মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বড় ধরনের ঘোষণার ঠিক আগ মুহূর্তে আর্থিক বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেনের ঘটনা নিয়ে জোরালো সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, এসব লেনদেনে ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের ইঙ্গিত থাকতে পারে।
বিবিসি-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন আর্থিক বাজারে লেনদেনের ভলিউমের তথ্য প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে, ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা বা কখনও মিনিট খানেক আগেই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এসব লেনদেন অবৈধ ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের বৈশিষ্ট্য বহন করছে। যেখানে সাধারণ মানুষের জানার কথা না এমন তথ্যের ভিত্তিতে আগাম বিনিয়োগ করা হয়েছে।
তবে অন্যরা বলছেন, কিছু বিনিয়োগকারী হয়ত প্রেসিডেন্টের পদক্ষেপ আগাম অনুমান করতে দক্ষ হয়ে উঠেছে।
তেলের বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন
গত ৯ই মার্চ ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের নয়দিন পর ট্রাম্প সিবিএস নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুদ্ধ “প্রায় শেষ পর্যায়ে।”
সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের ৪৭ মিনিট আগেই তেলের দাম কমবে বলে বড় অঙ্কের বাজি ধরা হয়।
পরে সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলে, তেলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এতে সংশ্লিষ্ট ট্রেডাররা কোটি ডলার লাভ করে।
ঘোষণার আগেই বড় বাজি
গত ২৩এ মার্চ, ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ইরানের সঙ্গে “সম্পূর্ণ সমাধান” নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানান।
কিন্তু তার সেই পোস্টের ১৪ মিনিট আগেই তেলের দামে পতন হবে বলে ‘অস্বাভাবিক’ পরিমাণ বাজি ধরা হয়। বিশ্লেষকরা যাকে “নিশ্চিতভাবেই অস্বাভাবিক” বলে মন্তব্য করেছেন।
শেয়ারবাজারেও একই চিত্র
২০২৫ সালের ২রা এপ্রিল ট্রাম্প ‘লিবারেশন ডে’ নামে বৈশ্বিক শুল্ক ঘোষণা দিলে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে ধস নামে। তবে এক সপ্তাহ পর, তিনি ৯০ দিনের জন্য শুল্ক স্থগিতের ঘোষণা দিলে বাজারের সূচকের বড় উত্থান হয়।
এসএন্ডপি ফাইভ হান্ড্রেড সূচক সেদিন ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে যায়, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অন্যতম বড় উত্থান।
ঘোষণার ১৮ মিনিট আগে থেকেই বাজার বাড়বে বলে ‘বিপুল’ পরিমাণ বিনিয়োগ শুরু হয়, যখন কিছু ট্রেডার ২০ লাখ ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে প্রায় ২ কোটি ডলার লাভ করে।
এই ঘটনায় পরে মার্কিন সিনেটের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে চিঠি দিয়ে তদন্তের আহ্বান জানান। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
প্রেডিকশন মার্কেটেও সন্দেহ
অনলাইন প্রেডিকশন প্ল্যাটফর্ম, যেমন, পলিমার্কেট এবং কালশি-তেও একই ধরনের সন্দেহজনক কার্যক্রম দেখা গেছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ‘বারডেনসাম মিক্স’ নামে একটি অ্যাকাউন্ট ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণ করা নিয়ে বাজি ধরে।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী তাকে আটক করলে ওই অ্যাকাউন্ট ৪ লাখ ৩৬ হাজার ডলার লাভ করে।
একইভাবে কয়েকটি অ্যাকাউন্ট যুক্তরাষ্ট্রের আগাম ইরান হামলা ও যুদ্ধবিরতি নিয়েও সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করে মিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
প্রমাণ করা দুঃসাধ্য
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩৩ সালের এক আইন অনুযায়ী ইনসাইডার ট্রেডিং অবৈধ। ২০১২ সালে এই আইন সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়।
ইএসএসইসি বিজনেস স্কুলের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পল ওডেনের মতে, “এই ধরনের অপরাধ প্রমাণ করা খুবই কঠিন। কারণ তথ্যের উৎস চিহ্নিত করা না গেলে মামলা করা যায় না।”
“লেনদেনের ধরণ দেখে বোঝা যেতে পারে কেউ আগাম তথ্য পেয়েছিল। তবুও কাউকে শাস্তি দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।”
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্তৃপক্ষগুলোর কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত বা অভিযোগ স্বীকার করেনি।
[বিবিসি অবলম্বনে]



