ব্যবসায়িক আমদানি কমলেও ডলারের চাহিদা কমছে না। জ্বালানি আমদানির বাড়তি বিল, দুর্বল রপ্তানি ও শ্লথ রেমিট্যান্স; এই তিন চাপেই আবার ঊর্ধ্বমুখী ডলারের বাজার।
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৮ পিএমআপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
জ্বালানি আমদানির বাড়তি বিল, দুর্বল রপ্তানি ও শ্লথ রেমিট্যান্স; এই তিন চাপেই আবার ঊর্ধ্বমুখী ডলারের বাজার।
আমদানি কমছে, কিন্তু ডলারের দাম সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েই চলেছে। অথচ সাধারণ নিয়মে এমন হওয়ার কথা নয়। কারণ ভোক্তা পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে। তারপরও ডলারের চাহিদা কমেনি।
উল্টো একই সময়ে দেশের বেশিরভাগ পণ্যের আমদানি কমেছে। তাহলে ডলারের এত চাহিদা আসছে কোথা থেকে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে জ্বালানি আমদানির বাড়তি বিলে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বাড়ায় সরকারকে আগের তুলনায় অনেক বেশি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে জ্বালানি কিনতে।
ফলে ব্যবসায়িক আমদানি কমলেও সরকারের জ্বালানি বিল পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে।
একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা কমে আসা এবং রপ্তানি আয় প্রত্যাশামতো না বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহও সীমিত রয়েছে। এই দুই চাপ মিলেই আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে ডলারের বাজার; বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডলারের দাম বেড়েছে দেড় টাকার বেশি
দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের তীব্র সংকট ও মূল্যের ঊর্ধ্বগতি থামছেই না। গত মে মাস থেকে শুরু করে জুলাই মাসের শেষ পর্যন্ত মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ব্যাংক, স্পট মার্কেট ও খোলা বাজারে ডলারের দর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ব্যাংকগুলোর সরবরাহকৃত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের মে মাসে ব্যাংকগুলো যে ডলার ১২২ টাকা ৪৫ পয়সায় কেনাবেচা করতো। জুন মাসের শুরুতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ টাকায়।
এর পরবর্তী ১২ থেকে ২০ দিনের মধ্যে দর আরও বেড়ে ১২৩ টাকা ৪০ থেকে ৫০ পয়সায় পৌঁছায়।
বর্তমানে সংকট আরও ঘনীভূত হয়ে কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংককে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৯০ থেকে ৯৫ পয়সা দরে কিনতে হচ্ছে।
অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতেই দুই মাসের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ১ টাকা ৫০ পয়সা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের হেড অব ট্রেজারি আলাপ-কে বলেন, “বাজারে যে পরিমাণ ডলার সঞ্চিত বা প্রবাহমান রয়েছে, তা দিয়ে সার্বিক বাণিজ্যিক চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি সম্প্রতি সুদের হার কমানোর পর অভ্যন্তরীণ মুদ্রা ব্যবস্থার সাথে বিনিময় হারের যে স্বাভাবিক সমন্বয় প্রয়োজন ছিলো, তা না হওয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুদ্রার সাথে টাকার বিনিময় হার সময়োচিতভাবে সামঞ্জস্য না করায় এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।”
এ জন্য কী করা যেতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে ডলারের বাজারে চলমান অস্থিরতা কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সাময়িকভাবে রিজার্ভ থেকে বাজারে ডলার সরবরাহ বা ইন্টারভেনশন করতে পারে। তবে রিজার্ভ ঢেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সাময়িক সমাধান মাত্র।”
প্রসঙ্গত, ডলারের বাজারে অস্থিরতা ও অতিরিক্ত মুনাফা করার অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালের আগস্টে ৬টি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানদের অপসারণের পর ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডিদের শোকজ বা কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল। এরপর থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে চান না ট্রেজারি প্রধানরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ৩রা অগাস্ট আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দর ছিল ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা।
অন্যদিকে স্পট মার্কেটে ডলার বিক্রি হয়েছে ১২৩ টাকা ৮৮ পয়সায়।
তবে ব্যাংকিং খাতের বাস্তব চিত্র আরও জটিল; বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আমদানির এলসি দায় বা দেনা পরিশোধ করতে প্রকৃতপক্ষে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা পর্যন্ত চড়া দামে কিনতে হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের এই দরবৃদ্ধির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে খোলা বাজারেও (কার্ব মার্কেট)।
রাজধানীর বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জে বর্তমানে প্রতি ডলার ১২৬ টাকা থেকে ১২৬ টাকা ৪০ পয়সায় কেনা হচ্ছে এবং সাধারণ গ্রাহকের কাছে তা বিক্রি হচ্ছে ১২৬ টাকা ৭০ থেকে ১২৬ টাকা ৮০ পয়সায় অথচ মাত্র এক মাস আগেও খোলা বাজারে এই দর ছিলো ১২৫ টাকা থেকে ১২৫ টাকা ২০ পয়সার মধ্যে।
সুগন্ধা মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মোস্তফা আলাপ-কে বলেন, “গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ডলার দাম অল্প অল্প করে বাড়ছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে বিক্রি দাম ১২৬ টাকা ৭০ পয়সা। আর কেনা এর চেয়ে ৪০-৫০ পয়সা কম।”
মূলত বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাহিদার বিপরীতে ডলারের তীব্র সরবরাহ তুলনা বা জোগান ঘাটতিই এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক মৌখিকভাবে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তঃব্যাংক বাজার বা রেমিট্যান্স চ্যানেল কোনো ক্ষেত্রেই যেনো ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার বেশি দামে ডলার না কেনা হয়।
জ্বালানির উত্তাপে চড়ছে ডলারের দাম
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ৭০ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারের আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে শুধু জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে। আগের অর্থবছরে এই ব্যয় ছিলো ১০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত শুধু পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে ৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ৮৫ শতাংশ বেশি।
ব্যাংকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে তেল, এলএনজি ও সার আমদানিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা কমেছে এবং রপ্তানি আয়ও প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। ফলে বাজারে ডলারের সরবরাহ কমলেও চাহিদা উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, "ডলারের দামে বর্তমান চাপের সবচেয়ে বড় কারণ আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির খরচ।”
তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০-৭০ ডলার থেকে বেড়ে ৯০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলে জ্বালানি আমদানির জন্য ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, “আগে কম দামে ডলার ধরে যেসব এলসি খোলা হয়েছিল, এখন সেগুলোর বিল পরিশোধ করতে ব্যাংকগুলোকে তুলনামূলক বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে এবং সেই চাপ সরাসরি ডলারের বিনিময় হারে প্রতিফলিত হচ্ছে।”
একই কথা বলেছেন বেসরকারি ব্যাংকের হেড অব ট্রেজারিও। তার ভাষায়, “জ্বালানি আমদানির পেমেন্ট বেড়ে যাওয়া এবং সরকারের কিছু খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। যা ডলারের দামে প্রভাব ফেলছে।”
বাজার বিবেচনায় ডলারের দাম আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুটা কমানো যেতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
“এখন রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ডলারের ওপর চাপ বাড়লে বিনিময় হারকে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত অবমূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে,” বলেছেন তিনি।
জ্বালানি আমদানির বিল বাড়লেও দেশের প্রায় সব উৎপাদনমুখী খাতে আমদানি কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভোক্তা পণ্যের আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ, মধ্যবর্তী (ইন্টারমিডিয়েট) পণ্যের আমদানি ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, দেশে উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে গতি কমেছে। নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণের বদলে অনেক উদ্যোক্তা এখন বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও অন্যান্য উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানিও কমে এসেছে।
এ বিষয়ে আলাপ-কে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লেও দেশে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। আবার মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিও কিন্তু বাড়ছে না। তার মানে নতুন কর্মসংস্থান বাড়ছে না। এর সঙ্গে উচ্চ সুদহার, প্রতিকূল করনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে টিকে থাকার লড়াইয়ে মনোযোগ দিচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও স্থগিত করেছে। এর প্রভাব এলসি খোলা ও এলসি নিষ্পত্তির পরিসংখ্যানেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।”
জ্বালানি আমদানির বাড়তি চাপ সামাল দিতে সরকার নতুন উৎসের দিকে ঝুঁকছে। মালয়েশিয়ার পর এবার মিয়ানমার থেকেও পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পুরোনো পাইপলাইন প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করা এবং এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনাও আলোচনা হয়েছে।
এতে স্পষ্ট, আগামী দিনেও দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকবে। ফলে ডলারের চাহিদাও উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে।
এদিকে জ্বালানির পাশাপাশি নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণেও আমদানির পথেই হাঁটছে সরকার।
কাঁচা মরিচের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ভারত থেকে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সোমবার থেকেই আমদানি শুরু হয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৩২০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক দিন আগেও ৪০০ টাকায় উঠেছিল।
সরকারের আশা, নতুন চালান বাজারে পৌঁছালে দুই থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে দাম কমে আসবে।
সব মিলিয়ে দেশের আমদানির ধরনের বড় পরিবর্তন এসেছে। উৎপাদন, শিল্প ও বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট আমদানি কমলেও জ্বালানি আমদানির ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
ফলে মোট আমদানি খুব বেশি না বাড়লেও ডলারের চাহিদা কমছে না। বরং জ্বালানি বিল পরিশোধেই বাড়তি ডলার লাগছে, যা ডলারের দাম বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়া ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থাৎ ডলারের বাড়তি ব্যয় উৎপাদন বাড়াচ্ছে না, কেবল বাড়াচ্ছে খরচ কমাচ্ছে রিজার্ভ।
কেন বাড়ছে ডলারের দাম, কী বার্তা দিচ্ছে কমে যাওয়া আমদানি
ব্যবসায়িক আমদানি কমলেও ডলারের চাহিদা কমছে না। জ্বালানি আমদানির বাড়তি বিল, দুর্বল রপ্তানি ও শ্লথ রেমিট্যান্স; এই তিন চাপেই আবার ঊর্ধ্বমুখী ডলারের বাজার।
আমদানি কমছে, কিন্তু ডলারের দাম সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েই চলেছে। অথচ সাধারণ নিয়মে এমন হওয়ার কথা নয়। কারণ ভোক্তা পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে। তারপরও ডলারের চাহিদা কমেনি।
উল্টো একই সময়ে দেশের বেশিরভাগ পণ্যের আমদানি কমেছে। তাহলে ডলারের এত চাহিদা আসছে কোথা থেকে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে জ্বালানি আমদানির বাড়তি বিলে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বাড়ায় সরকারকে আগের তুলনায় অনেক বেশি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে জ্বালানি কিনতে।
ফলে ব্যবসায়িক আমদানি কমলেও সরকারের জ্বালানি বিল পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে।
একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা কমে আসা এবং রপ্তানি আয় প্রত্যাশামতো না বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহও সীমিত রয়েছে। এই দুই চাপ মিলেই আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে ডলারের বাজার; বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডলারের দাম বেড়েছে দেড় টাকার বেশি
দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের তীব্র সংকট ও মূল্যের ঊর্ধ্বগতি থামছেই না। গত মে মাস থেকে শুরু করে জুলাই মাসের শেষ পর্যন্ত মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ব্যাংক, স্পট মার্কেট ও খোলা বাজারে ডলারের দর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ব্যাংকগুলোর সরবরাহকৃত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের মে মাসে ব্যাংকগুলো যে ডলার ১২২ টাকা ৪৫ পয়সায় কেনাবেচা করতো। জুন মাসের শুরুতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ টাকায়।
এর পরবর্তী ১২ থেকে ২০ দিনের মধ্যে দর আরও বেড়ে ১২৩ টাকা ৪০ থেকে ৫০ পয়সায় পৌঁছায়।
বর্তমানে সংকট আরও ঘনীভূত হয়ে কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংককে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৯০ থেকে ৯৫ পয়সা দরে কিনতে হচ্ছে।
অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতেই দুই মাসের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ১ টাকা ৫০ পয়সা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের হেড অব ট্রেজারি আলাপ-কে বলেন, “বাজারে যে পরিমাণ ডলার সঞ্চিত বা প্রবাহমান রয়েছে, তা দিয়ে সার্বিক বাণিজ্যিক চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি সম্প্রতি সুদের হার কমানোর পর অভ্যন্তরীণ মুদ্রা ব্যবস্থার সাথে বিনিময় হারের যে স্বাভাবিক সমন্বয় প্রয়োজন ছিলো, তা না হওয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুদ্রার সাথে টাকার বিনিময় হার সময়োচিতভাবে সামঞ্জস্য না করায় এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।”
এ জন্য কী করা যেতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে ডলারের বাজারে চলমান অস্থিরতা কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সাময়িকভাবে রিজার্ভ থেকে বাজারে ডলার সরবরাহ বা ইন্টারভেনশন করতে পারে। তবে রিজার্ভ ঢেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সাময়িক সমাধান মাত্র।”
প্রসঙ্গত, ডলারের বাজারে অস্থিরতা ও অতিরিক্ত মুনাফা করার অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালের আগস্টে ৬টি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানদের অপসারণের পর ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডিদের শোকজ বা কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল। এরপর থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে চান না ট্রেজারি প্রধানরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ৩রা অগাস্ট আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দর ছিল ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা।
অন্যদিকে স্পট মার্কেটে ডলার বিক্রি হয়েছে ১২৩ টাকা ৮৮ পয়সায়।
তবে ব্যাংকিং খাতের বাস্তব চিত্র আরও জটিল; বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আমদানির এলসি দায় বা দেনা পরিশোধ করতে প্রকৃতপক্ষে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা পর্যন্ত চড়া দামে কিনতে হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের এই দরবৃদ্ধির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে খোলা বাজারেও (কার্ব মার্কেট)।
রাজধানীর বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জে বর্তমানে প্রতি ডলার ১২৬ টাকা থেকে ১২৬ টাকা ৪০ পয়সায় কেনা হচ্ছে এবং সাধারণ গ্রাহকের কাছে তা বিক্রি হচ্ছে ১২৬ টাকা ৭০ থেকে ১২৬ টাকা ৮০ পয়সায় অথচ মাত্র এক মাস আগেও খোলা বাজারে এই দর ছিলো ১২৫ টাকা থেকে ১২৫ টাকা ২০ পয়সার মধ্যে।
সুগন্ধা মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মোস্তফা আলাপ-কে বলেন, “গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ডলার দাম অল্প অল্প করে বাড়ছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে বিক্রি দাম ১২৬ টাকা ৭০ পয়সা। আর কেনা এর চেয়ে ৪০-৫০ পয়সা কম।”
মূলত বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাহিদার বিপরীতে ডলারের তীব্র সরবরাহ তুলনা বা জোগান ঘাটতিই এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক মৌখিকভাবে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তঃব্যাংক বাজার বা রেমিট্যান্স চ্যানেল কোনো ক্ষেত্রেই যেনো ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার বেশি দামে ডলার না কেনা হয়।
জ্বালানির উত্তাপে চড়ছে ডলারের দাম
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ৭০ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারের আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে শুধু জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে। আগের অর্থবছরে এই ব্যয় ছিলো ১০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত শুধু পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে ৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ৮৫ শতাংশ বেশি।
ব্যাংকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে তেল, এলএনজি ও সার আমদানিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা কমেছে এবং রপ্তানি আয়ও প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। ফলে বাজারে ডলারের সরবরাহ কমলেও চাহিদা উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, "ডলারের দামে বর্তমান চাপের সবচেয়ে বড় কারণ আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির খরচ।”
তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০-৭০ ডলার থেকে বেড়ে ৯০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলে জ্বালানি আমদানির জন্য ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, “আগে কম দামে ডলার ধরে যেসব এলসি খোলা হয়েছিল, এখন সেগুলোর বিল পরিশোধ করতে ব্যাংকগুলোকে তুলনামূলক বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে এবং সেই চাপ সরাসরি ডলারের বিনিময় হারে প্রতিফলিত হচ্ছে।”
একই কথা বলেছেন বেসরকারি ব্যাংকের হেড অব ট্রেজারিও। তার ভাষায়, “জ্বালানি আমদানির পেমেন্ট বেড়ে যাওয়া এবং সরকারের কিছু খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। যা ডলারের দামে প্রভাব ফেলছে।”
বাজার বিবেচনায় ডলারের দাম আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুটা কমানো যেতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
“এখন রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ডলারের ওপর চাপ বাড়লে বিনিময় হারকে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত অবমূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে,” বলেছেন তিনি।
কমছে ভোক্তা পণ্যসহ অন্য আমদানি
জ্বালানি আমদানির বিল বাড়লেও দেশের প্রায় সব উৎপাদনমুখী খাতে আমদানি কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভোক্তা পণ্যের আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ, মধ্যবর্তী (ইন্টারমিডিয়েট) পণ্যের আমদানি ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, দেশে উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে গতি কমেছে। নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণের বদলে অনেক উদ্যোক্তা এখন বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও অন্যান্য উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানিও কমে এসেছে।
এ বিষয়ে আলাপ-কে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লেও দেশে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। আবার মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিও কিন্তু বাড়ছে না। তার মানে নতুন কর্মসংস্থান বাড়ছে না। এর সঙ্গে উচ্চ সুদহার, প্রতিকূল করনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে টিকে থাকার লড়াইয়ে মনোযোগ দিচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও স্থগিত করেছে। এর প্রভাব এলসি খোলা ও এলসি নিষ্পত্তির পরিসংখ্যানেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।”
জ্বালানির নতুন উৎস, আমদানিতে চোখ
জ্বালানি আমদানির বাড়তি চাপ সামাল দিতে সরকার নতুন উৎসের দিকে ঝুঁকছে। মালয়েশিয়ার পর এবার মিয়ানমার থেকেও পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পুরোনো পাইপলাইন প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করা এবং এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনাও আলোচনা হয়েছে।
এতে স্পষ্ট, আগামী দিনেও দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকবে। ফলে ডলারের চাহিদাও উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে।
এদিকে জ্বালানির পাশাপাশি নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণেও আমদানির পথেই হাঁটছে সরকার।
কাঁচা মরিচের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ভারত থেকে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সোমবার থেকেই আমদানি শুরু হয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৩২০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক দিন আগেও ৪০০ টাকায় উঠেছিল।
সরকারের আশা, নতুন চালান বাজারে পৌঁছালে দুই থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে দাম কমে আসবে।
সব মিলিয়ে দেশের আমদানির ধরনের বড় পরিবর্তন এসেছে। উৎপাদন, শিল্প ও বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট আমদানি কমলেও জ্বালানি আমদানির ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
ফলে মোট আমদানি খুব বেশি না বাড়লেও ডলারের চাহিদা কমছে না। বরং জ্বালানি বিল পরিশোধেই বাড়তি ডলার লাগছে, যা ডলারের দাম বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়া ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থাৎ ডলারের বাড়তি ব্যয় উৎপাদন বাড়াচ্ছে না, কেবল বাড়াচ্ছে খরচ কমাচ্ছে রিজার্ভ।