হরমুজ প্রণালী এখন একটি 'মাইনফিল্ড’। বাংলাদেশি জাহাজ চলাচলে বাধা না দেওয়ার আশ্বাস দিলেও যুদ্ধের ডামাডোলে কতটা নিশ্চিত হবে সেই আশ্বাস? জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প কৌশলই বা কী বাংলাদেশের?
কামরুজ্জামান পৃথু
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬, ০৯:১০ পিএমআপডেট : ১১ মার্চ ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম
বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত হরমুজ প্রণালি যখন কার্যত 'ডেথ ভ্যালি', তখনই বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়েছে ইরান। কঠোর অবরোধের মধ্যেও বাংলাদেশের তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে বাধা দেবে না বলে জানিয়েছে তারা। কিন্তু এই বিশেষ ছাড় কি পারবে আসন্ন জ্বালানি যুদ্ধের দাবদাহ থেকে ঢাকাকে রক্ষা করতে?
কী হচ্ছে হরমুজে
গত কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালিতে অন্তত কয়েক ডজন মাইন স্থাপন করেছে ইরান। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে এমনটাই জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
মাইনের এই সংখ্যাটি এখনও খুব বড় না হলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের হাতে শত শত মাইন স্থাপনের সক্ষমতা আছে।
বিশ্বের তেল পরিবহনের ‘চোকপয়েন্ট’ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণ করছে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান যদি কোনো মাইন স্থাপন করে থাকে, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব তা সরিয়ে নিতে হবে’। মাইন সরিয়ে না নিলে ইরান ‘আগে কখনও দেখেনি’ এমন পরিণতির মুখোমুখি হবে বলেও সতর্ক করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের মাইন স্থাপনকারী জাহাজগুলো লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে মার্কিন বাহিনী। হরমুজ প্রণালির কাছে ১৬টি ইরানি মাইন স্থাপনকারী জাহাজ ধ্বংস করেছে বলে এক বিবৃতিতে দাবি করেছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড।
আরো একটি 'ট্যাঙ্কার ওয়ার'
হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় একই ধরনের কৌশল দেখেছিলো বিশ্ব।
সেবার একে অপরের তেলের বাজার ধসিয়ে দিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা শুরু করে দুই দেশ। ইরান সেই সময় হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসিয়ে তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল।
ইরানের মাইনের আঘাতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ 'ইউএসএস স্যামুয়েল বি. রবার্টস' ক্ষতিগ্রস্ত হলে 'অপারেশন প্রেয়িং ম্যান্টিস’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। সেবার ইরানের নৌবাহিনীর একটা বড় অংশ ধ্বংস করে দিয়েছিলো তারা।
বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি পরিবহনে প্রভাব
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি খাতে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এই রুটে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৭ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১৯ দশমিক ৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল, যা ইউক্রেন যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের জরুরি রিজার্ভ থেকে তেল ছাড়ার ঘোষণার পর এই দাম কমে আসে।
কাতার এনার্জি তাদের এলএনজি উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখায় এশিয়া ও ইউরোপে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, প্রণালিটি বন্ধ হওয়ায় লজিস্টিকস এবং শিপিং সেক্টর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এশিয়া থেকে ইউরোপে বিমান ভাড়া বেড়েছে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত।
এছাড়া জেট ফুয়েলের দাম ৭০ শতাংশের বেশি বাড়ায় আকাশপথে পণ্য পরিবহন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি সার উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশ্বের মোট সারের কাঁচামালের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই রুট দিয়ে যায়। রুটটি বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের ইউরিয়া সারের দাম গত সপ্তাহে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এটি সরাসরি কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যমূল্যের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে উঠে এসেছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক গবেষণা প্রতিবেদনে।
জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে 'স্ট্যাগফ্লেশন' বা উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও স্থবির প্রবৃদ্ধি দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য ‘আশার আলো’
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকলেও বাংলাদেশের জন্য সুখবর দিয়েছে ইরান। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে ইরান কোনো বাধা দেবে না।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার সচিবালয়ে এক বৈঠকে এই নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশের জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালিতে ঢোকার আগে ইরানি কর্তৃপক্ষকে তাদের অবস্থান ও পরিচয় সম্পর্কে আগেভাগে জানাতে বলা হয়েছে।
বিকল্প সংস্থানে বাংলাদেশের প্রস্তুতি
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সরকার বৈশ্বিক সংকট মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করছে। জ্বালানি আমদানিতে চীন ও ভারতের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে দুটি এলএনজি কার্গো কেনা হয়েছে বলে আলাপকে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান। তবে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
দুটি কার্গোর মধ্যে একটি প্রায় দ্বিগুণ দামে এবং অন্যটি দ্বিগুণেরও বেশি দামে কিনতে হয়েছে বলে জানান মিজানুর রহমান।
এর মধ্যে একটি কার্গো ১৫ অথবা ১৬ই মার্চ এবং অন্যটি ১৮ই মার্চ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সরকার আপাতত যে ব্যবস্থা নিয়েছে তাতে চলতি মাসে কোনো সমস্যা হবে না বলে জানিয়েছেন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এর মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মোঃ শফিকুল ইসলাম।
তবে সরকার গ্যাস আমদানির চেষ্টা করে গেলেও চাহিদা মেটানো সামনে কঠিন হবে বলেই মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম। তিনি বলেন, ‘কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি না এলে গ্যাস সংকটে পড়বে পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতি’।
দেশের মোট পেট্রোল, অকটেন চাহিদার প্রায় পুরোটাই পূরণ হয় স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে দেশে পেট্রোল ও অকটেনের মোট চাহিদা ছিল ৮ লাখ ১৮ হাজার টন। এর বিপরীতে সে বছর বাংলাদেশে কনডেনসেট হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ১৬ লাখ ৪৭ হাজার মেট্রিক টন ছিলো বলে উঠে এসেছে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এর প্রতিবেদনে।
তবে আমদানিনির্ভর হওয়ায় ডিজেলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক।
ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল দেশে এসে পৌঁছেছে। ভারত থেকে প্রতি মাসে গড়ে ১৫ হাজার টন ডিজেল আসার কথা রয়েছে।
এরই মধ্যে দুটি জাহাজে করে ৩০ হাজার টন ডিজেল দেশে এসে পৌঁছেছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। ১২ই মার্চ আরো একটি জাহাজ আসবে বলেও জানান তিনি।
এসবের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা আছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। বলেন, ‘বর্তমানে দেশে যে মজুত আছে তা দিয়ে মার্চ মাস অনায়াসেই পার করা সম্ভব’।
জ্বালানি পাওয়া নিয়ে ইতিবাচক আশ্বাস মিলেছে চীনের পক্ষ থেকে। জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে চীনের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
হরমুজ প্রণালির এই সংকট শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের ওপর। বাংলাদেশের তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে বাধা দেবে না বললেও যুদ্ধের মাঠে এই নিশ্চয়তা কতটা কার্যকর থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করছেন, যুদ্ধের সময় আর ব্যাপ্তি বাড়লে এবং এর ক্ষয়-ক্ষতি যত বাড়বে বাংলাদেশের উপর তার প্রভাবও তত বেশি হবে।
হরমুজে মাইন, সংকট বাড়লেও সুখবর বাংলাদেশের জন্য
হরমুজ প্রণালী এখন একটি 'মাইনফিল্ড’। বাংলাদেশি জাহাজ চলাচলে বাধা না দেওয়ার আশ্বাস দিলেও যুদ্ধের ডামাডোলে কতটা নিশ্চিত হবে সেই আশ্বাস? জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প কৌশলই বা কী বাংলাদেশের?
বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত হরমুজ প্রণালি যখন কার্যত 'ডেথ ভ্যালি', তখনই বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়েছে ইরান। কঠোর অবরোধের মধ্যেও বাংলাদেশের তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে বাধা দেবে না বলে জানিয়েছে তারা। কিন্তু এই বিশেষ ছাড় কি পারবে আসন্ন জ্বালানি যুদ্ধের দাবদাহ থেকে ঢাকাকে রক্ষা করতে?
কী হচ্ছে হরমুজে
গত কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালিতে অন্তত কয়েক ডজন মাইন স্থাপন করেছে ইরান। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে এমনটাই জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
মাইনের এই সংখ্যাটি এখনও খুব বড় না হলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের হাতে শত শত মাইন স্থাপনের সক্ষমতা আছে।
বিশ্বের তেল পরিবহনের ‘চোকপয়েন্ট’ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণ করছে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান যদি কোনো মাইন স্থাপন করে থাকে, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব তা সরিয়ে নিতে হবে’। মাইন সরিয়ে না নিলে ইরান ‘আগে কখনও দেখেনি’ এমন পরিণতির মুখোমুখি হবে বলেও সতর্ক করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের মাইন স্থাপনকারী জাহাজগুলো লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে মার্কিন বাহিনী। হরমুজ প্রণালির কাছে ১৬টি ইরানি মাইন স্থাপনকারী জাহাজ ধ্বংস করেছে বলে এক বিবৃতিতে দাবি করেছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড।
আরো একটি 'ট্যাঙ্কার ওয়ার'
হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় একই ধরনের কৌশল দেখেছিলো বিশ্ব।
সেবার একে অপরের তেলের বাজার ধসিয়ে দিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা শুরু করে দুই দেশ। ইরান সেই সময় হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসিয়ে তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল।
ইরানের মাইনের আঘাতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ 'ইউএসএস স্যামুয়েল বি. রবার্টস' ক্ষতিগ্রস্ত হলে 'অপারেশন প্রেয়িং ম্যান্টিস’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। সেবার ইরানের নৌবাহিনীর একটা বড় অংশ ধ্বংস করে দিয়েছিলো তারা।
বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি পরিবহনে প্রভাব
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি খাতে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এই রুটে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৭ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১৯ দশমিক ৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল, যা ইউক্রেন যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের জরুরি রিজার্ভ থেকে তেল ছাড়ার ঘোষণার পর এই দাম কমে আসে।
কাতার এনার্জি তাদের এলএনজি উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখায় এশিয়া ও ইউরোপে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, প্রণালিটি বন্ধ হওয়ায় লজিস্টিকস এবং শিপিং সেক্টর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এশিয়া থেকে ইউরোপে বিমান ভাড়া বেড়েছে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত।
এছাড়া জেট ফুয়েলের দাম ৭০ শতাংশের বেশি বাড়ায় আকাশপথে পণ্য পরিবহন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি সার উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশ্বের মোট সারের কাঁচামালের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই রুট দিয়ে যায়। রুটটি বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের ইউরিয়া সারের দাম গত সপ্তাহে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এটি সরাসরি কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যমূল্যের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে উঠে এসেছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক গবেষণা প্রতিবেদনে।
জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে 'স্ট্যাগফ্লেশন' বা উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও স্থবির প্রবৃদ্ধি দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য ‘আশার আলো’
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকলেও বাংলাদেশের জন্য সুখবর দিয়েছে ইরান। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে ইরান কোনো বাধা দেবে না।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার সচিবালয়ে এক বৈঠকে এই নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশের জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালিতে ঢোকার আগে ইরানি কর্তৃপক্ষকে তাদের অবস্থান ও পরিচয় সম্পর্কে আগেভাগে জানাতে বলা হয়েছে।
বিকল্প সংস্থানে বাংলাদেশের প্রস্তুতি
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সরকার বৈশ্বিক সংকট মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করছে। জ্বালানি আমদানিতে চীন ও ভারতের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে দুটি এলএনজি কার্গো কেনা হয়েছে বলে আলাপকে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান। তবে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
দুটি কার্গোর মধ্যে একটি প্রায় দ্বিগুণ দামে এবং অন্যটি দ্বিগুণেরও বেশি দামে কিনতে হয়েছে বলে জানান মিজানুর রহমান।
এর মধ্যে একটি কার্গো ১৫ অথবা ১৬ই মার্চ এবং অন্যটি ১৮ই মার্চ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সরকার আপাতত যে ব্যবস্থা নিয়েছে তাতে চলতি মাসে কোনো সমস্যা হবে না বলে জানিয়েছেন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এর মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মোঃ শফিকুল ইসলাম।
তবে সরকার গ্যাস আমদানির চেষ্টা করে গেলেও চাহিদা মেটানো সামনে কঠিন হবে বলেই মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম। তিনি বলেন, ‘কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি না এলে গ্যাস সংকটে পড়বে পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতি’।
দেশের মোট পেট্রোল, অকটেন চাহিদার প্রায় পুরোটাই পূরণ হয় স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে দেশে পেট্রোল ও অকটেনের মোট চাহিদা ছিল ৮ লাখ ১৮ হাজার টন। এর বিপরীতে সে বছর বাংলাদেশে কনডেনসেট হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ১৬ লাখ ৪৭ হাজার মেট্রিক টন ছিলো বলে উঠে এসেছে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এর প্রতিবেদনে।
তবে আমদানিনির্ভর হওয়ায় ডিজেলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক।
ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল দেশে এসে পৌঁছেছে। ভারত থেকে প্রতি মাসে গড়ে ১৫ হাজার টন ডিজেল আসার কথা রয়েছে।
এরই মধ্যে দুটি জাহাজে করে ৩০ হাজার টন ডিজেল দেশে এসে পৌঁছেছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। ১২ই মার্চ আরো একটি জাহাজ আসবে বলেও জানান তিনি।
এসবের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা আছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। বলেন, ‘বর্তমানে দেশে যে মজুত আছে তা দিয়ে মার্চ মাস অনায়াসেই পার করা সম্ভব’।
জ্বালানি পাওয়া নিয়ে ইতিবাচক আশ্বাস মিলেছে চীনের পক্ষ থেকে। জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে চীনের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
হরমুজ প্রণালির এই সংকট শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের ওপর। বাংলাদেশের তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে বাধা দেবে না বললেও যুদ্ধের মাঠে এই নিশ্চয়তা কতটা কার্যকর থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করছেন, যুদ্ধের সময় আর ব্যাপ্তি বাড়লে এবং এর ক্ষয়-ক্ষতি যত বাড়বে বাংলাদেশের উপর তার প্রভাবও তত বেশি হবে।
বিষয়: