আবু সাঈদ: যার মৃত্যুতে বেজেছিল শেখ হাসিনার বিদায় ঘণ্টা

তিউনিসিয়ার মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতি ১৭টি আরব দেশে জ্বালিয়ে দিয়েছিলো দ্রোহের আগুন 'আরব বসন্তের' নামের সেই বিপ্লবে ক্ষমতার মসনদ হারিয়েছিলো ৭টি দেশের সরকারপ্রধান। যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেয়। ইতিহাসের সেই বিশেষ সন্ধিক্ষণগুলো প্রমাণ করে, একজন মানুষের মৃত্যু কখনো কখনো পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণের জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠে। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে আবু সাঈদের মৃত্যু ছিল ঠিক তেমনই এক মুহূর্ত।

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২৯ পিএম

প্রায় দুই বছরের আইনি প্রক্রিয়া শেষে ঘোষণা হলো আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়। রায়ে ২ জনের মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুই আসামি হলেন পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, এছাড়াও রায়ে ৩ জনের যাবজ্জীবন আর ২৪ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ায় একজনকে খালাসও দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন।

যা হয়েছিল আবু সাঈদের সাথে

ষোলোই জুলাই, ২০২৪। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ওইদিন দুপুরে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেইটের সামনে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীদের হটাতে মুখোমুখি অবস্থান নেয় পুলিশ।

গণমাধ্যমে প্রচার হয় ভিডিও। ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশের বন্দুকের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে কালো টি-শার্ট পরা এক তরুণ। হাতে কেবল একটি লাঠি।

হঠাৎ করেই গায়ে এসে লাগে গুলি। দুইবার। কেঁপে ওঠেন তিনি। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।

সহপাঠীরা ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তরুণকে মৃত ঘোষণা করেন দায়িত্বরত চিকিৎসক।

সেদিনের সেই তরুণই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। 

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সেই সময় ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানিয়েছিল, সাঈদ পুলিশের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছিলেন না। এটি ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ।

আবু সাঈদের মৃত্যুর ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার আগে কোটা সংস্কার আন্দোলন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, সাঈদের মৃত্যু রাস্তায় নামিয়ে আনে সাধারণ মানুষকেও।

আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ত্বরান্বিত হয় আন্দোলন। সেই পথ ধরেই আসে সরকার পতনের একদফা। শেষ হয় শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসন। আবু সাঈদ হয়ে ওঠেন 'জুলাই গণঅভ্যুত্থানের' অন্যতম প্রতীক।

আবু সাঈদকে হত্যার পরপরই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে তখনকার পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে। পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। এজাহারে বলা হয় আন্দোলনকারীদের ইট-পাটকেলের আঘাতে মৃত্যু হয়েছে আবু সাঈদের। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ থাকার পরেও পুলিশের এমন এজাহারে দেশব্যাপী বিতর্কের মুখে পড়ে এই মামলা।

শেখ হাসিনার পতনের পর ২০২৪ সালের ১৮ই অগাস্ট আবু সাঈদের বড় ভাই বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশের তৎকালীন বড় কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয় মামলায়। তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই। 

হত্যাকাণ্ডটি 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' এবং 'নির্বিচার হত্যা'র আওতায় পড়ায় পরবর্তীতে এই মামলার সাথে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাও।

ঘটনাস্থলের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ এবং সাধারণ মানুষের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও ফরেনসিক ল্যাবে বিশ্লেষণ করা হয়। আগের ময়নাতদন্ত রিপোর্টে কারচুপি ছিল কি-না পরীক্ষা করা হয় সেটিও।

তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, এটি কেবল একজন কনস্টেবলের ভুল নয়, বরং সুপরিকল্পিত একটি আদেশের অংশ ছিল।

তদন্ত শেষে মোট ৩০ জনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিল করা হয়। চার্জশিটে আসামিদের তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। রংপুর রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয় চার্জশিটে।

এছাড়াও কিছু পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করা হয় সরাসরি গুলিবর্ষণকারী হিসেবে। 

একইসাথে এই হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতাকারী হিসেবে উঠে আসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের নাম।

যা বলেছিলো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো

আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং ভিডিও ফুটেজের সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনাকে একটি 'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড' হিসেবে চিহ্নিত করেছিল কেউ কেউ। 

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, "আবু সাঈদ পুলিশের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক শারীরিক হুমকি তৈরি করেননি, অথচ তাকে অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে।" একে 'বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড' হিসেবে আখ্যা দেয় সংস্থাটি।

আবু সাঈদের ঘটনায় পুলিশের বলপ্রয়োগের সমালোচনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচও। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহার করার আন্তর্জাতিক নিয়ম মানেনি বলে জানায় তারা।

বাংলাদেশে জুলাই-অগাস্টের সহিংসতা নিয়ে একটি বিস্তারিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট প্রকাশ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর। রিপোর্টে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডকে পুলিশের 'অপ্রয়োজনীয় এবং অপ্রাসঙ্গিক বলপ্রয়োগের' একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে নিরস্ত্র ব্যক্তির ওপর এভাবে সরাসরি গুলি চালানো যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য দমন পীড়ন।

অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ল্যাবরেটরি ভিডিওর মেটাডেটা বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছে যে, পুলিশ কেবল আবু সাঈদকে গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি, তাকে চিকিৎসা সেবা দিতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এসব রিপোর্টগুলোর কারণেই বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হলে এই সংস্থাগুলোর ফরেনসিক বিশ্লেষণকেই প্রধান প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। 

উনিশ মাসের আইনি লড়াই শেষে রায় হলো এই মামলার। মোট ৩০ জন আসামির মধ্যে ৬ জন জেলহাজতে থাকলেও বাকি ২৪ জন এখনো পলাতক। তাদের অনুপস্থিতিতেই এই রায় ঘোষণা করেন আদালত।