সরকারের সাশ্রয় লক্ষ্যমাত্রা অবাস্তব, বাধাগ্রস্ত হবে ব্যবসা, এপ্রিলেই তীব্র হবে জ্বালানি সংকট
২০০৯ সালের জুনে 'ডে লাইট সেভিং' ও ২০২২ সালের আগস্টে আরও একবার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পরিকল্পনা কার্যকর করে ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তাতে কতটা সাশ্রয় হয়েছিল তার পরিসংখ্যান নেই। এবারের সফলতা কতটা?
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৬ পিএমআপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১১ পিএম
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে আগের সিদ্ধান্তগুলো কতটা সফল ছিল তার কোনো পরিসংখ্যান নেই
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চের প্রথম সপ্তাহেই নিজের কার্যালয়ে লাইট ও এসির ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এরপর থেকে সময় যত গড়িয়েছে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট ততটাই তীব্র হয়েছে।
সবশেষ এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনা এসেছে পুরো দেশজুড়ে।
এদিকে অতীতের অভিজ্ঞতায় অফিস সময় কমিয়ে দেওয়া, জোর করে আলোকসজ্জা বন্ধ, সন্ধ্যার পর বিপণি বিতান বন্ধের মতো নির্দেশনাগুলো সরকারের "লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে অবাস্তব" বলছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে সেচের সময় ও গ্রীষ্মের তীব্র গরম মিলে মধ্য-এপ্রিলেই একদিকে যেমন জ্বালানি সংকট তীব্র হবে, আর অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে স্থবির হয়ে থাকা ব্যবসা-বাণিজ্য যে আশার আলো দেখাচ্ছিল সেটাও বাধাগ্রস্ত হবে বলেই সতর্ক করেছেন তারা।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নতুন সিদ্ধান্ত কী?
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, এ জন্য আগামী তিন মাস দেশব্যাপী সব প্রকার আলোকসজ্জা পরিহার করা হবে।
সরকারি ও বেসরকারি অফিস চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা আর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের কাজ শেষ করবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে। এর পাশাপাশি, জরুরি সেবা ছাড়া সব অফিস ভবন, বিপণি বিতান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে।
এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনাপূর্বক শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরবর্তী মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রস্তাব উপস্থাপন করবে বলে জানিয়েছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
কোভিডকালীন সময়ের মতো সপ্তাহের কয়েকদিন অনলাইন ক্লাস ফিরতে পারে বলেও ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
আগের সফলতা কতটুকু
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের এই ব্যবস্থাপনা নতুন কিছু না। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসন আমলে এমন পরিকল্পনা হয়ে ছিল অন্তত দুই বার।
২০০৯ সালের জুনে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো 'ডে লাইট সেভিং' বা ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা কার্যকর করে ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় দিনে ২০০-৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আশা করে ছিল সরকার।
তবে নতুন সময় নিয়ে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল সাধারণের মনে। এমনকি এটাকে 'আওয়ামী সময়' বা 'হাসিনা সময়' বলে ঠাট্টা শুরু হয়। পরে আর সেই পথে হাঁটেনি সরকার। বছর শেষের সঙ্গেই শেষ হয় ওই নিয়ম।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে বেড়ে গিয়েছিল জ্বালানির দাম, সে সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারও হেঁটেছিল এখনকার সরকার যে পথে হাঁটছে।
২০২২ সালের ২৪ আগস্ট থেকে সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত অফিসের সময় সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৩টা ও পরে ৯টা থেকে ৪টা করা হয়। যা ২০২৪ সালের জুনে আবারো ৯টা থেকে ৫টায় ফিরে আসে।
সেই ২০২২ সালের জুনেই থেকে তৎকালীন সরকার সব ধরনের আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ করে। আর দোকানপাট বন্ধ হওয়ার সময় ছিল রাত ৮টা।
কিন্তু এতে ঠিক কতটা সফলতা এসেছিল তার কোনো হিসাব জানায়নি তখনকার সরকার।
“তখন যে সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তাতে আদৌ বড় ধরনের সাশ্রয় হয়ে ছিল কী না তার কোনো হিসাব সরকার দেয়নি। আবার কোনো সংস্থাও এই নিয়ে কাজ করেছে এমনটা আমার জানা নেই,” কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আলাপ-কে বলেছেন।
দ্বিগুণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় কীভাবে?
এবার বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বিত কর্মকৌশলে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
যদিও ২০২২ সালে একইরকম কার্যক্রম শুরুর সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, সে সময় প্রতিদিন ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ধারণা করেছিল বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।
তবে সেটাও হয়েছিল কী না, তা পরে কখনো জানায়নি তৎকালীন সরকার ও বিদ্যুৎ বিভাগ।
এবার সেই একই পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্বিগুণের বেশি বিদ্যুৎ কিভাবে সাশ্রয় সম্ভব সেটা নিয়ে তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সাশ্রয়ের এই পরিমাণকে "অবাস্তব" বলছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন।
“বাংলাদেশের গৃহস্থালি খাতে ৫৭ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। আর কমার্শিয়াল সেক্টরে ১১ শতাংশ এবং ২৭ শতাংশের মতো ব্যবহার হয় শিল্প খাতে। সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটা শুধু কমার্শিয়াল সেক্টরের জন্য, এতে এত বিদ্যুৎ কিভাবে সেভিং হবে?” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা কেবল বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য, এতে সামগ্রিক জ্বালানি সেভিং এর কথা ভাবা হয়নি বলেও মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
“এখানে ডে-লাইট ব্যবহারের বিষয়টি ভাবা হয়নি। যদি হতো তাহলে অফিস সময় এগিয়ে আনা হতো। এখন কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া হলো এতে প্রডাক্টিভিটি কমবে,” আলাপ-কে বলছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ।
সরকার যদি জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা ভাবতো তাহলে সাপ্তাহিক ছুটি একদিন বাড়ানোর কথা ভাবতো আর সেটা হলে যানবাহনের জ্বালানি খরচ কমত বলেই মত তার।
তার মতে, কর্মঘণ্টা কমানোর বদলে নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা গেলে তা বেশি কার্যকর হতে পারতো।
জ্বালানি সংকট তীব্র হবে এপ্রিলে
এদিকে এপ্রিলে একের পর এক তাপপ্রবাহ আসবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তার মানে বাড়বে বিদ্যুতের চাহিদা।
এছাড়া এপ্রিলের ইরি-বোরো ধান চাষের জন্য দরকার পড়বে সেচের। যার জন্য বিদ্যুতের পাশাপাশি দরকার হয় ডিজেল।
“গরম শুরু হয়ে গেছে। মধ্য এপ্রিল থেকে সেচের জন্য জ্বালানি চাহিদাও বাড়বে। তার মানে সংকট তীব্র হতে যাচ্ছে,” বলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম।
এ সময়ে সরকারের সিদ্ধান্তগুলো বড় আকারে না হলেও বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা হলেও সাশ্রয়ে সম্ভবপর হবে বলে মনে করছেন তিনি।
প্রভাব পড়বে ব্যবসায়
বিপণি বিতান ও দোকানপাট সন্ধ্যা ছয়টায় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে খুচরা ব্যবসায়।
কারণ সাধারণত বিকেল ও সন্ধ্যার সময়ই ক্রেতার চাপ বেশি থাকে বলছেন ব্যবসায়ীরা।
“দোকান ৬টায়া বন্ধ হোক, কিংবা ৮টায়, এতে ব্যবসার ক্ষতি হবে। নির্বাচিত সরকার আসার পর যেভাবে ব্যবসা বাড়ার আশা দেখা যাচ্ছিল সেটা বাধাগ্রস্ত হবে,” বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন আলাপ-কে বলেছেন ।
এই নিয়ে সরকারের সঙ্গে শনিবার আলোচনায় অংশ নেন ব্যবসায়ীরা।
সবমিলে সরকার তার চলমান সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত সমন্বিতভাবে নিতে ব্যর্থ হলে যতটা ধারণা করা হচ্ছে অভিঘাত তার চেয়েও তীব্র হবে বলে সতর্ক করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের সাশ্রয় লক্ষ্যমাত্রা অবাস্তব, বাধাগ্রস্ত হবে ব্যবসা, এপ্রিলেই তীব্র হবে জ্বালানি সংকট
২০০৯ সালের জুনে 'ডে লাইট সেভিং' ও ২০২২ সালের আগস্টে আরও একবার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পরিকল্পনা কার্যকর করে ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তাতে কতটা সাশ্রয় হয়েছিল তার পরিসংখ্যান নেই। এবারের সফলতা কতটা?
