সাবেক স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার মারা গেছেন

২০০২ সালের ২১এ জুন থেকে ৬ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ১১:০২ এএম

প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার মারা গেছেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।

রবিবার ভোর ৪টা ১৮ মিনিটে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।

জমিরউদ্দিন সরকারের স্ত্রী নূর আখতার ২০২৩ সালে মারা যান। তিনি এক মেয়ে নিলুফার জমির এবং দুই ছেলে নওশাদ জমির ও নওফেল জমিরকে রেখে গেছেন।

বড় ছেলে নওশাদ জমির বর্তমানে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য।

তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন গণমাধ্যমকে বলেন, “স্যার আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন।”

তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গভীর শোক প্রকাশ করে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খানসহ দলের শীর্ষ নেতারা পৃথক শোকবার্তায় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অবদানের কথা স্মরণ করেছেন। অনেক সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তার ধানমন্ডির বাসভবনে যান।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, জমির উদ্দিন সরকারের জানাজা তিন দফায় প্রথমে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে, হাইকোর্টে এবং পরে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত হবে। এর সময়সূচি পরে জানানো হবে।

গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও অবদান

জমিরউদ্দিন সরকার বাংলাদেশের রাজনীতি, আইন অঙ্গন এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্বকালেই বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবনের অসমাপ্ত নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।

পরে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এইচ এম এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে প্রথমে ভূমি প্রতিমন্ত্রী, পরে শিক্ষামন্ত্রী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন।

১৯৯৬ সালে বিএনপির স্বল্পমেয়াদি সরকারের সময় তিনি আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। ওই সময়ই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়।

২০০১ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এলে অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন জমিরউদ্দিন সরকার। স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সংসদ পরিচালনায় নিরপেক্ষতা ও সংসদীয় রীতিনীতি অনুসরণের জন্য প্রশংসিত হন।

২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে সংবিধান অনুযায়ী ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে নবনির্বাচিত নবম জাতীয় সংসদের সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান তৎকালীন স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার। নতুন স্পিকার দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে ওই বছরের ২৫এ জানুয়ারি তার দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটে।

এর আগে, ২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২১এ জুন থেকে ৬ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন।

বর্ণাঢ্য শিক্ষা ও পেশাজীবন

১৯৩১ সালের ১লা ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জমিরউদ্দিন সরকার। তার বাবা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স এবং মা বেগম ফখরুন্নেছা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। পরে যুক্তরাজ্যের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল ডিগ্রি লাভ করেন।

দেশে ফিরে ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যোগ দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।

রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলা

ছাত্রজীবনেই ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। পরে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের রাজনীতিতে যুক্ত হন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় হাইকোর্টের যেসব আইনজীবী স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম।

স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) গঠন করলে সেখানে যোগ দেন জমিরউদ্দিন সরকার। পরবর্তীতে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

পরে ১৯৯১ সালে ঢাকা-৯ আসন এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

এছাড়া ২০০৯ সালে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে নবম জাতীয় সংসদের সদস্য হন।

বিভিন্ন সময়ে তিনি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

লেখক হিসেবেও ছিলেন সমাদৃত

রাজনীতি ও আইনচর্চার পাশাপাশি লেখালেখিতেও সক্রিয় ছিলেন জমিরউদ্দিন সরকার।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, এক নজরে সংসদ সম্পর্কিত বিধিবিধান, লন্ডনে শিক্ষা জীবন, দ্য ল অফ দ্য সি, লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ও ডিগবাজি, পল রাজ থেকে পলাশী এবং ব্রিটিশ রাজ থেকে বঙ্গভবন এবং ল অফ দ্য ইন্টারন্যাশনাল রিভারস অ্যান্ড আদার ওয়াটারকোর্স।