আনন্দের দিনে চাপা কান্না, এসএসসির ফল কি শিক্ষার আয়না?
আমরা এতদিন শিক্ষার্থীদের সত্যিই শেখাচ্ছিলাম, নাকি পরীক্ষার ফল ভালো দেখানোর চেষ্টা করছিলাম? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুধু এবারের এসএসসি’র ফল নয়, ফিরে তাকাতে হবে গত দুই দশকের গল্পের দিকে।
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএমআপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম
আনন্দের ছবির ঠিক পাশেই এবার ছিল অন্য এক বাংলাদেশ হতাশা, আক্ষেপ আর নীরব কান্নার।
পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন গত কয়েক দশকে এমন ছবিই সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
কিন্তু এই আনন্দের ছবির ঠিক পাশেই এবার ছিল অন্য এক বাংলাদেশ হতাশা, আক্ষেপ আর নীরব কান্নার।
কারণ, প্রায় দুই দশকের মধ্যে এবারই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার সবচেয়ে নিচে। ১১ বোর্ড মিলিয়ে পাস করেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। অনুত্তীর্ণ হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯১ হাজার।
আরও একটি সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। এবার ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩৪টি। অর্থাৎ এক বছরে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৭৮টি, প্রায় ২ দশমিক ৩ গুণ।
তাহলে ফল খারাপ হয়েছে মানেই কি শিক্ষার মান খারাপ হয়েছে?
নাকি এতদিনের মূল্যায়ন ব্যবস্থার ফাঁকফোকরই এবার সামনে এসেছে?
আমরা এতদিন শিক্ষার্থীদের সত্যিই শেখাচ্ছিলাম, নাকি পরীক্ষার ফল ভালো দেখানোর চেষ্টা করছিলাম?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুধু এবারের ফল নয়, ফিরে তাকাতে হবে গত দুই দশকের গল্পের দিকে।
প্রায় দুই দশকের গল্পটা কী বলছে
২০০৭ সালে এসএসসি ও সমমানে পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপর কয়েক বছর ধরে তা দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালে পাসের হার উঠে যায় ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশে তখন সেটিই ছিল সর্বোচ্চ।
এরপর করোনার ধাক্কায় পরীক্ষাব্যবস্থায় আসে বড় পরিবর্তন। ২০২১ সালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নিয়ে পাসের হার দাঁড়ায় ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশে।
এরপর আবার শুরু হয় পতন। ২০২৫ সালে পাসের হার নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে যা তখন ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। এবার সেটিও ছাড়িয়ে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমেছে।
অর্থাৎ ৯০ শতাংশের ওপরে পাসের সেই সময় থেকে আজকের ৬২ শতাংশে আসার গল্পটি শুধু শিক্ষার্থীদের সক্ষমতার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, কোভিডের শেখার ক্ষতি, অটোপাস এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন।
বিশেষ করে অটোপাসের বিষয়টি এখন নতুন করে আলোচনায় আসছে।
করোনার সময় পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় একের পর এক পরিবর্তন আসে। পরীক্ষা বাতিল, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং বিকল্প মূল্যায়নের মতো সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্মকে স্বাভাবিক পরীক্ষা-ব্যবস্থার বাইরে যেতে হয়।
সরকারের সঙ্গে বদলায় ভালোর সংজ্ঞাও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদের মতে, শিক্ষার ফলাফল নিয়ে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গিতেই বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তার ভাষায়, “আগে যারা ছিলেন তারা মনে করতেন পাশের হার বেড়েছে মানে শিক্ষার মান বেড়েছে। আবার এখন যারা আছেন তারা মনে করছেন পাশের হার কমেছে মানে কোয়ালিটি এডুকেশন বেড়েছে। কিন্তু আসলে পাশের হারের ওপর শিক্ষার মান নির্ভর করে না। এটা অনেকটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।”
তার এই বক্তব্যের মধ্যেই গত কয়েক বছরের দুই ধরনের সরকারি দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় বেশি পাসের হার, বেশি জিপিএ-৫ এবং ভালো ফলাফলকে শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হতো। অর্থাৎ যত বেশি শিক্ষার্থী পাস করবে, তত ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা; এমন একটি ধারণাই সামনে ছিল।
বর্তমান সরকারের অবস্থান অনেকটাই ভিন্ন। আগের অটোপাসের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে শিক্ষামন্ত্রী এ এন এম এহছানুল হক মিলন চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার আগে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “অটোপাসের আর কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।” অর্থাৎ পরীক্ষা হবে, মূল্যায়ন হবে এবং শিক্ষার্থী যে ফল পাওয়ার যোগ্য, সেটিই তাকে দেওয়া হবে।
ফল প্রকাশের সংবাদ সম্মেলনেও শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “মন খুলে গান গাওয়া যায়, মন খুলে নাম্বার দেওয়া যায় না।”
সরকারের দাবি, এবার সেই নীতিই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সব শিক্ষা বোর্ডে একক প্রশ্নপত্র, পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি ও বডি ক্যামেরা এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মূল্যায়নকে আরও কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনের ভাষ্য, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে নির্মোহ মূল্যায়নের মাধ্যমে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা প্রাপ্য ফল পেয়েছেন।”
অর্থাৎ আগের দৃষ্টিভঙ্গিতে বেশি পাস ছিল সাফল্যের একটি বড় সূচক, আর বর্তমান সরকারের দৃষ্টিতে কৃত্রিমভাবে পাসের হার বাড়ানো নয়, শিক্ষার্থী তার যোগ্যতা অনুযায়ী ফল পেয়েছে কি না সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কঠোর করে দেখাই কি একমাত্র কারণ?
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, “পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হয়নি। নির্ধারিত নিয়ম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করেই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, পাঠ্যসূচির পরিবর্তন এবং পরীক্ষার মান বিবেচনায় ফলাফলে এ ধরনের পরিবর্তন এসেছে।”
তবে এবারের ফল খারাপ হওয়ার পুরো ব্যাখ্যা শুধু কঠোর মূল্যায়নে খুঁজছেন না নূরে আলম সিদ্দিকী।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “গত বছরও পাশের হার অনেক কম ছিলো। এবারও আমরা দেখলাম পাশের হার গতবারের চেয়েও কম। এর পেছনে কেবল সরকারের মান বাড়াতে গিয়ে কঠোর করে খাতা দেখাই যে একমাত্র কারণ তা কিন্তু নয়, এর পেছনে গত দুই বছরের অস্থিরতাও কিন্তু কাজ করেছে। বিদ্যালয়ের পড়াশোনা এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। তাছাড়া কোভিডের সময় একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। তার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে অটো পাসের সিদ্ধান্ত। এতে এক ধরনের বাজে ইমপ্যাক্ট পড়েছিল গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায়।”
অর্থাৎ এবারের ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ পাসের হারকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে করোনার শেখার ক্ষতি, অটোপাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, সাম্প্রতিক সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার অস্থিরতা, শিক্ষার্থীদের ভিত্তিগত দুর্বলতা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, “আমার কাছে মনে হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে মূল্যায়নের যে প্রক্রিয়া ছিলো তা সঠিক ছিলো না। কারণ আমি দেখেছি অনেকেই জিপিএ ৫ নিয়ে এসেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাস করতে পারে না।”
অধ্যাপক মনিনুর রশিদের ভাষায়, পরীক্ষাভিত্তিক এই মূল্যায়ন মূলত ‘ফল অ্যাসেসমেন্ট’। তাই ফলাফল ঠিক করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীকে শেখানোর পুরো প্রক্রিয়াটাও ঠিক করা জরুরি।
কেন গণিত-ইংরেজিতে ধাক্কা, মানবিকে বিপর্যয়
