আরও বাড়তে পারে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, যদি ফিল্ড মার্শাল এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে না পারেন, তবে তিনি দমন-পীড়নের পথ বেছে নিতে পারেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখন নির্জন কারাগারে আছেন। একজন জনপ্রিয় নেতা হিসেবে দেশ শাসন করার পর, ২০২২ সালে রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিধররা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং পরে ভিত্তিহীন অভিযোগে তাকে বন্দি করা হয়। কারাগারে বন্দী থাকায় তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। ইমরানের বোন আলিমার মতে, এখন তার অবস্থান হলো “হয় মুক্তি, নয় মৃত্যু”।
অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ফিল্ড মার্শাল যত দিন ক্ষমতায় আছেন, তত দিন ইমরান খানের মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বিরোধী দলগুলোর মতে, আরও শত শত মানুষকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ইমরান খানের দল পিটিআই, যা কি না আংশিকভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তার একজন সিনেটর আলী জাফর। তিনি বলেন, “আমরা যখনই কোনো প্রতিবাদের পরিকল্পনা করি, আমাদের লোকদের তুলে নিয়ে অজানা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়।” প্রবীণ ইসলামপন্থি নেতা ফজলুর রহমান অভিযোগ করেছেন যে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। তবে তিনি এটা বলেন যে, ফিল্ড মার্শাল একজন “ভালো মানুষ এবং সাহসী সৈনিক”।
দেশটিতে এখনও নামমাত্র একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রয়েছে; এমনকি ইমরান খানের দল পিটিআই এখনও একটি প্রদেশ শাসন করছে। কিন্তু পাকিস্তানের এই মিশ্র বা 'হাইব্রিড' ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সামরিক নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন ফিল্ড মার্শাল। সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তির মতে, বর্তমানে বেসামরিক সরকার বলতে অবশিষ্ট রয়েছে কেবল ‘একটি খোলস বা মুখোশ’। দিন দিন সেনাবাহিনীর এই একাধিপত্য এখন সবই স্বীকার করে নিচ্ছে প্রকাশ্যেই।
অতীতে পাকিস্তানের জেনারেলরা সাধারণত পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতার চাবিকাঠি ঘোরাতে পছন্দ করতেন, যাতে জনগণের সব ক্ষোভ রাজনীতিবিদদের ওপর গিয়ে পড়ে। কিন্তু ফিল্ড মার্শাল মুনিরের উত্থানের একটি বড় ফলাফল হলো, তিনি নিজেকে একেবারে সামনে এবং কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।
আসিম মুনিরের ভূরাজনৈতিক 'সাফল্য' পাকিস্তানকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
পাকিস্তানের এই মিশ্র বা 'হাইব্রিড' ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সামরিক নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন ফিল্ড মার্শাল। সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তির মতে, বর্তমানে বেসামরিক সরকার বলতে অবশিষ্ট রয়েছে কেবল ‘একটি খোলস বা মুখোশ’। দিন দিন সেনাবাহিনীর এই একাধিপত্য এখন সবই স্বীকার করে নিচ্ছে প্রকাশ্যেই।
একুশেএপ্রিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সময় শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। নতুন করে সংঘাত শুরুর হুমকির মুখে ডনাল্ড ট্রাম্প একটি ঘোষণা দেন। তিনি জানান যে, অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হবে, যাতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। আর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে পাকিস্তানের অনুরোধে।
এরপর যাই ঘটুক না কেন, পাকিস্তানের জন্য এটি কিছুটা হলেও গর্বের বিষয়। কয়েক দশক ধরে দেশটি মূলত আইএমএফ-এর অন্তহীন ঋণ সহায়তা এবং সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর বিদ্রোহের জন্যই পরিচিত ছিলো। কিন্তু সেই পাকিস্তান এখন বিশ্ব রাজনীতির একজন দক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে।
সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছেন সেই ব্যক্তি, যাকে ট্রাম্প ডেকেছেন তার “প্রিয় ফিল্ড মার্শাল”। এই সংকটের পুরোটা সময় পাকিস্তানের গোঁফওয়ালা সেনাপ্রধান আসিম মুনির ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাথে নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ রেখেছেন।
কূটনীতিকরা বলছেন, আসিম মুনির নজর দিচ্ছেন প্রতিটি বিষয়ের গভীরে। গত সপ্তাহে আলোচনার প্রথম রাউন্ডে দেখা গেছে যে, মূল নেতাদের মধ্যে একমাত্র তিনিই অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে নোট নিচ্ছেন।
সাবেক এই গোয়েন্দা প্রধান গত সপ্তাহে তেহরানে তিন দিন সময় কাটিয়েছেন। বোমাবর্ষণ থামার পর উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি হিসেবে তিনিই প্রথম সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। এর পরপরই ইরান জানায় যে, তারা হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে (যদিও পরে ট্রাম্পের অবরোধের প্রতিবাদে তারা সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে)।
কিছু পর্যবেক্ষক এই সামরিক শক্তিধরের এমন চটপটে কর্মকাণ্ড দেখে বেশ অবাক হয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তানের যারা তার দ্রুত উত্থান দেখেছেন, তাদের মতে তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, ধূর্ত, কঠোর হৃদয়ের এবং উচ্চাভিলাষী মানুষ। ২০২২ সালে সেনাপ্রধান হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি দ্রুতই পাকিস্তানের এই প্রজন্মের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হয়ে উঠেছেন। প্রথমে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করেন, এরপর বিরোধীদের কোণঠাসা করেন এবং সরকারের ওপর নিজের প্রভাব বিস্তার করেন। ধারণা করা হয়, সংবিধানের কিছু মারপ্যাঁচে তিনি এক দশক বা তারও বেশি সময়ের জন্য নিজের অবস্থান নিরাপদ করে নিয়েছেন। পাকিস্তানে এ নিয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ নেই যে, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ নন বরং দেশ চালাচ্ছেন আসলে আসিম মুনিরই।
বিশ্বের পঞ্চম জনবহুল দেশ এবং একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তার প্রাপ্য আসনে বসানোই ফিল্ড মার্শাল মুনিরের স্বপ্ন। যদিও পাকিস্তানের লক্ষ লক্ষ মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছেন। সাফল্যের চূড়ায় থাকার এই সূবর্ণ সুযোগকে কি তিনি ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারবেন? নাকি আবার একজন সামরিক শক্তিধরের আধিপত্য পাকিস্তানের সমস্যাগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলবে?
এই ধরনের “ঝুঁকিপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতি”তে পাকিস্তানের জড়িত হওয়া এবারই প্রথম না। দেশটির একজন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মতে, “বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে খেলার এক ধরনের নেশা” পাকিস্তানের সামরিক নেতাদের দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। ১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফরের আগে পাকিস্তান টানা তিন বছর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে গোপন যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছিলো। তিনি আরও বলেন, তবে এ ধরনের সূক্ষ্ম কাজগুলো দেশটির শাসকদের আত্মতৃপ্তি বাড়িয়েছে অথবা দেশের অভ্যন্তরে বিরোধীদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান শক্ত করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য তেমন কোনো সুফল বয়ে আনেনি।
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। ইরানের প্রসঙ্গ টেনেই এমনটা বলা যায়। সম্প্রতি সদিচ্ছা থাকলেও, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে একটি জটিল সম্পর্ক ছিল, যা সীমান্তের উভয় পাশের বিদ্রোহী তৎপরতার কারণে আরও খারাপের দিকে গেছে। পাকিস্তানের আশঙ্কা হলো, যুদ্ধ চলতে থাকলে শরণার্থীর ঢল নামবে এবং তাদের দেশের বিশাল শিয়া জনগোষ্ঠী অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু পাকিস্তান যদি সফলভাবে মধ্যস্থতা করতে পারে, তবে কূটনীতিকরা আশা করছেন যে, ইরানের পুনর্গঠন কাজে পাকিস্তান বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে। এটি দেশটির তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করবে। এছাড়া আলোচনার টেবিলে পাকিস্তানের এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে যে নিষেধাজ্ঞাগুলোর জন্য দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ‘ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন’ প্রকল্পটি আটকে আছে, সেগুলো উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।
ফিল্ড মার্শাল মুনির পাকিস্তানের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের আশাও রাখছেন। সাবেক সিনেটর মুশাহিদ হোসেনের মতে, যুদ্ধের পর উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের আগের চেয়ে বেশি অনিরাপদ মনে করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ওপর আর ভরসা করতে পারবে না। পাকিস্তানের সবচেয়ে, অনেকের মতে একমাত্র, কার্যকর প্রতিষ্ঠান হলো তাদের বিশাল এবং সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী। এ বছর দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত বছর সৌদি আরবের সাথে পারস্পরিক যে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছে, সেই চুক্তিকে মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে সৌদি আরবে পাকিস্তানের প্রায় ১৩ হাজার সৈন্য এবং ১৮টি যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। এই চুক্তির বিস্তারিত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন যে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিনিময়ে সৌদি আরব পাকিস্তানে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য মিশর, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং সম্ভবত আরও কিছু দেশকে নিয়ে এক ধরনের “ইসলামিক নেটো” তৈরির আলোচনাও বেশ জোরালো হচ্ছে।
পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খারের মতে, গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলিতে, ভারতের কাছেও আসল বাস্তবতা পরিষ্কার হয়েছে। ভারত দীর্ঘকাল ধরে পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করার চেষ্টা করে আসছে এবং গত বছর দুই দেশের মধ্যে হওয়া চার দিনের যুদ্ধের পর সেই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করেছিলো দেশটি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অবস্থান শক্ত করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের সাথেই সম্পর্ক উন্নত করেছে। অন্যদিকে ভারত শুধু পাশ থেকে দর্শক হয়ে তাকিয়ে আছে।
ফিল্ড মার্শাল মুনির যদিও ভালোই চাল চালছে, তবে এই ভূ-রাজনৈতিক সাফল্য দেশের ভেতরের সমস্যা সমাধানে খুব একটা কাজে নাও আসতে পারে। আইএমএফ-এর ঋণের বোঝা এবং সন্ত্রাসী বিদ্রোহের সেই পুরোনো আতঙ্কগুলো এখনও রয়ে গেছে। গত এক দশকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান খুব একটা বাড়েনি। দেশের অর্থনীতিকে সচল করতে ফিল্ড মার্শালের পরিকল্পনার বড় অংশ জুড়েই আছে অর্থনীতির ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো। তার সভাপতিত্বে গঠিত একটি ইনভেস্টমেন্ট কাউন্সিল বা বিনিয়োগ পরিষদ এখন পর্যন্ত খুব কম সুফল বয়ে এনেছে। পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী। তবে শাসকগোষ্ঠী বিরোধী দলগুলোকে কোনো ধরনের প্রতিবাদ না করতে দেওয়ায় মানুষের ক্ষোভ এখনও চাপা রয়েছে। বড় শহরগুলোতে গ্যাস সংকট ও লোডশেডিং চলছে এবং আগামী মাসগুলোতে খাবারের দাম আরও বাড়তে পারে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, যদি ফিল্ড মার্শাল এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে না পারেন, তবে তিনি দমন-পীড়নের পথ বেছে নিতে পারেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখন নির্জন কারাগারে আছেন। একজন জনপ্রিয় নেতা হিসেবে দেশ শাসন করার পর, ২০২২ সালে রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিধররা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং পরে ভিত্তিহীন অভিযোগে তাকে বন্দি করা হয়। কারাগারে বন্দী থাকায় তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। ইমরানের বোন আলিমার মতে, এখন তার অবস্থান হলো “হয় মুক্তি, নয় মৃত্যু”।
অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ফিল্ড মার্শাল যত দিন ক্ষমতায় আছেন, তত দিন ইমরান খানের মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বিরোধী দলগুলোর মতে, আরও শত শত মানুষকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ইমরান খানের দল পিটিআই, যা কি না আংশিকভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তার একজন সিনেটর আলী জাফর। তিনি বলেন, “আমরা যখনই কোনো প্রতিবাদের পরিকল্পনা করি, আমাদের লোকদের তুলে নিয়ে অজানা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়।” প্রবীণ ইসলামপন্থি নেতা ফজলুর রহমান অভিযোগ করেছেন যে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। তবে তিনি এটা বলেন যে, ফিল্ড মার্শাল একজন “ভালো মানুষ এবং সাহসী সৈনিক”।
দেশটিতে এখনও নামমাত্র একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রয়েছে; এমনকি ইমরান খানের দল পিটিআই এখনও একটি প্রদেশ শাসন করছে। কিন্তু পাকিস্তানের এই মিশ্র বা 'হাইব্রিড' ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সামরিক নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন ফিল্ড মার্শাল। সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তির মতে, বর্তমানে বেসামরিক সরকার বলতে অবশিষ্ট রয়েছে কেবল ‘একটি খোলস বা মুখোশ’। দিন দিন সেনাবাহিনীর এই একাধিপত্য এখন সবই স্বীকার করে নিচ্ছে প্রকাশ্যেই।
অতীতে পাকিস্তানের জেনারেলরা সাধারণত পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতার চাবিকাঠি ঘোরাতে পছন্দ করতেন, যাতে জনগণের সব ক্ষোভ রাজনীতিবিদদের ওপর গিয়ে পড়ে। কিন্তু ফিল্ড মার্শাল মুনিরের উত্থানের একটি বড় ফলাফল হলো, তিনি নিজেকে একেবারে সামনে এবং কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।
(দ্য ইকনমিস্ট থেকে অনুবাদ করা)
বিষয়: