বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কয়েক হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য জড়িয়ে গেছে ডনাল্ড ট্রাম্পের হুটহাট সিদ্ধান্তের সঙ্গে।
‘রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পালটা শুল্ক নিয়ে নয় মাসের আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে করা চুক্তির ফলাফল এখন শূন্য।
তবে এখানেও রয়ে গেছে কিছু ধোঁয়াশা। ব্যবসায়ীরা বলছেন বাতিল; অর্থনীতিবিদরা বলছেন বাতিল হবে না অন্যদিকে বাণিজ্য সচিব নিজেও জানেন না চুক্তির বর্তমান অবস্থা।
“যেহেতু বেসিসটা (ভিত্তি) থাকছে না আমার মনে হয় না চুক্তি কার্যকর থাকবে,” আলাপ-কে বলেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান।
পালটা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরপরই অন্য আইনের আওতায় প্রথমে ১০ শতাংশ ও পরে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।
কিন্তু নতুন ১৫ শতাংশ শুল্কও চূড়ান্ত নয়। অস্থায়ীভাবে আরোপ করা এই শুল্ককে স্থায়ী বা ১৫০ দিনের বেশি বাড়াতে চাইলে ট্রাম্পের প্রয়োজন হবে কংগ্রেসের অনুমোদন।
তবে এবার ট্রাম্প যে পথে হাঁটছেন তাতে শুল্ক আগের তুলনায় না কমে বরং বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
“ট্রাম্প এখন ১২২ ধারা ধরে শুল্ক আরোপ করেছেন। কংগ্রেসের অনুমতি না মিললে এর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫০ দিন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত এটাকে পাকাপোক্ত করতে ৩০১ ধারাকে বেছে নিতে পারে। আর সেটা হলে শুল্ক এখনকার চেয়েও বেড়ে যেতে পারে,” আলাপ-কে বলেছেন বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
ধারা ১২২ ও ‘স্পেশাল ৩০১’
আমেরিকার ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারায় আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যেটার পূর্ণ ব্যবহার করেছেন ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, সব দেশের পণ্য আমদানিতে বিদ্যমান শুল্কের ওপর বাড়তি ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন।
এর কয়েক ঘন্টা পর শনিবার সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টে তিনি জানান, “আমি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে, বিশ্বব্যাপী দেশগুলির ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ শুল্ক বাড়াচ্ছি যা অবিলম্ব কার্যকর হবে, এসব দেশের অনেকে দশকের পর দশক ধরে কোনা উপযুক্ত শাস্তি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ঠকাচ্ছে’ (আমি আসার আগ পর্যন্ত!), ১৫ শতাংশ স্ল্যাবটি সম্পূর্ণ অনুমোদিত ও আইনত পরীক্ষিত।”
তবে ১২২-ই শেষ নয়। এই ধারায় অনুমোদিত ১৫০ দিন সময় ব্যবহার করে অন্যান্য ‘আইন অনুমোদিত’ শুল্ক জারি করার জন্য তার প্রশাসন কাজ করবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প।
আর এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসছে ‘স্পেশাল ৩০১’ এর বিষয়টি।
ট্রেড অ্যাক্টের ৩০১ ধারা, যা ‘স্পেশাল ৩০১’ নামেও পরিচিত, হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান বাণিজ্য আইন, যা অন্য কোনো দেশের "অন্যায়" বা বৈষম্যমূলক বাণিজ্যিক আচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা দেয়।
এর মাধ্যমে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) তদন্ত করে শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে মার্কিন ব্যবসার স্বার্থ রক্ষা করে থাকে।
নতুন চিন্তায় বাংলাদেশ
ট্রাম্পের পালটা শুল্ক হিসেবে প্রথমে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয়েছিল বাংলাদেশি পণ্যের উপর।
এরপর তা কমে আসে ২০ শতাংশে। আর অন্তবর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের আগে আগে ৯ই ফেব্রুয়ারি করা চুক্তির পর তা আরও এক শতাংশ কমে।
সব মিলে তখন শুল্ক হয়েছিল প্রায় ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্পের নতুন করে জারি করা ১৫ শতাংশ শুল্কের পর এখন তা কমে তা হবে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া চুক্তিটির কী হবে?
বিজিএমইএ-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপকে অবৈধ বলেছে তার মানে চুক্তিটির আর কোনো বৈধতা থাকছে না।
কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আলাপ-কে বলেন, “যেহেতু এটা একটা ট্রেড চুক্তি সেহেতু এটা বাতিল হওয়ার কথা নয়।”
আর এ নিয়ে দ্বিধায় থাকা বাণিজ্য সচিব জানালেন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
তবে এ জন্য বসে থাকতে রাজি নয় বাংলাদেশ। শিগগিরই এ বিষয়ে মেইল করা হবে জানিয়ে বাণিজ্য সচিব আলাপ-কে বলেন, “আশা করছি আগামীকাল (সোমবার) মেইল করতে পারব। সেখানে চুক্তির অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট করতে বলব; জানতে চাইব চুক্তির 'স্ট্যাটাসটা' কী হবে?”
‘স্থায়ী মাথাব্যথা’
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। যদিও দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।
দুই দেশের প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানিই বেশি। যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে আট বিলিয়ন ডলার।
এই সম্পর্ক অটুট রাখতে ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক একপেশে শর্ত মেনেই চুক্তিটি সই করেছিল বাংলাদেশ।
এরপরও এই ‘মাথাব্যাথা’’ থেকে মুক্তি মিলছে না। গত ১০ মাসে ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক পরিবর্তন করেছে পাঁচবার।
বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলছেন, “ট্রাম্পের ট্যারিফ শুরু থেকেই আনপ্রেডিক্টাবল, কখন কী হয় বলা যাচ্ছে না। এখন যেটা দিয়েছে, সেটা আবার কয়দিন থাকে সেটাও তো অনিশ্চিত।”
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর পরিস্থিতি বদলেছে বলেই মত অর্থনীতিবিদদের। যদিও এ নিয়ে আলোচনার সময় এখনও আসেনি বলেই মনে করেন ড. জাহিদ হোসেন।
“পুরোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা না করে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের উচিত চুপ থেকে সময় নেওয়া,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
আগের চুক্তির শর্ত নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই অর্থনীতিবিদ।
তবে এই সময়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন জাহিদ হোসেন।
তার ভাষায়, “ট্রাম্প ট্যারিফ স্থায়ী মাথাব্যথা হয়ে উঠলেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যাতে আমরা আনফেয়ার ট্রেডের ওই সেকশনে পড়ে না যাই। সেক্ষেত্রে বাড়তি ট্যারিফ ৫০ শতাংশেও পৌঁছে যেতে পারে।”


ঢাকা-ওয়াশিংটন ‘গোপন’ চুক্তি নিয়ে সংশয়ে ব্যবসায়ীরা
বিদায়ের আগে শেষ চুক্তিটি কেন মাথা ব্যথার কারণ
