এক মাস আগেই ভারতের ককরোচ পার্টি নিয়ে তোলপাড় ছিলো গণমাধ্যম। অনেকেই বলতে শুরু করেছিলেন- এই ককরোচরাই বদলে দেবে ভারতের রাজনৈতিক চিত্র। সে কথায় যাওয়ার আগে বলতে হয় বাংলাদেশে রবিবার হয়ে যাওয়া ঝুম বৃষ্টির গল্পটা।
বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দে সাহিত্যিকরা রোমান্টিকতা খুঁজে পান। কিন্তু কখনো কখনো সেই রোমান্সকে ছাপিয়ে যায় দুর্ভোগ। রবিবারের বৃষ্টি রোমান্সের শৃঙ্খল ভেঙে দুর্যোগে রূপ নিলো। অফিসযাত্রায় বাধা তো আছেই, আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা যেতে পারেনি অনেকে।
তবে এবার বৃষ্টির দুর্ভোগের চেয়েও আলোচনায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। কেউ কি সেদিন এই ডুবে যাওয়া শহরে ভেবেছিলেন- কীভাবে পরীক্ষার্থীরা গন্তব্যে যাচ্ছেন? প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই জানি।
কেউ হয়তো ভিজে একাকার হয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন কেন্দ্রে, কেউ হয়তো পারেননি। চিত্রটা শুধু শহর নয়, পুরো দেশে। ভোগান্তি থেকে ক্ষোভ ঠাঁই নিয়েছে হৃদয়ে। তার বিস্ফোরণ ঘটালো একটি ভিডিও।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শিক্ষামন্ত্রী এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন। ফোনালাপের এক পর্যায়ে মন্ত্রী শিক্ষার্থীদের বললেন ‘ফার্মের মুরগি’।
বৃষ্টির ভোগান্তি যখন রাষ্ট্র বুঝতে অক্ষম হয়, তার মধ্যে যখন কোনো দায়িত্বশীল মন্ত্রী ‘ফার্মের মুরগি’ বলে কাউকে সম্বোধন করেন, তখন ‘মুরগিদের’ খোয়াড় থেকে তো বের হওয়ার সময় হয়েই যায়।
সুতরাং যা ঘটার, সেটাই ঘটলো।
মঙ্গলবার দিনভর আন্দোলনে উত্তাল ছিলো ঢাকার নানান সড়ক। তাদের স্লোগান এখন- “তুমি কে আমি কে, মুরগি, মুরগি, কে বলেছে, কে বলেছে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রী।"

সকাল থেকেই ঢাকার সায়েন্সল্যাব মোড়, উত্তরা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ। পরে তারা ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের দিকেও রওনা দেন।
কিন্তু বিধিবাম! পুলিশ দিলো আটকে। ফার্মের মুরগির মতো ছটফটিয়ে তারা আবার নিলো অবস্থান। তাদের আরও একটি দাবি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ।
এমনই সময় জন্ম নিলো ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘Broiler Chicken Party’ নামে একটি ফেসবুক পেজ খোলেন বাংলাদেশের জেড জেনারেশন। তাদের স্লোগান ‘উই আর নট ইনসালটেড, উই আর অ্যাওয়েকেন্ড’। বাংলায় অনুবাদ করলে হয়- “আমরা অপমানিত হইনি, আমরা জেগে উঠেছি।“
যখন এই লেখাটি লিখছি তখন ১৪ হাজার ফলোয়ার হয়ে গেছে। অর্থাৎ বলা যায়, গ্রুপটিতে ব্রয়লার চিকেনের সংখ্যা এখন ১৪ হাজার।
ভারতের ককরোচ এবং আরেক শিক্ষামন্ত্রী
জুন মাসে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নয়া দিল্লিতে রাজপথে নেমেছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) ।
পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ও দ্বাদশ শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগ তুলে পদত্যাগের দাবি জানানো হয়েছিল। এ দাবি নিয়ে জুনে রাজধানী দিল্লির জন্তর-মন্তর এলাকায় আন্দোলনের ডাক দেয় সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দিপকে।
এই ককরোচের সূত্রপাতও বঙ্গাত্মক মন্তব্যকে ঘিরে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সুরিয়া কান্ত ১৫ই মে এক বক্তব্যে ভারতের বেকার জনগোষ্ঠীকে “ককরোচ” বলে সম্বোধন করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ‘এক্স’-এ অভিজিৎ দিপকে প্রশ্ন তোলেন, “তাহলে সব ককরোচ একত্রিত হলে কেমন হয়?”
প্রধান বিচারপতির সেই বক্তব্যের একদিন পরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আবির্ভূত হয়েছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।
এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাখ লাখ ফলোয়ার হয়ে যায় ককরোচ পার্টির। সিজেপি’র গুগল ফর্মের মাধ্যমে হাজার হাজার সদস্য যুক্ত হতে শুরু করে।
সদস্য সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বিজেপি’র অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টকে কিছুদিনের মধ্যেই ছাড়িয়ে যায় সিজেপি। এক মাসেরও কম সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইন্সটাগ্রামে সিজেপির ফলোয়ার হয়েছে ২ কোটি ২৭ লাখ, যা বিজেপির ফলোয়ার সংখ্যার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।
সিজেপির ওয়েবসাইটে নিজেকে “অলস এবং বেকারদের কণ্ঠস্বর” হিসেবে দাবি করেছে। দলটির দাবি, তারা “জিরো স্পন্সর”, অর্থাৎ কারো টাকায় এই প্ল্যাটফর্ম চলে না। যারা আর আশেপাশের বাস্তবতা থেকে নিজেদের অন্ধ করে রাখতে চান না, তাদের নিয়েই গঠিত ককরোচ পার্টির, এমনটাই দাবি দলটির।
কোনো সরকারই চায় না, একটি অবমাননাকর শব্দ প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হোক। কিন্তু ইতিহাস বলে, অনেক সময় ক্ষমতাবানদের বলা একটি শব্দই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক স্লোগানে রূপ নেয়। ‘ককরোচ’ থেকে ‘ব্রয়লার চিকেন’—এই যাত্রা সেই সত্যটিই আবার মনে করিয়ে দিলো।



