চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার ২০২৬ শুভ হোক বাংলাদেশের জন্য

বিগত বেশ কয়েক বছরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সংকট এবং অর্থনৈতিক ধাক্কায় রয়েছে উদ্বেগ। আবার রয়েছে সম্ভাবনাও। বাংলাদেশ কি পারবে ২০২৬ এর অগ্নিপরীক্ষায় উতরে যেতে?

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম

নতুন বছরে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক এক সন্ধিক্ষণে। বছরের শেষ হলো একটি গভীর শোকাবহ ঘটনার মধ্যে দিয়ে। খালেদা জিয়ার মতো একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদকে বিদায় দিতে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ ঢাকার রাস্তায় নেমে এলেন, যাকে দেখা হচ্ছিল বিভেদের এই সময়ে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে। 

বছরের শুরুতে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ ব্যস্ত থাকবে সত্যিকারের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার জন্য একটি রাজনৈতিক সরকার নির্বাচন করবার জন্য। 

ওসমান হাদী হত্যা, বিএনপি চেয়ারপারসনের মৃত্যু বা তার রাজনৈতিক উত্তরাধীকারের নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার ঘটনা নির্বাচনের জয়রথকে কখনো বাধাগ্রস্ত করেছে - কখনো ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

তবে আশা করা হচ্ছে ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মানুষ ঠিকঠাক একটি দলকে জিতিয়ে আনবে পরবর্তী ৫ বছরের শাসনভার তুলে দেয়ার জন্য। 

যদিও অনেকেই শঙ্কায় আছেন, বাংলাদেশে বিগত বেশ কয়েক বছরে যে ধরণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা তৈরি হয়েছে সেটা সামলে নিয়ে নির্বাচিত ওই সরকারটি কতটা দায়িত্ব পালন করতে পারবে? নির্বাচিত সরকারটি কি ঠিকঠাক মেয়াদ শেষ করে যেতে পারবে?

থেমে থাকা অর্থনীতির গতি ফেরানো, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সুর ঠিক করে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন - এমন আরো নানাবিধ চ্যালেঞ্জও বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে খ্রিস্টিয় নতুন সাল ২০২৬এ, যেখানে উদ্বেগের সঙ্গে রয়েছে সম্ভাবনার পরীক্ষা। 

বাংলাদেশ কি পারবে ২০২৬ এর অগ্নিপরীক্ষায় উতরে যেতে?

উদ্বেগের ২৫ - সম্ভাবনার ২৬

বিদায়ী ২০২৫ সালের সূর্য অস্তমিত হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু শোক দিয়ে। 

এছাড়া নির্বাচনের এবং হাদী হত্যার পর প্রশ্নবিদ্ধ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেশজুড়ে যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে তা নিয়ে শঙ্কা কাটেনি।  

অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের অনিয়ন্ত্রিত দৌড়, নতুন কর্মসংস্থানের অভাব এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে স্থবিরতার মাঝে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ এর যাত্রা সদ্য বিদায়ী ২০২৫এ আস্থা ফেরাতে পারেনি ব্যাংকিং সেক্টরে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও চলছে নতুন মেরুকরণ। বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জকে আরও ঘনীভূত করেছে।

বছরের শুরুটা এমন একরাশ উদ্বেগ নিয়ে হলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শত প্রতিকূলতার মাঝেই লুকিয়ে আছে সম্ভাবনার বীজ। সঠিক পরিকল্পনা, দূরদর্শী চিন্তাভাবনা এবং সময়োপযোগী সংস্কারের মাধ্যমেই বাংলাদেশ এই অগ্নিপরীক্ষায় উতরে যেতে পারে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, “রাজনীতিতে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। কারণ আমার মনে হয় বড় একটি রাজনৈতিক দলকে দেশের বাইরে রাখা ঠিক হচ্ছে না। এটা দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করবে। অন্যদিকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেশকে এগিয়ে নেয়া এখন আরেকটি চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ আবার সম্ভাবনার। এটা যদি করা যায় তবে অনেক সংকট কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে।”

নতুন সমীকরণ ও উৎকণ্ঠা

২০২৬ সালের শুরুতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে এক শূন্যতা ও নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।

একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলোর অনড় অবস্থান স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। 

এর সাথে যুক্ত হয়েছে ওসমান হাদী হত্যাপরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। পুলিশের ভূমিকা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে জনমনে গভীর উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক পরীক্ষা হবে একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীর উদ্দেশে দেওয়া তার ভাষণে বলেন, “এই নির্বাচন প্রথাগত কোনো ভোট নয়, বরং এটি দেশ রক্ষার ভোট।”

চৌঠা ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশের জন্ম হবে। 

“এই নির্বাচন সেই নতুন বাংলাদেশের দরজা খুলে দেবে”, বলেন প্রফেসর ইউনূস।

অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ ২০২৬ এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছেন রাজনৈতিক সহিংসতাকে। 

তিনি বলেন, “যেভাবে রাজনৈতিক সহিংসতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তাতে এটাই ২০২৬ এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এক ধরনের উগ্রবাদী শক্তি সামনে আসছে। সামনের নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এ ধরনের সহিংসতা প্রভাব ফেলবে।”

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালেও চ্যালেঞ্জগুলো আরও ঘনীভূত হয়েছে

অর্থনীতির টানাপোড়েন: বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সংকট

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালেও চ্যালেঞ্জগুলো আরও ঘনীভূত হয়েছে। চাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। 

বিনিয়োগের অভাবে শিল্পায়ন থমকে আছে, যার ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব বৃদ্ধি সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই স্থবিরতার মধ্যেই ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা ব্যাংকিং খাতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করে খেলাপি ঋণ আদায় এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই হবে অর্থনীতির চাকা সচল করার একমাত্র পথ। 

তবে সেজন্যও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

আলাপকে তিনি বলেন, “সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। আর সেক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারা হবে ইতিহাসের বাঁক বদলে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যা পরবর্তীতে ইতিহাসে ঠাঁই পাবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বইতে পড়বে।”

নির্বাচনের সঙ্গে অন্যান্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে ড. জাহিদ বলেন, “কেবল একটি নির্বাচনই যথেষ্ট নয়; মাইক্রোইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সর্বোপরি আর্থিক খাতের সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনাই হবে হবে ২০২৬ সালের প্রধান চ্যালেঞ্জ। যে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে আগামী সরকারকে।”

তিনি আরও বলেন, “সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতি সতর্ক অবস্থায় থাকবে। শক্তিশালী ব্যাংকিং সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব নীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, ভ্যাট ও ট্যাক্সের বিষয়গুলো সহজ করা ও বাণিজ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক শাসন সংস্কারগুলো অব্যাহত রাখতে হবে।” 

২০২৬ সালের প্রথম দিনেই আমানতকারীদের সুসংবাদ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। টাকা তুলতে পারছেন তারা। 

আলাপকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা ১লা জানুয়ারি থেকে তাদের আমানতের সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা করে তুলতে পারছেন। এর মধ্য দিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এর প্রধান লেনদেন কার্যক্রম শুরু হয়ে গেল।” 

এদিকে রিজার্ভের ধারাবাহিকতাও অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। 

২০২৬ সাল বাংলাদেশ শুরু করেছে ৩৩.১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের গ্রস রিজার্ভ নিয়ে। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ২৮.৫১ বিলিয়ন ডলার।

আন্তর্জাতিক মেরুকরণ ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যকার আস্থাহীনতা স্পষ্ট। 

তবে বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর অনেকের মধ্যে আশা সঞ্চার করেছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সুদৃঢ় হচ্ছে বাংলাদেশের সম্পর্ক। এর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রভাবও বাংলাদেশের ওপর পড়ছে।

৩১এ ডিসেম্বর ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স প্রকাশিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান কথা বলেছেন ভারত প্রসঙ্গে।

তিনি বলেন, “আমাদের সবাইকে অবশ্যই একে অপরের সঙ্গে খোলামেলা হতে হবে। আমাদের সম্পর্ক ভালো করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।”

দীর্ঘদিন স্থবির থাকার পর বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো হতে থাকা পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে জামায়াতে আমির বলেছেন, “আমরা সবার সঙ্গে ভারসামপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখি। আমরা কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকতে আগ্রহী নই। এর বদলে আমরা সবাইকে সম্মান করি এবং সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চাই।”

কূটনৈতিক বিশ্লেষক এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জাতীয় কৌশলগত বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। 

তিনি বলেন, “অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ার ঝুঁকি আছে। দেশের যেটুকু সামর্থ্য আছে তা দিয়েই পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। তবে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় রেখে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিজেদের মতো করে স্বাধীনভাবে নিতে হবে।”

কূটনৈতিক সংকটগুলো মোকাবিলা করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন: বাণিজ্যের অগ্নিপরীক্ষা

বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪এ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। যার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে অনেক বছর ধরেই।

তবে ৫ই অগাস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নতুন শঙ্কায় ফেলেছে। 

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের আগে কূটনৈতিক সংকটগুলো মোকাবিলা করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া জিএসপি প্লাস সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক ঋণের সহজলভ্যতা বজায় রাখতে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্কের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা। 

এটি যেমন গৌরবের, তেমনি এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা। কারণ গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা কমে যাবে এবং ঋণের শর্ত কঠোর হবে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উত্তরণের ধাক্কা সামলাতে হলে ২০২৬ সালের মধ্যে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কারিগরি দক্ষতার উন্নয়ন করা অপরিহার্য। এটি সম্ভব না হলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতির পর এ গ্র্যাজুয়েশন কতটা টেকসই হবে তা নিয়েও নানান মত রয়েছে। 

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আলাপকে বলেন, “এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য আমরা এখনও তৈরি নই। আমরা আগেও বলেছি যে আমরা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের মতো অবস্থায় নেই। এখন যদি এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে যাই, তাহলে দেশের অর্থনীতি এবং দেশের শিল্প-কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আমরা বারবার অনুরোধ করেছি।”

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ন্যূনতম তিন থেকে সর্বোচ্চ ছয় বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে বলেও মতামত দেন তিনি। 

তবে এই আবেদন করলে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। 

তিনি বলেন, “আমরা ২০১৮ সাল থেকেই জানি যে ২০২৪-এ গ্র্যাজুয়েশন হওয়ার কথা ছিল। করোনা মহামারীর কারণে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় চেয়ে আগে আবেদন করা হয়। এর প্রেক্ষিতে জাতিসংঘ উত্তরণের সময়সীমা দুই বছর পিছিয়ে দেয়। এখন আবেদন করে যদি তিন বছর সময় পাওয়া যায়, তারপরও গ্র্যাজুয়েশন হবে ২০২৯ সালে। সেই সময়ের মধ্যে তো প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।”

“আবেদন করা যেতেই পারে তবে আবেদনের পক্ষে বিশেষ করে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে যথেষ্ট শক্ত যুক্তি দাঁড় করাতে হবে। ফলে প্রস্তুতি থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে,” সতর্ক করেন তিনি। 

সম্ভাবনার পথ ও সময়োপযোগী সংস্কার

শত উদ্বেগের মাঝেও ২০২৬ সালে সম্ভাবনার বীজ লুকিয়ে আছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংকটের এই মুহূর্তই হলো সংস্কারের সেরা সময়। 

বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব। এছাড়া দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন পথ প্রশস্ত হচ্ছে। 

অন্তবর্তীকালীন সরকার আগামী সরকারের কিছু কাজ এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করেন অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

তিনি বলেন, “ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ এর মতো বেশ কিছু সংস্কার পদক্ষেপ অন্তবর্তীকালীন সরকার নিয়েছে। বাকি অনেক কমিটির সংস্কার প্রস্তাব আবার তারা গ্রহণ করেনি। সে সব বিষয়ে কাজ এগিয়ে আছে। নতুন সরকার এসে অন্তত কিছু কাজ গোছানো পাবে। তবে তাদের সিদ্ধান্ত নেবেক এই কাজগুলো তারা কীভাবে বাস্তবায়ন করবে।”

এখন দেখার বিষয়, ২০২৬ সালের এমন বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাংলাদেশের আগামী নেতৃত্ব দেশকে কতটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে পারেন। 

সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে ২০২৬ সালের এসব বহুমুখী অগ্নিপরীক্ষায় উতরে গেলে আগামীর বাংলাদেশ একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।