মাজার ভাঙা থেকে সিনেমা বন্ধ: বহুত্ববাদী বাংলাদেশ কি তবে বদলে যাচ্ছে?
রাষ্ট্রের তোষণনীতি এবং মব-ভায়োলেন্সের সামনে প্রশাসনের বারবার নতি স্বীকারের মতো ঘটনায় জাতীয় নিরাপত্তার হুমকিও দিন দিন বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই মব ভায়োলেন্স দমনে প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
শরীফ খিয়াম আহমেদ
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ০২:৪৩ পিএমআপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ০২:৪৩ পিএম
অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। একদিকে যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ঠিক তখনই ঘরের ভেতরে সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতায় আটকে যাচ্ছে দেশ। বৈশ্বিক অর্জনের বিপরীতে অভ্যন্তরীণ ‘মব ভায়োলেন্স’ এবং সাংস্কৃতিক ‘সেন্সরশিপ’ এই চরম বৈপরীত্য বা ‘প্যারাডক্স’ তৈরি করেছে।
একদিকে হাজার বছরের বহুত্ববাদী লোকজ ঐতিহ্য এবং সুফি আধ্যাত্মিকতা; অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও উগ্রপন্থা। এই দুই বিপরীতমুখী আদর্শের এক তীব্র সংঘাত ঘনীভূত হচ্ছে। একপক্ষের জন্য এটা একাত্তরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে মৌলবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই; অন্যপক্ষের জন্য ইসলামের পবিত্রতা রক্ষা এবং অপসংস্কৃতি প্রতিরোধের সংগ্রাম। বিগত কয়েক দিনের ঘটনাবলীর কারণে সাংস্কৃতিক মানচিত্রের এই গভীর ফাটল এখন আরও দৃশ্যমান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কট্টরপন্থী মুসল্লিদের চলচ্চিত্র প্রদর্শনে বাধা দেওয়ার ঘটনা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই মুন্সীগঞ্জে ফকির লালন শাহকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি আশ্রম উচ্ছেদের চেষ্টা করেছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির এক স্থানীয় নেতা। জেলার সিরাজদিখান উপজেলার দোসরপাড়া গ্রামের ‘পদ্মহেম ধাম’ নামের ওই আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ও দৈনিক প্রথম আলোর ফিচার বিভাগের প্রধান ফটোসাংবাদিক কবির হোসেনকে মঙ্গলবার (২ জুন) কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ আক্রান্তের পরিবারের।
একই দিন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননা ও দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করার অভিযোগ তুলেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইসলামি নেতারা। চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পক্ষে সোচ্চার হওয়ায় নির্দলীয় এই সংসদ সদস্য ক্ষমা না চাইলে তার ‘দুই গালে জুতা মারা’, ‘পিঠের চামড়া তুলে নেওয়া’, ‘এলাকা ছাড়া করা’, এমনকি তাকে প্রতিহত করতে ‘জিহাদের (ধর্মযুদ্ধের) ডাক’ দেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন স্থানীয় কওমি আলেমরা। চলতি সপ্তাহে নেত্রকোণায় বাউলের আসর পণ্ড ও নরসিংদীতে এক সাধকের আখড়া উচ্ছেদেরও খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নেত্রকোণার ঘটনায় স্থানীয় সরকার দলীয় এমপি ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নির্দেশে গানের আয়োজন বন্ধ করা হয়েছে।
তার আগে ঢাকার মিরপুরে ঐতিহ্যবাহী শাহ আলী বোগদাদীর (রহ.) মাজারের বার্ষিক ওরশের মাত্র পাঁচ দিন আগে (১৪ই মে) গভীর রাতে ‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দিয়ে ভক্ত-আশেকানদের উপরে হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং জামায়াত-শিবির এই ঘটনাকে মাজারের ‘অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদকের’ বিরুদ্ধে একটি ‘পুলিশি অভিযান বা সামাজিক প্রতিরোধ’ হিসেবে চিত্রিত করতে চাইলেও, পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং একে একটি পরিকল্পিত হামলা হিসেবে গণ্য করছে।
গেল ১২ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সুফি সাধক আবদুর রহমান ওরফে শামীম রেজা (কালান্দার বাবা)-কে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি বর্তমান সরকারের আমলের ‘মব ভায়োলেন্সের’ চরম বহিঃপ্রকাশ। নিহতের মুখমণ্ডলে ১৫ থেকে ১৮টি কোপের দাগ প্রমাণ করে এই আক্রমণ কতটা ঘৃণা-প্রসূত ছিল।
কেবল হত্যা নয়, বরং মৃতদেহ নিজ আশ্রমে দাফন করতে না দেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা সুফি ধারার শারীরিক ও আধ্যাত্মিক উপস্থিতি—উভয়কেই মাটি থেকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা। বর্তমান সরকার ক্ষমতাগ্রহণের পর গত মার্চে বরিশালের হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিব শাহ ও কুষ্টিয়ার শামীম শাহের ক্ষেত্রে যা দেখা গেছে।
এপ্রিলের শুরুতে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা চাঁদপুরের শতবর্ষী লোকজ আয়োজন সোলেমান ল্যাংটার ওরশ এবং মেলাও বন্ধ করে দিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন। সবমিলিয়ে এটা এখন প্রকাশ্য যে শেখ হাসিনা পতন-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা উগ্রবাদী ইসলামি গোষ্ঠীগুলো বর্তমান সরকারের আমলেও অনমনীয়।
মাটির চিরায়ত টান বা লোকজ সংস্কৃতি এবং শাস্ত্রীয় কঠোরতা বা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের এই আদর্শিক সংঘাতে প্রগতিশীলরা মনে করেন, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি ও ধর্ম সমান্তরালভাবে চলে এসেছে।
অন্যদিকে, রক্ষণশীল গোষ্ঠী এই সাংস্কৃতিক সংশ্লেষকে ধর্মের জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য করছে। তাদের মতে, সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ‘মব কালচার’ বা দঙ্গলবাজির মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জীবনদর্শন ছাড়া বাকি সবাইকে সমাজ থেকে মুছে ফেলার যে কৌশলগত প্রয়াস চলমান, তা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন বিশৃঙ্খলা নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক শুদ্ধি অভিযানে রূপ নিয়েছে।
লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক মহাথেরো মুহাম্মদের মতে, এই আক্রমণগুলো ওহাবি ভাবধারা বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
রাষ্ট্রের তোষণ নীতি এবং মব-ভায়োলেন্সের সামনে প্রশাসনের বারবার নতি স্বীকারের মতো ঘটনায় জাতীয় নিরাপত্তার হুমকিও দিন দিন বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই মব ভায়োলেন্স দমনে প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে ২০২৫ সালের ৩১এ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশে মোট ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে উল্লেখ করে সুফি-সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’ জানিয়েছে, এর বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র ১১টি।
তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী গত বছরের নভেম্বরে বাউল আবুল সরকারের গ্রেপ্তার এবং মাজার ভাঙচুর নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করে বলেছিলেন, “পুরা পরিস্থিতি একটি সংকটের দিকে যাচ্ছে।”
সাংস্কৃতিক এই আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় মানবিক শিকার বাউল নেতা আবুল সরকার। তার ‘অপরাধ’ ছিল একটি পালাগানে 'জীব ও পরম' তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্রষ্টার অসীমতা বোঝাতে কিছু রূপক ব্যবহার করা। আধ্যাত্মিক দর্শনের এই সূক্ষ্ম পাঠকে 'ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত' হিসেবে আইনি ছাঁচে ফেলে তাকে আটক করা হয়েছিল। তখন তার স্ত্রী বাউল আলেয়া বেগম বলেছিলেন, তাদের আয়ের উৎস গান আজ বন্ধ, উগ্রপন্থীদের হুমকিতে আয়োজকরা তাকে বায়না করতে ভয় পাচ্ছেন।
মানিকগঞ্জ জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট নূরতাজ আলম বাহার স্বীকার করেছিলেন যে, মামলাটি 'টেকনিক্যালি' জামিনযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কেবল 'স্থানীয় উত্তেজনা' বা 'মব'-এর ভয়ে বিচারক জামিন দেননি। এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিচারব্যবস্থাকে উগ্রবাদী জনতার কাছে লিজ দেওয়ার এক প্রকট উদাহরণ। তখন আদালত চত্বরে আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে আসা ভক্তদের ওপরও হামলা চালানো হয়েছিল। অবশেষে বিএনপি ক্ষমতায় আসার দুই মাস পর তিনি কারামুক্ত হন।
নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত, কিংবা পরবর্তীতে ওরশে শিরনির জন্য তার গরু দেওয়ার ঘটনাও তরিকাপন্থীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। শাহ আলী বোগদাদীর (রহ.) ওরশের সমাপনীক্ষণে (২২এ মে) মাজারের আদি খাদেম পরিবারের উত্তরসূরি আকবর হোসেন বলছিলেন, “বিগত সরকারের আমলে মাজারে অবস্থানকারী পাগল-ফকিরদের অবস্থা ভালো ছিল না। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর, তারেক রহমানের দেশের নেতৃত্ব পাওয়ার পর দেশের আনাচে-কানাচে সব মাজার শরীফে ওরশ উদযাপিত হচ্ছে। এবং আমরা আশা করব, বর্তমান সরকার এই পাগল-মাস্তানদের মাজার শরীফকে প্রশাসনিক সহায়তা করবে, যেটা তারা শুরু করেছে। আমরা বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানাই, যে তারা পাগল-ফকিরদের সহানুভূতি দেখাচ্ছে।”
“এবার দেখলাম খাজা শরফুদ্দিন চিশতির দরবারে ওরশ করতে দেওয়া হয়নি, সুলেমান ল্যাংটার মাজারে ওরশ করতে দেওয়া হয়নি। তারই ধারাবাহিকতায় মিরপুরের মাজার শরীফে জামায়াত-শিবির অতর্কিতভাবে হামলা করেছিল। কিন্তু তাদের হামলা সত্ত্বেও বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে থেকে আসা লক্ষ ভক্তবৃন্দ এই ওরশ শরীফে অংশগ্রহণ করেছে। লক্ষ লক্ষ আশেক শাহ আলী বাবার দরগাতে উপস্থিত হয়েছেন,” যোগ করেন তিনি।
অর্থাৎ নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলের ট্রমা কাটিয়ে মাজার ভক্তরা চিরায়ত ধারায় ফিরতে চাইছেন, ঠিক তখনই একের পর এক নতুন ঘটনা সামনে আসতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন যখন উগ্রপন্থীদের দাবির মুখে নতি স্বীকার করে বাউল গান বন্ধ করে দেয় বা মাজার ভাঙার সময় নীরব থাকে, তখন তা আর ‘নিরাপত্তা প্রদান’ থাকে না, বরং আইন ভঙ্গকারীদের প্রতি এক ধরনের রাষ্ট্রীয় সমর্থন হয়ে দাঁড়ায়।
রাষ্ট্রের এই অবস্থান কার্যত উগ্রপন্থীদের দাবিকে আইনি বৈধতা প্রদান করছে এবং সংবিধানে বর্ণিত সাংস্কৃতিক অধিকারকে এক প্রকার অলিখিত নীতির মাধ্যমে খর্ব করছে। এটি কেবল আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বয়ান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিক পরিসর দখলের প্রচেষ্টা।
কদরুদ্দীন শিশির, মুনওয়ার আলম নির্ঝরসহ অনেক গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো হামলার শিকার ব্যক্তিদের নামের আগে ‘কথিত পীর’ বা ‘ভণ্ড’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে এক ধরনের ‘নেগেটিভ ফ্রেমিং’ তৈরি করে। এটি কার্যত ওই ব্যক্তিকে তার আইনি ও মানবিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করে এবং তার ওপর হওয়া সহিংসতাকে পাঠকের কাছে বৈধ করে তোলে। এটি সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালার চরম লঙ্ঘন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যা চলছে
সাম্প্রতিক সময়ে এই আদর্শিক লড়াইয়ের একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামের একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে সেখানে শুরু হয়েছে নতুন সংঘাত। একপক্ষ জেলা শহরকে ‘সংস্কৃতির রাজধানী’ হিসেবে রক্ষা করতে চান, অন্যপক্ষ একে ‘ওলামায়ে কেরামের শহর’ ও ‘শহীদের শহর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখতে বদ্ধপরিকর। অর্থাৎ চলচ্চিত্রটির একটি অবাণিজ্যিক প্রদর্শনী বন্ধ হওয়াকে কেন্দ্র করে পুরো পরিস্থিতি এক জটিল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মেরুকরণের দিকে মোড় নিয়েছে। সুস্থ ধারার শিল্পকর্মও কীভাবে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভাজনের প্রতীকে পরিণত হতে পারে, শাহবাজপুরের মানববন্ধন থেকে রুমিন ফারহানার বক্তব্য এবং তার বিপরীতে ওলামা সমাজের তীব্র প্রতিক্রিয়া তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
গেল সোমবার (১লা জুন) বিকেলের মানববন্ধনে রুমিন ফারহানার দেওয়া বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে রাতেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার দফতরে জরুরি সভা করে কওমি ঐক্য পরিষদের নেতারা। একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, কওমি ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা ও জেলা হেফাজতে ইসলামের সেক্রেটারি মাওলানা আলী আযম কাসেমীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভাতেই নেতৃবৃন্দ দাবি করেন, সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাহবাজপুরে আয়োজিত এক মানববন্ধনে রুমিন ফারহানা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে কোরআন তেলাওয়াত ও আজানের মতো ইসলামের পবিত্র বিষয়গুলোকে হারমোনিয়াম, বাদ্যযন্ত্র ও বাউল গানের সঙ্গে একই প্রসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রসঙ্গত, মাওলানা কাসেমী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন প্রভাবশালী আলেম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার সঙ্গে যুক্ত থেকে কওমি ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জাতীয় রাজনীতিতেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা। অর্থাৎ কাসেমী একদিকে কওমি আলেমদের ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতিনিধি, অন্যদিকে জাতীয় ইসলামি রাজনীতির সঙ্গে সংযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় নেতা।
তার নেতৃত্বে হওয়া উল্লেখিত সভায় বক্তারা আরও বলেন, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও আজান মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এসব বিষয়কে অন্য কোনো সাংস্কৃতিক বা সংগীত উপাদানের সঙ্গে তুলনা বা একই প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে। ওই সভাতেই পরদিন মানববন্ধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিক্ষোভের ঘোষণা দেয় কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ।
তবে পরদিন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, সরাইল শাখার উদ্যোগে এক প্রতিবাদী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ক্ষমতাসীন জোটের এই দলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি মাওলানা জুনাইদ আল হাবিবকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হারিয়েই সংসদ সদস্য হয়েছেন রুমিন ফারহানা। তাদের কর্মসূচির ভিডিওতে দেখা গেছে, এক বক্তা রুমিনের নেতৃত্ব ও ব্যক্তিসত্তাকে আক্রমণ করে তাকে ‘দাইয়ুস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ইসলামিক পরিভাষায় দাইয়ুস হলো সেই আত্মমর্যাদাহীন পুরুষ, যে তার পরিবারের (স্ত্রী, বোন, মেয়ে) নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা বা ব্যভিচার জেনেও উদাসীন থাকে এবং তা প্রতিরোধে কোনো পদক্ষেপ নেয় না। ওই বক্তা দাবি করেন, রুমিন ফারহানা ‘পুরুষের হুকুমে’ (পুরুষালি আচরণে) এই ধরনের দৃষ্টান্ত দেখাচ্ছেন এবং ‘তার মতো নারীর’ সরাইল-আশুগঞ্জের মাটিতে থাকার ‘কোনো অধিকার নেই’। ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিউজ টিভি ২৪’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে এই বক্তাকে জমিয়তের নেতা মাওলানা জাহিদুল ইসলাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই মানববন্ধনে আরেক বক্তাকে বলতে দেখা গেছে, “এই শহরে কাবাঘর নিয়া ব্যঙ্গ, ওলামায়ে কেরাম নিয়া ব্যঙ্গ, আর আজান নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে পিঠের চামড়া থাকবে না। আমরা বিভিন্ন দল করতে পারি, কিন্তু ইসলামের ওপর আঘাত আসলে আমরা সবাই একদল।” বক্তারা অভিযোগ করেছেন যে, রুমিন ফারহানা ইসলামি পরিভাষা নিয়ে ব্যঙ্গ ও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তাদের দাবি, এই ধরনের বক্তব্য মুসলমানদের ‘হৃদয়ে রক্তক্ষরণ’ ঘটিয়েছে এবং কোনো সচেতন মুসলমান এটি সহ্য করতে পারে না।
সেদিনই ‘সচেতন ইসলাম প্রিয় জনতা’ নামক একটি মোর্চার ব্যানারে অনুষ্ঠিত আরেক মানববন্ধনে মুফতী এরশাদুল্লাহ বিন ইকবাল কাসেমী নামের এক বক্তা বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আমরা ইসলামি সংস্কৃতি তথা বাঙালি ইসলামি সংস্কৃতির পক্ষে। কিন্তু এই শহরের মানুষ সিনেমা দেখে না বলেই সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। এখন যদি কেউ এসে কোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সিনেমায় রূপান্তর করতে চায়, তা হবে না।”
এই কর্মসূচি থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, রুমিন সরাইল-আশুগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ‘শাহবাগী’ এবং ‘রাম-বামদের’ মতাদর্শের জনপদে পরিণত করতে চান। তিনি সেখানকার সমাজকে ‘সুশীল সমাজে’ রূপান্তর করার চেষ্টা করছেন বলেও বক্তারা দাবি করেন।রুমিন ফারহানাকে ‘সাবধান’ করে মুফতী এরশাদুল্লাহ বলেন, “আগামীতে যদি আপনি কোনো কথা বলেন, তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুসলমানরা যে ইসলাম লালন করে, সেটা লালন করার কথা বলবেন। আপনি যে সমস্ত বক্তব্য দিচ্ছেন, তাতে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে যে আপনি তৃতীয় কোনো পক্ষের এজেন্ডা হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছেন।”
বক্তাদের দাবি, অতীতে শেখ হাসিনার মতো বড় শক্তিও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাদ্রাসার ছাত্রদের সামনে টিকতে পারেনি। আর সেখানকার ‘প্রতিটি ইঞ্চি মাটিতে’ ওলামায়ে কেরামের ‘রক্ত ও ঘাম’ মিশে আছে। এই অঞ্চলের ছাত্র-জনতা যেকোনো অপসংস্কৃতি ও বিজাতীয় আদর্শ রুখে দিতে প্রস্তুত। বক্তারা বলেন যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ‘শহীদের শহর’ এবং ইতিপূর্বে মোদিবিরোধী আন্দোলনেও এই অঞ্চলের ছাত্ররা ‘রক্ত দিয়েছে’। ফলে ইসলামের ওপর কোনো আঘাত এলে তারা রাজপথে কঠোর আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আগের দিনের সমাবেশে রুমিন অভিযোগ করেন যে, যারা বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে চায়, তারাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই প্রদর্শনীর পথ রুদ্ধ করেছে।
এই সরকারের আমলকে ইঙ্গিত করে রুমিন বলেন, "আমরা গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি—একটার পর একটা মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে তুলে নিয়ে লাশ পোড়ানো হয়েছে। আমরা দেখেছি দক্ষিণপন্থা বা ডানপন্থা উগ্রবাদের উত্থান। কিন্তু আমার দেশের মাটি তো এমন ছিল না। এই দেশের মাটিতে আজানের ধ্বনি যেমন সুমধুর ধ্বনি আমরা শুনেছি, আমরা বাউল গানও শুনেছি। এই দেশের মাটিতে সকালবেলা যেমন কোরআন তেলাওয়াত শুনেছি, আবার বিকেলবেলা হারমোনিয়াম নিয়ে ছোট ছোট বাচ্চারা গান প্র্যাকটিস করেছে, সেটাও আমরা দেখেছি।
“তাহলে এই বাংলাদেশকে কারা কারা মৌলবাদের ভূমি বানাতে চায়? এই প্রশ্ন আজকে আপনাদের মাধ্যমে আমি রেখে যাচ্ছি। এবং এই রাষ্ট্রের কাছে আমার দাবি থাকবে—যেই রাষ্ট্র কোনো অপরাধ বন্ধ করতে পারে নাই, যেই রাষ্ট্র ছোট ছোট শিশুদের বলাৎকার আর ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচাতে পারে নাই, সেই রাষ্ট্র আজকে কী করে বাংলাদেশে—যেখানে সব রকম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ধর্মের পাশাপাশি চলেছে—সেটাকে বন্ধ করে বাংলাদেশকে পরের প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়ার মদদ দিচ্ছে?”
ক্ষমতাসীন বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আমি বলে রাখি—তোমাকে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে। যাদেরকে আপনারা আজকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন, আপনাদের মদদে যারা আজকে গান-বাজনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সবকিছুর ওপরে শক্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস পাচ্ছে, একদিন তাদের হাতেই কিন্তু আপনারা পরাজিত হবেন। আমি আশা রাখব শুভ বুদ্ধির উদয় হবে; সামনের প্রজন্মকে আমরা যেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে না রাখি।
“ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা সিনেমা হল নাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছে না। এই কালো নকশা কারা করছে? যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, যারা বাংলাদেশকে অন্ধকারে নিয়ে যেতে চায়, যারা বাংলাদেশকে একটা মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে চায়; তারাই বাংলাদেশের এই সংস্কৃতির রাজধানী ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে একটা সিনেমা—যেটা একেবারেই পরিবারের সকলকে নিয়ে দেখবার মতন একটি সিনেমা, 'বনলতা এক্সপ্রেস'—তার প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে,” যোগ করেন সংসদ সদস্য রুমিন।
এসব কথা বলার জন্য যখন স্বাধীনতা পুরস্কার বিজয়ী ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অলি আহাদের এই কন্যাকে যেদিন শুনতে হচ্ছে ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত তাকে সরাইল-আশুগঞ্জ এলাকায় পা রাখতে দেওয়া হবে না এবং ওলামা ও কওমি ছাত্র সমাজ জেগে উঠলে তিনি পালাবার জায়গা পাবেন না, ঠিক সেই দিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখতে পেরেছিলেন, “জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অনেক অনেক অভিনন্দন।” তিনি আরও লিখেছেন, এই অর্জন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবদান এবং নির্ভরযোগ্যতার প্রতিফলন। মুন্সীগঞ্জে যা হয়েছে
একই দিনে ফেসবুকে সাংবাদিক কবির হোসেনের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলার পর তাকে একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সিরাজদিখান উপজেলার লতব্দি ইউনিয়নের দোসরপাড়া এলাকায় মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর মাদবরের নেতৃত্বে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর ইতোমধ্যে জাহাঙ্গীরকে পুলিশ আটকও করেছে।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানিয়েছে, দোসরপাড়া এলাকায় কবির হোসেনের পরিচালিত একটি লালন চর্চাকেন্দ্র আছে। স্থানীয়ভাবে ‘বাউল বাড়ি’ নামে পরিচিত এই আশ্রমে দুই দশক ধরে শীতের সময় দুই পূর্ণিমা তিথিতে লালন ফকিরের উৎসব, মেলা ও সাধুসঙ্গের আয়োজন করা হয়ে থাকে। সে সময় জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সাধুগুরুসহ অনেক বাউল শিল্পী, গণ্যমান্য ব্যক্তি, দর্শনার্থী ও লালনভক্তদের আগমন ঘটে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর মাদবর ও ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আলাউদ্দিন মাদবর ওই চর্চাকেন্দ্র ও এর জমি দখল করে ইটভাটা নির্মাণের চেষ্টা করে আসছিলেন। এ নিয়ে কবির হোসেনকে প্রায়ই হুমকি দিয়ে আসছিলেন তারা। হাসপাতালের শয্যায় আহত কবির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, “আখড়া বাঁচাতে হলে তারা আমার কাছে টাকা চেয়েছিল। আমি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম। এ কারণে কিছুদিন পরপর এখানকার মানুষদের চড়-থাপ্পড় দিত। চর্চাকেন্দ্রে এসে মাদক সেবন ও মাদকের ব্যবসা করত। দর্শনার্থীরা এলে জাহাঙ্গীর ও তাদের লোকজন বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করত।”
বাংলা ট্রিবিউনকে কবির বলেছেন, “আমি মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের এমপি শেখ মো. আব্দুল্লাহকেও অনুরোধ করেছিলাম যে, এই লালনের আখড়া গত ২১ বছর আগে বিএনপির আমলেই স্থাপিত হয়েছিল। এখন কিছু লোক ঝামেলা করছে। তাই আপনি এটির বিহিত করে দিন। এরই মধ্যে আশ্রমে এসে হামলা করেছে তারা।” তার ভাষ্য, “আমাকে মেরে ফেলার জন্য দলবল নিয়ে হামলা করেছে।” কবির হোসেনের ছোট ভাই বাউলশিল্পী তকবির হোসেনও বলেন, “সময়মতো না গেলে ওরা কবিরকে মেরে ফেলত। আমি নিজেও আহত হয়েছি।”
সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম হায়দার আলী প্রথম আলোকে বলেন, “অপরাধী কেউ আমাদের দলের নাম ভাঙিয়ে রক্ষা পাবে না। অপরাধীকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।”
তবে জাহাঙ্গীর মাদবরের ভাই মোহসিন মাদবর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “কবির হোসেন আমাদের আত্মীয়। কিন্তু তারপরও তিনি লালন আখড়া স্থাপনের নামে আমাদেরসহ আশপাশের অনেকের জমি দখল করেছেন। লালনের আখড়ায় গেট লাগিয়ে গ্রামের রাস্তায় বাধা দিয়ে রেখেছেন। এসব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল।”
বিষয়টি নিশ্চিত করে সিরাজদিখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হান্নানও বলেছেন, “লালনের ওই আখড়ার একখণ্ড জমি নিয়ে কবির হোসেনের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের বিরোধ চলছিল। সেটি নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে আজ কবির হোসেনের ওপর হামলা চালানো হয়। খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরকে আটক করেছে পুলিশ। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও আটকের চেষ্টা চলছে।”
নেত্রকোণায় কী ঘটেছে
নেত্রকোণার মদনে ইমাম ও ওলামাদের দাবির প্রেক্ষিতে একটি বাউল গানের আয়োজন পণ্ড করে দিয়েছে উপজেলা পুলিশ প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দের যৌথ উদ্যোগ। স্থানীয় এমপির নেতৃত্বে এমনটা করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান। দিগন্ত বাংলা নামের একটি স্থানীয় অনলাইনে প্রচারিত খবরে জানানো হয়েছে, ২১এ মে ইমাম ও ওলামা পরিষদের পক্ষ থেকে গান বন্ধের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দায়ের করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তার আগে বিষয়টি নিয়ে ইমাম ওলামা পরিষদ ও আয়োজক কমিটির সাথে দফায় দফায় বৈঠক বসে। বেশ কয়েক দিন এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করে। পরবর্তীতে শুক্রবার (২৯এ মে) জুমার নামাজের পর বিষয়টি নিয়ে হাসনপুর জামে মসজিদে ইমাম, ওলামা পরিষদ ও ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, সদস্যবৃন্দ ও এলাকাবাসীর বৈঠক বসে। বৈঠকে ইউপি চেয়ারম্যান সামিউল হায়দার শফি তাদের দাবির কথা শোনেন। পরবর্তীতে সকলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাউল গানের আসর বন্ধ করে দেন।
‘দৈনিক ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে শনিবার (৩০এ মে) প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন বলছেন, “আমাদের হাসনপুর গ্রামে ঈদের পরের দিন একটি গান করার উদ্যোগ নিয়েছিল। আমরা হাসনপুরের ওলামায়ে কেরামসহ ফতেপুর ইউনিয়নের ওলামা পরিষদের উদ্যোগে এই গানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি, প্রতিবাদ জানিয়েছি।
জেলা প্রশাসক, স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ দায়েরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন যে এখানে আর গান হবে না।” প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের অসামাজিক কোনো কার্যকলাপ না হয়।”
এই ধরনের আয়োজনকে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ, মাদক এবং জুয়ার প্রসারের উৎস’ হিসেবে চিহ্নিত করে ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সামিউল হায়দার শফিকে বলতে দেখা যায়, “আমরা এই অঙ্গীকার করতে পারি যে আমরা আজ গান থেকে সরে আসছি। আমাদের প্রশাসনের এবং আমাদের সাবেক সফল স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ভাইয়ের আদেশে, আমাদের মদন উপজেলা বিএনপির আদেশে, আমাদের প্রশাসনের আদেশে।” একই ভিডিওতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলতে দেখা গেছে, এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা পুলিশের নৈতিক দায়িত্ব। তারা স্থানীয় মুরুব্বি, জনপ্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের সাথে “কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে” কাজ করছে।
প্রশাসনের এই আপসকামী ভূমিকা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এখন সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার চেয়ে কট্টরপন্থীদের তোষণেই বেশি আগ্রহী। প্রশাসনের জন্য এটা ‘শান্তি রক্ষার’ উপায় হলেও মূলত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চাপের মুখে বাউলদের সুর সেদিন পরাজিত হয়েছিল। হাসনপুরের এই নিস্তব্ধতা কেবল একটি গ্রামের ঘটনা ছিল না, এটি ছিল পরবর্তী ঝড়ের পূর্বাভাস যা নরসিংদীর দিকে ধাবিত হচ্ছিল।
নরসিংদীতে কী হয়েছে?
‘দৈনিক জীবন যাত্রা’, ‘রায়পুরা কণ্ঠ’, ‘নরসিংদী জেলা সাংবাদিক ফোরাম’, ‘নরসিংদী টুডে’সহ আরও একাধিক ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, ৩১এ মে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চরাঞ্চলখ্যাত শ্রীনগর ইউনিয়নের ফকিরের চর এলাকায় তৈরি করা একটি আস্তানা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে স্থানীয়রা।
ভিডিওর কথোপকথন থেকে বোঝা যায় যে, ওই স্থানে রাতে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং মাদক কেনাবেচার মতো অসামাজিক কাজ চলায় গ্রামবাসী ও মাদ্রাসার ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। সেখানে গভীর রাত অবধি নেশাসামগ্রী বিক্রি চলে এবং নারী-পুরুষ একসাথে আড্ডা মারে বলে অভিযোগ করা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আগত মাদকসেবী কথিত ভণ্ড পীর শামসুল হক নামে এক ব্যক্তির ফকিরের চর গ্রামের পশ্চিমের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন বর্ণনা দিয়েই ভিডিওগুলো প্রকাশ করেছে নরসিংদীর স্থানীয় একাধিক গণমাধ্যম। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ভাঙচুর করতে করতে শামসুল হককে তার আধ্যাত্মিক শক্তি প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে। আবার আরেকজনকে বলতে শোনা যায়, “আমরা এই পাগলারে বাবার সমান শ্রদ্ধা কইরা এখান থেকে উচ্ছেদ করছি। দয়া করে আপনি এলাকা থেইকা চলে যান।”
“আগে মাজারটা উঠাইয়া তারপরে মাদক (নির্মূল), ইনশাল্লাহ!”—এমন আরও অনেক বাক্য শোনা যায়। আধ্যাত্মিক চর্চাকে 'ভণ্ডামি' হিসেবে চিহ্নিত করার এই হিংস্র প্রক্রিয়াটি মূলত একটি সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাতের নামান্তর।
ধূমপানেরও অভ্যাস নেই জানিয়ে আক্রান্ত শামসুলকে বলতে শোনা যায়, “আমি কি কোনো অশান্তির লাগি আইছি? আমি কোনো ঝামেলা সৃষ্টি করতেছি না।” একটি ভিডিওতে তাকে জোর করে নৌকায় তুলে দিতে দেখা যায়। ‘রায়পুরা কণ্ঠ’ প্রকাশিত একটি ফটোকার্ডে আল-আমিন খোন্দকার নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারীও লিখেছেন, “একজনের সম্বন্ধে না জেনে মন্তব্য করা ঠিক না। উনার বাড়ি শাহপুর গ্রাম। উনি মাহমুদ শাহ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সুফি সাধক হযরত কাজী মাহমুদ শাহ (রহ.) মাজারের খাদেম। একজন ভালো লোককে খারাপ কথা বলা ঠিক না। উনি কোনোদিন বিড়ি-সিগারেট খান না। তাই অযথা মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন না, যাচাই করে তারপর কথা বলা উচিত।”
ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ
এসব কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব পরিচয় সন্ধানের চরম কৌশলগত লড়াই। একদিকে একাত্তরের চেতনার রেশ ধরে রাখা সাংস্কৃতিক উদারবাদ, অন্যদিকে ইসলামের পবিত্রতা রক্ষার নামে 'অপসংস্কৃতি' প্রতিরোধের এক অনড় অবস্থান। এই স্নায়ুযুদ্ধ আজ কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এটি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।
যখন একটি জনপদের হাজার বছরের লোকজ আধ্যাত্মিকতাকে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ আখ্যা দেওয়া হয়, তখন তা কেবল একটি আসর বা আস্তানা বন্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন আসে, এই সংঘাত কি কেবল একটি আদর্শিক লড়াই, নাকি একটি জাতির স্বকীয়তা মুছে দেওয়ার বৃহত্তর কোনো পরিবর্তনের পূর্বাভাস? অর্থাৎ এই চলমান সংকট কেবল স্থানীয় বা ধর্মীয় কোনো বিরোধ নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের সাথে জড়িত।
যদি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক সাংস্কৃতিক চর্চা ও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সেই অভ্যন্তরীণ ফাটল দিয়ে বিদেশি আধিপত্যবাদ প্রবেশের পথ প্রশস্ত হয়। আজ মাজার ভাঙা বা গান বন্ধ করাকে যারা ধর্মীয় বিজয় হিসেবে দেখছেন, হয়তো বুঝতেও পারছেন না যে তারা আসলে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক নীল নকশার অংশ হচ্ছেন; যা বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ ও অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।
সাম্প্রতিক একাধিক বক্তব্যে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার দাবি করেছেন, মাজার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে একটি ‘টেররিস্ট স্টেট’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার সুযোগ করে দিচ্ছে। তার ভাষ্য, যদি রাষ্ট্র তার আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলো রক্ষা করতে না পারে, তবে এটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করার এক নৈতিক অজুহাত তুলে দেবে।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাজার ভাঙার ঘটনাগুলো ভারতের ‘হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা’ বা ‘ইসলাম নির্মূল নীতি’র সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে। সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘অনুধাবনের সক্ষমতা’ নিয়েও প্রশ্ন তুলে, তিনি সতর্ক করেছেন যে, এই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার ফলে বাংলাদেশকে কাশ্মীরের চেয়েও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া হতে পারে।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের পরিচালক তানিম নূর বর্তমান পরিস্থিতিকে ঘৃণা চাষবাস করার ফসল হিসেবে বর্ণনা করছিলেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে মানুষ একে অপরকে ভয়াবহভাবে ঘৃণা করে, যা ভারত, বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে প্রকট। আমরা সবাই মানুষ, অথচ মত ভিন্ন হলে আমরা একে অপরকে গালাগালি করি।”
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাবকে পুঁজি করে দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীকে উগ্রপন্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। শিল্প ও সংস্কৃতিই হতে পারে এই ঘৃণা জয়ের একমাত্র পথ, কিন্তু সেই পথকেই আজ রুদ্ধ করা হচ্ছে। “আমাদের দেশ ছোট এবং এখানে অনেক মানুষ, তাই ঐক্যবদ্ধ থাকা ছাড়া উপায় নেই। ধর্ম বা বর্ণের নামে বিবাদ আমাদের কোথাও নিয়ে যাবে না,” বলেন এই নির্মাতা।
দৃশ্যত বাংলাদেশের গ্রামীণ ও মফস্বল জনপদগুলোতে গত কয়েক দশকে এক সুদূরপ্রসারী এবং পদ্ধতিগত সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটছে। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের লোকজ সংস্কৃতির প্রাণশক্তি ছিল বহুত্ববাদ—যেখানে এক উঠানে আজান এবং অন্য উঠানে বাউল গান সহাবস্থান করত। তবে বর্তমান সময়ে এই বহুত্ববাদী কাঠামো ভেঙে একটি ‘এককেন্দ্রিক নৈতিক বলয়’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। এই রূপান্তর কেবল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সংকোচন নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ; যা জাতীয় পরিচয় ও নিরাপত্তার জন্য গভীর সংকট তৈরি করছে।
বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের অন্তত মনে রাখা উচিত, লোকজ সংস্কৃতির ধারকরা আজ রাজনৈতিকভাবে চরম অসুরক্ষিত। আর সমাজকে ‘মনোলিথিক’ বা একমুখী গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে হলে বহুমুখী সংস্কৃতির চর্চা অপরিহার্য। তাছাড়া এটা ইতিহাস স্বীকৃত, যখন ‘আধ্যাত্মিক আলাপ’ বা লোকজ আধ্যাত্মিকতা চর্চাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, তখন তা সমাজকে একটি বৌদ্ধিক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়, যা চরমপন্থার উর্বর চারণভূমি হিসেবে কাজ করে।
মন্তব্য প্রতিবেদন
মাজার ভাঙা থেকে সিনেমা বন্ধ: বহুত্ববাদী বাংলাদেশ কি তবে বদলে যাচ্ছে?
রাষ্ট্রের তোষণনীতি এবং মব-ভায়োলেন্সের সামনে প্রশাসনের বারবার নতি স্বীকারের মতো ঘটনায় জাতীয় নিরাপত্তার হুমকিও দিন দিন বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই মব ভায়োলেন্স দমনে প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। একদিকে যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ঠিক তখনই ঘরের ভেতরে সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতায় আটকে যাচ্ছে দেশ। বৈশ্বিক অর্জনের বিপরীতে অভ্যন্তরীণ ‘মব ভায়োলেন্স’ এবং সাংস্কৃতিক ‘সেন্সরশিপ’ এই চরম বৈপরীত্য বা ‘প্যারাডক্স’ তৈরি করেছে।
একদিকে হাজার বছরের বহুত্ববাদী লোকজ ঐতিহ্য এবং সুফি আধ্যাত্মিকতা; অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও উগ্রপন্থা। এই দুই বিপরীতমুখী আদর্শের এক তীব্র সংঘাত ঘনীভূত হচ্ছে। একপক্ষের জন্য এটা একাত্তরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে মৌলবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই; অন্যপক্ষের জন্য ইসলামের পবিত্রতা রক্ষা এবং অপসংস্কৃতি প্রতিরোধের সংগ্রাম। বিগত কয়েক দিনের ঘটনাবলীর কারণে সাংস্কৃতিক মানচিত্রের এই গভীর ফাটল এখন আরও দৃশ্যমান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কট্টরপন্থী মুসল্লিদের চলচ্চিত্র প্রদর্শনে বাধা দেওয়ার ঘটনা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই মুন্সীগঞ্জে ফকির লালন শাহকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি আশ্রম উচ্ছেদের চেষ্টা করেছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির এক স্থানীয় নেতা। জেলার সিরাজদিখান উপজেলার দোসরপাড়া গ্রামের ‘পদ্মহেম ধাম’ নামের ওই আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ও দৈনিক প্রথম আলোর ফিচার বিভাগের প্রধান ফটোসাংবাদিক কবির হোসেনকে মঙ্গলবার (২ জুন) কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ আক্রান্তের পরিবারের।
একই দিন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননা ও দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করার অভিযোগ তুলেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইসলামি নেতারা। চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পক্ষে সোচ্চার হওয়ায় নির্দলীয় এই সংসদ সদস্য ক্ষমা না চাইলে তার ‘দুই গালে জুতা মারা’, ‘পিঠের চামড়া তুলে নেওয়া’, ‘এলাকা ছাড়া করা’, এমনকি তাকে প্রতিহত করতে ‘জিহাদের (ধর্মযুদ্ধের) ডাক’ দেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন স্থানীয় কওমি আলেমরা। চলতি সপ্তাহে নেত্রকোণায় বাউলের আসর পণ্ড ও নরসিংদীতে এক সাধকের আখড়া উচ্ছেদেরও খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নেত্রকোণার ঘটনায় স্থানীয় সরকার দলীয় এমপি ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নির্দেশে গানের আয়োজন বন্ধ করা হয়েছে।
তার আগে ঢাকার মিরপুরে ঐতিহ্যবাহী শাহ আলী বোগদাদীর (রহ.) মাজারের বার্ষিক ওরশের মাত্র পাঁচ দিন আগে (১৪ই মে) গভীর রাতে ‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দিয়ে ভক্ত-আশেকানদের উপরে হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং জামায়াত-শিবির এই ঘটনাকে মাজারের ‘অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদকের’ বিরুদ্ধে একটি ‘পুলিশি অভিযান বা সামাজিক প্রতিরোধ’ হিসেবে চিত্রিত করতে চাইলেও, পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং একে একটি পরিকল্পিত হামলা হিসেবে গণ্য করছে।
গেল ১২ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সুফি সাধক আবদুর রহমান ওরফে শামীম রেজা (কালান্দার বাবা)-কে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি বর্তমান সরকারের আমলের ‘মব ভায়োলেন্সের’ চরম বহিঃপ্রকাশ। নিহতের মুখমণ্ডলে ১৫ থেকে ১৮টি কোপের দাগ প্রমাণ করে এই আক্রমণ কতটা ঘৃণা-প্রসূত ছিল।
কেবল হত্যা নয়, বরং মৃতদেহ নিজ আশ্রমে দাফন করতে না দেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা সুফি ধারার শারীরিক ও আধ্যাত্মিক উপস্থিতি—উভয়কেই মাটি থেকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা। বর্তমান সরকার ক্ষমতাগ্রহণের পর গত মার্চে বরিশালের হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিব শাহ ও কুষ্টিয়ার শামীম শাহের ক্ষেত্রে যা দেখা গেছে।
এপ্রিলের শুরুতে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা চাঁদপুরের শতবর্ষী লোকজ আয়োজন সোলেমান ল্যাংটার ওরশ এবং মেলাও বন্ধ করে দিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন। সবমিলিয়ে এটা এখন প্রকাশ্য যে শেখ হাসিনা পতন-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা উগ্রবাদী ইসলামি গোষ্ঠীগুলো বর্তমান সরকারের আমলেও অনমনীয়।
মাটির চিরায়ত টান বা লোকজ সংস্কৃতি এবং শাস্ত্রীয় কঠোরতা বা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের এই আদর্শিক সংঘাতে প্রগতিশীলরা মনে করেন, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি ও ধর্ম সমান্তরালভাবে চলে এসেছে।
অন্যদিকে, রক্ষণশীল গোষ্ঠী এই সাংস্কৃতিক সংশ্লেষকে ধর্মের জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য করছে। তাদের মতে, সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ‘মব কালচার’ বা দঙ্গলবাজির মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জীবনদর্শন ছাড়া বাকি সবাইকে সমাজ থেকে মুছে ফেলার যে কৌশলগত প্রয়াস চলমান, তা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন বিশৃঙ্খলা নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক শুদ্ধি অভিযানে রূপ নিয়েছে।
লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক মহাথেরো মুহাম্মদের মতে, এই আক্রমণগুলো ওহাবি ভাবধারা বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
রাষ্ট্রের তোষণ নীতি এবং মব-ভায়োলেন্সের সামনে প্রশাসনের বারবার নতি স্বীকারের মতো ঘটনায় জাতীয় নিরাপত্তার হুমকিও দিন দিন বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই মব ভায়োলেন্স দমনে প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে ২০২৫ সালের ৩১এ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশে মোট ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে উল্লেখ করে সুফি-সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’ জানিয়েছে, এর বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র ১১টি।
তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী গত বছরের নভেম্বরে বাউল আবুল সরকারের গ্রেপ্তার এবং মাজার ভাঙচুর নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করে বলেছিলেন, “পুরা পরিস্থিতি একটি সংকটের দিকে যাচ্ছে।”
সাংস্কৃতিক এই আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় মানবিক শিকার বাউল নেতা আবুল সরকার। তার ‘অপরাধ’ ছিল একটি পালাগানে 'জীব ও পরম' তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্রষ্টার অসীমতা বোঝাতে কিছু রূপক ব্যবহার করা। আধ্যাত্মিক দর্শনের এই সূক্ষ্ম পাঠকে 'ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত' হিসেবে আইনি ছাঁচে ফেলে তাকে আটক করা হয়েছিল। তখন তার স্ত্রী বাউল আলেয়া বেগম বলেছিলেন, তাদের আয়ের উৎস গান আজ বন্ধ, উগ্রপন্থীদের হুমকিতে আয়োজকরা তাকে বায়না করতে ভয় পাচ্ছেন।
মানিকগঞ্জ জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট নূরতাজ আলম বাহার স্বীকার করেছিলেন যে, মামলাটি 'টেকনিক্যালি' জামিনযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কেবল 'স্থানীয় উত্তেজনা' বা 'মব'-এর ভয়ে বিচারক জামিন দেননি। এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিচারব্যবস্থাকে উগ্রবাদী জনতার কাছে লিজ দেওয়ার এক প্রকট উদাহরণ। তখন আদালত চত্বরে আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে আসা ভক্তদের ওপরও হামলা চালানো হয়েছিল। অবশেষে বিএনপি ক্ষমতায় আসার দুই মাস পর তিনি কারামুক্ত হন।
নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত, কিংবা পরবর্তীতে ওরশে শিরনির জন্য তার গরু দেওয়ার ঘটনাও তরিকাপন্থীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। শাহ আলী বোগদাদীর (রহ.) ওরশের সমাপনীক্ষণে (২২এ মে) মাজারের আদি খাদেম পরিবারের উত্তরসূরি আকবর হোসেন বলছিলেন, “বিগত সরকারের আমলে মাজারে অবস্থানকারী পাগল-ফকিরদের অবস্থা ভালো ছিল না। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর, তারেক রহমানের দেশের নেতৃত্ব পাওয়ার পর দেশের আনাচে-কানাচে সব মাজার শরীফে ওরশ উদযাপিত হচ্ছে। এবং আমরা আশা করব, বর্তমান সরকার এই পাগল-মাস্তানদের মাজার শরীফকে প্রশাসনিক সহায়তা করবে, যেটা তারা শুরু করেছে। আমরা বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানাই, যে তারা পাগল-ফকিরদের সহানুভূতি দেখাচ্ছে।”
“এবার দেখলাম খাজা শরফুদ্দিন চিশতির দরবারে ওরশ করতে দেওয়া হয়নি, সুলেমান ল্যাংটার মাজারে ওরশ করতে দেওয়া হয়নি। তারই ধারাবাহিকতায় মিরপুরের মাজার শরীফে জামায়াত-শিবির অতর্কিতভাবে হামলা করেছিল। কিন্তু তাদের হামলা সত্ত্বেও বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে থেকে আসা লক্ষ ভক্তবৃন্দ এই ওরশ শরীফে অংশগ্রহণ করেছে। লক্ষ লক্ষ আশেক শাহ আলী বাবার দরগাতে উপস্থিত হয়েছেন,” যোগ করেন তিনি।
অর্থাৎ নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলের ট্রমা কাটিয়ে মাজার ভক্তরা চিরায়ত ধারায় ফিরতে চাইছেন, ঠিক তখনই একের পর এক নতুন ঘটনা সামনে আসতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন যখন উগ্রপন্থীদের দাবির মুখে নতি স্বীকার করে বাউল গান বন্ধ করে দেয় বা মাজার ভাঙার সময় নীরব থাকে, তখন তা আর ‘নিরাপত্তা প্রদান’ থাকে না, বরং আইন ভঙ্গকারীদের প্রতি এক ধরনের রাষ্ট্রীয় সমর্থন হয়ে দাঁড়ায়।
রাষ্ট্রের এই অবস্থান কার্যত উগ্রপন্থীদের দাবিকে আইনি বৈধতা প্রদান করছে এবং সংবিধানে বর্ণিত সাংস্কৃতিক অধিকারকে এক প্রকার অলিখিত নীতির মাধ্যমে খর্ব করছে। এটি কেবল আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বয়ান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিক পরিসর দখলের প্রচেষ্টা।
কদরুদ্দীন শিশির, মুনওয়ার আলম নির্ঝরসহ অনেক গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো হামলার শিকার ব্যক্তিদের নামের আগে ‘কথিত পীর’ বা ‘ভণ্ড’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে এক ধরনের ‘নেগেটিভ ফ্রেমিং’ তৈরি করে। এটি কার্যত ওই ব্যক্তিকে তার আইনি ও মানবিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করে এবং তার ওপর হওয়া সহিংসতাকে পাঠকের কাছে বৈধ করে তোলে। এটি সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালার চরম লঙ্ঘন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যা চলছে
সাম্প্রতিক সময়ে এই আদর্শিক লড়াইয়ের একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামের একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে সেখানে শুরু হয়েছে নতুন সংঘাত। একপক্ষ জেলা শহরকে ‘সংস্কৃতির রাজধানী’ হিসেবে রক্ষা করতে চান, অন্যপক্ষ একে ‘ওলামায়ে কেরামের শহর’ ও ‘শহীদের শহর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখতে বদ্ধপরিকর। অর্থাৎ চলচ্চিত্রটির একটি অবাণিজ্যিক প্রদর্শনী বন্ধ হওয়াকে কেন্দ্র করে পুরো পরিস্থিতি এক জটিল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মেরুকরণের দিকে মোড় নিয়েছে। সুস্থ ধারার শিল্পকর্মও কীভাবে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভাজনের প্রতীকে পরিণত হতে পারে, শাহবাজপুরের মানববন্ধন থেকে রুমিন ফারহানার বক্তব্য এবং তার বিপরীতে ওলামা সমাজের তীব্র প্রতিক্রিয়া তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
গেল সোমবার (১লা জুন) বিকেলের মানববন্ধনে রুমিন ফারহানার দেওয়া বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে রাতেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার দফতরে জরুরি সভা করে কওমি ঐক্য পরিষদের নেতারা। একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, কওমি ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা ও জেলা হেফাজতে ইসলামের সেক্রেটারি মাওলানা আলী আযম কাসেমীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভাতেই নেতৃবৃন্দ দাবি করেন, সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাহবাজপুরে আয়োজিত এক মানববন্ধনে রুমিন ফারহানা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে কোরআন তেলাওয়াত ও আজানের মতো ইসলামের পবিত্র বিষয়গুলোকে হারমোনিয়াম, বাদ্যযন্ত্র ও বাউল গানের সঙ্গে একই প্রসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রসঙ্গত, মাওলানা কাসেমী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন প্রভাবশালী আলেম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার সঙ্গে যুক্ত থেকে কওমি ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জাতীয় রাজনীতিতেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা। অর্থাৎ কাসেমী একদিকে কওমি আলেমদের ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতিনিধি, অন্যদিকে জাতীয় ইসলামি রাজনীতির সঙ্গে সংযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় নেতা।
তার নেতৃত্বে হওয়া উল্লেখিত সভায় বক্তারা আরও বলেন, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও আজান মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এসব বিষয়কে অন্য কোনো সাংস্কৃতিক বা সংগীত উপাদানের সঙ্গে তুলনা বা একই প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে। ওই সভাতেই পরদিন মানববন্ধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিক্ষোভের ঘোষণা দেয় কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ।
তবে পরদিন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, সরাইল শাখার উদ্যোগে এক প্রতিবাদী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ক্ষমতাসীন জোটের এই দলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি মাওলানা জুনাইদ আল হাবিবকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হারিয়েই সংসদ সদস্য হয়েছেন রুমিন ফারহানা। তাদের কর্মসূচির ভিডিওতে দেখা গেছে, এক বক্তা রুমিনের নেতৃত্ব ও ব্যক্তিসত্তাকে আক্রমণ করে তাকে ‘দাইয়ুস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ইসলামিক পরিভাষায় দাইয়ুস হলো সেই আত্মমর্যাদাহীন পুরুষ, যে তার পরিবারের (স্ত্রী, বোন, মেয়ে) নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা বা ব্যভিচার জেনেও উদাসীন থাকে এবং তা প্রতিরোধে কোনো পদক্ষেপ নেয় না। ওই বক্তা দাবি করেন, রুমিন ফারহানা ‘পুরুষের হুকুমে’ (পুরুষালি আচরণে) এই ধরনের দৃষ্টান্ত দেখাচ্ছেন এবং ‘তার মতো নারীর’ সরাইল-আশুগঞ্জের মাটিতে থাকার ‘কোনো অধিকার নেই’। ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিউজ টিভি ২৪’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে এই বক্তাকে জমিয়তের নেতা মাওলানা জাহিদুল ইসলাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই মানববন্ধনে আরেক বক্তাকে বলতে দেখা গেছে, “এই শহরে কাবাঘর নিয়া ব্যঙ্গ, ওলামায়ে কেরাম নিয়া ব্যঙ্গ, আর আজান নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে পিঠের চামড়া থাকবে না। আমরা বিভিন্ন দল করতে পারি, কিন্তু ইসলামের ওপর আঘাত আসলে আমরা সবাই একদল।” বক্তারা অভিযোগ করেছেন যে, রুমিন ফারহানা ইসলামি পরিভাষা নিয়ে ব্যঙ্গ ও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তাদের দাবি, এই ধরনের বক্তব্য মুসলমানদের ‘হৃদয়ে রক্তক্ষরণ’ ঘটিয়েছে এবং কোনো সচেতন মুসলমান এটি সহ্য করতে পারে না।
সেদিনই ‘সচেতন ইসলাম প্রিয় জনতা’ নামক একটি মোর্চার ব্যানারে অনুষ্ঠিত আরেক মানববন্ধনে মুফতী এরশাদুল্লাহ বিন ইকবাল কাসেমী নামের এক বক্তা বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আমরা ইসলামি সংস্কৃতি তথা বাঙালি ইসলামি সংস্কৃতির পক্ষে। কিন্তু এই শহরের মানুষ সিনেমা দেখে না বলেই সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। এখন যদি কেউ এসে কোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সিনেমায় রূপান্তর করতে চায়, তা হবে না।”
এই কর্মসূচি থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, রুমিন সরাইল-আশুগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ‘শাহবাগী’ এবং ‘রাম-বামদের’ মতাদর্শের জনপদে পরিণত করতে চান। তিনি সেখানকার সমাজকে ‘সুশীল সমাজে’ রূপান্তর করার চেষ্টা করছেন বলেও বক্তারা দাবি করেন।রুমিন ফারহানাকে ‘সাবধান’ করে মুফতী এরশাদুল্লাহ বলেন, “আগামীতে যদি আপনি কোনো কথা বলেন, তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুসলমানরা যে ইসলাম লালন করে, সেটা লালন করার কথা বলবেন। আপনি যে সমস্ত বক্তব্য দিচ্ছেন, তাতে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে যে আপনি তৃতীয় কোনো পক্ষের এজেন্ডা হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছেন।”
বক্তাদের দাবি, অতীতে শেখ হাসিনার মতো বড় শক্তিও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাদ্রাসার ছাত্রদের সামনে টিকতে পারেনি। আর সেখানকার ‘প্রতিটি ইঞ্চি মাটিতে’ ওলামায়ে কেরামের ‘রক্ত ও ঘাম’ মিশে আছে। এই অঞ্চলের ছাত্র-জনতা যেকোনো অপসংস্কৃতি ও বিজাতীয় আদর্শ রুখে দিতে প্রস্তুত। বক্তারা বলেন যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ‘শহীদের শহর’ এবং ইতিপূর্বে মোদিবিরোধী আন্দোলনেও এই অঞ্চলের ছাত্ররা ‘রক্ত দিয়েছে’। ফলে ইসলামের ওপর কোনো আঘাত এলে তারা রাজপথে কঠোর আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আগের দিনের সমাবেশে রুমিন অভিযোগ করেন যে, যারা বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে চায়, তারাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই প্রদর্শনীর পথ রুদ্ধ করেছে।
এই সরকারের আমলকে ইঙ্গিত করে রুমিন বলেন, "আমরা গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি—একটার পর একটা মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে তুলে নিয়ে লাশ পোড়ানো হয়েছে। আমরা দেখেছি দক্ষিণপন্থা বা ডানপন্থা উগ্রবাদের উত্থান। কিন্তু আমার দেশের মাটি তো এমন ছিল না। এই দেশের মাটিতে আজানের ধ্বনি যেমন সুমধুর ধ্বনি আমরা শুনেছি, আমরা বাউল গানও শুনেছি। এই দেশের মাটিতে সকালবেলা যেমন কোরআন তেলাওয়াত শুনেছি, আবার বিকেলবেলা হারমোনিয়াম নিয়ে ছোট ছোট বাচ্চারা গান প্র্যাকটিস করেছে, সেটাও আমরা দেখেছি।
“তাহলে এই বাংলাদেশকে কারা কারা মৌলবাদের ভূমি বানাতে চায়? এই প্রশ্ন আজকে আপনাদের মাধ্যমে আমি রেখে যাচ্ছি। এবং এই রাষ্ট্রের কাছে আমার দাবি থাকবে—যেই রাষ্ট্র কোনো অপরাধ বন্ধ করতে পারে নাই, যেই রাষ্ট্র ছোট ছোট শিশুদের বলাৎকার আর ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচাতে পারে নাই, সেই রাষ্ট্র আজকে কী করে বাংলাদেশে—যেখানে সব রকম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ধর্মের পাশাপাশি চলেছে—সেটাকে বন্ধ করে বাংলাদেশকে পরের প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়ার মদদ দিচ্ছে?”
ক্ষমতাসীন বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আমি বলে রাখি—তোমাকে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে। যাদেরকে আপনারা আজকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন, আপনাদের মদদে যারা আজকে গান-বাজনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সবকিছুর ওপরে শক্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস পাচ্ছে, একদিন তাদের হাতেই কিন্তু আপনারা পরাজিত হবেন। আমি আশা রাখব শুভ বুদ্ধির উদয় হবে; সামনের প্রজন্মকে আমরা যেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে না রাখি।
“ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা সিনেমা হল নাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছে না। এই কালো নকশা কারা করছে? যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, যারা বাংলাদেশকে অন্ধকারে নিয়ে যেতে চায়, যারা বাংলাদেশকে একটা মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে চায়; তারাই বাংলাদেশের এই সংস্কৃতির রাজধানী ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে একটা সিনেমা—যেটা একেবারেই পরিবারের সকলকে নিয়ে দেখবার মতন একটি সিনেমা, 'বনলতা এক্সপ্রেস'—তার প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে,” যোগ করেন সংসদ সদস্য রুমিন।
এসব কথা বলার জন্য যখন স্বাধীনতা পুরস্কার বিজয়ী ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অলি আহাদের এই কন্যাকে যেদিন শুনতে হচ্ছে ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত তাকে সরাইল-আশুগঞ্জ এলাকায় পা রাখতে দেওয়া হবে না এবং ওলামা ও কওমি ছাত্র সমাজ জেগে উঠলে তিনি পালাবার জায়গা পাবেন না, ঠিক সেই দিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখতে পেরেছিলেন, “জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অনেক অনেক অভিনন্দন।” তিনি আরও লিখেছেন, এই অর্জন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবদান এবং নির্ভরযোগ্যতার প্রতিফলন।
মুন্সীগঞ্জে যা হয়েছে
একই দিনে ফেসবুকে সাংবাদিক কবির হোসেনের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলার পর তাকে একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সিরাজদিখান উপজেলার লতব্দি ইউনিয়নের দোসরপাড়া এলাকায় মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর মাদবরের নেতৃত্বে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর ইতোমধ্যে জাহাঙ্গীরকে পুলিশ আটকও করেছে।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানিয়েছে, দোসরপাড়া এলাকায় কবির হোসেনের পরিচালিত একটি লালন চর্চাকেন্দ্র আছে। স্থানীয়ভাবে ‘বাউল বাড়ি’ নামে পরিচিত এই আশ্রমে দুই দশক ধরে শীতের সময় দুই পূর্ণিমা তিথিতে লালন ফকিরের উৎসব, মেলা ও সাধুসঙ্গের আয়োজন করা হয়ে থাকে। সে সময় জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সাধুগুরুসহ অনেক বাউল শিল্পী, গণ্যমান্য ব্যক্তি, দর্শনার্থী ও লালনভক্তদের আগমন ঘটে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর মাদবর ও ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আলাউদ্দিন মাদবর ওই চর্চাকেন্দ্র ও এর জমি দখল করে ইটভাটা নির্মাণের চেষ্টা করে আসছিলেন। এ নিয়ে কবির হোসেনকে প্রায়ই হুমকি দিয়ে আসছিলেন তারা। হাসপাতালের শয্যায় আহত কবির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, “আখড়া বাঁচাতে হলে তারা আমার কাছে টাকা চেয়েছিল। আমি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম। এ কারণে কিছুদিন পরপর এখানকার মানুষদের চড়-থাপ্পড় দিত। চর্চাকেন্দ্রে এসে মাদক সেবন ও মাদকের ব্যবসা করত। দর্শনার্থীরা এলে জাহাঙ্গীর ও তাদের লোকজন বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করত।”
বাংলা ট্রিবিউনকে কবির বলেছেন, “আমি মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের এমপি শেখ মো. আব্দুল্লাহকেও অনুরোধ করেছিলাম যে, এই লালনের আখড়া গত ২১ বছর আগে বিএনপির আমলেই স্থাপিত হয়েছিল। এখন কিছু লোক ঝামেলা করছে। তাই আপনি এটির বিহিত করে দিন। এরই মধ্যে আশ্রমে এসে হামলা করেছে তারা।” তার ভাষ্য, “আমাকে মেরে ফেলার জন্য দলবল নিয়ে হামলা করেছে।” কবির হোসেনের ছোট ভাই বাউলশিল্পী তকবির হোসেনও বলেন, “সময়মতো না গেলে ওরা কবিরকে মেরে ফেলত। আমি নিজেও আহত হয়েছি।”
সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম হায়দার আলী প্রথম আলোকে বলেন, “অপরাধী কেউ আমাদের দলের নাম ভাঙিয়ে রক্ষা পাবে না। অপরাধীকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।”
তবে জাহাঙ্গীর মাদবরের ভাই মোহসিন মাদবর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “কবির হোসেন আমাদের আত্মীয়। কিন্তু তারপরও তিনি লালন আখড়া স্থাপনের নামে আমাদেরসহ আশপাশের অনেকের জমি দখল করেছেন। লালনের আখড়ায় গেট লাগিয়ে গ্রামের রাস্তায় বাধা দিয়ে রেখেছেন। এসব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল।”
বিষয়টি নিশ্চিত করে সিরাজদিখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হান্নানও বলেছেন, “লালনের ওই আখড়ার একখণ্ড জমি নিয়ে কবির হোসেনের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের বিরোধ চলছিল। সেটি নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে আজ কবির হোসেনের ওপর হামলা চালানো হয়। খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরকে আটক করেছে পুলিশ। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও আটকের চেষ্টা চলছে।”
নেত্রকোণায় কী ঘটেছে
নেত্রকোণার মদনে ইমাম ও ওলামাদের দাবির প্রেক্ষিতে একটি বাউল গানের আয়োজন পণ্ড করে দিয়েছে উপজেলা পুলিশ প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দের যৌথ উদ্যোগ। স্থানীয় এমপির নেতৃত্বে এমনটা করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান। দিগন্ত বাংলা নামের একটি স্থানীয় অনলাইনে প্রচারিত খবরে জানানো হয়েছে, ২১এ মে ইমাম ও ওলামা পরিষদের পক্ষ থেকে গান বন্ধের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দায়ের করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তার আগে বিষয়টি নিয়ে ইমাম ওলামা পরিষদ ও আয়োজক কমিটির সাথে দফায় দফায় বৈঠক বসে। বেশ কয়েক দিন এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করে। পরবর্তীতে শুক্রবার (২৯এ মে) জুমার নামাজের পর বিষয়টি নিয়ে হাসনপুর জামে মসজিদে ইমাম, ওলামা পরিষদ ও ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, সদস্যবৃন্দ ও এলাকাবাসীর বৈঠক বসে। বৈঠকে ইউপি চেয়ারম্যান সামিউল হায়দার শফি তাদের দাবির কথা শোনেন। পরবর্তীতে সকলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাউল গানের আসর বন্ধ করে দেন।
‘দৈনিক ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে শনিবার (৩০এ মে) প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন বলছেন, “আমাদের হাসনপুর গ্রামে ঈদের পরের দিন একটি গান করার উদ্যোগ নিয়েছিল। আমরা হাসনপুরের ওলামায়ে কেরামসহ ফতেপুর ইউনিয়নের ওলামা পরিষদের উদ্যোগে এই গানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি, প্রতিবাদ জানিয়েছি।
জেলা প্রশাসক, স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ দায়েরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন যে এখানে আর গান হবে না।” প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের অসামাজিক কোনো কার্যকলাপ না হয়।”
এই ধরনের আয়োজনকে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ, মাদক এবং জুয়ার প্রসারের উৎস’ হিসেবে চিহ্নিত করে ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সামিউল হায়দার শফিকে বলতে দেখা যায়, “আমরা এই অঙ্গীকার করতে পারি যে আমরা আজ গান থেকে সরে আসছি। আমাদের প্রশাসনের এবং আমাদের সাবেক সফল স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ভাইয়ের আদেশে, আমাদের মদন উপজেলা বিএনপির আদেশে, আমাদের প্রশাসনের আদেশে।” একই ভিডিওতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলতে দেখা গেছে, এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা পুলিশের নৈতিক দায়িত্ব। তারা স্থানীয় মুরুব্বি, জনপ্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের সাথে “কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে” কাজ করছে।
প্রশাসনের এই আপসকামী ভূমিকা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এখন সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার চেয়ে কট্টরপন্থীদের তোষণেই বেশি আগ্রহী। প্রশাসনের জন্য এটা ‘শান্তি রক্ষার’ উপায় হলেও মূলত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চাপের মুখে বাউলদের সুর সেদিন পরাজিত হয়েছিল। হাসনপুরের এই নিস্তব্ধতা কেবল একটি গ্রামের ঘটনা ছিল না, এটি ছিল পরবর্তী ঝড়ের পূর্বাভাস যা নরসিংদীর দিকে ধাবিত হচ্ছিল।
নরসিংদীতে কী হয়েছে?
‘দৈনিক জীবন যাত্রা’, ‘রায়পুরা কণ্ঠ’, ‘নরসিংদী জেলা সাংবাদিক ফোরাম’, ‘নরসিংদী টুডে’সহ আরও একাধিক ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, ৩১এ মে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চরাঞ্চলখ্যাত শ্রীনগর ইউনিয়নের ফকিরের চর এলাকায় তৈরি করা একটি আস্তানা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে স্থানীয়রা।
ভিডিওর কথোপকথন থেকে বোঝা যায় যে, ওই স্থানে রাতে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং মাদক কেনাবেচার মতো অসামাজিক কাজ চলায় গ্রামবাসী ও মাদ্রাসার ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। সেখানে গভীর রাত অবধি নেশাসামগ্রী বিক্রি চলে এবং নারী-পুরুষ একসাথে আড্ডা মারে বলে অভিযোগ করা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আগত মাদকসেবী কথিত ভণ্ড পীর শামসুল হক নামে এক ব্যক্তির ফকিরের চর গ্রামের পশ্চিমের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন বর্ণনা দিয়েই ভিডিওগুলো প্রকাশ করেছে নরসিংদীর স্থানীয় একাধিক গণমাধ্যম। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ভাঙচুর করতে করতে শামসুল হককে তার আধ্যাত্মিক শক্তি প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে। আবার আরেকজনকে বলতে শোনা যায়, “আমরা এই পাগলারে বাবার সমান শ্রদ্ধা কইরা এখান থেকে উচ্ছেদ করছি। দয়া করে আপনি এলাকা থেইকা চলে যান।”
“আগে মাজারটা উঠাইয়া তারপরে মাদক (নির্মূল), ইনশাল্লাহ!”—এমন আরও অনেক বাক্য শোনা যায়। আধ্যাত্মিক চর্চাকে 'ভণ্ডামি' হিসেবে চিহ্নিত করার এই হিংস্র প্রক্রিয়াটি মূলত একটি সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাতের নামান্তর।
ধূমপানেরও অভ্যাস নেই জানিয়ে আক্রান্ত শামসুলকে বলতে শোনা যায়, “আমি কি কোনো অশান্তির লাগি আইছি? আমি কোনো ঝামেলা সৃষ্টি করতেছি না।” একটি ভিডিওতে তাকে জোর করে নৌকায় তুলে দিতে দেখা যায়। ‘রায়পুরা কণ্ঠ’ প্রকাশিত একটি ফটোকার্ডে আল-আমিন খোন্দকার নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারীও লিখেছেন, “একজনের সম্বন্ধে না জেনে মন্তব্য করা ঠিক না। উনার বাড়ি শাহপুর গ্রাম। উনি মাহমুদ শাহ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সুফি সাধক হযরত কাজী মাহমুদ শাহ (রহ.) মাজারের খাদেম। একজন ভালো লোককে খারাপ কথা বলা ঠিক না। উনি কোনোদিন বিড়ি-সিগারেট খান না। তাই অযথা মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন না, যাচাই করে তারপর কথা বলা উচিত।”
ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ
এসব কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব পরিচয় সন্ধানের চরম কৌশলগত লড়াই। একদিকে একাত্তরের চেতনার রেশ ধরে রাখা সাংস্কৃতিক উদারবাদ, অন্যদিকে ইসলামের পবিত্রতা রক্ষার নামে 'অপসংস্কৃতি' প্রতিরোধের এক অনড় অবস্থান। এই স্নায়ুযুদ্ধ আজ কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এটি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।
যখন একটি জনপদের হাজার বছরের লোকজ আধ্যাত্মিকতাকে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ আখ্যা দেওয়া হয়, তখন তা কেবল একটি আসর বা আস্তানা বন্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন আসে, এই সংঘাত কি কেবল একটি আদর্শিক লড়াই, নাকি একটি জাতির স্বকীয়তা মুছে দেওয়ার বৃহত্তর কোনো পরিবর্তনের পূর্বাভাস? অর্থাৎ এই চলমান সংকট কেবল স্থানীয় বা ধর্মীয় কোনো বিরোধ নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের সাথে জড়িত।
যদি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক সাংস্কৃতিক চর্চা ও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সেই অভ্যন্তরীণ ফাটল দিয়ে বিদেশি আধিপত্যবাদ প্রবেশের পথ প্রশস্ত হয়। আজ মাজার ভাঙা বা গান বন্ধ করাকে যারা ধর্মীয় বিজয় হিসেবে দেখছেন, হয়তো বুঝতেও পারছেন না যে তারা আসলে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক নীল নকশার অংশ হচ্ছেন; যা বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ ও অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।
সাম্প্রতিক একাধিক বক্তব্যে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার দাবি করেছেন, মাজার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে একটি ‘টেররিস্ট স্টেট’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার সুযোগ করে দিচ্ছে। তার ভাষ্য, যদি রাষ্ট্র তার আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলো রক্ষা করতে না পারে, তবে এটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করার এক নৈতিক অজুহাত তুলে দেবে।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাজার ভাঙার ঘটনাগুলো ভারতের ‘হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা’ বা ‘ইসলাম নির্মূল নীতি’র সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে। সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘অনুধাবনের সক্ষমতা’ নিয়েও প্রশ্ন তুলে, তিনি সতর্ক করেছেন যে, এই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার ফলে বাংলাদেশকে কাশ্মীরের চেয়েও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া হতে পারে।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের পরিচালক তানিম নূর বর্তমান পরিস্থিতিকে ঘৃণা চাষবাস করার ফসল হিসেবে বর্ণনা করছিলেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে মানুষ একে অপরকে ভয়াবহভাবে ঘৃণা করে, যা ভারত, বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে প্রকট। আমরা সবাই মানুষ, অথচ মত ভিন্ন হলে আমরা একে অপরকে গালাগালি করি।”
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাবকে পুঁজি করে দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীকে উগ্রপন্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। শিল্প ও সংস্কৃতিই হতে পারে এই ঘৃণা জয়ের একমাত্র পথ, কিন্তু সেই পথকেই আজ রুদ্ধ করা হচ্ছে। “আমাদের দেশ ছোট এবং এখানে অনেক মানুষ, তাই ঐক্যবদ্ধ থাকা ছাড়া উপায় নেই। ধর্ম বা বর্ণের নামে বিবাদ আমাদের কোথাও নিয়ে যাবে না,” বলেন এই নির্মাতা।
দৃশ্যত বাংলাদেশের গ্রামীণ ও মফস্বল জনপদগুলোতে গত কয়েক দশকে এক সুদূরপ্রসারী এবং পদ্ধতিগত সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটছে। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের লোকজ সংস্কৃতির প্রাণশক্তি ছিল বহুত্ববাদ—যেখানে এক উঠানে আজান এবং অন্য উঠানে বাউল গান সহাবস্থান করত। তবে বর্তমান সময়ে এই বহুত্ববাদী কাঠামো ভেঙে একটি ‘এককেন্দ্রিক নৈতিক বলয়’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। এই রূপান্তর কেবল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সংকোচন নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ; যা জাতীয় পরিচয় ও নিরাপত্তার জন্য গভীর সংকট তৈরি করছে।
বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের অন্তত মনে রাখা উচিত, লোকজ সংস্কৃতির ধারকরা আজ রাজনৈতিকভাবে চরম অসুরক্ষিত। আর সমাজকে ‘মনোলিথিক’ বা একমুখী গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে হলে বহুমুখী সংস্কৃতির চর্চা অপরিহার্য। তাছাড়া এটা ইতিহাস স্বীকৃত, যখন ‘আধ্যাত্মিক আলাপ’ বা লোকজ আধ্যাত্মিকতা চর্চাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, তখন তা সমাজকে একটি বৌদ্ধিক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়, যা চরমপন্থার উর্বর চারণভূমি হিসেবে কাজ করে।