সংবিধান ‘সংশোধন’ নাকি ‘সংস্কার’, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরবে কোন পথে
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, একই দিনে জাতীয় সংসদের সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার কথা নির্বাচনে বিজয়ীদের। কিন্তু ওই আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সরকারি দল।
নাহিদ হোসেন
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪১ পিএমআপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম
সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে পুনর্বহাল হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। কিন্তু সংবিধানে তা যুক্ত হবে কীভাবে? তা নিয়েই চলছে রাজনৈতিক বিতর্ক। সংসদে পালটা পালটি অবস্থানে সরকার ও বিরোধী দল।
সংবিধান সংশোধনের জন্য সোমবার ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব আনা হয় সংসদে। কিন্তু বিরোধী দল প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ওয়াক আউট করেছে। তাদের অনুপস্থিতিতেই কণ্ঠভোটে প্রস্তাব পাস হয়।
কমিটির জন্য বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচ জনের নাম না দেওয়ায় ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরে নাম দিলে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ।
তবে বিরোধী দলীয় নেতা স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, তাদের অবস্থান এই কমিটি গঠনের বিরুদ্ধে। জুলাই সনদ অনুযায়ী ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবিতে অনড় তারা।
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিলেও, অসাংবিধানিক হওয়ার যুক্তিতে শপথ নেয়নি সরকারি দলের সদস্যরা।
বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তারা সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নিয়েছেন।
“ওইটাকে যদি বাইপাস করার জন্য এই কমিটি গঠন করা হয় তাহলে আমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা আমাদের আগের অবস্থানেই আছি”, বলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির।
সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ এই কমিটির প্রধান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আর সেই আলোচনার উপযুক্ত স্থান সংসদের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি”।
যে কারণে বিরোধ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় ৯ মাস ধরে ৩০টি রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি করেছিলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধানসম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট আছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধীজোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। এটিকে সংবিধান সংশোধন নয়, বরং ‘সংবিধান সংস্কার’ হিসেবে দেখছে তারা।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, একই দিনে জাতীয় সংসদের সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার কথা নির্বাচনে বিজয়ীদের।
কিন্তু বিএনপি ও জোটবদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলো থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় পরিষদ গঠিত হয়নি।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে গত ১৫ই মার্চ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার সমাচার
সম্প্রতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এসেছে সর্বোচ্চ আদালত থেকে। তারপরই জোরেসোরে উঠেছে সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গ।
জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিস্তারিত প্রক্রিয়া উল্লেখ করা আছে। বিচার বিভাগকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখাসহ বেশ কিছু ইস্যুতে নোট অব ডিসেন্ট আছে বিএনপির।
আদালতের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের রায় দিলেও তা কীভাবে সংবিধানে ফিরিয়ে আনতে বেশ কয়েকটি ধারা সংশোধন করতে হবে।
এই সংশোধনে জুলাই সনদ প্রাধান্য পাবে না-কি সংসদ প্রচলিত পদ্ধতিতের আলোচনা করে সংশোধন করবে তাই এখন প্রশ্ন।
ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত হয়েছিলো ১৯৯৬ সালে। এই সংশোধনী ২০১১ সালে বাতিল করে দেয় আপিল বিভাগ।
রিভিউ শুনানি ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায় ফের গত বছর বাতিল করে দেয় আপিল বিভাগ।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয় সংবিধান থেকে। ২০২৪ সালের শেষদিকে, ওই সংশোধনীর কিছু অংশ (তত্ত্বাবধায়ক সরকার, গণভোট ইত্যাদি) বাতিল করে রায় দেয় হাইকোর্ট। রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রায়ের মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংশোধনীতে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’ যে অবস্থায় ছিলো সেই অবস্থায় ফিরে গেছে, অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘রিস্টোর’ হয়েছে।
তবে সংসদ যদি মনে করে আগের অবস্থার বদলে সংযোজন বিয়োজন করা হবে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে তা করার এখতিয়ার আছে সংসদের।
আইনজীবীরা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো কী হবে তা পুরোপুরি সংসদের ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে জুলাই সনদ না-কি নির্বাচনি ইশতেহার প্রাধান্য পাবে তাও সংসদের এখতিয়ারাধীন।
যা আছে জুলাই সনদে
জুলাই সনদের ১৬ নাম্বার দফায় বলা হয়েছে, “সংবিধান সংশোধন করে অনুচ্ছেদ ৫৮খ সংশোধনপূর্বক সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ১৫ দিন পূর্বে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভঙ্গ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।”
কোন প্রক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা হবে, জুলাই সনদে সেটিও বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জুলাই সনদে উল্লিখিত পদ্ধতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বেছে নেওয়া সম্ভব না হলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসরণের কথাও বলা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, তা পরবর্তী সংসদে আলোচনা এবং স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে বলেও উল্লেখ আছে ইশতেহারে।
তবে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাইরে রাখতে চায় বিএনপি।
কার্যত জুলাই সনদ এবং বিএনপির ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে পার্থক্য যৎসামান্যই।
কী করবে সংসদ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ অন্যান্য সাংবিধানিক সংশোধন অথবা সংস্কারে প্রক্রিয়া নিয়েই এখন রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক চলছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট আরিফ খান বলছেন, “জুলাই সনদ সকল অংশগ্রহণকারী পক্ষগুলো একসঙ্গে হয়ে এটাকে অ্যাডপ্ট করেছে। ফলে জুলাই মানতে বাধ্য। জুলাই সনদকে বাস্তবায়ন করা হবে সংবিধানের আলোকে বা সংবিধানের মধ্যে থেকে, বিএনপির এই অবস্থানও আইনগত বিবেচনায় সঠিক।”
আইনজীবী শিশির মনিরও মনে করেন বিষয়টি এখন পুরোপুরি সংসদের এখতিয়ারাধীন। তিনি বলেন, “পার্লামেন্ট ইজ ওপেন। একাধিক পথ আছে। কোনটা বেছে নেবে এটা পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত।”
“যদি পার্লামেন্ট কোনো পরিবর্তন করতে চায় মেজরিটি দিয়ে সংবিধান সংশোধন করে, এই প্রক্রিয়া পার্লামেন্টের জন্য ওপেন থাকবে”, যোগ করেন শিশির মনির।
“কোনো বিষয়ের আইনগত মান্যতা এবং বাধ্যবাধকতার জন্য লিগ্যাল বেসিস বা পাটাতন প্রয়োজন হয়। জুলাই সনদ আদেশের যে এটা নাই তা স্পষ্ট। এই নিয়ে বিতর্ক কিন্তু তখনও তৈরি হয়েছিলো”, আলাপ-কে বলেন আরিফ খান।
তার মতে, “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে যদি লিগ্যাল ভিত্তি ধরে নিয়ে কোনো কাজ করেন, তাহলে ভবিষ্যতে আইনি প্রশ্ন যখন উঠবে তখন অনায়াসে এর আইনগত বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
আইনজীবী শিশির মনির বলছেন, “জুলাই সনদের ওই প্রপোজালটা তারা (সংসদ) গ্রহণ করতে পারে, নাও পারে। উচিততো সনদ অনুযায়ী করা। না করলে আপনি কী করবেন?”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের অন্যতম পিটিশনার সুজন-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে তার ভিন্নমত আছে।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা বাধ্যতামূলক সংসদের জন্য। কারণ গণভোটটা পাস হয়ে গেছে, গণভোটে যখন জনগণ সম্মতি তখন সেটাই শেষ কথা।”
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আমরা তো জনগণের কথা বলি, জনগণের দোহাই দেই। কিন্তু জনগণের মতামত উপেক্ষা করি। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে যদি কাজ করতে চায় তাহলে যেইভাবে জুলাই সনদ পাস হয়েছে, যেভাবে গণভোট পাস হয়েছে সেইভাবেই তাদের (সংসদের) করাটা বাধ্যতামূলক।”
যদি তা না হয়, এরপর কী? বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “এখন দেখা যাক কী হয়, এখন আগেতো বলা দুরূহ। বল এখন সংসদের কোর্টে।”
সংবিধান ‘সংশোধন’ নাকি ‘সংস্কার’, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরবে কোন পথে
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, একই দিনে জাতীয় সংসদের সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার কথা নির্বাচনে বিজয়ীদের। কিন্তু ওই আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সরকারি দল।
সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে পুনর্বহাল হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। কিন্তু সংবিধানে তা যুক্ত হবে কীভাবে? তা নিয়েই চলছে রাজনৈতিক বিতর্ক। সংসদে পালটা পালটি অবস্থানে সরকার ও বিরোধী দল।
সংবিধান সংশোধনের জন্য সোমবার ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব আনা হয় সংসদে। কিন্তু বিরোধী দল প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ওয়াক আউট করেছে। তাদের অনুপস্থিতিতেই কণ্ঠভোটে প্রস্তাব পাস হয়।
কমিটির জন্য বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচ জনের নাম না দেওয়ায় ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরে নাম দিলে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ।
তবে বিরোধী দলীয় নেতা স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, তাদের অবস্থান এই কমিটি গঠনের বিরুদ্ধে। জুলাই সনদ অনুযায়ী ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবিতে অনড় তারা।
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিলেও, অসাংবিধানিক হওয়ার যুক্তিতে শপথ নেয়নি সরকারি দলের সদস্যরা।
বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তারা সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নিয়েছেন।
“ওইটাকে যদি বাইপাস করার জন্য এই কমিটি গঠন করা হয় তাহলে আমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা আমাদের আগের অবস্থানেই আছি”, বলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির।
সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ এই কমিটির প্রধান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আর সেই আলোচনার উপযুক্ত স্থান সংসদের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি”।
যে কারণে বিরোধ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় ৯ মাস ধরে ৩০টি রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি করেছিলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধানসম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট আছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধীজোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। এটিকে সংবিধান সংশোধন নয়, বরং ‘সংবিধান সংস্কার’ হিসেবে দেখছে তারা।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, একই দিনে জাতীয় সংসদের সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার কথা নির্বাচনে বিজয়ীদের।
কিন্তু বিএনপি ও জোটবদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলো থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় পরিষদ গঠিত হয়নি।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে গত ১৫ই মার্চ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার সমাচার
সম্প্রতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এসেছে সর্বোচ্চ আদালত থেকে। তারপরই জোরেসোরে উঠেছে সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গ।
জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিস্তারিত প্রক্রিয়া উল্লেখ করা আছে। বিচার বিভাগকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখাসহ বেশ কিছু ইস্যুতে নোট অব ডিসেন্ট আছে বিএনপির।
আদালতের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের রায় দিলেও তা কীভাবে সংবিধানে ফিরিয়ে আনতে বেশ কয়েকটি ধারা সংশোধন করতে হবে।
এই সংশোধনে জুলাই সনদ প্রাধান্য পাবে না-কি সংসদ প্রচলিত পদ্ধতিতের আলোচনা করে সংশোধন করবে তাই এখন প্রশ্ন।
ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত হয়েছিলো ১৯৯৬ সালে। এই সংশোধনী ২০১১ সালে বাতিল করে দেয় আপিল বিভাগ।
রিভিউ শুনানি ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায় ফের গত বছর বাতিল করে দেয় আপিল বিভাগ।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয় সংবিধান থেকে। ২০২৪ সালের শেষদিকে, ওই সংশোধনীর কিছু অংশ (তত্ত্বাবধায়ক সরকার, গণভোট ইত্যাদি) বাতিল করে রায় দেয় হাইকোর্ট। রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রায়ের মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংশোধনীতে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’ যে অবস্থায় ছিলো সেই অবস্থায় ফিরে গেছে, অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘রিস্টোর’ হয়েছে।
তবে সংসদ যদি মনে করে আগের অবস্থার বদলে সংযোজন বিয়োজন করা হবে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে তা করার এখতিয়ার আছে সংসদের।
আইনজীবীরা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো কী হবে তা পুরোপুরি সংসদের ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে জুলাই সনদ না-কি নির্বাচনি ইশতেহার প্রাধান্য পাবে তাও সংসদের এখতিয়ারাধীন।
যা আছে জুলাই সনদে
জুলাই সনদের ১৬ নাম্বার দফায় বলা হয়েছে, “সংবিধান সংশোধন করে অনুচ্ছেদ ৫৮খ সংশোধনপূর্বক সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ১৫ দিন পূর্বে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভঙ্গ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।”
কোন প্রক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা হবে, জুলাই সনদে সেটিও বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জুলাই সনদে উল্লিখিত পদ্ধতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বেছে নেওয়া সম্ভব না হলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসরণের কথাও বলা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, তা পরবর্তী সংসদে আলোচনা এবং স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে বলেও উল্লেখ আছে ইশতেহারে।
তবে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাইরে রাখতে চায় বিএনপি।
কার্যত জুলাই সনদ এবং বিএনপির ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে পার্থক্য যৎসামান্যই।
কী করবে সংসদ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ অন্যান্য সাংবিধানিক সংশোধন অথবা সংস্কারে প্রক্রিয়া নিয়েই এখন রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক চলছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট আরিফ খান বলছেন, “জুলাই সনদ সকল অংশগ্রহণকারী পক্ষগুলো একসঙ্গে হয়ে এটাকে অ্যাডপ্ট করেছে। ফলে জুলাই মানতে বাধ্য। জুলাই সনদকে বাস্তবায়ন করা হবে সংবিধানের আলোকে বা সংবিধানের মধ্যে থেকে, বিএনপির এই অবস্থানও আইনগত বিবেচনায় সঠিক।”
আইনজীবী শিশির মনিরও মনে করেন বিষয়টি এখন পুরোপুরি সংসদের এখতিয়ারাধীন। তিনি বলেন, “পার্লামেন্ট ইজ ওপেন। একাধিক পথ আছে। কোনটা বেছে নেবে এটা পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত।”
“যদি পার্লামেন্ট কোনো পরিবর্তন করতে চায় মেজরিটি দিয়ে সংবিধান সংশোধন করে, এই প্রক্রিয়া পার্লামেন্টের জন্য ওপেন থাকবে”, যোগ করেন শিশির মনির।
“কোনো বিষয়ের আইনগত মান্যতা এবং বাধ্যবাধকতার জন্য লিগ্যাল বেসিস বা পাটাতন প্রয়োজন হয়। জুলাই সনদ আদেশের যে এটা নাই তা স্পষ্ট। এই নিয়ে বিতর্ক কিন্তু তখনও তৈরি হয়েছিলো”, আলাপ-কে বলেন আরিফ খান।
তার মতে, “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে যদি লিগ্যাল ভিত্তি ধরে নিয়ে কোনো কাজ করেন, তাহলে ভবিষ্যতে আইনি প্রশ্ন যখন উঠবে তখন অনায়াসে এর আইনগত বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
আইনজীবী শিশির মনির বলছেন, “জুলাই সনদের ওই প্রপোজালটা তারা (সংসদ) গ্রহণ করতে পারে, নাও পারে। উচিততো সনদ অনুযায়ী করা। না করলে আপনি কী করবেন?”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের অন্যতম পিটিশনার সুজন-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে তার ভিন্নমত আছে।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা বাধ্যতামূলক সংসদের জন্য। কারণ গণভোটটা পাস হয়ে গেছে, গণভোটে যখন জনগণ সম্মতি তখন সেটাই শেষ কথা।”
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আমরা তো জনগণের কথা বলি, জনগণের দোহাই দেই। কিন্তু জনগণের মতামত উপেক্ষা করি। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে যদি কাজ করতে চায় তাহলে যেইভাবে জুলাই সনদ পাস হয়েছে, যেভাবে গণভোট পাস হয়েছে সেইভাবেই তাদের (সংসদের) করাটা বাধ্যতামূলক।”
যদি তা না হয়, এরপর কী? বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “এখন দেখা যাক কী হয়, এখন আগেতো বলা দুরূহ। বল এখন সংসদের কোর্টে।”
বিষয়: