কথা চলুক

বাংলাদেশ এখন একটা নতুন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী: ফরহাদ মজহার

আলাপের সাথে বিশিষ্ট চিন্তক ফরহাদ মজহারের একান্ত সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি নাহিদ হোসেন

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম

গণঅভ্যুত্থানের পর প্রায় ১৭ মাস পেরিয়েছে। এই দেড় বছর সময়ে বাংলাদেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো? সামনের বাংলাদেশ কোন দিকে যাবে? এসব নিয়েই চিন্তক ও দার্শনিক ফরহাদ মজহারের সাথে কথোপকথন। 

আলাপ: ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে একটা বড় গণঅভ্যুত্থান আমরা দেখলাম। এক ধরনের বাংলাদেশের প্রত্যাশা নিয়ে। এই ১৬-১৭ মাস পর বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

ফরহাদ মজহার: আমি বলছি, বাংলাদেশেরতো এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জন আছে কোনও সন্দেহ নাই। যেমন আপনার সাথে আমি কথা বলতে পারছি। ২০ বছরতো আমরা এভাবে কথা বলতে পারি নাই। দুই নাম্বার হল গণঅভ্যুত্থানে যেকোনও রাজনৈতিক আন্দোলনে জনগণের চেতনায় একটা রূপান্তর ঘটে। এবং এই রূপান্তরটা অধিকাংশ সময়ে ইতিবাচক।

যেমন ধরেন যদি আমরা এখন বলি একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন করে আমরা ভুল করেছি, এটা কিন্তু ঠিক নয়। আমরা ঠিকই করেছি। কারণ একটা নতুন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর আবির্ভাবটা ঘটেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অবদানটা হচ্ছে এই প্রথম ‘জনগণ’ কথাটা আলাদা রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়েছে। এবং এই যে জনগণের অভিপ্রায় কথাটা আমরা বইতে পড়তাম, এই প্রথম জনগণের অভিপ্রায় কথাটা একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বর্গ হিসেবে হাজির হয়েছে। ফলে অর্জন কিন্তু প্রচুর।

এখন কথা হচ্ছে এই অর্জনটুকু কি আমাদের যে প্রত্যাশা তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা? উত্তর হচ্ছে, না। দুই নাম্বার হচ্ছে যে এখনকার যে পরিস্থিতি এটা কি আমাদের যে কাঠামোগত সংকট বা বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন করার যে ভিত্তিগত দিক এটা আমরা মজবুত করে বসাতে পেরেছি কি না? উত্তর হচ্ছে, না।

কিন্তু এটা যে করা দরকার, এই প্রসঙ্গ এসে গেছে। ফলে আমি এটাকে নেতিবাচক বলতে পারব না। এখন আমাদের কী হয় বলি … আমাদের সমস্যাটা আমরা রাষ্ট্র এবং সরকারের মধ্যে গোলমাল পাকিয়ে ফেলার কারণে সরকারের ব্যর্থতাকে রাষ্ট্র গঠনের ব্যর্থতা মনে করি। আবার যখন আমার রাষ্ট্র গঠনের কর্তব্য সামনে আনতে হবে, তখন আমি সরকারের কাছে দাবি জানানো শুরু করি। সরকারতো চাইলেই পারবে না এটা করতে, কারণ রাষ্ট্র গঠনতো জনগণ করে। রাষ্ট্রতো সরকার বানাইতে পারে না। জনগণই যেটা তৈরি করে সেটাই কিন্তু প্রতিভাত হয় রাজনীতিতে।

যেমন ধরেন, একটা কথা আছে না যেমন প্রজা তেমনি রাজা, ফলে আপনি যে সরকার পেয়েছেন আপনি তেমন প্রজা ছিলেন বলেই এমন সরকার পেয়েছেন। খেয়াল করেন, গণঅভ্যুত্থানের পরে যতটুকু ন্যারেটিভ বাংলাদেশে যারাই লেখালেখি করেছে সবসময় তারা আলোচনা করেছে সরকার নিয়ে। রাষ্ট্র নিয়ে কোন আলোচনা নেই। এটা একটা অদ্ভূত ব্যপার না? তো এই মানদণ্ড দ্বারা তো আপনি বুঝতে পারবেন জনগণের মধ্যে বিশেষত আমাদের বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মধ্যে এবং গণমাধ্যমের কর্মীদের মধ্যে এই ব্যাপারে চেতনার মারাত্মক অভাব রয়েছে।

“সরকারতো চাইলেই পারবে না এটা করতে, কারণ রাষ্ট্র গঠনতো জনগণ করে।”

আপনার সম্পাদিত পত্রিকা 'সাপ্তাহিক চিন্তা'। ২২এ ডিসেম্বরের সংখ্যার মূল স্টোরিটা আমি পড়ছিলাম, আপনি শিরোনাম করেছেন, ‘নির্বাচন গণতন্ত্র ও আততায়ী রাজনীতি’। রাজনীতিকে কেন আততায়ী হতে হলো?

আর্গুমেন্টটা কী করছেন আপনারা? যে নির্বাচন দিলেই স্থিতিশীলতা আসবে। কিন্তু আমরা দেখলাম যেদিন আপনি সিডিউল ঘোষনা করলেন তারপরই কিন্তু হাদিকে গুলিবিদ্ধ করা হল। তার মানে অলরেডি আততায়ী রাজনীতিকে আপনি কিন্তু সামনে নিয়ে আসছেন। মানে রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে আসছেন। এবং একটা জুলাই যোদ্ধাকে হত্যা করা হল। তো আপনি অলরেডি নির্বাচনের নাম করে একটা আততায়ী রাজনীতিকে ফিরিয়ে এনেছেন। এটা ঠেকাবেন কী করে আপনি? কারণ এখনতো এই দুর্বল রাষ্ট্রের সুযোগে তো এরা তো অরগানাইজ করবে।

আপনি নির্বাচন দিয়ে কী করে ঠেকাবেন? আপনি কী করে মোকাবেলা করবেন? আমিতো আমার সেনাবাহিনীর ক্ষমতা সম্পর্কে জানি, তাদের কতটুকু ক্ষমতা আছে। আমাদের এজেন্সিগুলোর ক্ষমতা সম্পর্কে আপনিও যেমন জানেন, আমিও তেমনি জানি। তারা কী করে এটাকে মোকাবেলা করবে? কারণ এই আততায়ী রাজনীতির সঙ্গেতো আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত। এটা করার মতো ক্যাপাসিটিতো এই রাষ্ট্রের নাই।

এটা করার মতো ক্যাপাসিটি তো ডক্টর ইউনুসেরও নাই। কারণ তিনি ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশকে একটা বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। যেখানে উচিত ছিল জনগণের সঙ্গে আগে কথা বলা, জনগণের বক্তব্য শোনা, তিনি শুরু করলেন কী দ্বারা? তিনি লুটেরা মাফিয়া শ্রেণির সাথে বসে কথা শুরু করলেন। লুটেরা মাফিয়া শ্রেণি কারা? তাদের প্রতিনিধি যারা রাজনৈতিক দল। এরা এত বছরতো বাংলাদেশকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে, রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে তাদের কোন অবদান নেই। আছে কি বলুন? বাংলাদেশকে একটা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর অবদানটা কী? জিরো! তো আপনি ওদের সাথে কথা বলে কী করে গণতন্ত্র কায়েম করবেন? 

আপনার উচিত ছিল জনগণের কাছে জিজ্ঞেস করা যে তোমরা গণঅভ্যুত্থান করেছো, তোমরা বুলেট বুকে নিয়েছো, তোমরা পঙ্গু হয়ে আছো। এখন বলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কাছে তুমি কি চাও? এবং ইতোমধ্যে তিনি কিন্তু এতগুলো কমিশন করেছেন। কমিশনের মধ্যে উনি ছয়টা কমিশন দিয়ে একটা জাতীয় ঐক্যমত কমিশন করেছেন।

তো বাকিগুলার কী হবে? আমাদের কি স্বাস্থ্য ইস্যু না? আমাদের অর্থনীতি ইস্যু না? দুর্নীতি আমাদের ইস্যু না? এগুলা তামাশা নাকি? এটাতো সিম্পল। কী করে এই রাষ্ট্র এই সরকার ফাংশন করে? তার মানে তারা কোনক্রমে এই লুটেরা মাফিয়া শ্রেণির সঙ্গে একটা চুক্তি করে পালাতে চায়।

আপনি দুর্বল রাষ্ট্র বলছেন, রাষ্ট্র দুর্বল নাকি সরকারটা দুর্বল? 

না রাষ্ট্র দুর্বল হলেতো সরকার এটা করতে পারে না। আপনিতো সরকারটা গঠন করতে দেন নাই। আপনি ৮ তারিখে (আগস্ট ২০২৪) কী সরকার গঠন করলেন? করলেন একটা প্রতিবিপ্লবী।

মানে আপনি যেটাকে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব বলেন।

আপনি কনস্টিটিউশন ব্যবহার করেছেন জনগণের গণঅভ্যুত্থানকে নস্যাৎ করার জন্য, ভেরি সিম্পল।  গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, আপনি তখন শেখ হাসিনার সংবিধানকে ব্যবহার করলেন গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে।  ফলে আপনি একটা হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থা কায়েম রেখেছেন। তো এটা দুর্বল না?

গণঅভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিল তারাতো জিনিসটা মেনেও নিল তখন।

না মেনে নিয়েছে সেরকমটা বলতে পারব না। শুনুন, ইয়াংরা শেখ হাসিনার মত একটা ফ্যাসিস্ট শক্তিকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে, তার কাছ থেকে আপনি এর বেশি কী আশা করেন? এটা অন্যায় হবে এবং তারা যেটা করতে পেরেছে, সে সময় ঐতিহাসিকভাবে তারা যে অবস্থানে ছিল, তারা একটা কোটা সংস্কার আন্দোলন করছিল। সেখান থেকে তারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনটা করেছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে তারা একটা গণঅভ্যুত্থানের রূপ দিয়েছে। এর চেয়ে বেশি কী চান তরুণদের কাছ থেকে?

আমি মনে করি এই সমালোচনাটা খুব অন্যায় হবে। এখন সমালোচনা হতে পারে আমরা জাতিগতভাবে, এই তরুণদেরকে যারা বিভ্রান্ত করেছে, এদেরকে ধরুন। আপনি সেনাবাহিনীকে ধরছেন না কেন? আপনি আসিফ নজরুলকে ধরছেন না কেন? আপনি অন্যান্য যারা আইনজীবীরা, যারা বলছে এইটাই ঠিক আছে, আমাদের ট্রেন চলে গেছে, এখন আর এখন আর করা যাবে না বাংলাদেশ রাষ্ট্র, এদেরকে ধরছেন না কেন?

তরুণদেরকে কেন দোষ দিচ্ছেন? তরুণরা কী অন্যায় করেছে? তারা তাদের যে দায়িত্ব আছে সেটা করেছে তারা। এখন দুর্নীতি করে ও ২০ কোটি টাকা নিয়েছে ও ১০০ কোটি টাকা নিয়েছে, এসব কাহিনী বলে তো লাভ হচ্ছে না।

একইসঙ্গে আপনি ওই সেই চোর-বাটপার, দুর্নীতিবাজ-লুটেরা এদের পক্ষে আপনি তরুণদের আন্ডারমাইন করছেন। তরুণদের রাজনীতিতে আসাটাতো ইতিবাচক। এই কয়দিন আগেও তারা ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতো আর তারা এখন রাজনীতি, দেশ গঠন নিয়ে ভাবছে। এতো বিরাট ব্যাপার। আপনি কেন তরুণদের বিপক্ষে যাবেন? আমি তরুণদের পক্ষে ১০০ ভাগ আনকন্ডিশনড।

আপনার ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘সংবিধান ও গণতন্ত্র’ বইয়ে, আপনি লিখেছেন নয়টা ধাপের কথা। এই নয়টা ধাপ মোটামুটি পার হতে হবে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করতে হলে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা  নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আমরা কি এই ধাপগুলো পার হতে পারলাম? আপনি সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব যাকে বলছেন সেইখানে গিয়ে আটকে গেল। এই আটকে যাওয়াটা কেন হল? এই ধাপগুলো পার করে আমরা কেন একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দিকে কেন যেতে পারলাম না? 

‘সংবিধান ও গণতন্ত্র’ ছিল মূলত একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যখন উত্থান ঘটে, তার রাজনৈতিক রূপ-চরিত্র সম্পর্কে একটা আলোচনা। সেটা প্র্যাকটিক্যাল ইস্যু আকারে না থাকলেও থিওরিটিক্যালি, লিগ্যালি কী হতে পারে এবং কিভাবে এই তর্কগুলো চলে। এটা এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আমি তখন কথাটা বলেছিলাম। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় একটা গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ত্রিদলীয় জোটের রূপরেখার নামে সেটাকে নস্যাৎ করা হয়েছে। হিস্টোরিকালি আপনি যে খুব বেশি অগ্রসর হতে পারতেন তখন, এটা আমি মনে করি বাস্তব বিষয় ছিল না। এবার কিন্তু বাস্তবটা ছিল। আমি বরং বলব ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’ বইতে যে লিখেছি রাষ্ট্র গঠন কী করে করতে হয়।

যেটা ২০২৩ সালে প্রকাশ হয়েছে?

তেইশে যেটা লেখা। ওখানে পরিষ্কার ধাপে ধাপে এটা ছিল। ছাত্ররা এটাকে বাস্তবায়ন করতে পারে নাই দুটো কারণে। একটা হচ্ছে ছাত্রদের মধ্যে পড়াশোনার অভ্যাস এখনও কম। এবং তারা এখনও তত্ত্বকে মনে করে, তত্ত্বটা রাজনৈতিক চর্চার অন্তর্গত না, তত্ত্বের চর্চাও যে রাজনীতি, এটা তাদের মধ্যে এখনও আসে নাই। আগেতো তাত্ত্বিকভাবে পরিষ্কার থাকতে হবে।

আপনি একটা রাস্তায় যাচ্ছেন, আপনি কোনদিকে যাবেন, আপনি কোন মোড় নেবেন, বাঁয়ে যাবেন না ডানে যাবেন, আপনার আগে থেকেতো ধারণা থাকতে হবে। ফলে এই তাত্ত্বিক ব্যাপারে তরুণদের মধ্যে এই অশিক্ষাটুকু অজ্ঞানতাটুকু কিন্তু আছে। এটা আপনি আজকে যদি বলেন জুলাই অভ্যুত্থানের একটা ব্যর্থতা, তরুণদের ব্যর্থতার এটা একটা বড় কারণ।

আজকে তারা কিন্তু আরও বড় জায়গায় পৌঁছাতে পারত। বড় বড় নেতা এসে যেত। একটা ব্যক্তিত্ব নিয়ে তারা দাঁড়াত। এটা আমি নিশ্চিত ছিলাম। যদি তারা এই তাত্ত্বিক দিকটুকু সম্পর্কে পরিষ্কার থাকত। সেটা হয়নি। সেটা নিয়ে হা-হুতাশ করার কিছু নেই।

কিন্তু বড় কাজ কী হয়েছে? বড় কাজটা হয়েছে যে রাষ্ট্র গঠন করবার প্রশ্নটা, এই যে আপনি আমাকে যে প্রশ্ন করছেন, এটা ইমপসিবল ছিল এই চব্বিশের আগে। আপনি এই প্রশ্ন কখনই করতে পারতেন না। ফলে এই প্রশ্ন আপনি করছেন যেহেতু জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়ে গেছে। যেহেতু জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘটে গেছে। এখন আমরা রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন, সরকার এবং রাষ্ট্রের পার্থক্য, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনকার কী পদক্ষেপগুলো আমাদের নিতে হবে এই প্রত্যেকটা বিষয় এখন কিন্তু আমাদের এই রাজনীতির সামনে এসে গেছে।

রাজনৈতিক দলগুলা যদি মনে করে এগুলোকে অস্বীকার করে শুধু নির্বাচনের কথা বললে তারা পার পেয়ে যাবে, এটা ইমপসিবল। এটা আমি আপনাকে অনরেকর্ড বলছি। যদি এটা বিএনপি করে, বিএনপি ভুল করছে। যদি জামায়াত মনে করে জামায়াত ভুল করছে। আমি বলব সেদিক থেকে কীভাবে তারা আগামী দিন রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করবে এটা এখনও পরিষ্কার না। কিন্তু অ্যাট লিস্ট আমরা জানি যে গণঅভ্যুত্থানের পরে যে চেতনার যে একটা বিস্তৃতি ঘটেছে। একটা নতুন গণচেতনা আমরা দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন সময়ে। এটাকে এড়িয়ে যাওয়া খুব ডিফিকাল্ট।

“আপনি গাড়িই বানালেন না আপনি ঘোড়া নিয়ে লাফালাফি করছেন।”

আপনি বারবারই নির্বাচনটাকে কি এক ধরণের অগুরুত্বপূর্ণ করে দেখছেন?

না, নির্বাচনের সঙ্গে গণতন্ত্রের কোন সম্পর্ক নেই। আপনি কেন নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ বলছেন এটা আমাকে উত্তর দেন। বাকিটা আমি উত্তর দেব। নির্বাচনের সঙ্গে গণতন্ত্রের কোন সম্পর্ক নাই। আপনি গণতন্ত্র চান, না নির্বাচন চান? 

দুইটাইতো চায় মানুষ।

নির্বাচনতো গণতন্ত্র না। নির্বাচন একটা প্রক্রিয়া, একটা পদ্ধতি। গণতন্ত্রের তিনটা মতদার্শিক দিক আছে। একটা হলো ব্যক্তি স্বাধীন; তার ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। সেকেন্ডলি গণতন্ত্র হলো রাষ্ট্রের একটা বিশেষ রূপ। সেপারেশন অফ পাওয়ার থেকে শুরু করে আরও বিভিন্নরকম রাষ্ট্রের যে কাঠামো এটা তার একটা রূপ। তৃতীয় হচ্ছে তার একটা গাঠনিক ভিত্তি গণতন্ত্র। ফলে গণতন্ত্রতো রাষ্ট্রেরই রূপ।

গণতন্ত্রেরতো নির্বাচনের সাথে কোন সম্পর্ক নাই। গণতন্ত্র থাকলেতো নির্বাচনে গণতন্ত্রের চর্চা হয়। আপনি গাড়িই বানালেন না, আপনি ঘোড়া নিয়ে লাফালাফি করছে! এটার কী অর্থ? এটার কোন অর্থ নেইতো। আপনি নির্বাচন যদি বলেনও, পরিষ্কারভাবে বলতে হবে কিসের নির্বাচন চাইছেন আপনি এখন? বলুন আমাকে বলেন, কী নির্বাচন চান?

একটা সরকার গঠনের নির্বাচন।

আমরাতো রাষ্ট্রই গঠন করি নাই, তো সরকার গঠন করবেন কেন? এদেশের সমস্যাটা কোন জায়গায়? একটা নির্বাচনতো লাগবে আমার সরকার গঠন করতে হলে। আমরা যদি গণপরিষদ নির্বাচনও করি তখনওতো আমার নির্বাচন লাগবে। আমি যদি স্থানীয় সরকার করি তাওতো আমার নির্বাচন লাগবে। আমি যদি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন করি তাওতো নির্বাচন লাগবে। ফলে নির্বাচনটা প্রক্রিয়া মাত্র। নির্বাচন সেই প্রক্রিয়ায় জনমত তৈরির, সামষ্টিক অভিপ্রায় তৈরির একটা প্রক্রিয়া মাত্র।

এটাই একটা মাত্র প্রক্রিয়া না। আপনার সাথে আমি কথা বলছি এটা কিন্তু সামষ্টিক অভিপ্রায় তৈরির একটা প্রক্রিয়া। কেন? আপনি আমাকে সুযোগ দিচ্ছেন স্পেস দিচ্ছেন ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে। ফলে আমার পক্ষে-বিপক্ষে লোক হয়তো কথা বলবে। এর মধ্যেই কিন্তু জনগণ একটা মত তৈরি করবে। এটা একটা প্রক্রিয়া।

একটা সমষ্টিগত ধারণা তৈরি করবে?

ডেফিনেটলি। আপনি এখন যেটা করছেন এটাকেইতো বলে গণতন্ত্র।

আপনি গণতন্ত্রের যে রূপটা বললেন, আপনার একটা লেখায় পড়ছিলাম, আপনি বলছেন বাংলাদেশে গণতন্ত্র একটি অপরিচ্ছন্ন শব্দ।

হ্যাঁ, বলেছিতো। এজন্যই, যেহেতু আমরা অস্পষ্ট। এটা বলতে আমরা কী বুঝাই? যেমন আপনি গণতন্ত্র বলতে নির্বাচন বুঝছেন। অস্পষ্ট না? 

আমি গণতন্ত্র মানে নির্বাচন বলিনি।

একটু আগে বললেন। আপনি যখন নির্বাচনের বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন তখন আপনার মনের মধ্যে রয়েছে যে গণতন্ত্র মানে নির্বাচন, নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র, এটা অস্পষ্টতা না? তাহলে আপনি গণতন্ত্র নিয়েই কথা বলতেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, গণঅভ্যুত্থানের পরে কী ধরণের রাষ্ট্র আমরা বানাতে পারতাম, এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করতাম।

আমি সেই প্রশ্নটাই করছিলাম আপনাকে।  আপনি সরকারটাকে তো দুর্বল বলছেন, সরকারের ফাংশনাল ক্যাপাসিটি অনেক কম। এই সরকারের দ্বারা কিংবা এই সরকার যারা পরিচালনা করছে তাদের দ্বারা এই রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢোকা কী সম্ভব এই মুহূর্তে?

রাষ্ট্রতো সরকার গঠন করে না। রাষ্ট্র গঠন করে জনগণ।

রাষ্ট্র গঠন করে জনগণ। সেই জনগণের অবস্থানটা কোথায় এখন, এই রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায়?

খুব ভালো অবস্থানে আছে। নাহলে আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন ভোরবেলায় এতো কষ্ট করে?  খুব সিম্পল ব্যপার। যদি এতোই গৌণ হতো তাহলে আপনি কেন কষ্ট করবেন আমার জন্য? তার মানে আমার এই বক্তব্য শোনার মত জনগণ তৈরি হয়েছে। আজকে থেকে ১৫ বছরে এই কথাগুলো শোনার জন্য জনগণ তৈরি ছিলে না। এটাতো বিরাট গুণগত পরিবর্তন।

তাহলেতো একটা ভালো প্রক্রিয়াগত উন্নয়নের দিকেই বাংলাদেশ এগোচ্ছে।

ডেফিনেটলি। আপনি নেতিবাচক বলছেন, আমি তো একবারও বলছি না।

আমি নেতিবাচক-ইতিবাচক কিছুই বলি নাই। তাহলে কি বাংলাদেশ সঠিক রাস্তায়ই আছে? 

সঠিক-বেঠিক এই তর্কগুলা পলিটিক্সে এভাবে হয় না। এটা হল করার বিষয়।

এটাতো লম্বা সময়ের একটা প্রক্রিয়া।

না, তাও না। করার বিষয়। আপনারও করার বিষয় আমারও করার বিষয়।

চর্চা করার বিষয়?

ডেফিনেটলি। তার মানে গণমাধ্যম কী ভূমিকা রাখবে, আমি বা আমার মতো যে বুদ্ধিজীবীরা আছেন বা যারা রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় তারা কী ভূমিকা পালন করবে, তার উপর ভিত্তি করে বুঝব যে বাংলাদেশ সঠিক পথে যাচ্ছে, কি না যাচ্ছে।

অন্তত সেদিক থেকে বলতে পারি আপনি হাতে একটা পত্রিকা নিয়ে বসে আছেন, আমি একটা সাপ্তাহিক ‘চিন্তা’ বের করছি, ‘চিন্তা’তো আমি বের করতে পারছি। হাসিনা আমলে এটা বের করতে পারতাম না। ফলে এখন এই চিন্তাটা আমাকে বের করে দিতে হবে, আমাকে এডুকেট করতে হবে। আমারতো এখন অভিমান করে লাভ নাই যে, আমি পারলাম না। সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব হয়ে গেছে। আমি এখন ঘরে বসে থাকব। তাতো হচ্ছে না। আপনাকেতো অবশ্যই কাজ করতে হবে। তাহলে গণতন্ত্র যারা চায় তাদেরকে তো কাজ করতেই হবে। সে কাজের মধ্য দিয়েই নতুন রাষ্ট্রটাকে আপনি গঠন করবেন।

সেদিক থেকে যদি বলেন তাহলে নিঃসন্দেহে কাজ করার মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে আছে। তার মধ্যে কি ঝুঁকি নাই? হ্যাঁ, আছে। আমাকে ঢুকতে দিচ্ছে না রাইট উইং। যারা ধর্মবাদী, ধর্মবাদী জাতীয়তাবাদ আমি যেটাকে বলি। এটা এক ধরণের ফ্যাসিজম। বলছে না ফরহাদ মজহারকে কতল করতে হবে? আছেতো এরকম। তাদেরকে ভয় পেয়ে কি আমি ঘরে ঢুকে যাব? তাদেরকে আমি ভয় পেয়ে আজকে যে তারা মাজার ভাঙছে, এটাকে বন্ধ করব না? আমি কি ভয় পেয়ে তাদেরকে মোকাবেলা করব না? তাদের ভয়ে কি আমি ইসলাম পড়ব না? তাদের ভয়ে কি আমি ইসলাম ছেড়ে দেব?

ইটস পার্ট অফ মাই রিলিজিয়ন। এটা আমার কালচারের অংশ। এটা আমার রাষ্ট্র গঠনের অংশ। ফলে আমি তাদের কথায়তো ভীত হব না। ফলে এটাতো সমাজের শক্তি। সমাজের শক্তি যখন উত্থিত হয় এটাকে দমন করার ক্ষমতা পৃথীবিতে কারোর নাই।

ফলে আমি মনে করি যে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সমাজের কিছু শক্তি, যে শক্তিটা এতদিন সুপ্ত ছিল, সে শক্তি কিন্তু হাজির হয়ে গেছে। এটাকে আপনি নির্বাচনের কথা বলে লুটেরা মাফিয়া শ্রেণির হাতে তুলে দিয়ে আপনি শক্তিকে আবার দৈত্যের মতন আবার বোতলে ঢুকাবেন, ইমপসিবল। এটা আমি অন রেকর্ড বলে যাচ্ছি আজকে।

নির্বাচনটা একপাশে সরিয়েই রাখি। আপনি যে জনগণের অভিপ্রায়ের কথা বলছেন, যেটা ইতোমধ্যে হাজির হয়েছে, সেই কাঙ্খিত বাংলাদেশ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢোকার জন্য যে চর্চার কথা আপনি বলছেন, সেখানেতো নানান অ্যান্টিফোর্সও যুক্ত হচ্ছে।

খুব ভালো, থাকবেই তো। আমরা মানুষ না!

মতের ভিন্নতাতো থাকবেই কিন্তু আপনি একটু আগে বললেন ধর্মবাদী রাজনীতি কিংবা উগ্রপন্থা...

বা ভূ-রাজনীতি। আমি বুঝে গেছি আপনার প্রশ্নটা। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা কি আমাদের পক্ষে? অ্যানসার ইজ, নো। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে কিছু কিছু গুণগত পরিবর্তন ঘটে গেছে। এটাকে কি আমি ব্যবহার করতে পারব? অ্যানসার ইজ, ইয়েস।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইন্টারফেয়ার করল, এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে একটা জনমত তৈরি হয়েছে যে, বিশ্বব্যবস্থা বলে কোনও ব্যবস্থা এখন আর নাই। আমাদেরকে সারভাইভ করতে হবে। তাহলে যদি সারভাইভ করতে হয়, তাহলে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আমাকে নতুন করে ভাবতে হবে, নতুন সমীকরণ লাগবে।

সমাজের যারা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ যারা সেই পথটা দেখায় যে তুমি এই পথে গেলে তোমার জন্য বিপদটা বেশি। তুমি শত্রুকে মোকাবেলা করতে পারবে না। এটা সহজ পথ বা সহজ রাস্তায় গেলে তেমাকে মেরে ফেলবে, একটু গলিঘুপচি দিয়ে পার হয়ে যাও, বুদ্ধিজীবীর কাজতো এটাই। আপনারও কাজ তাই। আমাদের দুজনেরই কাজতো একই রকম।

এইটা যদি মানুষকে আমরা শিখাতে পারি, দিতে পারি, দেখাতে পারি, আমাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ এখন। আমেরিকা ইজ এ ডিক্লাইনিং পাওয়ার। সেকেন্ডলি, থার্ড ওয়াল্ড কান্ট্রিতে, সেটা ল্যাটিন আমেরিকা বলেন আফ্রিকা বলেন, থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির পিপল আর রাইজিং। আজকে নিউ ইয়র্ক শহরে জোহরান মামদানির মতন একজন মুসলিম মেয়র হয়ে গেছে। তাকে মেয়র করার পেছনে কারা ভূমিকা রেখেছে? বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা। বাংলাদেশের যে ডায়াস্পোরা, বাংলাদেশি মাইগ্রেন্টরা। বিরাট সুযোগ আমাদের জন্য। এই সুযোগ আমরা কেন হারাব? এই সুযোগটাকেতো আমাদের অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশে একটা অ্যাবস্ট্র্যাক্ট অ্যান্টি ইন্ডিয়ানিজম ডেভলপ করেছে। এটা কাকে পুষ্ট করে? ওই যাকে আমরা বলছি ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট শক্তিকে এটা পুষ্ট করে। কারণ সে কিন্তু ইসলামটাকে দেখে একটা পরিচয় হিসাবে। এর বেশি কিছু না। ইসলামের যে একটা রাজনৈতিক-দার্শনিক অবস্থান থাকতে পারে, যেমন একাত্তরে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, এই তিনটাইতো ইসলামের নীতি।

একাত্তরের স্বাধীনতার ঘোষণা যদি কায়েম করতাম তবেতো এটা একটা ইসলামিক রাষ্ট্র হয়ে যেত। কিন্তু আপনি যদি পরিচয়বাদী রাজনীতি করেন, এটা মুসলমানদের রাষ্ট্র হতে হবে, এটাতো ফ্যাসিজম। এই সিম্পল পার্থক্য সাধারণ মানুষকে আমরা বুঝাতে পারছি না। এটা ব্যবহার করছে কারা? রাজতন্ত্র, পেট্রোডলার এই ধরনের ইসলামকে তারা প্রচার করছে, যাতে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের জনগণ তাদের ইকোনমিকে ডেভলপ করতে না পারে। তাদের ধর্মের সঙ্গে তাদের একটা সত্যিকার আন্তরিক সম্পর্ক যেন তৈরি না হয়।

ইসলামে দেখেন না, যখন মোনাজাত করে তখন কী বলে। দুনিয়ায় কল্যাণ দাও, আখেরাতেও কল্যাণ দাও। আখেরাততো আল্লাহর ব্যপার। আমি জানি নাকি আমার আখেরাতে কী হবে? কে জান্নাতে যাবে কে বেহেশতে যাবে, এটা কি আমরা কেউ জানি? এখন তারা কী করতেছে, তারা এসে একটা ব্যবসা বসায়া দিছে। আপনাকে জান্নাতের টিকিট দিয়ে দিচ্ছে সরাসরি।

এটারতো ধর্মের সাথে সম্পর্ক নাই। তো এই লড়াই তো থাকবেই। এটা সব সমাজেই ছিল। আমাদের সমাজেও ছিল। খ্রিষ্টান সমাজে ছিল না? তাদেরকে লড়তে হয়েছে না? প্রোটেস্টেন্ট ভার্সাস আদারস। আপনি এটাকে এড়িয়ে কিভাবে ইতিহাস গ্রহণ করবেন। পারবেন নাতো।

এই লড়াইটাতো অবশ্যই থাকবে। আমি যেটা জানতে চাচ্ছিলাম, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে এই লড়াইটা অনেক বেশি বাড়ল কি না? মানে মবক্রেসি হচ্ছে মাজার ভাঙা হচ্ছে।

আমিতো মনে করি অসম্ভব ভালো হয়েছে। এতদিন এটা সুপ্ত ছিল। এটা রাষ্ট্র গঠনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, যেটা আপনাকে মীমাংসা করতে হবে। সেভেনটি ওয়ানে রাষ্ট্র গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি কী ছিল? বলা হলো যে আমরা শুধু বাঙালি। আমরা ইসলামবিরোধী। মানে ইসলাম বাদ দিতে হবে। একাত্তর সালে যুদ্ধ কী ইসলাম বনাম বাঙালির লড়াই? এটাতো ছিল পাকিস্তানবাদীদের বয়ান। এটাইতো ছিল তথাকথিত বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের বয়ান। এটা তো ডেড হয়ে গেছে, এটা পরাস্ত হয়েছে।

কিন্তু সেভেনটি ওয়ানতো আপনি রিরাইট করতে পারেন ভিন্নভাবে। আপনি বলতে পারেন এটা জালিম ইসলামের সঙ্গে মজলুম ইসলামের লড়াই। ইসলাম তো মজলুমের পক্ষে, জালিমের পক্ষে না। তাহলে সেভেনটি ওয়ানে কি বাংলাদেশের মানুষ ইসলামকে ছেড়ে দিয়েছে? ছেড়েতো দেয় নাই। দেয় নাই বলেইতো ইসলাম এখনও আছে।

তো ইসলামের প্রসঙ্গ আপনাকে মোকাবেলা করতেই হবে। মোকাবেলা করার মানেই হল যে ইসলাম ন্যায়ের ধর্ম, ইনসাফের ধর্ম, এটা গরিবের ধর্ম, এটা মজলুমের ধর্ম। ফলে মজলুম যখন জালিমের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এটাকে বলে ইসলাম। আর জালিম যখন লোকের উপর অত্যাচার করে নির্যাতন করে বিভিন্ন রকম বয়ান তৈরি করে কোরআন থেকে হাদিস থেকে এটা জালিমদের ব্যাপার। এই লড়াই কি আপনি এড়াতে পারবেন? এটার কোনও উপায় আছে? এটা কখনও হবে না। গরিব এবং ধনীর লড়াইতো থাকবেই। ফলে এই লড়াইটা এসে গেছে। এটা ভালোতো। 

কিন্তু মানুষের মধ্যে যে একটা চরম নিরাপত্তার অভাব বোধ হচ্ছে।

আমি কোথাও দেখছি না। আমিতো গ্রামে গ্রামে ঘুরি।

হ্যাঁ, আপনিতো অনেক জায়গায় ঘোরেন। আপনার এটা মনে হয় না, যে সাধারণ মানুষ অনিরাপদ বোধ করে?

নো। সাধারণ মানুষের মধ্যে শহরের লোকজন অত্যন্ত বাজে লোক। এতগুলো ঘটনার পরও তাদেরকে কিছু দিতে পারে নাই। আমাদের ন্যারেটিভ চাপিয়ে দিয়েন না পিপলের উপরে।

মানুষের মধ্যে কি এক ধরণের ইনসিকিউরিটি তৈরি হয় নাই?

না, মোটেও না। তারা মনে করছে যে, যারা এখন রাজনীতির কথা বলে, দলবলে, এরা সব লুটেরা মাফিয়া,  এরা একেবারে নিচের স্তর থেকে সব লুটপাট শুরু করে দিয়েছে, দে শুড বি স্টপড। এটাই তারা বলে। তারা ঠিকইতো বলে। আপনি নির্বাচন চান কেন? আপনি চেয়েছেন নির্বাচন একটু আগে। লোকজনতো নির্বাচন চায় না, এই লুটেরাদের তারা ক্ষমতায় আনতে চায় না। আপনি চাচ্ছেন কেন? হোয়াই ইউ ওয়ান্ট?

আপনি প্রশ্নটা করেছেন। আমি বলছি না আপনি পারসোনালি...। এটাইতো কথা, ফরহাদ ভাই নির্বাচন চান না কেন? চাইব কেন? জনগণইতো চায় না। আপনার এটা দ্বারা তো ইকোনমির প্রবলেম সলভ হবে না। এটা দ্বারা তো তার খাদ্যের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তার স্বাস্থ্যের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তারপরও আপনি বলতে পারেন, ঠিক আছে আমাদের রাষ্ট্র গঠনের জন্য একটা নির্বাচন লাগবে, ফাইন। তো ওই জায়গায় আসেন না। জনগণতো বিরোধিতা করবে না তার। কিন্তু আপনি খালি লুটেরাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেবেন। আমাকে একটা ছোট্ট কথা বলেন। ছোট্ট উত্তর দেবেন আপনি। বিএনপি কি ক্ষমতায়?

না। কোনও রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না।

ফাইন। এই যে রাষ্ট্রীয়ভাবে তারেককে আনা, উদযাপন করা একটা রাজপুত্রের মতন, এটা কিভাবে ব্যাখ্যা দেবেন?

আপনার সাথে অন্য আলোচনায় হয়তো বলতে পারতাম, এখন আমি অন রেকর্ড কোন কমেন্ট করতে পারি না সাংবাদিক হিসাবে।

আমি জাস্ট প্রশ্ন করছি আপনাকে। এটা ডক্টর ইউনূসকেতো প্রশ্ন করার বিষয়। তারেককে আমি খুবই ভালোবাসি, কোনও সমস্যা নেই আমার। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর, খুবই ঘনিষ্ট ছিল। কিন্তু রাষ্ট্র যখন এটা করে, রাষ্ট্র যখন একটা দলকে প্রমোট করে জনগণের বিরুদ্ধে, যেখানে জনগণ ইতোমধ্যেই কিন্তু নীরবে বলছে যে গ্রামে গ্রামে যে লুটতরাজ হচ্ছে, বিভিন্নরকম অনৈতিক কাজ হচ্ছে তার মধ্যে বিএনপি জড়িত। তা আপনি তাকে প্রমোট করছেন কেন?

আমি এই প্রশ্নটা একটু অন্যভাবে করতাম। সামনে যে নির্বাচনের কথা আমরা বলছি আগের মতো কি এই নির্বাচনের ফলাফলও কি এখন অনেকটা অনুমেয় হয়ে গেছে?

না, আমি সেটা জানি না। আমি তো গণক না। আমি বলতে পারব না। আমি বলতে পারব জনগণের সেন্টিমেন্টটা কী। আরেকটা উদাহরণ দিই আমি। কোনও রাষ্ট্র তাদের গোয়েন্দা প্রধান যখন আরেকটা দলের কাছে দেখা করতে যায় সে কি গোয়েন্দা প্রধান থাকতে পারে? পারবে? পারা উচিত? দলের পক্ষে কাজ করেছে। রাষ্ট্র ফাংশন করবে কিভাবে? ওরতো কাজ রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করা, দলের পক্ষেতো কাজ করা তার কাজ না।

এই ইস্যুগুলা সিম্পল মনে হতে পারে। উনি কী সেটা ইরিলেভেন্ট আমার জন্য। কথা হচ্ছে এই প্র্যাকটিসগুলো করার মধ্য দিয়ে আপনি রাষ্ট্রকে একটা ভয়ঙ্কর জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন। আপনি ভাবতেছেন এটা সিম্পল একটা ব্যাপার। ব্যাপারটা সিম্পল না। সাংঘাতিক গভীর ব্যাপার।

সেকেন্ডলি, (জেনারেল) ওয়াকার সাহেব শুরু থেকে নির্বাচনের কথা বলেছেন। তিনিতো নির্বাচন নিয়ে কথা বলার লোক না। এটাতো তার কাজ না। এখন আপনি ম্যাজিস্ট্রেসি পেয়েছেন। এখন আপনি অভিমান করছেন যে আমাকে ম্যাজিস্ট্রেসি দেওয়া হয়েছে কিন্তু ওই বুথের মধ্যে কিছু করবার ক্ষমতা আমার নাই। আপনি নিলেন কেন ম্যাজিস্ট্রেসি? এখন দায়তো আপনার। কারণ নির্বাচন যদি খারাপ হয় তাহলে দায়তো সেনাবাহিনীর উপর চাপাবে। তাহলে সেনাবাহিনীকে এই দায় নিতে আপনারা বাধ্য করলেন কেন?

আপনি কেন একটা সেনা প্রতিষ্ঠানকে, এটা তো আমার ইনস্টিটিউশন, আমাদের পুরো সভরেনটি এর উপর নির্ভর করে। আমাদের সেনাবাহিনীর কাজ হচ্ছে আমার সীমান্ত রক্ষা করা, রাস্তায় রাস্তায় কি ভোটের বাক্স পাহারা দেয়া তার কাজ?

আপনি তো অনেক গ্রামেগঞ্জে ঘোরেন। সাধারণ মানুষ, ধরেন সেনাবাহিনীর কাজ নিশ্চয়ই ভোটের বাক্স পাহারা দেওয়া না, সেনাবাহিনীর কাজ আমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, আমার বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। কিন্তু ওই ভোটের বাক্স পাহারা দেওয়া যার কাজ, যে পুলিশের, যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর, সাধারণ মানুষের তাদের প্রতি কি আস্থা আছে এই ষোলো মাসে?

তাহলে সেই আস্থা তৈরি করেন। এই সরকার যদি সে আস্থা তৈরি করতে না পারে, তাহলে জনগণ কী করবে? আপনিতো যখন নিজেকে সরকার বলেন, তার মানে আপনাদের প্রথম কাজ হল যে পুলিশ রিফর্ম করা। এই যে দেড় বছর চলে গেল, আপনি পারেননি কেন? কেন পারলেন না?

কোন রিফর্মটা হইলো এই যে ১১ টা কমিশন…

কিচ্ছু হয় নাই। তাহলে এই প্রশ্নটা তোলেন। তাহলে আপনি যদি এটা করেন, তো সরকারের পুনর্গঠন নিয়ে কিছু একটা করেন। কিন্তু আপনিতো নির্বাচন হলে সলভ করবেন, এটা তো হতে পারে না। আপনি নির্বাচন করে আপনি একে সমাধান করবেন, এটা তো হতে পারবে না।

এখন ভারত বলতেছে, শোনা কথা, আই কুড বি কমপ্লিটলি রং, বলতেছে আওয়ামী লীগকে ইলেকশনে অংশ নিতে দিতে হবে। আমাদের ৪০-৫০ জন লোক আছে, ইলেকশন তারা আসবে। ইন্ডিয়ান প্রেসারের মধ্যে আপনি নির্বাচন করবেন।

আপনি গণভোট করবেন কেন? আপনি মনে করেন জনগণ এগুলো ক্ষমা করে দিবে? এত লোক মারা গেছে, ক্ষমা করে দেবে? আমরা ক্ষমা করে দেব? আমরা ২০ বছর লড়াই করেছি। আমরা ক্ষমা করে দেব? আমরা চুপ করে থাকবো? এটা তো হবে না। পলিটিক্যাল ইস্যু পলিটিক্যালি রিজলভ করবেন। আপনি রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন যদি ডক্টর ইউনুসের থাকে কিছু, তাকেতো কথা বলতেই হবে আমাদের সঙ্গে। 

আমি তো একা কথা বলছি না। আই অ্যাম নোবডি। আমি জনগণের কণ্ঠসহকারে কথা বলছি। তাকে কথা বলতেই হবে। যারাই আসুক, সেটা সেনাবাহিনীর প্রধান আসুক বা জেনারেলরা আসুক, তাদেরকে কথা বলতেই হবে পিপলের সঙ্গে। এবং তারা এক এক এগারোর সময় তাদের যে ভূমিকা ছিল, সেই ভূমিকা থেকে তারা মুক্ত হতে চেয়েছেন বলে আমি জানি।

অনেক জেনারেল আমাকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বলেছেন তারা সে ভূমিকা তারা চান না। কিন্তু এবারের ভূমিকাতো আরো খারাপ। এবার যদি আরো খারাপ হয় তাহলে আমি এই দেশটাকে রক্ষা করব কি করে? বাংলাদেশ থাকলে তো আমাকে চিন্তা করতে হবে, এই সেনাবাহিনী দিয়ে আমি চলব কি করে? এটা দিয়েতো আমি কিছু করতে পারব না। 

এটাতো ক্রমাগত বাধা দিবে। তারতো কমান্ড স্ট্রাকচার থাকবে না। কারণ সৈনিকরা তাকে মানবে না। সেনাবাহিনী টিকে থাকে একটা স্ট্রাকচারের ভিত্তিতে। আপনি যখন অনৈতিক কাজ করেন, জেনারেল যখন নিজেরাই লুটতরাজ করেন, নিজেরা যখন দুর্নীতি করে, আপনি কি মনে করেন যে সাধারণ সৈনিকরা থাকবে? আপনাকে সমর্থন করবে?

সেকেন্ডলি, আমি আরেকটা কথা বলি। এই যে র‌্যাবতো বিলুপ্ত করার কথা। র‍্যাবে আপনি কি করছেন? আপনি একটা সৈনিককে র‍্যাবে ঢুকাচ্ছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং সে কী করছে? সে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং করছে। আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করছে, নিরস্ত্র মানুষকে মারছে। এটা কী সেনাবাহিনীর শিক্ষা? সৈনিকের মর্যাদা মাত্রইতো সে নিরস্ত্র মানুষকে কখনও সে গুলি করে না। তাহলে আপনি এই চর্চাটা র‍্যাবের মাধ্যমে করে সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করছেন। এর দায়টা কে নেবে? আপনি তো এখনও এটাকে বিলুপ্ত করেননি।

প্রত্যেকটা মানবাধিকার সংস্থা বলেছে র‌্যাব একটা ঘাতকদল। আপনি এটাকে বিলুপ্ত করেন নাই, এটা কারা করে নাই? সেনাবাহিনী রেখেছে ওটা? কেন সে রাখবে? কারণ এটার কাজ তো তার না। আপনি যখন একটা সৈনিককে, আজকে যত মনস্টার, আয়নাঘর বলুন, কি যত রকম অত্যাচারগুলো হয়েছে এটা তো র‍্যাবের মাধ্যমেই তারা শিখেছে। এটাতো একটা মোরাল এডুকেশন, সিরিয়াস ইস্যু, মারাত্মক ক্ষয় হয়েছে এসব জায়গাগুলোতে।

তাহলে আমরা এত বড় একটা গণঅভ্যুত্থানের পর এই গত ১৬-১৭ মাসে কী করলো বাংলাদেশ?

সেটাতো আমার কথার পরিপ্রেক্ষিতে আপনি বুঝতে পারছেন কী করছে। আপনি যদি পুরোটাই খালি ইতিবাচক দেখতে চান আর নেতিবাচক না শুনতে চান তাহলে সমস্যা। আমি মনে করি...

আমি পুরোটাই বুঝতে চাই।

ইতিবাচক অগ্রসর হলো আমরা যে কথাগুলো বলতে পারছি বা জনগণ যে বিষয়টা আগে বললে বুঝতে পারতো না, তার সে বোঝার ক্ষমতা হয়েছে। সেটা আমি মনে করি সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক দিকে যাবে। আমি একটা ছোট্ট কথা বলব, তারপর কেন ইতিবাচক বলব। এই গণঅভ্যুত্থানের সময় সৈনিকরা কিন্তু জনগণের উপর গুলি চালাতে চায়নি, অস্বীকার করেছে। এটা বিরাট ঘটনা। তার মানে এটা আমাদের জাতীয় চেতনার মধ্যে এসে গেছে। এটা তো অগ্রগতি। এটাতো চেতনাগত বিরাট রূপান্তর।

ফলে এই রূপান্তরটা যখনই ঘটে এটাইতো রাষ্ট্রের রূপ নিয়ে সামনে আসে। আমরা বলতে পারি আমরা সেই ক্রিটিক্যাল মোমেন্টটা, সেই মুহূর্তের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এবং এটা আমার জন্য খুব ইন্টারেস্টিং।

কারণ আমি তো আমিতো দেখতে পাচ্ছি জনগণকে জীবন্ত দেখছি। সে এই রাষ্ট্রের নির্মাণের ক্ষেত্রে তার ব্যর্থতার দিক আমার কাছে পরিষ্কার। যেখানে যেখানে সে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে সেটাও আমার কাছে পরিষ্কার এবং সে করবেই। কারণ আমরা মনে করি গ্লোবালি এবং আঞ্চলিক যে বাস্তবতা তার কারণে বাংলাদেশে একটা বড় ধরনের রূপান্তর, আরো বড় ধরনের, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেয়েও আরো বড় রূপান্তরের জন্য বাংলাদেশের জনগণ তৈরি হচ্ছে। এটা পরিষ্কার আমার কাছে। আমি দেখতে পাচ্ছি দেয়ালে।

সেইটার টাইমফ্রেম জিজ্ঞেস করতে চাই না। আবার আপনার কথায় আসি, নির্বাচনের নামে সেই যে লুটেরা মাফিয়া শ্রেণির হাতে রাষ্ট্রকে তুলে দেওয়া কিংবা মানুষের মধ্যে যে পপুলার সভেরিনটির কথা আপনি বারবার বলেন, সেই পপুলার সভেরনটির জন্য আবার যে জনগণ তৈরি হচ্ছে কিন্তু আরো ভাঙ্গা-গড়ার মধ্যে দিয়েই যেতে হবে না বাংলাদেশকে ?

সিরাজুল আলম খানের গতকাল (৬ জানুয়ারি) ছিল জন্মদিন। তার একটা চিন্তা খেয়াল করেন, একটা অসাধারণ তার গুণ, তিনি কিন্তু রাজনৈতিক দলে বিশ্বাস করতেন না। খুব অদ্ভূত ব্যাপার। তিনি জাসদ নিয়ে কী বলতেন, গণসংগঠন বলতেন। খুব অদ্ভুত ব্যাপার। তিনি মনে করতেন পার্টি করলে পার্টি ইভেনচুয়ালি রাষ্ট্রের রূপ নেয়। ফলে তিনি বলছেন যে জনগণকে সংগঠিত করতে হবে।

ক্ষমতা জনগণের হাতে রাখতে হবে এবং সে হাতে নেওয়াটাই হল তার নৈতিক শিক্ষা, তার রাজনৈতিক শিক্ষা। তার অন্যান্য শিক্ষার মধ্য দিয়ে আমি যেটাকে বলি সামষ্টিক অভিপ্রায় এটা তৈরি হয়। তার মানে আজকে যে আমি সামষ্টিক অভিপ্রায়ের কথা বলতেছি এটা তো নতুন না ওটা তো ঊণসত্তরেও ছিল। তাহলে ঊণসত্তর থেকে অনেক সময় লেগেছে আমাদের এই পর্যন্ত আসতে। ইতোমধ্যে সিরাজুল আলম খানরা এসে গেছেন, মুজিবুর রহমান চলে গেছেন, জিয়াউর রহমানও চলে গেছেন, হিস্ট্রিতো এভাবেই অগ্রসর হয়।

ইউরোপতো একদিনেই অগ্রসর হয়নি। কোনও দেশই একদিনে অগ্রসর হয়নি। ফরাসি বিপ্লবতো একদিনে হয়নি। বাংলাদেশে মাত্র ১৯৭১ সালে আমরা একটা স্বাধীনতা পেয়েছি। স্বাধীনতা পেয়েছি বটে কিন্তু আমরা যে একটা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী, নতুন এই উপলব্ধি কিন্তু খুব একটা ছিল না তখন।

এই উপলব্ধি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে একটু শুরু হয়েছিল। এবারকার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই প্রথম বাংলাদেশ বিশ্বসভায় সে বুঝতে শুরু করেছে, সে একটা নতুন পলিটিক্যাল কমিউনিটি। একে আপনি মুসলমান বললেও এটা ভুল, একে বাঙালি বললেও এটা ভুল। এটা একদম নতুন। কারণ এর মধ্যে তার ইসলাম আছে বিরাট কারণে। এটাতো বাংলাদেশের ইসলামের ইতিহাস। এটাতো আরবদের ইতিহাস না। তুরস্কের ইতিহাস না, ইরানের ইতিহাস না, বাংলাদেশের ইতিহাস।

ফলে বাংলাদেশের ইসলামের ইতিহাস আর বাঙালির ইতিহাস, আপনিতো আলাদা করতে পারছেন না। এই যে অবিচ্ছিন্ন, এই যে দুইটাকে আলাদা করবার যে চর্চাটা, একদিকে ধর্ম একদিকে ভাষা একদিকে সংস্কৃতি এটা তো মীমাংসা হয়ে গেছে।

আমাদের সময় একাত্তরের পরে আপনি কি দেখতেন নামের সঙ্গে একটা বাঙালি নাম ঢুকায় দিতে? মৃণ্ময় আহমেদ, হুমায়ুন আহমেদ ঢুকাচ্ছেন। আজকে ওই হীনমন্যতা থেকে এসেছে। একাত্তরে যুদ্ধটা করেছে পাকিস্তানিরা, ফলে মুসলমানরা খারাপ। ফলে সেই নামটা বহন করা তার লজ্জা ছিল। আজকে উল্টা দেখতেছে। হাদির মধ্যে সেটা দেখেন। আজকে উল্টা দেখছেন, কারণ ধর্মতো সমস্যা না। সে যখন আল্লাহু আকবার বলে। সে আল্লাহু আকবার বলে কিন্তু ওই ধর্মীয় রাজনীতির জন্য না। ইনসাফের জন্য বলে। তার ইনকিলাব, বিপ্লবের জন্য বলে। ফলে আল্লাহু আকবার স্লোগানটাও ব্যবহৃত হচ্ছে গণবিপ্লবের জন্য। দিস ইজ অ্যা ফান্ডামেন্টাল ট্রান্সফরমেশন। এইটা যদি আমরা বুঝতে পারি, আমি কিন্তু দেখতে পারি ইতিবাচক। আমি খারাপ কিছু দেখছি না।

কিন্তু আপনি বলছিলেন যে এটা মীমাংসা হয়ে গেছে। এটা কি মীমাংসা হয়ে গেল? মানে এই যে ধর্ম কিংবা জাতীয়তাবাদের পরিচয়ের যে বিভাজন, সে বিভাজন মীমাংসা হলো? সমাজে কি ডানপন্থার এক ধরনের আগ্রাসন নাই এখনও?

আছে এই আগ্রসনটা। এটা হয়েছে গ্লোবাল ক্যাপিটালের জন্য। এটা হয়েছে রাজতন্ত্রের জন্য। এটা হয়েছে পেট্রোডলারের জন্য। এমনকি এটা মোসাদ এবং র’য়ের প্রমোশন। আপনাকে যদি একটা ইউটিউবে ইসলামকে শুধু পরকালের একটা ধর্ম আকারে বানান, ইহলোকে আপনাকে কিছু করতে হবে না, আপনি যা কিছু করবেন সব পরকালের জন্য। আপনি মসজিদ রাখবেন। মসজিদটা হওয়া উচিত সমস্ত কিছু। প্রশাসন, স্থানীয় সরকার কালচার, পড়াশোনা সমস্ত কিছুর সেন্টার হবে না? মসজিদতো একটা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে। এটা তো একটা বিরাট স্কুল হতে পারে। কমিউনিটির সমস্ত কিছু কাজের জন্য মসজিদ। তার পারিবারিক বন্ধন থেকে আরম্ভ করা সমস্ত কিছু। সেখান থেকে মসজিদকে নিয়ে গেছেন একটা হাওয়াই জায়গায়। আপনি লিখে দিচ্ছেন যে এখানে কোন দুনিয়াবি কথাবার্তা বলা যাবে না। এটা কি ভাঙবে না?

ধর্মতো মানুষের জীবন থেকে আলাদা কিছু না। জীবনের মধ্যে আসবেতো সে। সে কোন রূপে আসবে সেটা হচ্ছে প্রশ্ন। এই প্রশ্নের মীমাংসা হয়েছে আমি এটা জোর গলায় বলব না ঠিক। কিন্তু মীমাংসা হবার, মীমাংসা যে দরকার সেটা এসে গেছে।

যে কারণে এই যে গণঅভ্যুত্থানটা হলো এর যে মূল যে স্পিরিটটা ছিল, তথাকথিত ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার বাইনারি দ্বারা গণঅভ্যুত্থান হবে না। এই বাইনারি ভেঙ্গে দিতে হবে। ভাঙবার পরে এখন আরেকটা ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট শক্তি। আগে ছিল জাতিবাদী সেকুলার ফ্যাসিজম এখন ধর্মবাদী ফ্যাসিজম সামনে এসছে। বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালো দেখতে পারছে এদেরকে। এটিকে তারা মোকাবেলা করবেই। আপনি কি মনে করেন পার পেয়ে যাবে? আপনি মনে করেন মানুষের ইহলৌকিক জীবনে কোন সুখ-দুঃখ নাই? তারা খালি পরকালের জন্য ধর্ম করে যাবে?

এটাতো ভালো। দ্বন্দ্বটা এসে গেছে। এসে যাওয়া মানেই হল যে আজকে আমরা তাকে এড়িয়ে যেতাম যে এটাতো ধর্মীয় ব্যাপার, এটা নিয়ে কথা বলতে হবে না, আজকেতো ইয়াংগার জেনারেশন তাকে এড়িয়ে যাবে না।

দ্বন্দ্বটা স্পষ্ট হলো বলে, এখন এই দ্বন্দ্বটাকে লড়াই করে মীমাংসার একটা পথ তৈরি হল?

মীমাংসা করা সহজ হবে। আমরা জাতিবাদীকে সেকুলার মোকাবেলা করেছি। তাহলে ধর্মীয় জাতিবাদকে মোকাবেলা করব। এটাতো সিম্পল ব্যাপার।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। মানে জুলাই গণঅভ্যত্থানের অন্যতম একটা ম্যান্ডেট ছিল। সেইটা কি আমরা দেখলাম গত ১৬-১৭ মাসে? প্রথম আলো যে পুরো আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমরা দেখেছি সরকারের নানান রকম সমালোচনা করতে রিপোর্ট করতে সেই প্রথম আলোর অফিস পুড়িয়ে দেয়া হলো। সংবাদপত্রের নিচে জেয়াফত হলো। ময়মনসিংহে একজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। বলা হচ্ছিল এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু আপনার একটা লেখায় পড়ছিলাম যে এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা না, এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক রূপান্তরের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

অবশ্যই বলেছি।

সেই জায়গায় তাহলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অবস্থান কই?

মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অ্যাবস্ট্রাকলি বললে এটায় প্রবলেম আছে। ফিলোসফিক্যালি এবং পলিটিক্যাল প্রবলেম আছে। প্রথমত হল যে চিন্তার স্বাধীনতা আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এক না। চিন্তা সবসময় স্বাধীন। পোয়েটিক শোনাতে পারে, যারা চিন্তাবিদ বা দার্শনিক প্রথম গুলিটা ওদের বুকে লাগে। প্রথম তীরটা ওদের বুকেই লাগে। কারণ তারা নতুন চিন্তা আনে, নতুন কথা বলে। এটা খুব তাড়াতাড়ি সমাজ গ্রহণ করে না। ফলে আমাদের তো গুলি খাইতে হবে। খাইছিতো। বেঁচে আছি এটাতো একটা দুর্ঘটনা। আমাদের বেঁচে যাওয়াটা দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু না।

আমি মনে করি সেদিক থেকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নটা আমাদের রিজলভ করতে হবে। আপনার সাথে আমি একমত। কিন্তু আমরা তো এখনও ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট থেকে আরম্ভ করে কোন কিছুইতো করি নাই। সেই পুরোনো আমলের সেই আইনগুলা ব্রিটিশ আমলের আইনগুলো রয়ে গেছে। এই পুরো প্রশ্ন তো রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত।

আমরা যখনই একটা গণপরিষদে তর্ক করব, আমি আপনি না করে যদি গণপরিষদে হতো তাহলে আমরা আরগু করতাম যে মতপ্রকাশ বলতে কী বুঝি আমরা। কিভাবে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের যে বাস্তবতা আমাদের যে বিপদের আশঙ্কাগুলো আমাদের যে একই সঙ্গে আমাদের ইতিবাচক দিক, এটাকে আমরা কী করে আমরা রক্ষা করব। তো সেই তর্কটা হতে হবে। এটাই তো গণপরিষদ করে। কারণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তর্ক হতেই হবে গণপরিষদে।

সরকার নির্বাচন করেছি। গঠনতন্ত্র নির্বাচনের নির্বাচন আর সরকার গঠনের নির্বাচনতো এক না। বাড়িটা বানালেই না বাড়িতে কে বাস করবে সেই প্রশ্নটা আসে।

মানে একটা কমপ্লিট কনস্টিটিউয়েন্ট আ্যাসেম্বলির কথা আপনি বলছেন?

হ্যাঁ, ডেফিনেটলি। ইট শুড বি ফুল কনস্টিটিয়েন্ট আ্যাসেম্বলি। মানুষ জানবে যে এখানে নতুন আইন তৈরি হবে। এখানে গিয়ে তর্ক-বিতর্কটা হতে হবে। নতুন রাষ্ট্র কী করে গড়ে তুলব।

এতসব আলোচনা-সমালোচনা-হতাশা-আশা, সামনের বাংলাদেশ কেমন দেখেন?

খুব ভালো।

মানে একটু ব্যাখ্যা করবেন?

আমি কিছু কিছু জিনিস বলি। আমি হয়তো দেখে যাব কিনা বলতে পারবো না। আমি একটা বয়সেতো পৌঁছে গেছি। বাংলাদেশ উপমহাদেশে রূপান্তরের হাব হবে। এটা প্রথমত জিওগ্রাফিকালি, এটা খুবই স্ট্র্যাটেজিক একটা জায়গা।

মানে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে?

ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানটা একটা কারণ। কিন্তু এই যে গণচেতনার যে রূপান্তরটা এবং যেসব প্রশ্ন মীমাংসা করছে, এখান ধর্মের প্রশ্ন, সেকুলারিজমের প্রশ্ন, রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন, চিন্তা এবং মতের পার্থক্য, এই প্রশ্নগুলো সে কিন্তু এখানে মোকাবেলা করছে। এটা পশ্চিম বাংলাতেও নাই, এটা এমনকি ভারতেও নাই। ফলে এটা একটা জীবন্ত একটা জনগোষ্ঠীর লক্ষণ।

এখানে অনেকগুলো ক্ষতি হতে পারে, অনেকগুলো বিপর্যয় ঘটতে পারে। কিন্তু এখানে ভয় পাবার কিছু নেই। কারণ পৃথিবীতে কোন জনগোষ্ঠী রক্তক্ষয় ছাড়া অনেক বেশি বিসর্জন ছাড়া, শাহাদাত বরণ করা ছাড়া বড় কিছু অর্জন করে না। আমরাতো ইতোমধ্যে অনেক কিছু করেছি। ইতোমধ্যে বহু ক্ষতি আমাদের হয়েছে। বহু তরুণ জীবন দিয়েছে। আমি মনে করি না যে এটা ব্যর্থ হবে। ব্যর্থ হওয়ার কোন কারণ দেখি না। অন্তত আমরা যে পথরেখাটা রেখে যাব বা রেখে যাবার জন্য চেষ্টা করছি। আমি জানি যে এটা বহু তরুণ সেখানে এসে জড়ো হবে। আজকে যেমন সিরাজুল আলম খানের কথা বলছি, মাওলানা ভাসানি আছে। তরুণরাতো খুঁজে বের করবে ওদের পথগুলো। এরা কোথায় ভুল করেছিল এরা কোথায় ঠিক ছিল।

মানে জনগণ তার পথ খুঁজে নেবে?

নিশ্চয়ই খুঁজে নেবে। সেই অবস্থাটাই এসে গেছে। আগে কি ছিল? যারা খুঁজতেছে তারা কিন্তু আমার মতো বয়সে নাই। তারা ২০ থেকে ৪০ বছর। এই বয়সের মত। ওদের থেকে নতুন নেতৃত্ব আসবে। আমরা তো দেখলাম তো ওদের নেতৃত্বেই গণঅভ্যুত্থানটা ঘটল। ওদের মধ্যে আসবে অবশ্যই।

তো এই জায়গায় বাংলাদেশের বুদ্ধিভিত্তিক চর্চাটা কেমন? আপনি সিরাজুল আলম খান সম্পর্কে লিখছিলেন যে তিনি নিজেকে বক্তৃতা প্রদানকারী জননেতা হিসেবে গড়ে তোলেননি। তিনি ভেতর থেকে চিন্তা করতেন।

সেখানে আমরা পিছিয়ে আছি। আমরা বুদ্ধিভিত্তিক চর্চাকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করি এটাই হল সমস্যা। এই সমস্যাটা যদি আমরা কাটিয়ে তুলতে পারি এবং আমাদের একাডেমিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যদি আমরা ঠিকমত পরিচ্ছন্ন করতে পারি। বুদ্ধিবৃত্তির জগতের একাডেমিক চরিত্র আছে। সেই জায়গায় আমরা যদি পৌঁছাতে পারি।

পৃথিবীতে যেসব জনগোষ্ঠী বিকশিত হয়েছে শুরুতেতো তারা এরকমই ছিল। হা-হুতাশ করে কোন লাভ নেই। সেই কাজটা তো আমাদের করতে হবে। আমি নিশ্চিত, আমি একমাত্র নই আরো অনেকে আছেন বাংলাদেশে তারা অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন বিভিন্ন বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

দর্শনের দিকে আমার ঝোঁক, রাষ্ট্রের দিকে ঝোঁক। কিন্তু অনেক অসাধারণ বিজ্ঞানী আছে। তাদেরকে দিয়ে আমরা বাংলাদেশকে ইকোনমিক্যালি ডেভেলপ করা, একটা টেকনোলজিক্যাল ট্রান্সফরমেশনের দিকে আমাদের চলে যাওয়া, এটা খুবই সহজ। সেদিক থেকে অত্যন্ত আশাবাদী।

ধন্যবাদ ফরহাদ ভাই। চারিদিকে হতাশার মধ্যে, দোষ-ত্রুটি সম্পন্ন হলেও আপনি আশার কথা শোনালেন। আলাপকে সময় দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

আপনাকেও ধন্যবাদ। আলাপকেও ধন্যবাদ।