সত্যিকারের শিক্ষানুরাগী, সম্মান, প্রভাব নাকি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ কামানো?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির একটি পদ ঘিরে কেন তৈরি হয় এতো প্রতিযোগিতা?
পদটি বেতনভুক্ত নয়, নেই কোনো নিয়মিত অফিসও।
অথচ কোনো কোনো এলাকায় স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা সদস্য হওয়ার জন্য প্রার্থী খোঁজা, ভোটের হিসাব, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তৎপরতা- সব মিলিয়ে তৈরি হয় জাতীয় বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মতো বিশাল রাজনৈতিক উৎসব ও মর্যাদার লড়াইয়ের আবহ।
সম্প্রতি ঢাকার অন্যতম শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকার শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির নির্বাচন রীতিমতো সংসদ নির্বাচনের আমেজ তৈরি করে।
প্রার্থীদের শত শত রঙিন ব্যানার, ফেস্টুন এবং লিফলেটে ছেয়ে যায় পুরো ডেমরা এলাকা। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়া এবং নির্বাচনি ক্যাম্প স্থাপনের ঘটনা ছিলো একেবারে বড় বড় রাজনৈতিক আয়োজনের মতো।
অনেক স্কুল-কলেজের নির্বাচনে হাজার হাজার অভিভাবকরা ভোট দেন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে চলে সেই ভোট গ্রহণ।
ঢাকার নামকরা একাধিক শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে বড় অংকের টাকা ছড়ানো এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে ‘পকেট কমিটি’ গঠনের অভিযোগ উঠেছে বহুবার।
এমনকি বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের মাধ্যমিক স্কুল এবং ডিগ্রি কলেজের ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচনে প্রার্থী ভেদে লাখ লাখ টাকা খরচ এবং ভোট কেনাবেচারও অভিযোগ উঠেছে।
প্রশ্ন হলো- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির একটি পদে এমন কী ক্ষমতা আছে, যার জন্য এতো আগ্রহ অসংখ্য মানুষের?
নাকি এই পদে এমন কিছু রয়েছে- যা ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, প্রভাব এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ- এই চার বিষয়ের সম্মিলিত সমীকরণ তৈরি করেছে?
অথচ এই পদ যখন তৈরি হয়, তখন লক্ষ্য ছিলো- স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষানুরাগী এবং অভিভাবকদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি স্থানীয় মানুষের মালিকানাবোধ ও দায়বদ্ধতা তৈরি করা।
কিন্তু এখন তা এসে কোথায় দাঁড়িয়ে? স্কুল-কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সেই পদই কি এখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার?
“ওভারঅল ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে যে কনসেপ্ট- হ্যাঁ এটা একটা সময়কার নেসেসিটি এক রকম ছিলো, বাস্তবতা একরকম ছিলো। এখনকার বাস্তবতা আরেকরকম। এগুলো আমার মনে হয়, টোটালি রিভিজিট করা দরকার যে, থাকবে কি থাকবে না?” আলাপ-কে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রগতি না হওয়ার পেছনের অন্যতম কারণ হিসেবে স্কুল ম্যানেজিং কমিটিতে ‘অনুপ্রবেশ’কে দায়ী করছেন দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। “সার্বিকভাবে আমাদের দেশের শিক্ষার মান যেরকম বিরাট ধরনের অবনমন হয়েছে, তার পেছনে যে শক্তিগুলো, তার মধ্যে একটা বিষয় হচ্ছে ব্যবস্থাপনা কমিটিতে নির্বাচিত হওয়া বা অনুপ্রবেশের দৌড়ঝাঁপ।”
স্কুল-কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটি কী এবং কীভাবে এলো
বাংলাদেশে বেসরকারি (এমপিওভুক্ত) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২১ হাজারের বেশি। এখানে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি) থাকা বাধ্যতামূলক।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৬৬টি। এখানেও রয়েছে এসএমসি।
প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বেসরকারি কলেজ (উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি) ও মাদরাসাতে (কামিল/ফাজিল) রয়েছে ‘গভর্নিং বডি’।
এছাড়া মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রায় ৯ হাজার বেসরকারি মাদরাসায় (দাখিল ও আলিম): রয়েছে মাদরাসায় ম্যানেজিং কমিটি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের স্কুল, কলেজ এবং মাদরাসা মিলিয়ে লাখ খানেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে পরিচালনা কমিটি (ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি)।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির গঠনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ ছিলো। তবে প্রধান লক্ষ্য ছিলো, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বিস্তার ঘটানো।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে বিভিন্ন স্কুল পরিচালিত হলো স্থানীয় তহবিল ও ‘গণ্যমান্য’ ব্যক্তিদের উদ্যোগে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, এই অঞ্চলে শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছে অনেক পরে। শিক্ষার তিনটি স্তর থাকে। ইনফর্মাল, নন-ফর্মাল এডুকেশন, এরপরে ফর্মাল এডুকেশন।
“আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পেয়েছি অনেক পরে। আমাদের একসময় মক্তব, টোল এগুলো ছিলো, গুরু নিরূপণ শিক্ষা ব্যবস্থা ছিলো। সেগুলো থেকে বেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকতা আসলো অনেক পরে।”
এক সময় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় সম্পদশালী বা ধনাঢ্য ব্যক্তিরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতেন। সেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বেও থাকতেন তারাই।
“তারা ফিল করলেন যে, আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বানাবো। উনি যখন করতেন, তখন এলাকার কোনো লোকজনকে রাখতেন। সাধারণত উনি সভাপতি হতেন এবং অন্যকে মেম্বার বানাতেন। এই ধারাবাহিকতা থেকেই আস্তে আস্তে আস্তে হলো,” বলেন অধ্যাপক মুজিবুর।
পরবর্তীতে ১৯৬১ সালের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অর্ডিন্যান্সের আওতায় শিক্ষাবোর্ডগুলোকে আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয় স্কুল ও কলেজ পরিচালনার কমিটি অনুমোদনের।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে একটি সাময়িক রেগুলেশন বা নিয়ম করা হলেও, সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ প্রবিধানমালা হিসেবে ১৯৭৭ সালের ২৪এ মার্চ গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে। তখন থেকেই এটি সব স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে চালু হয়।
এরপর বিভিন্ন সময়ে সংশোধন হয়েছে প্রবিধানমালা। ২০০৯ সালে ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা’ নতুনভাবে জারি করা হয়।
ব্যবস্থাপনা কমিটিকে সক্রিয় করার পেছনে সরকারের পক্ষ থেকে বেশকিছু যুক্তি ছিলো।
সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো, রাষ্ট্রের একার পক্ষে প্রতিটি এলাকার বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন তদারকি করা সম্ভব নয়। তাই স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষানুরাগী এবং অভিভাবকদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করলে বিদ্যালয়ের প্রতি স্থানীয় মানুষের মালিকনাবোধ ও দায়বদ্ধতা তৈরি হবে।
এছাড়া, সরকারি আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমানো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, স্থানীয় সম্পদ ও অনুদান সংগ্রহ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানো, স্থানীয় চাহিদানুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়াও ছিলো এর পেছনের অন্যতম কারণ।
কিন্তু ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে এতো প্রশ্ন কেন?
যে মহৎ ও ইতিবাচক যুক্তিগুলো দিয়ে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, বর্তমানে যেন তার উলটো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
এখন স্থানীয় সমাজসেবার চেয়ে রাজনীতিকরণ, শিক্ষক নিয়োগ ও ভর্তি বাণিজ্য এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে কমিটির মূল আকর্ষণের জায়গা।
টিআইবির ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “ম্যানেজিং কমিটির সদস্য বা সভাপতিদের প্রধান যোগ্যতা হওয়া উচিত শিক্ষানুরাগ। তারা যে পেশারই হোন না কেন, তাদের মূল লক্ষ্য হতে হবে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার বিকাশ এবং মান উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সুশাসন ও নৈতিকতা বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের পাঠাগার ও গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে অবদান রাখা তাদের অন্যতম দায়িত্ব বলেও মনে করেন তিনি।
তবে বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে আসার জন্য যে দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়, তার একটি বড় কারণ হিসেবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দায়ী করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি পর্যায়ে- নেতৃত্ব থেকে শুরু করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী স্তর পর্যন্ত নজিরবিহীন দলীয়করণ করা হয়েছে।
“মূলত রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা অন্যতম বিষয় হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ। নেতৃত্ব থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, দেশ থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ে। এমন কোনো পেশা তো নাই বাংলাদেশে, যেখানে দলীয় প্রভাব নাই।”
“এটাকে শিক্ষাখাতেও বিকশিত করার একটা প্রচন্ড ক্ষুধা ও চাহিদা আছে,” যোগ করেন তিনি।
১৯৭৭ সালের প্রবিধানে বিদ্যালয়ের যেকোনো শিক্ষক এবং কর্মচারী নিয়োগের সম্পূর্ণ ক্ষমতা ছিলো স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটির হাতে। কমিটি নিজেদের পছন্দমতো বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারতো।
কিন্তু এই ক্ষমতার অপব্যবহার এতোটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, ২০১৫ সালে এনটিআরসিএ গঠনের পর কমিটির শিক্ষক নিয়োগের মূল ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। তখন থেকে শিক্ষক নিয়োগ করে সরকার, আর কমিটি সম্পন্ন করে শুধু যোগদানের আনুষ্ঠানিকতা।
আগে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা সরাসরি বা পদাধিকারবলে হতে পারতেন যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। তবে ২০০৯ সালের প্রবিধানমালায় সংসদ সদস্যদের নিজ এলাকার চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হওয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমপিদের প্রভাব এতোটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, শিক্ষাঙ্গণে তীব্র রাজনীতিকরণ ও ‘পকেট কমিটির’ সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
অবশেষে ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত এই নিয়ম বাতিল হয় এবং ২০২০ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটি থেকে বাদ পড়েন সংসদ সদস্যরা।
কালক্রমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির পদ এমন হয়ে উঠেছে যে, স্থানীয় রাজনীতিক, ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী ব্যক্তির জন্য এই কমিটিতে থাকা অনেক সময় সামাজিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
ম্যানেজিং কমিটিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি হলো শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ এবং ভর্তি।
কিছু প্রতিষ্ঠানে কমিটির প্রভাব ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে নিয়োগ বা ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সুযোগ। অনেক নামকরা স্কুলের বিরুদ্ধেও এসব অভিযোগ।
প্রশ্ন ওঠে শিশুদের মিড ডে মিল নিয়ে, যেখানেও পৌঁছেছে দুর্নীতির থাবা।
এছাড়াও গ্রাম বা মফস্বলের সামাজিক বাস্তবতায় স্কুল-কলেজের সভাপতি বা সদস্য হওয়া আগে থেকেই মর্যাদার বিষয় হওয়াঢয় এ নিয়েও আগ্রহ রয়েছে।
কিন্তু সবক্ষেত্রেই বিষয়টা এমন না। অনেকেই আছেন, যাদের লক্ষ্য থাকে শিক্ষার বিস্তার ঘটানো।
টাঙ্গাইল দিঘুলিয়া শহীদ মিজানুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি ছিলেন এ হাসান ফিরোজ।
তিনি কীভাবে এই পদে এলেন তা জানতে চাইলে বলেন, “মূলত আমার মামা স্কুলটির সভাপতি ছিলেন। তিনি মারা গেলে কমিটির বাকি সদস্য এবং এলাকার লোকজনের সম্মতিতে আমি সভাপতি নির্বাচিত হই।”
“মূল কথা হলো যে, এটি একটি সম্মানী পোস্ট। কিন্তু এখানে যে ধরনের লোকের সভাপতি হওয়ার কথা, সে ধরনের লোকজন এখানে যেতে পারে না।”
এর কারণ হিসেবে তিনি “বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং এলাকার সার্বিক পরিস্থিতিকে” দায়ী করেন।
“দেখলাম, প্রভাবশালী একজন সদস্যের সাথে হেডমাস্টার মিলেমিশে নিজের ইচ্ছামতো সব চালাইতো। পরে আমি যখন সভাপতি হলাম, দেখলাম কোনো ক্যাশ বই নেই। এমনকি স্কুল ফান্ডে কোনো ক্যাশই নেই। পরে স্থানীয় এমপি যিনি ওই ম্যানেজিং কমিটির একজন দাতা সদস্য, তাকে জানালে হেডমাস্টারকে তিনি তিন মাস সময় দিলেন। তিন মাস পর সে ক্যাশ বই লিখলো এবং দেখা গেল ব্যাংকের সাথে ৬ লাখ টাকার গরমিল রয়েছে।”
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে হাসান ফিরোজ বলেন, “শিক্ষার মান বলতে এখন টাকা দিয়ে শিক্ষা কেনার মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকরা স্কুলে ঠিকমতো পড়ান না। আর শিক্ষা অফিসার বা অডিট অফিসাররা সঠিক তদন্ত করেন না।”
‘মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সুশাসন: কমিউনিটি মনিটরিং থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও সুপারিশ’ শিরোনামে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে টিআইবি একটি গবেষণা প্রকাশ করে।
সেখানে লেখা হয়েছে, “অনেক বিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি নেই এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমিটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য নির্বাচন বা মনোনয়নে রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা প্রভাব বিস্তার করে কমিটি গঠন করে থাকেন।
“অনেক সদস্যের শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান নেই। ফলে বিদ্যালয়ের নীতি প্রণয়ন, শিক্ষক নিয়োগ বা আর্থিক পরিকল্পনায় তারা সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন।”
ওই গবেষণায় আরো দেখানো হয়েছে, “শিক্ষা অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ দুর্বল। ফলে অনেক কমিটি নিয়মিত সভা করে না বা কেবল কাগজে-কলমে বৈঠক দেখানো হয়।”
টিআইবির গবেষণােয় ব্যবস্থাপনা কমিটির দূর্বলতাগুলো মোটাদাগে চিহ্নিত করা হয়েছে:
- নিয়মিত সভা না হওয়া,
- সদস্যদের অনুপস্থিতি ও নিষ্ক্রিয়তা
- রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও পক্ষপাতিত্ব
- অভিভাবকদের সাথে দুর্বল যোগাযোগ
- স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ
- কমিউনিটি অ্যাকশন মিটিং ও মনিটরিংয়ে সমস্যা উন্মোচিত হওয়া
- এডহক কমিটির দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান
২০২১ সালের আরেক গবেষণায় টিআইবি দেখিয়েছে, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমে, বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম রয়েছে।
দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, স্কুলের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি, প্রধান শিক্ষক, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কর্মকর্তা এবং দালালদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে সেখানে তুলে ধরা হয়।
ওই গবেষণায় দেখানো হয়, শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে ৫ হাজার টাকা থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। সহকারী প্রধান শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দিতে হয় ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা। আর সহকারী গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগে ঘুষের পরিমাণ ২ থেকে ৩ লাখ টাকা।
এমপিওভুক্তির জন্য ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয় বলেও উঠে আসে ওই প্রতিবেদনে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই পরিস্থিতির এখন কেমন? গত দুই বছরে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে কতটা বদল ঘটলো?
টিআইবির ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পাঁচই অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তাতে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিলো, শিক্ষা ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু ৫ই অগাস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে যে “দখলবাজি” ও “দলীয় প্রভাব”-এর চিত্র দেখা গেছে, তাতে বোঝা যায় যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বরং "এতদিন সুযোগ পাইনি, এখন আমাদের পালা" এই মানসিকতা থেকে একই ধরনের দলীয়করণের ধারা অব্যাহত রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
“যেটা হয়েছে, এটা আমাদের পালা। এতোদিন আমরা সুযোগটা পাই নাই বা কম ছিলো।”
তাহলে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটিকে শক্তিশালী করতে হবে, নাকি এই ব্যবস্থাই বিলুপ্ত করতে হবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম শিক্ষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন, যা আমলা বা রাজনৈতিক দল নির্ভর হবে না। এই কমিশন একটি জাতীয় শিক্ষা দর্শন নির্ধারণ করবে, যার মাধ্যমে ঠিক করা হবে শিক্ষার মাধ্যমে কেমন মানুষ তৈরি করতে চাই আমরা।
“প্রথমে হলো শিক্ষা কমিশন করে শিক্ষা দর্শনটা নির্ণয় করা দরকার। এরপর শিক্ষানীতির উপরে ভিত্তি করে কারিকুলাম তৈরি করতে হবে। সেই শিক্ষাক্রমের ভিত্তিতে তৈরি হবে টেক্সটবুক।”
এই অধ্যাপক বলেন, “স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি নিয়ে… হ্যাঁ শুধু এটা না, এটার সাথে আরো অনেক কিছু জড়িত- প্রশাসনিক, অবকাঠামো, বরাদ্দ, টেক্সট বুক, বিনামূল্যে শিক্ষা, মিডডে মিল- সবকিছু এর সাথে ইনভলভ।”
স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটি তৈরির পেছনে যে ধারণা ছিলো, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি মালিকানাবোধ, জবাবদিহিতা ও শিক্ষার মান বাড়ানো–সময়ের সঙ্গে সেই ধারণার সঙ্গে তৈরি হয়েছে বাস্তবতার দূরত্ব।a
রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব, নিষ্ক্রিয়তা, দুর্বল তদারকি এবং নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলোই বলে দিচ্ছে, শুধু কমিটি থাকলেই নিশ্চিত হয় না স্থানীয় অংশগ্রহণ।
তাই প্রশ্নটি শুধু ম্যানেজিং কমিটি থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কারা সিদ্ধান্ত নেবেন, তাদের জবাবদিহিতা কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থের বাইরে শিক্ষার্থীর স্বার্থকে কীভাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে।