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চের প্রথম সপ্তাহেই নিজের কার্যালয়ে লাইট ও এসির ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এরপর থেকে সময় যত গড়িয়েছে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট ততটাই তীব্র হয়েছে।
সবশেষ এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনা এসেছে পুরো দেশজুড়ে।
এদিকে অতীতের অভিজ্ঞতায় অফিস সময় কমিয়ে দেওয়া, জোর করে আলোকসজ্জা বন্ধ, সন্ধ্যার পর বিপণি বিতান বন্ধের মতো নির্দেশনাগুলো সরকারের "লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে অবাস্তব" বলছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে সেচের সময় ও গ্রীষ্মের তীব্র গরম মিলে মধ্য-এপ্রিলেই একদিকে যেমন জ্বালানি সংকট তীব্র হবে, আর অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে স্থবির হয়ে থাকা ব্যবসা-বাণিজ্য যে আশার আলো দেখাচ্ছিল সেটাও বাধাগ্রস্ত হবে বলেই সতর্ক করেছেন তারা।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নতুন সিদ্ধান্ত কী?
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, এ জন্য আগামী তিন মাস দেশব্যাপী সব প্রকার আলোকসজ্জা পরিহার করা হবে।
সরকারি ও বেসরকারি অফিস চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা আর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের কাজ শেষ করবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে। এর পাশাপাশি, জরুরি সেবা ছাড়া সব অফিস ভবন, বিপণি বিতান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে।
এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনাপূর্বক শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরবর্তী মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রস্তাব উপস্থাপন করবে বলে জানিয়েছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
কোভিডকালীন সময়ের মতো সপ্তাহের কয়েকদিন অনলাইন ক্লাস ফিরতে পারে বলেও ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
আগের সফলতা কতটুকু
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের এই ব্যবস্থাপনা নতুন কিছু না। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসন আমলে এমন পরিকল্পনা হয়ে ছিল অন্তত দুই বার।
২০০৯ সালের জুনে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো 'ডে লাইট সেভিং' বা ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা কার্যকর করে ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় দিনে ২০০-৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আশা করে ছিল সরকার।
তবে নতুন সময় নিয়ে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল সাধারণের মনে। এমনকি এটাকে 'আওয়ামী সময়' বা 'হাসিনা সময়' বলে ঠাট্টা শুরু হয়। পরে আর সেই পথে হাঁটেনি সরকার। বছর শেষের সঙ্গেই শেষ হয় ওই নিয়ম।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে বেড়ে গিয়েছিল জ্বালানির দাম, সে সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারও হেঁটেছিল এখনকার সরকার যে পথে হাঁটছে।
২০২২ সালের ২৪ আগস্ট থেকে সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত অফিসের সময় সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৩টা ও পরে ৯টা থেকে ৪টা করা হয়। যা ২০২৪ সালের জুনে আবারো ৯টা থেকে ৫টায় ফিরে আসে।
সেই ২০২২ সালের জুনেই থেকে তৎকালীন সরকার সব ধরনের আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ করে। আর দোকানপাট বন্ধ হওয়ার সময় ছিল রাত ৮টা।
কিন্তু এতে ঠিক কতটা সফলতা এসেছিল তার কোনো হিসাব জানায়নি তখনকার সরকার।
“তখন যে সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তাতে আদৌ বড় ধরনের সাশ্রয় হয়ে ছিল কী না তার কোনো হিসাব সরকার দেয়নি। আবার কোনো সংস্থাও এই নিয়ে কাজ করেছে এমনটা আমার জানা নেই,” কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আলাপ-কে বলেছেন।
দ্বিগুণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় কীভাবে?
এবার বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বিত কর্মকৌশলে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
যদিও ২০২২ সালে একইরকম কার্যক্রম শুরুর সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, সে সময় প্রতিদিন ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ধারণা করেছিল বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।
তবে সেটাও হয়েছিল কী না, তা পরে কখনো জানায়নি তৎকালীন সরকার ও বিদ্যুৎ বিভাগ।
এবার সেই একই পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্বিগুণের বেশি বিদ্যুৎ কিভাবে সাশ্রয় সম্ভব সেটা নিয়ে তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সাশ্রয়ের এই পরিমাণকে "অবাস্তব" বলছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন।
“বাংলাদেশের গৃহস্থালি খাতে ৫৭ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। আর কমার্শিয়াল সেক্টরে ১১ শতাংশ এবং ২৭ শতাংশের মতো ব্যবহার হয় শিল্প খাতে। সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটা শুধু কমার্শিয়াল সেক্টরের জন্য, এতে এত বিদ্যুৎ কিভাবে সেভিং হবে?” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
কতটা সাশ্রয় সম্ভব?
সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা কেবল বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য, এতে সামগ্রিক জ্বালানি সেভিং এর কথা ভাবা হয়নি বলেও মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
“এখানে ডে-লাইট ব্যবহারের বিষয়টি ভাবা হয়নি। যদি হতো তাহলে অফিস সময় এগিয়ে আনা হতো। এখন কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া হলো এতে প্রডাক্টিভিটি কমবে,” আলাপ-কে বলছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ।
সরকার যদি জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা ভাবতো তাহলে সাপ্তাহিক ছুটি একদিন বাড়ানোর কথা ভাবতো আর সেটা হলে যানবাহনের জ্বালানি খরচ কমত বলেই মত তার।
তার মতে, কর্মঘণ্টা কমানোর বদলে নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা গেলে তা বেশি কার্যকর হতে পারতো।
জ্বালানি সংকট তীব্র হবে এপ্রিলে
এদিকে এপ্রিলে একের পর এক তাপপ্রবাহ আসবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তার মানে বাড়বে বিদ্যুতের চাহিদা।
এছাড়া এপ্রিলের ইরি-বোরো ধান চাষের জন্য দরকার পড়বে সেচের। যার জন্য বিদ্যুতের পাশাপাশি দরকার হয় ডিজেল।
“গরম শুরু হয়ে গেছে। মধ্য এপ্রিল থেকে সেচের জন্য জ্বালানি চাহিদাও বাড়বে। তার মানে সংকট তীব্র হতে যাচ্ছে,” বলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম।
এ সময়ে সরকারের সিদ্ধান্তগুলো বড় আকারে না হলেও বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা হলেও সাশ্রয়ে সম্ভবপর হবে বলে মনে করছেন তিনি।
প্রভাব পড়বে ব্যবসায়
বিপণি বিতান ও দোকানপাট সন্ধ্যা ছয়টায় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে খুচরা ব্যবসায়।
কারণ সাধারণত বিকেল ও সন্ধ্যার সময়ই ক্রেতার চাপ বেশি থাকে বলছেন ব্যবসায়ীরা।
“দোকান ৬টায়া বন্ধ হোক, কিংবা ৮টায়, এতে ব্যবসার ক্ষতি হবে। নির্বাচিত সরকার আসার পর যেভাবে ব্যবসা বাড়ার আশা দেখা যাচ্ছিল সেটা বাধাগ্রস্ত হবে,” বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন আলাপ-কে বলেছেন ।
এই নিয়ে সরকারের সঙ্গে শনিবার আলোচনায় অংশ নেন ব্যবসায়ীরা।
সবমিলে সরকার তার চলমান সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত সমন্বিতভাবে নিতে ব্যর্থ হলে যতটা ধারণা করা হচ্ছে অভিঘাত তার চেয়েও তীব্র হবে বলে সতর্ক করছেন সংশ্লিষ্টরা।