আমি তখন খুব ছোট। আট কি নয় বছর বয়স। গ্রামে থাকি। আমাদের পরিবার খুব একটা রক্ষণশীল ছিল, এটা বলা যাবে না। আমরা সচ্ছল পরিবার ছিলাম, আর চিন্তাভাবনাতেও বেশ প্রগতিশীলই ছিলাম সে সময় বলা যায়।
হঠাৎ একদিন শুনলাম, ছোট চাচ্চুকে বিয়ে করানো হবে। বাড়িতে পাত্রী দেখার আলোচনা। অমুক বাড়ির মেয়ে সুন্দর, তমুক মেয়ের স্বভাব ভালো, এমন নানা কথা কানে আসতে লাগল। একেকদিন একেকজন মেয়ের কথা উঠছে। বড়রা বসে আলোচনা করছে, আর আমি আশপাশে ঘুরঘুর করছি, কান খাড়া করে শুনছি।
আমার কাছে ব্যাপারটা তখন বেশ মজারই লাগছিল। বিয়ে মানে আমার কাছে তখন নতুন জামাকাপড়, অনেক মানুষ, রান্নাবান্না, মজা আর হৈচৈ। কে কাকে বিয়ে করবে সেটার মধ্যে যে এত হিসাব-নিকাশ থাকতে পারে, সেটা বোঝার বয়স তখন আমার হয়নি।
কিন্তু পাত্রী বাছাইয়ের সেই আলোচনাগুলোতে যে কত হিসাব-নিকাশ চলত, তখন তার কিছুই বুঝতাম না।
মেয়ে দেখতে কেমন, স্বভাব কেমন, পরিবার কেমন এসব নিয়ে আলোচনা চলত। তবে সবকিছুর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা ছিল, মেয়ে ভালো রান্নাবান্না জানে তো?
মেয়ে বেশি কথা বলে কি না। বেশি স্বাধীনচেতা কি না। সংসারের সব কাজ সামলাতে পারবে কি না। স্বামীর কথা শুনবে কি না। শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে কি না। এগুলোও বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিলো।
তখন অবশ্য এসব প্রশ্নের গভীরতা বুঝিনি।
একজনকে এর মধ্যে পছন্দ হলো। বলা হলো, তিনি খুব নম্র, স্বভাব ভালো, পড়াশোনায়ও ভালো। কিন্তু কাজকর্মে তেমন পারদর্শী নয়; খুবই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা! পরিবারের সবার মধ্যে নাখোশ ভাব দেখা গেলেও ডাকসাইটে সুন্দরী হওয়ার জন্য সে পাশ করে গেল আমার চাচার কাছে।
কিন্তু একটা বিষয় তখন আমার ছোট্ট মাথায় কেন যেন বুঝে আসলো না। বিয়ে হলে কেন মেয়েদের কাজকর্ম জানতেই হয়? আচ্ছা ছেলেদের জানতে হয় না? কেন মেয়েটা মানুষ হিসাবে কেমন সেটা কেউ জানার আগ্রহ বোধ করলো না? একটা মেয়ে ভালো রান্না করতে পারে কি না, সংসারের সব কাজ সামলাতে পারে কি না, এসব এত গুরুত্বপূর্ণ? কিন্তু মেয়েটা মানুষ হিসেবে কেমন, সেটা জানার আগ্রহ যেন কারও নেই, কেন?
সে কী পছন্দ করে? কী চায়? কী হতে চায়? তার নিজের কোনো স্বপ্ন আছে কি না? এসব প্রশ্নের চেয়ে কী বেশী গুরুত্বপূর্ণ সে রান্না পারে কিনা?
কিন্তু বড় হতে হতে বুঝেছি, একজন নারী মানুষ হিসাব যেমনই হোক না কেন, তার নৈতিকতা যাই হোক না কেন, তাতে সে ভালো কিংবা মন্দ মানুষ হিসাবে প্রমাণিত হয় না। স্বামী ও সংসার ঠিক কতটা ভালোভাবে সামলাতে পারছেন একজন নারী সেটাই তিনি মানুষ হিসাবে কেমন তার মাপকাঠি। যদি সে সেটা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে মানুষ হিসাবেও সে এই সমাজের চোখে ‘ব্যর্থ।’
সেই বিয়ের বছর তিনেক পর আমরা ঢাকায় চলে আসলাম। চাচা-চাচী তখন আর আমাদের সাথে থাকেন না। তারা আমাদের থেকে কিছুটা দূরে আলাদা বাসায় থাকেন। এরমধ্যে চাচী ভীষণ অসুস্থ, তার মিসক্যারেজ হলো, আমরা সবাই চাচীকে দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখলাম চাচী মোটামুটি সুস্থই আছেন। তবে ভিতরে ভিতরে তিনি শারীরিক ও মানসিক ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত ছিলেন। আমাদের দেখে চাচা চাচীকে বললেন রান্না-বান্নার আয়োজন করতে। সেই শুনে আমার মা চাচাকে দিলেন এক ধমক।
আমার মনে প্রশ্ন আসলো ,আচ্ছা, চাচা কি বুঝতে পারছিলেন না চাচী কতটা ভেঙে পড়েছেন?
শারীরিক কষ্টটা নাহয় বাদই দিলাম। তিনি তো জানতেন কী ঘটেছে। জানতেন, তার স্ত্রী মাত্রই একটা সন্তান হারিয়েছেন। তাহলে তাকে কীভাবে রান্না করতে বললেন? বাইরে থেকেও তো খাবার কিনে আনা যেতো!
কিন্তু না, সন্তান হারানোর শোক চাচীকে অসাড় করে দিলেও তার একটা দায়িত্ব ছিল, রান্না করা। কারণ তিনি স্ত্রী। সেদিন অবশ্য আমার মা-ই রান্না করেছিলেন।
আমার পুরানো কর্মস্থলে এক সহকর্মী একদিন বলছিলেন যে তিনি ছুটির দিনে পুরো সপ্তাহের রান্না একসঙ্গে করে ফ্রিজে রেখে দিতেন। উদ্দেশ্য ছিল, প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে যেন আবার রান্নাঘরে যেতে না হয়। কিন্তু তার শাশুড়ির কথা, “আমার পুতে নি ফ্রিজের এই বাসি রান্না খাইবো সারা সপ্তাহ?”
তার স্বামীও মায়ের কথায় সায় দিয়েছিলেন।
অগত্যা প্রতিদিন অফিস করে রাত আটটার দিকে বাসায় ফিরে আবার পরিবারের সবার জন্য রান্না করতে হতো আমার সেই সহকর্মীকে।
আমার তখন মনে হয়েছিল, একজন নারীর সারাদিনের পরিশ্রম, ক্লান্তি, সময় এসবের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার স্বামীর প্রতিদিন ‘তাজা’ রান্না পাওয়ার অধিকার। সংসারের অন্য সবার সুবিধা-অসুবিধা থাকতে পারে,পছন্দ-অপছন্দ থাকতে পারে, কিন্তু তার ক্লান্তির কোনো আলাদা জায়গা নেই।
কারণ সে তো বউ। তাকে রান্না করতেই হবে।
তারপর আমি বিয়ে করলাম, গুনে গুনে ছয় বছর প্রেমের পর। দেশের সেরা বিদ্যাপীঠে পড়া, শিক্ষিত, মার্জিত এক সুদর্শন পুরুষকে। প্রেমের সময় যার ব্যক্তিত্ব, আচরণ, ব্যবহার, সুশীলতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। বহু নারীর আকাঙ্খিত পুরুষ যখন আমাকে পছন্দ করেছিল, তখন আমার মনে হয়েছিল, “আমি পাইলাম। আমি ইহাকে পাইলাম।”
তারপর কী প্রেম! প্রেমিক হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষকে পেয়ে আমি পুলকিত ছিলাম। সত্যিই তার জুড়ি মেলা ভার!
আমার ব্যক্তিত্ব, চলাফেরা, চিন্তাভাবনা সবকিছুই ছিল তার পছন্দের। যেকোনো পোশাকে আমি তার সামনে গেলে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিত। আমি চাকরি-বাকরি করব, আমি খুব বেশি রান্নাবান্না জানি না, তাতেও তার কোনো সমস্যা নেই। দুজন মিলেই রান্নাবান্না করে ফেলবো, সে বলতো। এছাড়াও আমার চোখের দিকে তাকিয়েই সে বিনা দ্বিধায় সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবে বলেও সে আমাকে আশ্বস্ত করেছিল।
বিয়ের পর সংসারজীবন আমার কাছে সুখকরই মনে হলো, কারণ দুঃখের তো কিছু নাই। শুধু অফিস থেকে যখন দুজন ফিরি, রান্নার ভাগটা আমাকেই সামলাতে হয়। একদিকে থাকি ভীষণ টায়ার্ড, অন্যদিকে রান্নাবান্নাও খুব একটা পারি না। সেও আমার ধারে কাছে আসে না, কারণ সেও রান্নাবান্না পারে না।
একদিন বললাম, “তোমার তো আমাকে একটু হেল্প করা উচিত।”
সে বলল, “আমি তো পারি না। আর তোমার রান্না খুব মজা হয়।”
-না পারলে তো একটু শেখার চেষ্টাও করতে হয়।
-আমাকে আমার মা এগুলো শেখায় নাই। আর তুমি আমাকে এগুলো করতে বলো?
-বউয়ের কাছ থেকে নাহয় একটু শিখলা। কী-ই বা হবে?
সে আর কথা বাড়ালো না। তবে একটু মনক্ষুণ্ন যে হয়েছে, সেটা বোঝা গেল।
একদিন রাতে শুয়ে ছিলাম। সে আমাকে একটা রিলস দেখালো। যার সারমর্ম, একজন নারী তার স্বামীকে এতই ভালোবাসে যে, স্বামী যদি রাত তিনটার সময় বিরিয়ানি খেতে চায়, তখনও সেটা রান্না করে খাওয়াবে। এটাই বউয়ের ‘লাভ ল্যাঙ্গুয়েজ।’
আমি বললাম, “তোমার কি এখন বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছা করছে?”
কিছু একটা বলতে গিয়ে বললো, “না।”
আমি বললাম, “আমার বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছা করছে। রান্না করে খাওয়াবা, প্লিজ?”
সে পাশ ফিরে শুয়ে মোবাইলের স্ক্রিন অফ করে, চোখ বন্ধ করে ফেললো।
আমি বুঝলাম না একজন মানুষ কীভাবে এমন একটা কিছু এক্সপেক্ট করতে পারে যেটা সে নিজে ফুলফিল করতে পারবে না।
বিয়ের আগে যেকোনো পোশাক আমি তার সামনে পরে গেলে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিত। বিয়ের পর সেই পোশাকই আমার কাল হয়ে দাঁড়ালো।
আমি বুঝলাম না, সমস্যা কী? আমার পোশাক-আশাক তো তার বেশ পছন্দেরই ছিল। তাহলে সমস্যা কোথায়?
তার ভাষ্যে, “দেখো, তোমার পোশাক নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু বুঝোই তো, তুমি এখন বউ। এ বাসায় যখন আসি, প্রতিবেশীরা বিভিন্ন কথা বলে, আব্বু-আম্মুর সেটা ভালো লাগে না।”
-আমি তো বিয়ে তোমাকে করেছি। অন্যের পছন্দ-অপছন্দ দিয়ে আমি কী করবো?
-বিয়ে দুটো পরিবারের মধ্যে হয়। শুধু তুমি-আমি না, এখানে আরও অনেক কিছু থাকবে।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। ভীষণ শান্তিপ্রিয় মানুষ আমি।
তবে একটা জিনিস বুঝলাম, বিয়ের আগে যে পোশাক একজন পুরুষের চোখে সুন্দর, বিয়ের পর সেই একই পোশাক অস্বস্তিকর হয়ে যেতে পারে। কারণ আমি তো এখন আর আগের আমি নেই, আমি তো এখন ‘বউ’।
বিয়ের আগে আমি একজন মানুষ ছিলাম। আমার নিজের পছন্দ ছিল, অপছন্দ ছিল, কাজ ছিল, স্বপ্ন ছিল। আমি কী পরব, কী খাব, কোথায় যাব এসব নিয়ে আমার নিজের সিদ্ধান্ত ছিল।
বিয়ের পর হঠাৎ করে আমার পরিচয়ের সামনে একটা নতুন শব্দ বসে গেল ‘স্ত্রী’। অমুকের স্ত্রী। অমুক বাড়ির বউ।
কিন্তু এটা তো শুধু একটা সম্পর্কের পরিচয় হওয়ার কথা ছিল। কোনো ব্যারিকেড নয়।
আচ্ছা কেন বিয়ের পরে একজন নারীকে পরিবার-সমাজ আগের মত ব্যক্তি মানুষ ভাবতে পারে না? কেন তাকে তার সব সত্তা জমা দিয়ে দিতে হয়?
একজন পুরুষ বিয়ে করলে সে স্বামী হয় ঠিকই, কিন্তু তার আগে সে একজন ব্যক্তি, একজন মানুষ। তার জীবনে সবকিছুই থাকতে পারে। কিন্তু কেন একজন নারী বিয়ে করলে তার অনেক কিছুই হঠাৎ করে আর শুধু তার থাকে না? কারণ সে এখন কারও কিংবা কোনো বাড়ির বউ?
আর তাই এক আলোচিত অভিনেতার সাক্ষাৎকারে দেওয়া বক্তব্য–রাত ৪টায় ১০২ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে স্ত্রী পরোটা বানিয়ে দিয়েছেন–নিয়ে ফেইসবুকের তর্কটা আমার কাছে একেবারেই নতুন কোন ব্যাপার না! শুধু একই গল্পের চরিত্রগুলো বদলে গেছে। ছোটবেলায় দেখেছি বউ মানেই রান্না জানবে আর বড় হয়ে দেখছি অসুস্থ হলেও রান্নাটা তারই দায়িত্ব; দেখছি ভালবাসার সাথে রান্নাঘরের দায়িত্বটা কীভাবে মিশিয়ে ফেলা হয়। অথচ প্রশ্নটা খুব সহজ–একজন মানুষ অসুস্থ হলে তার সেবা-যত্ন পাওয়ার কথা, নাকি তার হাতে পরোটা বানানোর দায়িত্ব তুলে দেওয়া? হয়তো বিয়ের ধারণাটাই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।