ফলাফলের বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে উঠে আসছে সেই বহু পুরনো চিত্রই - বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছে গণিতের ভয় আর ইংরেজির দুর্বোধ্যতা।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সাতটিতেই ইংরেজিতে পাসের হার ৭৫ শতাংশের নিচে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাস করেছে মাত্র ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৩ জনই এই বিষয়ে ফেল করেছে। বরিশাল ও সিলেটেও ইংরেজিতে পাসের হার যথাক্রমে ৬৯ দশমিক ২৪ ও ৬৯ দশমিক ১১ শতাংশ। যশোরে ৭১ দশমিক ৮৪, চট্টগ্রামে ৭২ দশমিক ২৭ এবং রাজশাহীতে ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ।
গণিতেও খুব একটা স্বস্তির চিত্র নেই। ময়মনসিংহ বোর্ডে গণিতে পাসের হার ৬৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩০ জন এই বিষয়েই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। মাদ্রাসা বোর্ডেও গণিতে পাসের হার ৬৯ শতাংশের ঘরে। কারিগরি বোর্ডে ৭০ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং দিনাজপুরে ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে সব জায়গার চিত্র এক নয়। ইংরেজিতে কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ৮১ দশমিক ২৯ শতাংশ, কারিগরি বোর্ডে ৯৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। গণিতেও ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর ও চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে।
অর্থাৎ কোথাও ইংরেজিতে ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করছে, আবার কোথাও ৮১ শতাংশের বেশি। গণিতেও একই পার্থক্য।
ফলে বিষয়ভিত্তিক এই ফল শুধু প্রশ্নপত্র বা খাতা কতটা কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান, শিক্ষকের সক্ষমতা, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং শেখানোর পরিবেশের মতো বিষয়ও জড়িয়ে আছে।
লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান মনে করেন, সমস্যাটা আরও গভীরে।
“গণিত পড়াতে হলে যে ভালোবাসা ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয় সেটা আমাদের শিক্ষকদের নেই। ইংরেজির ক্ষেত্রেও একই কথা। এখানে ইংরেজি মিডিয়াম ইংরেজি শেখার পথ নয়। প্রাথমিক থেকেই এখানে যে ক্যালিবারের শিক্ষকের প্রয়োজন তা আমাদের নেই,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
অর্থাৎ ইংরেজি বা গণিতে একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে গিয়ে হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ছে না। তার ভিত তৈরি হয় আরও আগে।
আর সেই দুর্বলতার সবচেয়ে বড় প্রকাশ দেখা গেছে মানবিক বিভাগে।
বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক- তিন বিভাগের মধ্যে এবার সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এই বিভাগে পরীক্ষার্থী ছিল ৬ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৫ জন। পাস করেছে মাত্র ৩ লাখ ১ হাজার ১৭৪ জন। ফলে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশে।
অর্থাৎ মানবিক বিভাগের প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫১ জনের বেশি পাস করতে পারেনি।
এ বিভাগেই আবার পরীক্ষার্থী ছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে মানবিকের এই ফল সরাসরি টেনে নামিয়েছে সামগ্রিক পাসের হারও।
সলিমুল্লাহ খানের ব্যাখ্যাটি বেশ কঠোর। তিনি বলেন, “মানবিকে পড়াশোনা করে স্কুলের সবচেয়ে খারাপ ছাত্ররা। সেখানে তো ফলাফল এমনই হবে। এতো সেই ছোটবেলা থেকেই কিছু শেখে নাই।”
নবম শ্রেণিতে উঠেই শিক্ষার্থীদের এভাবে বিভাগে ভাগ করার ব্যবস্থাকেও ‘অশ্লীল’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা অবশ্য কিছুটা ভিন্ন। তাদের মতে, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বিশেষ করে মাদ্রাসা থেকে দাখিলে অংশ নেওয়া মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ দুটি বিষয়ে ফল খারাপ হয়েছে। আর এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ফলাফলে।
কিন্তু এখানেই প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে যায়- শিক্ষার্থীরা কি কঠিন প্রশ্নে ফেল করেছে, নাকি বছরের পর বছর তারা যে শিক্ষা পেয়েছে, সেটিই যথেষ্ট ছিল না?
পাসের হার দিয়ে শিক্ষার মান বিচার কতটা যৌক্তিক?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদের মতে, শুধু পাসের হার দিয়ে শিক্ষার মান বিচার করা খুবই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।
“আমাদের নীতিনির্ধারকরা দ্বৈত নীতিতে চলছেন। আগে যারা ছিলেন তারা মনে করতেন পাশের হার বেড়েছে মানে শিক্ষার মান বেড়েছে। আবার এখন যারা আছেন তারা মনে করছেন পাশের হার কমেছে মানে কোয়ালিটি এডুকেশন বেড়েছে। কিন্তু আসলে পাশের হারের ওপর শিক্ষার মান নির্ভর করে না। এটা অনেকটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। পরীক্ষাভিত্তিক অ্যাসেসমেন্ট আসলে ফলটি অ্যাসেসমেন্ট,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
এই যুক্তির সঙ্গে মিলে যায় এবারের আরেকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন ফেল করেছে। আবার ৩১২টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
এগুলোকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে প্রশ্নের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। কারণ একটি শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে গিয়ে ফেল করে। কিন্তু তার দুর্বলতা তৈরি হয় বছরের পর বছর ধরে শ্রেণিকক্ষে।
সে কীভাবে পড়েছে, শিক্ষক কতটা সময় দিয়েছেন, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছে কি না, নিয়মিত ক্লাস হয়েছে কি না এসবের যোগফলই শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার খাতায় এসে ধরা পড়ে।
তাই ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী ফেল করেছে মানেই তারা সবাই হঠাৎ করে খারাপ শিক্ষার্থী হয়ে গেছে এমন সিদ্ধান্ত যেমন ঠিক নয়, তেমনি ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন পাস করেছে বলেই তারা সবাই ভালোভাবে শিখেছে, বিষয়টিও এত সরল নয়।
যে কোনো পরীক্ষার ফলকে শুধু শিক্ষার মান বেড়েছে কিংবা কমেছে এই দুই বাক্সের একটিতে বন্দি করা কঠিন।
দীর্ঘদিনের উচ্চ পাসের হার যদি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার সক্ষমতাকে পুরোপুরি তুলে না ধরে থাকে, তাহলে সেই মূল্যায়ন ব্যবস্থা সংশোধন করা দরকার। কিন্তু সংশোধনের পর যদি দেখা যায় ইংরেজি ও গণিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী দুর্বল, মানবিক বিভাগের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী পাস করতে পারছে না কিংবা শত শত প্রতিষ্ঠান থেকে একজনও উত্তীর্ণ হচ্ছে না, তাহলে সেই দুর্বলতার কারণ খুঁজে বের করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এখানেই নূরে আলম সিদ্দিকীর সতর্কতাটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “কেবল ভয় দেখিয়ে শিক্ষার মান বাড়ানো যাবে না।”
তার ভাষায়, “আমাদের গুণগত শিক্ষার দিকে জোর দিতে হবে। সঠিকভাবে লার্নিংটা হচ্ছে কি না সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আসলে পুরো স্ট্রাকচারটাই পরিবর্তন করতে হবে।”
অধ্যাপক মনিনুর রশিদও মনে করেন, সমস্যার জায়গাটা আরও আগে খুঁজতে হবে। তার ভাষায়, “পড়ালেখার ভিত্তিটা কিন্তু তৈরি হয় এসএসসির আগেই। তাই এখানে কোথায় দুর্বল সেটা খুঁজে বের করে শিক্ষকদের সেভাবে তৈরি বা নিয়োগ দিতে হবে।”
তাই ফলাফল শুধু পরীক্ষার খাতার গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, পাঠ্যক্রম এবং বছরের পর বছর নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তেরও প্রতিফলন।
আগে বেশি পাসের হারকে শিক্ষার মানের প্রমাণ হিসেবে দেখানো যেমন ঠিক ছিল না, এখন পাসের হার কমে যাওয়াকেও শিক্ষার মান বেড়েছে, এমন প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সঠিক মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর প্রকৃত অবস্থাটা সামনে আনতে পারে, কিন্তু সেই দুর্বলতা তৈরি হলো কেন তার সমাধান করতে পারে না- বলেই মনে করেন সলিমুল্লাহ খান।
আসল কাজটা শুরু করতে হবে শ্রেণিকক্ষে। কারণ খাতা বলে দেয় কে ফেল করেছে। কিন্তু কেন সে ফেল করার জায়গায় পৌঁছাল, সেই গল্প শুরু হয় অনেক আগে।
ফল প্রকাশের দিন তাই শুধু মিষ্টির বাক্স, উল্লাস আর ‘ভাইকিং রো’-এর ছবি মনে রাখার দিন নয়। এবারের ফলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো নম্বরের বাইরেই একজন শিক্ষার্থী কত পেল, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সে আসলে কতটা শিখল।
আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে তাকাতে হবে পরীক্ষার খাতায় নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে।
আমরা কি শুধু ভালো ফল চাই, নাকি সত্যিই ভালো শিক্ষা চাই?
আনন্দের দিনে চাপা কান্না, এসএসসির ফল কি শিক্ষার আয়না?
আমরা এতদিন শিক্ষার্থীদের সত্যিই শেখাচ্ছিলাম, নাকি পরীক্ষার ফল ভালো দেখানোর চেষ্টা করছিলাম? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুধু এবারের এসএসসি’র ফল নয়, ফিরে তাকাতে হবে গত দুই দশকের গল্পের দিকে।
ড্রামের তালে তালে আনন্দে নাচছে ভিকারুননিসা, হলিক্রসের মেয়েরা। আনন্দে চিৎকার করছে মতিঝিল আইডিয়ালের ছেলেরা। কেউ মিষ্টি খাওয়াচ্ছে, কেউ জড়িয়ে ধরছে মা-বাবাকে। বিশ্বকাপে ভাইরাল হওয়া ‘ভাইকিং রো’-তে মেতেছে মতিঝিল আইডিয়ালের ছেলেরা।
পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন গত কয়েক দশকে এমন ছবিই সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
কিন্তু এই আনন্দের ছবির ঠিক পাশেই এবার ছিল অন্য এক বাংলাদেশ হতাশা, আক্ষেপ আর নীরব কান্নার।
কারণ, প্রায় দুই দশকের মধ্যে এবারই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার সবচেয়ে নিচে। ১১ বোর্ড মিলিয়ে পাস করেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। অনুত্তীর্ণ হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯১ হাজার।
আরও একটি সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। এবার ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩৪টি। অর্থাৎ এক বছরে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৭৮টি, প্রায় ২ দশমিক ৩ গুণ।
তাহলে ফল খারাপ হয়েছে মানেই কি শিক্ষার মান খারাপ হয়েছে?
নাকি এতদিনের মূল্যায়ন ব্যবস্থার ফাঁকফোকরই এবার সামনে এসেছে?
আমরা এতদিন শিক্ষার্থীদের সত্যিই শেখাচ্ছিলাম, নাকি পরীক্ষার ফল ভালো দেখানোর চেষ্টা করছিলাম?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুধু এবারের ফল নয়, ফিরে তাকাতে হবে গত দুই দশকের গল্পের দিকে।
প্রায় দুই দশকের গল্পটা কী বলছে
২০০৭ সালে এসএসসি ও সমমানে পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপর কয়েক বছর ধরে তা দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালে পাসের হার উঠে যায় ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশে তখন সেটিই ছিল সর্বোচ্চ।
এরপর করোনার ধাক্কায় পরীক্ষাব্যবস্থায় আসে বড় পরিবর্তন। ২০২১ সালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নিয়ে পাসের হার দাঁড়ায় ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশে।
এরপর আবার শুরু হয় পতন। ২০২৫ সালে পাসের হার নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে যা তখন ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। এবার সেটিও ছাড়িয়ে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমেছে।
অর্থাৎ ৯০ শতাংশের ওপরে পাসের সেই সময় থেকে আজকের ৬২ শতাংশে আসার গল্পটি শুধু শিক্ষার্থীদের সক্ষমতার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, কোভিডের শেখার ক্ষতি, অটোপাস এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন।
বিশেষ করে অটোপাসের বিষয়টি এখন নতুন করে আলোচনায় আসছে।
করোনার সময় পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় একের পর এক পরিবর্তন আসে। পরীক্ষা বাতিল, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং বিকল্প মূল্যায়নের মতো সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্মকে স্বাভাবিক পরীক্ষা-ব্যবস্থার বাইরে যেতে হয়।
সরকারের সঙ্গে বদলায় ভালোর সংজ্ঞাও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদের মতে, শিক্ষার ফলাফল নিয়ে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গিতেই বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তার ভাষায়, “আগে যারা ছিলেন তারা মনে করতেন পাশের হার বেড়েছে মানে শিক্ষার মান বেড়েছে। আবার এখন যারা আছেন তারা মনে করছেন পাশের হার কমেছে মানে কোয়ালিটি এডুকেশন বেড়েছে। কিন্তু আসলে পাশের হারের ওপর শিক্ষার মান নির্ভর করে না। এটা অনেকটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।”
তার এই বক্তব্যের মধ্যেই গত কয়েক বছরের দুই ধরনের সরকারি দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় বেশি পাসের হার, বেশি জিপিএ-৫ এবং ভালো ফলাফলকে শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হতো। অর্থাৎ যত বেশি শিক্ষার্থী পাস করবে, তত ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা; এমন একটি ধারণাই সামনে ছিল।
বর্তমান সরকারের অবস্থান অনেকটাই ভিন্ন। আগের অটোপাসের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে শিক্ষামন্ত্রী এ এন এম এহছানুল হক মিলন চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার আগে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “অটোপাসের আর কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।” অর্থাৎ পরীক্ষা হবে, মূল্যায়ন হবে এবং শিক্ষার্থী যে ফল পাওয়ার যোগ্য, সেটিই তাকে দেওয়া হবে।
ফল প্রকাশের সংবাদ সম্মেলনেও শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “মন খুলে গান গাওয়া যায়, মন খুলে নাম্বার দেওয়া যায় না।”
সরকারের দাবি, এবার সেই নীতিই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সব শিক্ষা বোর্ডে একক প্রশ্নপত্র, পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি ও বডি ক্যামেরা এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মূল্যায়নকে আরও কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনের ভাষ্য, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে নির্মোহ মূল্যায়নের মাধ্যমে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা প্রাপ্য ফল পেয়েছেন।”
অর্থাৎ আগের দৃষ্টিভঙ্গিতে বেশি পাস ছিল সাফল্যের একটি বড় সূচক, আর বর্তমান সরকারের দৃষ্টিতে কৃত্রিমভাবে পাসের হার বাড়ানো নয়, শিক্ষার্থী তার যোগ্যতা অনুযায়ী ফল পেয়েছে কি না সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কঠোর করে দেখাই কি একমাত্র কারণ?
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, “পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হয়নি। নির্ধারিত নিয়ম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করেই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, পাঠ্যসূচির পরিবর্তন এবং পরীক্ষার মান বিবেচনায় ফলাফলে এ ধরনের পরিবর্তন এসেছে।”
তবে এবারের ফল খারাপ হওয়ার পুরো ব্যাখ্যা শুধু কঠোর মূল্যায়নে খুঁজছেন না নূরে আলম সিদ্দিকী।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “গত বছরও পাশের হার অনেক কম ছিলো। এবারও আমরা দেখলাম পাশের হার গতবারের চেয়েও কম। এর পেছনে কেবল সরকারের মান বাড়াতে গিয়ে কঠোর করে খাতা দেখাই যে একমাত্র কারণ তা কিন্তু নয়, এর পেছনে গত দুই বছরের অস্থিরতাও কিন্তু কাজ করেছে। বিদ্যালয়ের পড়াশোনা এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। তাছাড়া কোভিডের সময় একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। তার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে অটো পাসের সিদ্ধান্ত। এতে এক ধরনের বাজে ইমপ্যাক্ট পড়েছিল গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায়।”
অর্থাৎ এবারের ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ পাসের হারকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে করোনার শেখার ক্ষতি, অটোপাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, সাম্প্রতিক সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার অস্থিরতা, শিক্ষার্থীদের ভিত্তিগত দুর্বলতা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, “আমার কাছে মনে হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে মূল্যায়নের যে প্রক্রিয়া ছিলো তা সঠিক ছিলো না। কারণ আমি দেখেছি অনেকেই জিপিএ ৫ নিয়ে এসেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাস করতে পারে না।”
অধ্যাপক মনিনুর রশিদের ভাষায়, পরীক্ষাভিত্তিক এই মূল্যায়ন মূলত ‘ফল অ্যাসেসমেন্ট’। তাই ফলাফল ঠিক করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীকে শেখানোর পুরো প্রক্রিয়াটাও ঠিক করা জরুরি।
কেন গণিত-ইংরেজিতে ধাক্কা, মানবিকে বিপর্যয়
ফলাফলের বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে উঠে আসছে সেই বহু পুরনো চিত্রই - বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছে গণিতের ভয় আর ইংরেজির দুর্বোধ্যতা।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সাতটিতেই ইংরেজিতে পাসের হার ৭৫ শতাংশের নিচে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাস করেছে মাত্র ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৩ জনই এই বিষয়ে ফেল করেছে। বরিশাল ও সিলেটেও ইংরেজিতে পাসের হার যথাক্রমে ৬৯ দশমিক ২৪ ও ৬৯ দশমিক ১১ শতাংশ। যশোরে ৭১ দশমিক ৮৪, চট্টগ্রামে ৭২ দশমিক ২৭ এবং রাজশাহীতে ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ।
গণিতেও খুব একটা স্বস্তির চিত্র নেই। ময়মনসিংহ বোর্ডে গণিতে পাসের হার ৬৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩০ জন এই বিষয়েই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। মাদ্রাসা বোর্ডেও গণিতে পাসের হার ৬৯ শতাংশের ঘরে। কারিগরি বোর্ডে ৭০ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং দিনাজপুরে ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে সব জায়গার চিত্র এক নয়। ইংরেজিতে কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ৮১ দশমিক ২৯ শতাংশ, কারিগরি বোর্ডে ৯৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। গণিতেও ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর ও চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে।
অর্থাৎ কোথাও ইংরেজিতে ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করছে, আবার কোথাও ৮১ শতাংশের বেশি। গণিতেও একই পার্থক্য।
ফলে বিষয়ভিত্তিক এই ফল শুধু প্রশ্নপত্র বা খাতা কতটা কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান, শিক্ষকের সক্ষমতা, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং শেখানোর পরিবেশের মতো বিষয়ও জড়িয়ে আছে।
লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান মনে করেন, সমস্যাটা আরও গভীরে।
“গণিত পড়াতে হলে যে ভালোবাসা ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয় সেটা আমাদের শিক্ষকদের নেই। ইংরেজির ক্ষেত্রেও একই কথা। এখানে ইংরেজি মিডিয়াম ইংরেজি শেখার পথ নয়। প্রাথমিক থেকেই এখানে যে ক্যালিবারের শিক্ষকের প্রয়োজন তা আমাদের নেই,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
অর্থাৎ ইংরেজি বা গণিতে একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে গিয়ে হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ছে না। তার ভিত তৈরি হয় আরও আগে।
আর সেই দুর্বলতার সবচেয়ে বড় প্রকাশ দেখা গেছে মানবিক বিভাগে।
বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক- তিন বিভাগের মধ্যে এবার সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এই বিভাগে পরীক্ষার্থী ছিল ৬ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৫ জন। পাস করেছে মাত্র ৩ লাখ ১ হাজার ১৭৪ জন। ফলে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশে।
অর্থাৎ মানবিক বিভাগের প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫১ জনের বেশি পাস করতে পারেনি।
এ বিভাগেই আবার পরীক্ষার্থী ছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে মানবিকের এই ফল সরাসরি টেনে নামিয়েছে সামগ্রিক পাসের হারও।
সলিমুল্লাহ খানের ব্যাখ্যাটি বেশ কঠোর। তিনি বলেন, “মানবিকে পড়াশোনা করে স্কুলের সবচেয়ে খারাপ ছাত্ররা। সেখানে তো ফলাফল এমনই হবে। এতো সেই ছোটবেলা থেকেই কিছু শেখে নাই।”
নবম শ্রেণিতে উঠেই শিক্ষার্থীদের এভাবে বিভাগে ভাগ করার ব্যবস্থাকেও ‘অশ্লীল’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা অবশ্য কিছুটা ভিন্ন। তাদের মতে, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বিশেষ করে মাদ্রাসা থেকে দাখিলে অংশ নেওয়া মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ দুটি বিষয়ে ফল খারাপ হয়েছে। আর এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ফলাফলে।
কিন্তু এখানেই প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে যায়- শিক্ষার্থীরা কি কঠিন প্রশ্নে ফেল করেছে, নাকি বছরের পর বছর তারা যে শিক্ষা পেয়েছে, সেটিই যথেষ্ট ছিল না?
পাসের হার দিয়ে শিক্ষার মান বিচার কতটা যৌক্তিক?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদের মতে, শুধু পাসের হার দিয়ে শিক্ষার মান বিচার করা খুবই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।
“আমাদের নীতিনির্ধারকরা দ্বৈত নীতিতে চলছেন। আগে যারা ছিলেন তারা মনে করতেন পাশের হার বেড়েছে মানে শিক্ষার মান বেড়েছে। আবার এখন যারা আছেন তারা মনে করছেন পাশের হার কমেছে মানে কোয়ালিটি এডুকেশন বেড়েছে। কিন্তু আসলে পাশের হারের ওপর শিক্ষার মান নির্ভর করে না। এটা অনেকটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। পরীক্ষাভিত্তিক অ্যাসেসমেন্ট আসলে ফলটি অ্যাসেসমেন্ট,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
এই যুক্তির সঙ্গে মিলে যায় এবারের আরেকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন ফেল করেছে। আবার ৩১২টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
এগুলোকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে প্রশ্নের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। কারণ একটি শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে গিয়ে ফেল করে। কিন্তু তার দুর্বলতা তৈরি হয় বছরের পর বছর ধরে শ্রেণিকক্ষে।
সে কীভাবে পড়েছে, শিক্ষক কতটা সময় দিয়েছেন, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছে কি না, নিয়মিত ক্লাস হয়েছে কি না এসবের যোগফলই শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার খাতায় এসে ধরা পড়ে।
তাই ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী ফেল করেছে মানেই তারা সবাই হঠাৎ করে খারাপ শিক্ষার্থী হয়ে গেছে এমন সিদ্ধান্ত যেমন ঠিক নয়, তেমনি ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন পাস করেছে বলেই তারা সবাই ভালোভাবে শিখেছে, বিষয়টিও এত সরল নয়।
নম্বরের বাইরে যে গল্পটা রয়ে গেল
যে কোনো পরীক্ষার ফলকে শুধু শিক্ষার মান বেড়েছে কিংবা কমেছে এই দুই বাক্সের একটিতে বন্দি করা কঠিন।
দীর্ঘদিনের উচ্চ পাসের হার যদি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার সক্ষমতাকে পুরোপুরি তুলে না ধরে থাকে, তাহলে সেই মূল্যায়ন ব্যবস্থা সংশোধন করা দরকার। কিন্তু সংশোধনের পর যদি দেখা যায় ইংরেজি ও গণিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী দুর্বল, মানবিক বিভাগের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী পাস করতে পারছে না কিংবা শত শত প্রতিষ্ঠান থেকে একজনও উত্তীর্ণ হচ্ছে না, তাহলে সেই দুর্বলতার কারণ খুঁজে বের করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এখানেই নূরে আলম সিদ্দিকীর সতর্কতাটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “কেবল ভয় দেখিয়ে শিক্ষার মান বাড়ানো যাবে না।”
তার ভাষায়, “আমাদের গুণগত শিক্ষার দিকে জোর দিতে হবে। সঠিকভাবে লার্নিংটা হচ্ছে কি না সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আসলে পুরো স্ট্রাকচারটাই পরিবর্তন করতে হবে।”
অধ্যাপক মনিনুর রশিদও মনে করেন, সমস্যার জায়গাটা আরও আগে খুঁজতে হবে। তার ভাষায়, “পড়ালেখার ভিত্তিটা কিন্তু তৈরি হয় এসএসসির আগেই। তাই এখানে কোথায় দুর্বল সেটা খুঁজে বের করে শিক্ষকদের সেভাবে তৈরি বা নিয়োগ দিতে হবে।”
তাই ফলাফল শুধু পরীক্ষার খাতার গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, পাঠ্যক্রম এবং বছরের পর বছর নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তেরও প্রতিফলন।
আগে বেশি পাসের হারকে শিক্ষার মানের প্রমাণ হিসেবে দেখানো যেমন ঠিক ছিল না, এখন পাসের হার কমে যাওয়াকেও শিক্ষার মান বেড়েছে, এমন প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সঠিক মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর প্রকৃত অবস্থাটা সামনে আনতে পারে, কিন্তু সেই দুর্বলতা তৈরি হলো কেন তার সমাধান করতে পারে না- বলেই মনে করেন সলিমুল্লাহ খান।
আসল কাজটা শুরু করতে হবে শ্রেণিকক্ষে। কারণ খাতা বলে দেয় কে ফেল করেছে। কিন্তু কেন সে ফেল করার জায়গায় পৌঁছাল, সেই গল্প শুরু হয় অনেক আগে।
ফল প্রকাশের দিন তাই শুধু মিষ্টির বাক্স, উল্লাস আর ‘ভাইকিং রো’-এর ছবি মনে রাখার দিন নয়। এবারের ফলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো নম্বরের বাইরেই একজন শিক্ষার্থী কত পেল, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সে আসলে কতটা শিখল।
আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে তাকাতে হবে পরীক্ষার খাতায় নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে।
আমরা কি শুধু ভালো ফল চাই, নাকি সত্যিই ভালো শিক্ষা চাই?
বিষয়: