গভর্নরদের রাজনৈতিক বিদায় ও নিয়োগ সংস্কৃতির চ্যালেঞ্জ কোথায়?
“আমার যতটুকু মনে আছে ১৪ জন গভর্নরের মধ্যে অন্তত ছয় জন তাদের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি,”
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএমআপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম
পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর ক্ষমতা নেওয়া নতুন সরকারের সঙ্গে হিসাব মেলেনি। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল বাংলাদেশের দ্বিতীয় গভর্নর এ. কে. নাজিরউদ্দীন আহমেদকে। পরে জানিয়েছিলেন, নিজের `বিবেকের কাছে স্বচ্ছ’ থাকতে সরে দাঁড়িয়েছিলেন।
সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগের সুযোগ সেই ১৯৭৬ সালে একজন গভর্নর পেলেও ২০২৬ সালে সে সুযোগ পাননি আহসান এইচ মনসুর।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার আগে বিমর্ষ কন্ঠে তার বক্তব্য ছিল, “আমি পদত্যাগ করিনি। সরকারও আমার পদ বাতিল করেছে বলে শুনিনি। কিন্তু শুনেছি নতুন কাউকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ কারণে বাসায় চলে যাচ্ছি।”
এমন সংস্কৃতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের জন্য নতুন নয় বলে জানালেন সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।
“আমার যতটুকু মনে আছে ১৪ জন গভর্নরের মধ্যে অন্তত ছয় জন তাদের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
এ ধরনের কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে ‘রেডি করা নেই’ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
মেয়াদের আগেই সরে যাওয়ার সংস্কৃতি
নাজিরউদ্দীন আহমেদের পর শেগুফতা বখ্ত চৌধুরী, খোরশেদ আলম, ড. আতিউর রহমান, আব্দুর রউফ তালুকদার, আহসান এইচ মনসুর তাদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করার আগেই সরে যেতে হয়েছে বলে আলাপকে জানিয়েছেন ফরাসউদ্দিন।
এদের মধ্যে একমাত্র গভর্নর হিসাবে মেয়াদ শেষ না করেই দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল রউফ তালুকদারকে।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে দায়িত্ব পাওয়া এ গভর্নর বিদায় নেন চব্বিশের অগাস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দায়িত্ব নিয়েও মেয়াদের মাঝেই বিদায় নিতে হয়েছিল ড. আতিউর রহমানকে।
২০১৬ সালের মার্চে সাইবার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর ১৫ মার্চ তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।
এ তালিকায় সবশেষ সংযোজন আহসান এইচ মনসুর।
সদ্য সাবেক এই গভর্নরকে এভাবে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ভালো ইঙ্গিত নয় বলেই মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
“রাখতে না চাইলে ওনাকে আগে থেকে বলে দিলেই হতো। কারণ এখানে একজনকে সরিয়ে আরেক জনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে,” আলাপকে বলেন তিনি।
এভাবে সরিয়ে দেওয়াটা রাজনীতি এবং অর্থনীতির জন্য ভালো বার্তা দিচ্ছে না বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানও।
“যেভাবে ঘটেছে ব্যাপারটা ভালো ছিল না। এখানে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত প্রকাশের ঘাটতি ছিল,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
গভর্নর অপসারণের ব্যাপারকে ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’ হিসাবে দাবি করে তিনি বলেন, “নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের অগ্রাধিকার, কর্মসূচি ও নীতিগত চিন্তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের পরিবর্তন অব্যাহত থাকবে।”
তারেক রহমান সরকারের গভর্নরের দায়িত্ব পাওয়া মোঃ মোস্তাকুর রহমান ব্যবসায়ী পরিচিতি থেকে দায়িত্ব পেলেও এটাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করতে চান না সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।
তার ভাষায়, “আমলা ও অর্থনীতিবিদ ছাড়া আগে কেউ গভর্নর পদে নিয়োগ পায়নি বলে দেওয়া যাবে না বিষয়টা এমন নয়। তবে এটা এশিয়াসহ আন্তর্জাতিক যে ট্রেডিশন রয়েছে তার চেয়ে ভিন্ন উদাহরণ তৈরি হলো।”
আর এই ভিন্ন উদাহরণ সৃষ্টি করে তারেক রহমান বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে বলেই মনে করছেন হোসেন জিল্লুর রহমান।
“এ ধরনের নিয়োগে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ হয়ে থাকে,” বলেছেন তিনি।
নতুন গভর্নর ব্যবসায়ী হিসাবে অর্থনীতির চলমান সংকট ও মূল্যস্ফীতির চাপ কী ভাবে সামাল দেন সেটা সময় বলবে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কতটা বাস্তব, আর কতটা কাগুজে? আর সেখানে বিএনপির সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কারণ এটা নিশ্চিত করা না গেলে, গভর্নর বদলাবে কিন্তু বাজার ও অর্থনীতিতে ফিরবে না আস্থা।
গভর্নরদের রাজনৈতিক বিদায় ও নিয়োগ সংস্কৃতির চ্যালেঞ্জ কোথায়?
“আমার যতটুকু মনে আছে ১৪ জন গভর্নরের মধ্যে অন্তত ছয় জন তাদের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি,”
পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর ক্ষমতা নেওয়া নতুন সরকারের সঙ্গে হিসাব মেলেনি। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল বাংলাদেশের দ্বিতীয় গভর্নর এ. কে. নাজিরউদ্দীন আহমেদকে। পরে জানিয়েছিলেন, নিজের `বিবেকের কাছে স্বচ্ছ’ থাকতে সরে দাঁড়িয়েছিলেন।
সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগের সুযোগ সেই ১৯৭৬ সালে একজন গভর্নর পেলেও ২০২৬ সালে সে সুযোগ পাননি আহসান এইচ মনসুর।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার আগে বিমর্ষ কন্ঠে তার বক্তব্য ছিল, “আমি পদত্যাগ করিনি। সরকারও আমার পদ বাতিল করেছে বলে শুনিনি। কিন্তু শুনেছি নতুন কাউকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ কারণে বাসায় চলে যাচ্ছি।”
এমন সংস্কৃতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের জন্য নতুন নয় বলে জানালেন সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।
“আমার যতটুকু মনে আছে ১৪ জন গভর্নরের মধ্যে অন্তত ছয় জন তাদের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
এ ধরনের কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে ‘রেডি করা নেই’ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
মেয়াদের আগেই সরে যাওয়ার সংস্কৃতি
নাজিরউদ্দীন আহমেদের পর শেগুফতা বখ্ত চৌধুরী, খোরশেদ আলম, ড. আতিউর রহমান, আব্দুর রউফ তালুকদার, আহসান এইচ মনসুর তাদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করার আগেই সরে যেতে হয়েছে বলে আলাপকে জানিয়েছেন ফরাসউদ্দিন।
এদের মধ্যে একমাত্র গভর্নর হিসাবে মেয়াদ শেষ না করেই দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল রউফ তালুকদারকে।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে দায়িত্ব পাওয়া এ গভর্নর বিদায় নেন চব্বিশের অগাস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দায়িত্ব নিয়েও মেয়াদের মাঝেই বিদায় নিতে হয়েছিল ড. আতিউর রহমানকে।
২০১৬ সালের মার্চে সাইবার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর ১৫ মার্চ তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।
এ তালিকায় সবশেষ সংযোজন আহসান এইচ মনসুর।
সদ্য সাবেক এই গভর্নরকে এভাবে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ভালো ইঙ্গিত নয় বলেই মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
“রাখতে না চাইলে ওনাকে আগে থেকে বলে দিলেই হতো। কারণ এখানে একজনকে সরিয়ে আরেক জনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে,” আলাপকে বলেন তিনি।
এভাবে সরিয়ে দেওয়াটা রাজনীতি এবং অর্থনীতির জন্য ভালো বার্তা দিচ্ছে না বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানও।
“যেভাবে ঘটেছে ব্যাপারটা ভালো ছিল না। এখানে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত প্রকাশের ঘাটতি ছিল,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
নেপথ্যে কী?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ধরনের বিদায় প্রধানত ‘রাজনৈতিক’ বিচেনাতেই হয় বলে মনে করেন ফরাসউদ্দিন।
তার ভাষায়, “১৪ জনের মধ্যে ছয়জন দায়িত্ব পালন করতে পারলেন না, এটা কিন্তু উদ্বেগজনক সংখ্যা।”
এদিকে রাজনৈতিক নিয়োগের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যে।
গভর্নর অপসারণের ব্যাপারকে ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’ হিসাবে দাবি করে তিনি বলেন, “নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের অগ্রাধিকার, কর্মসূচি ও নীতিগত চিন্তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের পরিবর্তন অব্যাহত থাকবে।”
রাজনৈতিক নিয়োগের চ্যালেঞ্জ
তারেক রহমান সরকারের গভর্নরের দায়িত্ব পাওয়া মোঃ মোস্তাকুর রহমান ব্যবসায়ী পরিচিতি থেকে দায়িত্ব পেলেও এটাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করতে চান না সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।
তার ভাষায়, “আমলা ও অর্থনীতিবিদ ছাড়া আগে কেউ গভর্নর পদে নিয়োগ পায়নি বলে দেওয়া যাবে না বিষয়টা এমন নয়। তবে এটা এশিয়াসহ আন্তর্জাতিক যে ট্রেডিশন রয়েছে তার চেয়ে ভিন্ন উদাহরণ তৈরি হলো।”
আর এই ভিন্ন উদাহরণ সৃষ্টি করে তারেক রহমান বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে বলেই মনে করছেন হোসেন জিল্লুর রহমান।
“এ ধরনের নিয়োগে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ হয়ে থাকে,” বলেছেন তিনি।
নতুন গভর্নর ব্যবসায়ী হিসাবে অর্থনীতির চলমান সংকট ও মূল্যস্ফীতির চাপ কী ভাবে সামাল দেন সেটা সময় বলবে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কতটা বাস্তব, আর কতটা কাগুজে? আর সেখানে বিএনপির সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কারণ এটা নিশ্চিত করা না গেলে, গভর্নর বদলাবে কিন্তু বাজার ও অর্থনীতিতে ফিরবে না আস্থা।
বিষয়: