স্বপ্নের সিঙ্গাপুরে উগ্রবাদের থাবায় ঝুঁকিতে শ্রমবাজার ও রেমিটেন্স

সোশ্যাল মিডিয়া ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ এবং উগ্রবাদী প্রচারণা পড়ে সিঙ্গাপুরে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকেরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছেন বলে মনে করছে পুলিশ। গত এক দশকে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫৭ জন, যাদের বেশিরভাগকেই দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, ৭ জন জেল খেটছেন সেদেশেই। প্রশ্ন উঠছে, উগ্রপন্থার এই খেসারত কি ব্যক্তিবিশেষের? নাকি বিপন্ন হতে চলেছে লাখো বাংলাদেশির স্বপ্নের শ্রমবাজার?

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম

বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা প্রবাসী শ্রমিকদের ঘামে দেশ ও পরিবারের যে স্বপ্ন মিশে থাকে, সেই স্বপ্নে এখন উদ্বেগের ছায়া ফেলছে ‘জঙ্গিবাদ ও উগ্রপন্থা।’ 

সামাজিক মাধ্যমের তথাকথিত কিছু ধর্মীয় ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ ও ‘উগ্রবাদী’ প্রচারকের বিকৃত ব্যাখ্যায় বিভ্রান্ত হয়ে সিঙ্গাপুরপ্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি অংশ অন্ধকার পথে পা বাড়াচ্ছে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সম্প্রতি সাহেদুল ইসলাম ও রিশাদ তায়ানী নামে দুই প্রবাসীকে সিঙ্গাপুরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তারের পর বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পর এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে নতুন করে।  

গত এক দশকে অন্তত ৫৭ জন বাংলাদেশির বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুরে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে, যার মধ্যে সাতজন দেশটিতে কারাদণ্ড ভোগ করেছেন। 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উগ্রপন্থার দিকে প্রবাসীদের একটা অংশের ঝুঁকে পড়া শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্যই চ্যালেঞ্জ নয়, বরং সিঙ্গাপুরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, ভবিষ্যৎ জনশক্তি রপ্তানি এবং রেমিটেন্স প্রবাহকে ফেলছে ঝুঁকির মধ্যে। 

সম্প্রতি বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া সাহেদুল ইসলাম ও রিশাদ তায়ানী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে সামাজিক মাধ্যমে উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচারকারী বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য ও প্রচারণা তাদেরকে ‘জঙ্গিবাদে যুক্ত’ হতে প্রভাবিত করেছে।

সিঙ্গাপুরের ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (আইএসএ)-এর আওতায় গত ৫ই জুলাই গ্রেপ্তার করা হয় সাহেদুল ইসলাম ও রিশাদ তায়ানীকে।

তিন দিনের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৮ই জুলাই তাদেরকে ফেরত পাঠানো হয় বাংলাদেশে। দেশে ফেরার পর তাদের কাছ থেকে তিনটি মোবাইল ফোন ও তিনটি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে।

সাহেদুল ইসলামের বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার রামচন্দ্রপুরে। রিশাদ তায়ানীর বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার কুলপদ্দি গ্রামে।

সাহেদুল ১৬ বছর আগে এবং রিশাদ প্রায় তিন বছর আগে কাজের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন সিঙ্গাপুরে। 

এর আগে ২০১৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে জঙ্গিবাদ-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে আরও ৫৫ বাংলাদেশি শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে ৪৬ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

ফেরত আসাদের ১৯ জনকে বাংলাদেশে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়। মামলাগুলো এখনও বিচারাধীন থাকলেও অভিযুক্তরা সবাই জামিনে বাইরে রয়েছেন।

ধারাবাহিক এসব ঘটনা প্রবাসী বাংলাদেশিদের কার্যক্রমের ওপর দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরদারি আরও জোরদার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। 

সামাজিক মাধ্যমে উগ্রবাদী প্রচারণায় প্রভাবিত 

প্রাথমিক শুনানির পর পুলিশ বলছে, সামাজিক মাধ্যমে উগ্রবাদী প্রচারণা এবং কয়েকজন পরিচিত ধর্মীয় ‘ইনফ্লুয়েন্সার’-এর বক্তব্যের প্রভাবে জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হন সাহেদুল ইসলাম ও রিশাদ তায়ানী।

বিমানবন্দর থানার একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদের প্রাথমিক পর্যায়ে সাহেদুল ও রিশাদ স্বীকার করেছেন যে, তারা অনলাইনে আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট (আইএস) এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) প্রচারণামূলক কনটেন্ট অনুসরণ করতেন।

একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে পরিচিত বাংলাদেশের কয়েকজন ধর্মীয় বক্তার বক্তব্যও তাদের ওপর প্রভাব ফেলেছিলো বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করেন বলে সন্দেহভাজন কয়েকজন অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সারের সঙ্গে সাহেদুল ও রিশাদের সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া গেছে। সেই যোগাযোগের ধরন, উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক এখন খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় মতাদর্শের বিকৃত ব্যাখ্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ; এই তিন বিষয়ে সাহেদুল ও রিশাদের উগ্রবাদে ঝুঁকে পড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিষয়গুলো আরও যাচাই করতে বিস্তারিত তদন্ত চলছে।

সাহেদুল ও রিশাদ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত শুনানি শেষে তাদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন মঞ্জুর করেন।

বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশরাফুল আলম রিমান্ডের আবেদন করেন। আদালতের আদেশের পর সাহেদুল ও রিশাদকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

এসআই আশরাফুল আলম আলাপ-কে বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। রোববার থেকে রিমান্ডে এনে শুরু হবে জিজ্ঞাসাবাদ।

রিমান্ড আবেদনে ‘গুরুতর’ অভিযোগ

জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সিঙ্গাপুরের আটক করে সাহেদুল ইসলাম ও রিশাদ তায়ানীকে বুধবার বিমানযোগে বাংলাদেশে পাঠানো হলে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দর থানা পুলিশ তাদের হেফাজতে নেয়।

আদালতে জমা দেওয়া রিমান্ড আবেদনে পুলিশ দাবি করেছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুই আসামি সিঙ্গাপুরে অবস্থানকালে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, "যেকোনো সময় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে জঙ্গি হামলা করতে পারেন সাহেদুল ও রিশাদ, এমন সম্ভাবনা রয়েছে।"

তদন্তের স্বার্থে তাদের নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। 

সেখানে বলা হয়েছে, দুই আসামির সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের যোগাযোগ রয়েছে কি না, তারা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন কি না, জঙ্গি কর্মকাণ্ডের অর্থায়নের উৎস কারা এবং আন্তর্জাতিক কোনো নিষিদ্ধ জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা আছে কি না—এসব বিষয় উদ্ঘাটনে রিমান্ড প্রয়োজন।

রিমান্ড আবেদনে পুলিশ বলেছে, এসব তথ্য উদ্ঘাটন এবং সম্ভাব্য সহযোগী ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে দুই আসামিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।

জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগ, শংকায় সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশিদের সুনাম

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিঙ্গাপুরে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার।

দক্ষতা, পরিশ্রম ও শৃঙ্খলার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মীদের একটি ইতিবাচক সুনাম রয়েছে।

তবে সময়ে সময়েই জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বাংলাদেশি শ্রমিকদের গ্রেপ্তার ও দেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনা সেই সুনামের ওপর প্রশ্ন তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ সোসাইটির অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং বাংলা ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড লিটারারি সোসাইটির প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী আলাপ-কে বলেছেন, "সিঙ্গাপুরের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অত্যন্ত সতর্ক ও পদ্ধতিগতভাবে কাজ করে। 

“দীর্ঘ তদন্ত ও তথ্য-যাচাই ছাড়া কাউকে ফেরত পাঠানোর নজির নেই। ফলে এমন প্রতিটি ঘটনা প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

এক দশকে গ্রেপ্তার অন্তত ৫৫ বাংলাদেশি

সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশিদের জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগ নতুন নয়। গত এক দশকে বিভিন্ন সময়ে অন্তত ৫৫ জন বাংলাদেশি শ্রমিককে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থা। তাদের মধ্যে ৪৬ জনকে ফেরত পাঠানো হয় বাংলাদেশে।

২০১৬ সালের ২০এ জানুয়ারি সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার অভিযোগে ২৭ বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

২০১৫ সালের ১৬ই নভেম্বর থেকে ১লা ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে আটক করা হয় তাদের।

সেসময় সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ জামান জানান, আটক ২৭ জনের মধ্যে ২৬ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। দেশে ফেরার পর তাদের মধ্যে ১৪ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় বাকিদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

'আইএস বাংলাদেশ' গঠনের অভিযোগ

২০২৬ সালের ৩রা মে সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও আট বাংলাদেশিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনে আটকের তথ্য প্রকাশ করে।

তাদের দাবি, এই আটজন 'ইসলামিক স্টেট ইন বাংলাদেশ (আইএসবি)' নামে একটি উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর সদস্য।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৩১ বছর বয়সি নির্মাণশ্রমিক মিজানুর রহমান ২০১৬ সালের মার্চে সংগঠনটি গঠন করেন। তার কাছ থেকে ‘We Need to Fight for Jihad’ শিরোনামের একটি দলিল উদ্ধার করা হয়, যেখানে বাংলাদেশের সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের একটি তালিকা পাওয়া যায় বলেও দাবি করে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ।

সেই সময় মিজানুর রহমানসহ আট বাংলাদেশির ছবি প্রকাশ করে সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 

অন্যদের মধ্যে ছিলেন লিয়াকত আলী মামুন, সোহাগ ইব্রাহিম, রুবেল মিয়া, দৌলতুজ্জামান, শরিফুল ইসলাম, মো. জাবেদ কায়সার ওরফে হাজি নুরুল ইসলাম সওদাগর) এবং ইসমাইল হাওলাদার সোহেল।

২০১৬ সালের ২৯এ এপ্রিল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠায় সিঙ্গাপুর। তারা হলেন, মিজানুর রহমান, রানা, আলমগীর, তানজিমুল ইসলাম ও সন্তু খান।

দেশে ফিরে তারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিলে ৩রা মে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (সিটিটিসি)। 

২০২০ সালের ২৪এ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার সন্দেহে আহমেদ ফয়সাল নামে এক বাংলাদেশি নির্মাণশ্রমিককে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

২০১৭ সাল থেকে সিঙ্গাপুরে কর্মরত ছিলেন ২৬ বছর বয়সী ফয়সাল। 

একই সময়ে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হুমকির আশঙ্কায় দেশজুড়ে নিরাপত্তা অভিযান জোরদার করা হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ৩৭ জনের বিষয়ে তদন্ত চালানো হয় বলে সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

তদন্ত শেষে বাংলাদেশের ১৫ জন এবং মালয়েশিয়ার একজন নাগরিককে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। 

সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের এই ধারাবাহিক পদক্ষেপ দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মকাণ্ডের ওপর নিরাপত্তা নজরদারি যে ক্রমেই কঠোর বিষয়টি স্পষ্ট বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

উগ্রপন্থায় অর্থায়নের দায়ে সিঙ্গাপুরে দণ্ডিত সাত বাংলাদেশি

সিঙ্গাপুরে জঙ্গিবাদে অর্থায়ন ও উগ্রপন্থি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে এখন পর্যন্ত অন্তত সাত বাংলাদেশি বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড পেয়েছেন। আদালতের রায়গুলোতে অনলাইন উগ্রবাদী প্রচারণা, জঙ্গি অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের প্রতি সমর্থনের অভিযোগ উঠে আসে।

২০১৬ সালের ১২ই জুলাই সিঙ্গাপুরের একটি আদালত 'ইসলামিক স্টেট ইন বাংলাদেশ (আইএসবি)' নামে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান এবং তার তিন সহযোগীকে সন্ত্রাসে অর্থায়নের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে।

রায়ে মিজানুর রহমানকে পাঁচ বছরের, ইসমাইল হাওলাদার সোহেলকে দুই বছরের এবং রুবেল মিয়া ও জাবেদ কায়সার (ওরফে হাজি নুরুল ইসলাম সওদাগর)-কে ৩০ মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এর আগে ২০১৬ সালের এপ্রিলে মিজানুরসহ আট বাংলাদেশিকে আটক করেছিলো সিঙ্গাপুরের নিরাপত্তা বাহিনী। তাদের মধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে অর্থায়নের অভিযোগ আনা হয়।

একই মামলার আরেক রায়ে ২০১৬ সালের ৩০এ আগস্ট সিঙ্গাপুরের জেলা আদালত মিজানুর রহমানের সহযোগী লিয়াকত আলী মামুনকে আড়াই বছরের এবং দৌলতুজ্জামানকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন।

ছয় বছর পর, ২০২২ সালের ২১এ ফেব্রুয়ারি সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠীর জন্য অর্থ সংগ্রহ ও উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশি নির্মাণশ্রমিক আহমেদ ফয়সালকে দুই বছর আট মাসের কারাদণ্ড দেন সিঙ্গাপুরের একটি আদালত।

আদালতের রায়ে বলা হয়, ২০২০ সালের ২রা নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়া ফয়সাল একাধিক ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে জিহাদি প্রচারণা চালাতেন, উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর জন্য অর্থ সংগ্রহে যুক্ত ছিলেন এবং সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কয়েকটি ছুরিও কিনেছিলেন। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দণ্ডিত করা হয়।

সিঙ্গাপুরে মতো আকর্ষণীয় শ্রমবাজারে যেসব বাংলাদেশি সততা, শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে দেশটিতে সুনাম অর্জন করেছিলেন, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড সেই সুনামের ভিত্তি এখন নড়বড়ে হয়ে উঠছে। 

এই বিপর্যয় থেকে শ্রমবাজারকে রক্ষা করতে প্রবাসীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি, সোশ্যাল মিডিয়ায় উগ্রবাদী কনটেন্টের ওপর কঠোর নজরদারি এবং বিদেশে যাওয়ার আগেই মোটিভেশনাল ও সচেতনতামূলক ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।