শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা 

শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত রাখা, ১৩ই জুলাই পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৭ পিএম

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া এবং পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে সম্বোধন করায় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে দেশের বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়েছে শিক্ষার্থীরা।

মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা রাস্তায় অবস্থান নিলে ঢাকার সায়েন্সল্যাব মোড়, উত্তরা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরে তারা ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডও ঘেরাও করে। কিন্তু সেখান থেকে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিলে বিকেল সাড়ে ৪টায় আবারও সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন শিক্ষার্থীরা।

এমনকি বিকেলের পর জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে তারা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিয়ে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেয়।

বিক্ষোভের সময় ‘তুমি কে, আমি কে- ফার্মের মুরগি’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে শিক্ষামন্ত্রী’, ‘দফা এক দাবি এক শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’, ‘জ্বালো রে জ্বালো-আগুন জ্বালো’, ‘আপস না সংগ্রাম-সংগ্রাম, সংগ্রাম’ সহ নানা স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় তাদের হাতে পরীক্ষা স্থগিত এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ডও দেখা যায়।

শিক্ষার্থীরা কেন আন্দোলনে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোমবার শিক্ষামন্ত্রীর একটি ফোনালাপের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে পরীক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “ওরা তো ফার্মের মুরগি, একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর চলে আসবে।”

'শিক্ষার্থী ঐক্য' নামে একটি ফেইসবুক পেইজ থেকে ১৩ই জুলাই বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।

এরপর শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা স্থগিত না করাসহ ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়াকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার বিক্ষোভে নামে শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা মন্ত্রীর পদত্যাগেরও দাবি জানায়। 

ঢাকার সায়েন্সল্যাব মোড়, মানিক মিয়া এভিনিউ, শাহবাগ, উত্তরা, মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে ঢাকার বিভিন্ন কলেজের পরীক্ষার্থীরা।

এক পর্যায়ে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের দিকে শিক্ষার্থীরা অগ্রসর হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর এলাকায় পুলিশ তাদের বাধা দেয়।

পরে বিকেলে আবারও সায়েন্সল্যাব মোড়ে ফিরে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন।

শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত রাখা, ১৩ই জুলাই পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।

ঢাকার বাইরেও রাজশাহী, বরিশাল, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সামনে এবং সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, রংপুর জিলা স্কুলসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।

মন্ত্রী যা বলেছেন 

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার করা এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, "আমরা ৬৪টি জেলার এসপি, আটটি বিভাগীয় কমিশনার, প্রত্যেকটি বোর্ডের চেয়ারম্যান, ইউএনও এবং আবহাওয়া কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছিলেন, বৃষ্টি হবে না। বিকেল ৫টা পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আমরা পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু সকালে উঠে দেখি কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের মাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে।"

তিনি আরও বলেন, সারা দেশে প্রায় দুই হাজার ৭০০টি কেন্দ্রে একযোগে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

“চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সময় প্রথমে রাঙামাটি, পরে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং পরে পুরো শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। এবারও বৃষ্টির পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিলো।”

কেন্দ্রে পানি ঢোকার খবর পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিলো বলেও জানান শিক্ষামন্ত্রী।

এদিকে এবারের এইচএসসি পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার ছয় ও সাত নাম্বার প্রশ্নে ভুল থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার মাত্র চার মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছে। আগের মডারেটররাই প্রশ্নপত্র তৈরি করেছেন বলে জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, “প্রশ্ন মডারেশনের প্রক্রিয়া দুই বছর আগে থেকে শুরু করতে হয়। আমরা এসে কোনো প্রশ্ন তৈরি করতে পারিনি। বিগত সরকারের মডারেটর এই প্রশ্ন করেছে। তবুও আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষণা করেছি, পদার্থবিজ্ঞানের ছয় ও সাত নাম্বার প্রশ্নে পরীক্ষার্থীদের ফুল ক্রেডিট দিয়ে দেওয়া হবে।”

চট্টগ্রামে পরীক্ষা স্থগিত

বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি থেকে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চট্টগ্রামসহ পাঁচ জেলায় আগামী ১৬ই জুলাই পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থগিত থাকবে। তবে দেশের অন্য সব বোর্ডে পরীক্ষা যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি জানায়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির কারণে সব জেলার পরীক্ষা স্থগিতের দাবি উঠলেও তা বাস্তবসম্মত নয়।

বারবার পরীক্ষা স্থগিত হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন, ফল প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কার্যক্রমসহ পুরো শিক্ষা ক্যালেন্ডার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থী।