আম্মার-কাণ্ডের পর প্রশ্নের মুখে রাকসু: দায়িত্ব নাকি প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি
রাকসু আবারও আলোচনায়। আম্মার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে ছাত্র সংসদের বর্তমান ভূমিকা নিয়ে।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩২ পিএমআপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), যে সংগঠন একসময় শিক্ষার্থীদের অধিকার, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলো, সাম্প্রতিক সময়ে বারবার আলোচনায় আসছে বিতর্কিত ঘটনাকে ঘিরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ছাত্র সংসদ। এর মধ্যে বারবার আলোচনায় উঠে আসে রাকসু।
বিশেষ করে সম্প্রতি রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারকে ঘিরে সংঘর্ষ ও শিক্ষার্থী মারধরের অভিযোগ আবারও আলোচনার ঝড় উঠেছে।
সোমবার এক নারী শিক্ষার্থীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধের জেরে রাকসু কার্যালয়, প্রক্টর অফিস ও কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ ওঠে, রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর করেছেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে।
এই ঘটনার পর আলোচনায় এসেছে, ছাত্র সংসদের নেতাদের ভূমিকা কি শুধুই শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা করা, নাকি তারা ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্র হয়ে উঠছেন?
১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ বিভিন্ন সময়ে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে।
১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। সেই আন্দোলনে নিহত হন শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা, যিনি শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন।
এরপর দীর্ঘ সময় ছাত্র সংসদ নির্বাচন না থাকায় ক্যাম্পাসে প্রতিনিধিত্বশীল ছাত্র নেতৃত্বের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে যখনই রাকসু নির্বাচন বা রাকসুর কোনো ঘটনা সামনে আসে, সেটি জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় চলে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকসুসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাকসুর আলোচনায় থাকার অন্যতম কারণ হলো—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির সক্রিয়তা এবং জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব।
সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকে মনে করেন, রাকসু দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যের একটি প্রতীক। তাই রাকসুর নেতৃত্ব, নির্বাচন কিংবা নেতাদের কর্মকাণ্ড সহজেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
শিক্ষার্থীরা কী বলছেন?
বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনেকের প্রশ্ন.ছাত্র সংসদের মূল উদ্দেশ্য কি শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার?
তাদের মতে, ছাত্র সংসদ কার্যকর হলে আবাসন, পরিবহন, নিরাপত্তা, একাডেমিক সমস্যা ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু নেতৃত্বের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে পুরো প্রতিষ্ঠানটির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপোর্টিং ইউনিটের সেক্রেটারি শান্ত ইসলাম বলেন, “রাকসু বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক ছাত্র সংসদ। তবে বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, রাকসুর মূল দায়িত্ব কি শিক্ষার্থীদের অধিকার ও সমস্যা নিয়ে কাজ করা, নাকি ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা।”
তিনি বলেন, “রাকসু নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের সামনে বিভিন্ন ইশতেহার দিয়েছিলেন। বিশেষ করে নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের অনেক প্রতিশ্রুতি ছিলো। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে সেসব প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন এখনো তেমনভাবে দেখা যাচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।”
শান্ত ইসলাম আরও বলেন, “রাকসুর কার্যক্রমে রাজনৈতিক আলোচনা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে কোনো পক্ষ শিবির বা অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এ ধরনের আলোচনা সামনে আসছে। এতে ছাত্র সংসদের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আলি রমজান বলেন, ছাত্র সংসদ বা ক্যাম্পাসভিত্তিক সংগঠনগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীরা কতটা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, তাদের সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায় এবং তাদের উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখা যায়।
“আমরা আশা করেছিলাম, রাকসু নির্বাচনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পাবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি।”
রাজনীতির সঙ্গে ছাত্র সংসদের সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশে রাজনীতি থাকা উচিত মত দিয়ে এই গবেষক বলেন, “যখন মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব ছাত্র সংসদের কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন শিক্ষার্থীদের স্বার্থ পিছিয়ে যায়। বিভিন্ন প্যানেল ও কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনেরও দায় রয়েছে মত দিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রশাসন চাইলে একটি নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে পারতেন। কিন্তু অতীতে যেমন বিভিন্ন সংগঠনের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা দেখা গেছে, এখনো সেই সংস্কৃতি পুরোপুরি পরিবর্তন হয়নি।
আম্মার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কেউ একদিনে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব ছিলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে না পারে। কিন্তু সেই জায়গায় ব্যর্থ হওয়ায় এই ফল দাঁড়িয়েছে।
আম্মারের প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার উপস্থাপন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলন করে রাকসু।
সেখানে সাংবাদিকদের উদ্দেশে সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, “আমি আপনাদের সাংবাদিকতা শেখাবো না, এটা আমার থেকে ভালো আপনারা জানেন। কীভাবে শব্দ দিয়ে মানুষকে তৈরি করতে হয়, কীভাবে শব্দ দিয়ে মানুষকে ধ্বংস করতে হয়, এই জায়গায় আপনাদের অবদান আছে।”
তিনি আরও বলেন, “আপনারা প্রত্যেকেই জুলাইয়ের সময় সামনে থেকে কাজ করেছেন। এই ঘটনাকে শুধু একটি অভিযোগ বা সংঘর্ষ হিসেবে না দেখে, এটাকে প্রতিরোধ হিসেবেও কেন নিতে পারেন না?”
প্রশাসন কী বলছে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, “ঘটনার পরদিনই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটির সদস্যরা ইতোমধ্যে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।”
তিনি বলেন, “ঘটনার একটি অংশ প্রক্টর অফিসের কাছাকাছি এলাকায় ঘটেছে। পরে রাকসু ভবনে গিয়ে সালাউদ্দিন আম্মার ও রাকসুর নাজম নামে একজন আহত হন। এরপর আনাসসহ তার সহযোগীরা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির রিডিং রুমের পাশের এলাকায় গেলে সেখানে আবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।”
প্রক্টর বলেন, “ঘটনার কিছু ভিডিও ও তথ্য আমাদের কাছে এসেছে। তবে সব ধরনের ভিডিও পাওয়া না গেলেও ঘটনার সত্যতা রয়েছে। তদন্ত কমিটি ঘটনার পেছনে ও সামনে থাকা সব বিষয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করছে।”
তিনি আরও বলেন, “তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
“সিম্পটম অব এ গ্রেটার পলিটিকাল ডেডলক”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পর আমরা আশা করেছিলাম, ছাত্র সংসদগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করবে। শিক্ষার্থীদের সমস্যা, অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করাই হওয়া উচিত ছাত্র সংসদের মূল ভূমিকা।”
তিনি বলেন, “কিন্তু বর্তমানে যে ধরনের ঘটনা সামনে আসছে, তাতে মনে হচ্ছে আমরা আবার আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকেই ফিরে যাচ্ছি। এ ধরনের ঘটনা মোটেও শুভ নয়। আসলে বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটা এসেছে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।”
“এটা খুবই রিগ্রেটেবল এবং এটার ওয়াইডার ইমপ্লিকেশনটা অনেক বেশি সিরিয়াস। সিম্পটম অব এ গ্রেটার মানে পলিটিক্যাল ডেডলক অ্যান্ড পলিটিকাল ইনস্টেবিলিটি ইন বাংলাদেশ।”
আম্মার-কাণ্ডের পর প্রশ্নের মুখে রাকসু: দায়িত্ব নাকি প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি
রাকসু আবারও আলোচনায়। আম্মার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে ছাত্র সংসদের বর্তমান ভূমিকা নিয়ে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), যে সংগঠন একসময় শিক্ষার্থীদের অধিকার, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলো, সাম্প্রতিক সময়ে বারবার আলোচনায় আসছে বিতর্কিত ঘটনাকে ঘিরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ছাত্র সংসদ। এর মধ্যে বারবার আলোচনায় উঠে আসে রাকসু।
বিশেষ করে সম্প্রতি রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারকে ঘিরে সংঘর্ষ ও শিক্ষার্থী মারধরের অভিযোগ আবারও আলোচনার ঝড় উঠেছে।
সোমবার এক নারী শিক্ষার্থীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধের জেরে রাকসু কার্যালয়, প্রক্টর অফিস ও কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ ওঠে, রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর করেছেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে।
এই ঘটনার পর আলোচনায় এসেছে, ছাত্র সংসদের নেতাদের ভূমিকা কি শুধুই শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা করা, নাকি তারা ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্র হয়ে উঠছেন?
১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ বিভিন্ন সময়ে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে।
১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। সেই আন্দোলনে নিহত হন শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা, যিনি শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন।
এরপর দীর্ঘ সময় ছাত্র সংসদ নির্বাচন না থাকায় ক্যাম্পাসে প্রতিনিধিত্বশীল ছাত্র নেতৃত্বের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে যখনই রাকসু নির্বাচন বা রাকসুর কোনো ঘটনা সামনে আসে, সেটি জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় চলে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকসুসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাকসুর আলোচনায় থাকার অন্যতম কারণ হলো—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির সক্রিয়তা এবং জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব।
সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকে মনে করেন, রাকসু দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যের একটি প্রতীক। তাই রাকসুর নেতৃত্ব, নির্বাচন কিংবা নেতাদের কর্মকাণ্ড সহজেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
শিক্ষার্থীরা কী বলছেন?
বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনেকের প্রশ্ন.ছাত্র সংসদের মূল উদ্দেশ্য কি শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার?
তাদের মতে, ছাত্র সংসদ কার্যকর হলে আবাসন, পরিবহন, নিরাপত্তা, একাডেমিক সমস্যা ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু নেতৃত্বের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে পুরো প্রতিষ্ঠানটির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপোর্টিং ইউনিটের সেক্রেটারি শান্ত ইসলাম বলেন, “রাকসু বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক ছাত্র সংসদ। তবে বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, রাকসুর মূল দায়িত্ব কি শিক্ষার্থীদের অধিকার ও সমস্যা নিয়ে কাজ করা, নাকি ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা।”
তিনি বলেন, “রাকসু নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের সামনে বিভিন্ন ইশতেহার দিয়েছিলেন। বিশেষ করে নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের অনেক প্রতিশ্রুতি ছিলো। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে সেসব প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন এখনো তেমনভাবে দেখা যাচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।”
শান্ত ইসলাম আরও বলেন, “রাকসুর কার্যক্রমে রাজনৈতিক আলোচনা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে কোনো পক্ষ শিবির বা অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এ ধরনের আলোচনা সামনে আসছে। এতে ছাত্র সংসদের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আলি রমজান বলেন, ছাত্র সংসদ বা ক্যাম্পাসভিত্তিক সংগঠনগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীরা কতটা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, তাদের সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায় এবং তাদের উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখা যায়।
“আমরা আশা করেছিলাম, রাকসু নির্বাচনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পাবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি।”
রাজনীতির সঙ্গে ছাত্র সংসদের সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশে রাজনীতি থাকা উচিত মত দিয়ে এই গবেষক বলেন, “যখন মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব ছাত্র সংসদের কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন শিক্ষার্থীদের স্বার্থ পিছিয়ে যায়। বিভিন্ন প্যানেল ও কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনেরও দায় রয়েছে মত দিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রশাসন চাইলে একটি নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে পারতেন। কিন্তু অতীতে যেমন বিভিন্ন সংগঠনের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা দেখা গেছে, এখনো সেই সংস্কৃতি পুরোপুরি পরিবর্তন হয়নি।
আম্মার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কেউ একদিনে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব ছিলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে না পারে। কিন্তু সেই জায়গায় ব্যর্থ হওয়ায় এই ফল দাঁড়িয়েছে।
আম্মারের প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার উপস্থাপন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলন করে রাকসু।
সেখানে সাংবাদিকদের উদ্দেশে সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, “আমি আপনাদের সাংবাদিকতা শেখাবো না, এটা আমার থেকে ভালো আপনারা জানেন। কীভাবে শব্দ দিয়ে মানুষকে তৈরি করতে হয়, কীভাবে শব্দ দিয়ে মানুষকে ধ্বংস করতে হয়, এই জায়গায় আপনাদের অবদান আছে।”
তিনি আরও বলেন, “আপনারা প্রত্যেকেই জুলাইয়ের সময় সামনে থেকে কাজ করেছেন। এই ঘটনাকে শুধু একটি অভিযোগ বা সংঘর্ষ হিসেবে না দেখে, এটাকে প্রতিরোধ হিসেবেও কেন নিতে পারেন না?”
প্রশাসন কী বলছে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, “ঘটনার পরদিনই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটির সদস্যরা ইতোমধ্যে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।”
তিনি বলেন, “ঘটনার একটি অংশ প্রক্টর অফিসের কাছাকাছি এলাকায় ঘটেছে। পরে রাকসু ভবনে গিয়ে সালাউদ্দিন আম্মার ও রাকসুর নাজম নামে একজন আহত হন। এরপর আনাসসহ তার সহযোগীরা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির রিডিং রুমের পাশের এলাকায় গেলে সেখানে আবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।”
প্রক্টর বলেন, “ঘটনার কিছু ভিডিও ও তথ্য আমাদের কাছে এসেছে। তবে সব ধরনের ভিডিও পাওয়া না গেলেও ঘটনার সত্যতা রয়েছে। তদন্ত কমিটি ঘটনার পেছনে ও সামনে থাকা সব বিষয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করছে।”
তিনি আরও বলেন, “তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
“সিম্পটম অব এ গ্রেটার পলিটিকাল ডেডলক”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পর আমরা আশা করেছিলাম, ছাত্র সংসদগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করবে। শিক্ষার্থীদের সমস্যা, অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করাই হওয়া উচিত ছাত্র সংসদের মূল ভূমিকা।”
তিনি বলেন, “কিন্তু বর্তমানে যে ধরনের ঘটনা সামনে আসছে, তাতে মনে হচ্ছে আমরা আবার আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকেই ফিরে যাচ্ছি। এ ধরনের ঘটনা মোটেও শুভ নয়। আসলে বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটা এসেছে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।”
“এটা খুবই রিগ্রেটেবল এবং এটার ওয়াইডার ইমপ্লিকেশনটা অনেক বেশি সিরিয়াস। সিম্পটম অব এ গ্রেটার মানে পলিটিক্যাল ডেডলক অ্যান্ড পলিটিকাল ইনস্টেবিলিটি ইন বাংলাদেশ।”