জুলাই আন্দোলনের সকল কার্যক্রম থেকে দায়মুক্তি চায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। থানায় গিয়ে পুলিশ পরিদর্শককে হুমকি দেওয়ার প্রেক্ষাপটে আটক একজন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতার মুক্তির দাবিতে ঢাকায় একটি বিক্ষোভ থেকে এই দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
তারা ২৮ ঘণ্টার একটি আল্টিমেটাম দিয়ে দাবি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের পয়লা অগাস্ট থেকে শুরু করে ৮ই অগাস্ট পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে তা থেকে দায়মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে একটি অধ্যাদেশ জারি করতে হবে।
এমন একটা সময় তারা এই দাবি জানাচ্ছেন, যখন মাহদী হাসান নামে এক ব্যক্তিকে পুলিশ আটক করেছিল থানায় গিয়ে পুলিশকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে ওই ব্যক্তিকে পুলিশের উদ্দেশ্য করে বলতে শোনা গেছে, ‘বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম’।
মাহদী হাসান, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী কর্মকাণ্ডের উদাহরণ দিয়ে এই বক্তব্য দিচ্ছিলেন।
মাহদী এই বক্তব্য দেন হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় গিয়ে। বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি গিয়েছিলেন পুলিশের হাতে আটক এক ছাত্রনেতাকে ছাড়িয়ে আনতে। সেই ছাত্রনেতার নাম এনামূল হক।
শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক আবুল কালামকে উদ্দেশ্য করে হুমকি দেয়ায় আটক হওয়ার পর শাহবাগে তারই মুক্তির দাবিতে শনিবার রাতে দুই দফা আন্দোলন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
সেখানে মাহদীর নিঃশর্ত মুক্তি এবং হবিগঞ্জ সদর থানার ওসিকে প্রত্যাহারসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতার সকল কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি চেয়ে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয় সংগঠনটি।
শনিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে রাত সোয়া ১২টা পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা সড়ক অবরোধ করে।
এরই মধ্যে রবিবার কোর্টে পাঠানোর পরই মাহদীকে জামিন দেয় আদালত।
মাহদী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক। আর তারই মুক্তির দাবিকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির এই দুই দফা দাবির মুখেই জামিন পেল সে।
সেই দাবিকে আরও জোরালো করার চেষ্টা করছে সংগঠনের নেতারা।
২০২৪ সালে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের দেওয়া একটি পোস্টের রেফারেন্স টেনে তারা বলছে, ‘‘জুলাই আন্দোলনে ১৫ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানসংশ্লিষ্ট ঘটনার জন্য কোনো মামলা, গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা হবে না।’’

এমনকি তারা এটাও দাবি করে বলছে, ‘‘১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া সহিংসতার বিচার চাওয়া না গেলে এখন কেন বিচার হবে?’’
সংগঠনটির মুখ্য সমন্বয়ক হাসিবুল ইসলাম বলেন, একাত্তরের যুদ্ধের সময়ও তো এমন ঘটনা ঘটেছে। মুক্তিকামী জনতার জন্য এটা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আমাদের দুই দফা দাবির একটা আইনি ভিত্তি চাই।’’
‘‘আমরা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক স্বীকৃতি চাচ্ছি কারণ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটি যেকোনও সময় বাতিল করে দিতে পারে। যেকোনও আন্দোলনে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে, সেটা তো সারা বিশ্বে স্বীকৃত। তার জন্য কি গ্রেপ্তার করা যায়?’’
রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি না হলে এই সংক্রান্ত আরও কর্মসূচি আছে বলে জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশীদ।
রিফাত রশীদ আলাপকে বলেন, “স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে অবরোধ করা হয়েছিল। মাহদীকে জামিনে মুক্তি দেয়া হলেও আমাদের আরও কিছু কর্মসূচি আছে। রবিবার সন্ধ্যায় মধুর ক্যান্টিনে প্রেস কনফারেন্স এর মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে।”
এনামূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকার পরও কেন তার পক্ষে অবস্থান নিলেন, জানতে চাইলে রিফাত বলেন, ‘‘এনামূল জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। যে ছেলে ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করে আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, তাকে এরকম মামলায় আটক করা হাস্যকর না?’’
’’তবে মাহদীর ভাষার ব্যবহারে ত্রুটি ছিল, সেটা আমরা স্বীকার করি।’’
শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক আবুল কালাম আলাপকে বলেন, “মাহদী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক। জুলাই আন্দোলনের সময় সক্রিয় ছিলেন। আমার সাথে তার কথাবার্তাতো ভিডিওতেই শুনেছেন। সেই ইস্যুতেই তাকে মামলা দেয়া হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয়। কোর্টে চালান দেয়ার পর রবিবার কোর্ট তাকে জামিন দেয়।’’
যা বলছেন বিশ্লেষকরা
জুলাই আন্দোলনের সময় সকল সহিংসতা থেকে এই দায়মুক্তি চাওয়ার কারণ হিসেবে তারা নানা যুক্তি দাঁড় করালেও এর প্রভাব ভালো হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মাহদির ঘটনাকে গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করার কোনও সুযোগ নেই বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক।
আলাপকে তিনি বলেন, ‘‘এখানে তো রাষ্ট্রপ্রধান বা আইনশৃঙ্খলাবাহিনী বলুন, তারাতো শুরু থেকে নানা ভাবে পরিস্থিতি অনুযায়ী চলছে। সেই পরিস্থিতিরই ফলাফল এটি।’’
‘‘এই যে আন্দোলন হচ্ছে সেটি কোনদিকে গড়ায় অর্থাৎ এক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তারা তাকে গ্রেপ্তার করেছে, আরেক বাস্তবতা সৃষ্টি হওয়ার কারণে তারা তাদেরকে জামিন দিয়েছে।’’
এটা কি মবকে উসকে দেওয়া? এই প্রশ্নে বলেন, “'হ্যাঁ অবশ্যই, কোনও না কোনও ভাবে এটা মবক্রেসি অথবা নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার মতো উদাহরণ। রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কোনও না কোনও ভাবে আসলে সৃষ্টি করে দিচ্ছে।’’
শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম জানান, শায়েস্তাগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহসভাপতি এনামুল হাসানকে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়। এনামূলের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং তাদের পক্ষে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ছিল।
‘‘এনামূলকে আটকের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা তার মুক্তির দাবিতে শুক্রবার দুপুরে থানা ঘেরাও করে।’’
‘‘এর মধ্যে মাহদী এসে এনামূলকে মুক্তির দাবিতে আমাদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।’’



