মানুষ মরে গেলে পঁচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়, কারণে-অকারণে বদলায়। কিন্তু সংবিধান বদলায় কি কারণে? ৫৫ বছর বয়সের বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সংবিধানে কাটাকুটি করা হয়েছে ১৭ বার। গড়ে প্রতি ৩৪ মাসে একবার সংসদের কাঁচি চলেছে সংবিধানের ওপর। কখনও সংসদীয় ব্যবস্থা পাল্টে দিয়ে একদলীয় শাসন, কখনও সামরিক শাসনের বৈধতা আবার কখনো নির্বাচনী ব্যবস্থা নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে নিতে হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সংবিধান সংশোধন। এ যেন এক রাজনৈতিক আয়না। যার প্রতিবিম্ব বলে ক্ষমতার লড়াইয়ের ইতিহাস।
নাহিদ হোসেন
প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএমআপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম
১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১। মাত্রই স্বাধীন হলো বাংলাদেশ। এবার একটা সংবিধান লাগবে। সেটি তৈরি করতেই সত্তরের নির্বাচনে জেতা সংসদ সদস্যদের নিয়ে তৈরি হয় গণপরিষদ। ডক্টর কামাল হোসেনের নেতৃত্বেই ৩৫ সদস্যের একটি কমিটি দায়িত্ব পায় সংবিধানের খসড়া তৈরির। তৈরিও হয়ে যায় আট মাসের মধ্যেই। বলা হয়, এতো কম সময়ে একটি দেশের সংবিধান তৈরির নজির খুব কম। সংবিধান কার্যকর হয় প্রথম বিজয় দিবসেই।
কিন্তু মাত্র সাত মাসের মাথায় সেই সংবিধান সংশোধনের দরকার পড়ে। ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ শহীদ মিনারে জড়ো হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সদস্যরা। সে সময় দাবি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে। কিন্তু সেই আইনতো নেই। এজন্যই আসে প্রথম সংশোধনী। বিলটি আনেন সে সময়ের আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর। সংসদে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে শুধু তিনজন ভোট দেননি। বিল পাস হয় ১৯৭৩ সালের ১৫ই জুলাই। এই সংশোধনী সংসদকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আইন তৈরির ক্ষমতা দেয়। এর ভিত্তিতেই মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের জন্য তৈরি হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন।
জরুরি অবস্থা ও মৌলিক অধিকার স্থগিত
স্বাধীনতার বছরখানেক পরই ক্ষমতাসীনরা হয়তো ভেবেছিলেন দেশে এমন অবস্থা তৈরি হতে পারে যা নিয়ন্ত্রণ করতে বেগ পেতে হবে রাষ্ট্রকে। প্রথম সংশোধনীর দুই মাস পরই ফের সংশোধন।
এবার যোগ হলো জরুরি অবস্থা জারির বিধান। সাথে আবার ৩৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বলা হলো, কোনো কারণ না দেখিয়েই কাউকে আটক রাখা যাবে ছয় মাস পর্যন্ত। যদিও মূল সংবিধানে ছিল যত দ্রুত সম্ভব গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে হবে। ১৯৭৩ সালের ২০ই সেপ্টেম্বর পাস হওয়া সেই সংশোধনীতে এমন বিধানও যুক্ত করা হয় যে, জরুরি অবস্থার সময় কারো মৌলিক অধিকার থাকবে না। বিলটি পাসের সময় সে সময়ের বিরোধীদল এবং স্বতন্ত্র কয়েকজন সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন।
মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি
সাতচল্লিশের দেশভাগের পর ভারত পাকিস্তানের মধ্যে অনেক সীমানা বিরোধ থেকে যায়। যেমন এক দেশের জমি অন্য দেশের ভেতরে থাকা, যাকে বলা হয় ছিটমহল। কিছু জমি আবার দুই দেশই নিজেদের বলে দাবি করে, এমন আরো অনেক কিছু।
একাত্তরে স্বাধীনতার পরও সেসব ঝক্কি বয়ে চলতে হচ্ছিল বাংলাদেশকে। সেসব মেটাতে ১৯৭৪ সালে স্থলসীমানা চুক্তি করেন শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধী। তবে চুক্তি হলেইতো বাস্তবায়ন হয় না। কারণ দেশের জমি অন্য কাউকে দিয়ে দেয়ার বৈধতা ছিল না সংবিধানে। তাই সংসদে উঠল তৃতীয় সংশোধনী। পক্ষে ২৬১ ভোটের বিপরীতে ৭টি বিপক্ষের ভোট নিয়ে বিলটি পাস হয় ১৯৭৪ সালের ২৩এ নভেম্বর।
বাকশাল গঠন ও একদলীয় শাসন
ততদিন বাংলাদেশ চলছিল বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে। এরপর যা ঘটল তা হলো, ইতিহাসের বাঁক বদল। তারই নাম বাকশাল।
স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায়, দেশের শাসন ব্যবস্থাকে আমূল বদলে ফেলেছিল সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী। বহুদলীয় সরকার পদ্ধতি বাদ দিয়ে চালু করা হয় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার। ক্ষমতার সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। মাত্র চারটি চালু রেখে, বন্ধ করে দেয়া হয় সব সংবাদপত্র। এই শাসন ব্যবস্থার নামই ছিল বাকশাল।
বিলটি সংসদে পাস হয় ১৯৭৫ সালের ২৫এ জানুয়ারি। ওই সময়ের সরকারি দল আওয়ামী লীগেরই দুই জন সংসদ সদস্য অধিবেশন বর্জন করেন। একজন মুক্তিবাহিনীর প্রধান এম এ জি ওসমানী আর ব্যরিস্টার মঈনুল হোসেন। পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ২৯৪ জন। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতির এই একদলীয় শাসন ব্যবস্থার পদক্ষেপ নিয়ে এখনও বিতর্ক হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৬এ মার্চ ঢাকায় এক জনসভায় বাকশাল নিয়ে বক্তব্যে ঘুনেধরা সমাজ পাল্টানোর কথা বলেছিলেন। তবে তার আগেই তাকে হত্যা করা হয়।
সামরিক শাসনের বৈধতা ও জাতীয়তাবাদের পরিবর্তন
খন্দকার মোশতাক ছিলেন আওয়ামী লীগেরই নেতা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের প্রবাসী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বাধীনতার পর প্রথমে ছিলেন বিদ্যুৎ ও সেচমন্ত্রী। তিয়াত্তর সালে দায়িত্ব নেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। পঁচাত্তরের ১৫ই অগাস্ট শেখ মুজিবকে হত্যার পর এই খন্দকার মোশতাকই নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। জারি করেন সামরিক শাসন। শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেন তিনি। এরপর কারাগারে চার নেতা হত্যা আর একের পর এক অভ্যুত্থান পাল্টা অভ্যুত্থানে তথৈবচ অবস্থা।
সাত নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনিই একদলীয় শাসন ব্যবস্থার বদলে বহুদলীয় ব্যবস্থা আবার চালু করেন। তবে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে না গিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি বহাল রাখেন। বাঙালির বদলে সংবিধানে যুক্ত হয় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টের পর থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ই এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক শাসনামলে নেয়া এসব সিদ্ধান্তেরই বৈধতা দেয়া হয় পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে। এই সংশোধনীতেই সংবিধানে যুক্ত হয় বিসমিল্লাহির-রহমানির-রহিম। ২০১০ সালে উচ্চ আদালত এই পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে।
সাত্তারের প্রার্থিতা ও লাভজনক পদের সংজ্ঞা
১৯৮১ সালের ৩০এ মে মধ্যরাত। সারা দেশের মানুষ তখন গভীর ঘুমে। ঘুমাচ্ছিলেন জিয়াউদ্দিন চৌধুরীও। তখন তিনি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক। তিনি তার 'দুই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড' বইতে লিখেছেন সেই ভোরের কথা, যেদিন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হত্যা করা হয়।
তখন উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন আবদুস সাত্তার। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তিনি। ক্ষমতাসীন বিএনপি বিচারপতি সাত্তারকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে তিনি কি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন? কারণ সংবিধান বলছিল লাভজনক পদে থেকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করা যাবে না। বিচারপতি সাত্তারের প্রার্থিতা বৈধ করার জন্যই ষষ্ঠ সংশোধনী আনা হয়। এই সংশোধনীর কারণেই এখন রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর পদকে প্রজাতন্ত্রের লাভজনক কাজ বলে গণ্য করা হয় না।
এরশাদের সামরিক শাসন ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম
রাষ্ট্রপতি সাত্তার অবশ্য এক বছরও টেকেননি। রাজনীতির ময়দানে আবির্ভূত হন আরেক জেনারেল, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করেন সে সময়ের এই সেনাপ্রধান। সেনা শাসন জারি থাকে চার বছর। জেনারেল এরশাদের সেই সেনা শাসন এবং তার অন্যান্য কার্যক্রমের বৈধতা দিতেই সপ্তমবারের সংশোধন হয় দেশের সর্বোচ্চ আইন। যেখানে বলা হয় এই আদেশগুলো নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।
চার বছর পর সামরিক আইন উঠিয়ে নেন এরশাদ। কিন্তু ক্ষমতায় তখনও এরশাদই। ছোট ছোট কয়েকটি রাজনৈতিক দল নিয়ে ১৯৮৮ সালে সংসদ নির্বাচন করেন। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে তৈরি হয় চতুর্থ সংসদ। এবার অষ্টম সংশোধনী ওঠে সংসদে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পুরোপুরি পাল্টে দেয়া হয়। এতে সংবিধানে যুক্ত হয় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। যদিও এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিসহ বেশির ভাগ দলই ঐ সংসদ নির্বাচনটি বর্জন করেছিল।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ও সাহাবুদ্দীন আহমদের মধ্যবর্তী সরকার
একজন মানুষ কয়বার রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন? সেই বিধান আগে ছিল না সংবিধানে। ১৯৮৯ সালে সংসদ ভাবলো লাগাম পরাতে হবে। নবম সংশোধনী পাস হওয়ার পর তাই এখন কেউ দুইবারের বেশি রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না।
ততোদিনে এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। রাজপথ উত্তাল। এরশাদও বুঝতে পারছিলেন মসনদে আর থাকা হবে না তার। কিন্তু নির্বাচনী বন্দোবস্ত কি হবে? ১৯৯০ সালের ১২ই জুন দশ নাম্বার সংশোধনী পাস হয়। যেখানে স্পষ্ট করা হয়, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে।
কিন্তু এই কয়দিন সরকার চালাবেন কে? তখনই দৃশ্যপটে হাজির হন ওই সময়ের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। নির্বাচন আয়োজনের জন্য তিন মাসের অস্থায়ী সরকার করা হয়। আন্দোলনকারী দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সাহাবুদ্দীন আহমদকে প্রধান করা হয়। প্রথমে তিনি উপরাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব নেন। পরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালন শেষে ফের ফিরে গিয়েছিলেন এজলাসে। এই দুটি বিষয়কেই বৈধতা দেয়ার জন্যই ছিল একাদশ সংশোধনী। একানব্বইয়ের নির্বাচনের মাধ্যমে হওয়া পঞ্চম সংসদে এই সংশোধনী পাস করা হয়।
সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন
একাদশ সংশোধনী পসের দিন, একই অধিবেশনে পাস হয়েছিল দ্বাদশ সংশোধনীও। দীর্ঘ ১৬ বছর পর বাংলাদেশ চলেছে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায়। কিন্তু রাজনীতিকরা ফিরতে চাইলেন সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে। জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী আর শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেতা। আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতৃত্বে দু'টি জোট আর বামপন্থি পাঁচটি দল মিলে একটি জোট—এই তিন জোটের রূপরেখার অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল এই সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। ১৯৯১ সালের ৬ই অগাস্ট সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাসের বিপক্ষে ভোট পড়েনি একটিও।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা
একটা সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর। কিন্তু বাংলাদেশে একটি সংসদ টিকেছিল মাত্র বারোদিন। ১৯৯৬ সালে। তার বেশ আগে থেকেই প্রশ্ন উঠছিল সংসদের মেয়াদ শেষে কি হবে? নির্বাচন আয়োজনের সময়ে দেশ চালাবে কে? দলীয় সরকার থাকলে কি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে? ঠিকঠাক কাজ করবে পুলিশ আর প্রশাসন? এমন নানা প্রশ্ন তখনকার বিরোধীদের মুখে।
তারা চাইছিল নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে যেতে হবে নির্বাচনের দায়িত্ব। শুরু হয় আন্দোলন। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলোর ১৪৭ জন সংসদ সদস্য একসাথে পদত্যাগ করেন ১৯৯৪ সালের ২৮শে ডিসেম্বর।
শেষমেষ ১৯৯৫ সালের ২৪শে নভেম্বর পঞ্চম সংসদ ভেঙে দিয়েছিল বিএনপি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ফের নির্বাচন হয়, যা বর্জন করেছিল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি আর বামপন্থি দলগুলো। থামেনি আন্দোলনও। পরে তীব্র আন্দোলনের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আনার জন্যই ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস হয় ১৯৯৬ সালের ২৭এ মার্চ। তিনদিন পর ভেঙে দেয়া হয় মাত্র বারোদিন বয়সী সংসদ। এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে কম বয়সী সংসদ।
বিচারপতিদের বয়সসীমা বিতর্ক
পরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। তবে সেবার আর সংবিধানে কাটাকুটি হয়নি। ২০০১ সালের শেষে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। উদ্যোগ নেয়া হয় চতুর্দশ সংশোধনীর। এতে সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসন ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৪৫টি করা হয়েছিল। সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত সব প্রতিষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি রাখার বিধান করা হয়।
কিন্তু গোল পাকে অন্য জায়গায়। এই সংশোধনীতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়। এই নিয়েই উত্তাল হয়ে ওঠে রাজনীতির ময়দান। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে জটিলতায় রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ শেষপর্যন্ত সংঘাত ও জরুরি অবস্থায় রূপ নেয়। ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর সমর্থনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়, যা 'ওয়ান-ইলেভেন সরকার' নামে পরিচিতি পায়।
এবার বাতিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার
দুই বছরের কাঠখড় পুড়িয়ে ২০০৮ সালের শেষে নির্বাচন হয়। দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতা নেয়ার দুই বছরের মধ্যেই ১৯৭২ সালের সংবিধানের মৌলিক কিছু বিষয় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়। এটিই এ যাবত সংবিধানের সবচেয়ে বড় সংশোধনী।
সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ফিরে আসে। তবে বহাল থাকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতার স্বীকৃতি দেয়া হয়। ফিরে আসে বাহাত্তরের সংবিধানের মূল কাঠামোর রূপ। বাতিল হয় গণভোট। পঞ্চাশটিরও বেশি অনুচ্ছেদকে মৌলিক কাঠামো হিসাবে চিহ্নিত করে সংশোধনের অযোগ্য করা হয়। অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানও করা হয় এই সংশোধনীতে।
এখানেই শেষ নয়। যে অংশটি নিয়ে গত এক দশকেরও বেশি সময় রাজনীতির চায়ের কাপে ঝড় উঠেছে তা হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যে ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা, সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন তোলে আওয়ামী লীগ। বিষয়টি আদালতে গড়ালে ২০১১ সালের মে মাসে সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সর্ম্পকিত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেয়। আদালত অবশ্য বলেছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আরও দু'টি সংসদ নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার সেই সুযোগ না রেখে পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করে দেয়। ফিরিয়ে আনা হয় রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচনী ব্যবস্থা।
বিচারক অপসারণের ক্ষমতা
২০১৪ সালে ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণ বা অব্যাহতি দেয়ার ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনা হয়, যা আগে ছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে। তবে এ নিয়ে সরকারের সাথে আদালতের টানাপোড়েন তৈরি হয় এবং আপিল বিভাগ এই সংশোধনী বাতিল করে দেয়। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর ২০২৪ সালের শেষ দিকে এর রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি হয়। ফলে কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে অসমর্থতা ও পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে তা নিষ্পত্তির ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতেই বহাল থাকে।
সংবিধানে ২০১৮ সালে সপ্তদশ সংশোধনী আসে, যার মাধ্যমে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন আরও ২৫ বছর বহাল রাখার বিধান আনা হয়।
আঠারোতম সংশোধনীর দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ
১৭টি সংশোধনীর পরও বাংলাদেশের সংবিধান কতটুকু গণআকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে এখনও। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুরু করে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ, যার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে সংবিধান সংস্কারের বিষয়।
এজন্য ঐকমত্য কমিশন, জুলাই সনদ অনেক কিছুই হয়। তবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচেনর পর বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি।
সংসদ সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু সেখানে যুক্ত হয়নি বিরোধীরা। শোনা যাচ্ছে আগামী জানুয়ারিতে সংসদে উঠবে সংবিধানের আঠারোতম সংশোধনী।
৪ঠা নভেম্বর সংবিধান দিবস
সংবিধান সংশোধন: ক্ষমতার আয়নায় রাজনীতির ইতিহাস
মানুষ মরে গেলে পঁচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়, কারণে-অকারণে বদলায়। কিন্তু সংবিধান বদলায় কি কারণে? ৫৫ বছর বয়সের বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সংবিধানে কাটাকুটি করা হয়েছে ১৭ বার। গড়ে প্রতি ৩৪ মাসে একবার সংসদের কাঁচি চলেছে সংবিধানের ওপর। কখনও সংসদীয় ব্যবস্থা পাল্টে দিয়ে একদলীয় শাসন, কখনও সামরিক শাসনের বৈধতা আবার কখনো নির্বাচনী ব্যবস্থা নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে নিতে হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সংবিধান সংশোধন। এ যেন এক রাজনৈতিক আয়না। যার প্রতিবিম্ব বলে ক্ষমতার লড়াইয়ের ইতিহাস।
১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১। মাত্রই স্বাধীন হলো বাংলাদেশ। এবার একটা সংবিধান লাগবে। সেটি তৈরি করতেই সত্তরের নির্বাচনে জেতা সংসদ সদস্যদের নিয়ে তৈরি হয় গণপরিষদ। ডক্টর কামাল হোসেনের নেতৃত্বেই ৩৫ সদস্যের একটি কমিটি দায়িত্ব পায় সংবিধানের খসড়া তৈরির। তৈরিও হয়ে যায় আট মাসের মধ্যেই। বলা হয়, এতো কম সময়ে একটি দেশের সংবিধান তৈরির নজির খুব কম। সংবিধান কার্যকর হয় প্রথম বিজয় দিবসেই।
কিন্তু মাত্র সাত মাসের মাথায় সেই সংবিধান সংশোধনের দরকার পড়ে। ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ শহীদ মিনারে জড়ো হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সদস্যরা। সে সময় দাবি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে। কিন্তু সেই আইনতো নেই। এজন্যই আসে প্রথম সংশোধনী। বিলটি আনেন সে সময়ের আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর। সংসদে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে শুধু তিনজন ভোট দেননি। বিল পাস হয় ১৯৭৩ সালের ১৫ই জুলাই। এই সংশোধনী সংসদকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আইন তৈরির ক্ষমতা দেয়। এর ভিত্তিতেই মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের জন্য তৈরি হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন।
জরুরি অবস্থা ও মৌলিক অধিকার স্থগিত
স্বাধীনতার বছরখানেক পরই ক্ষমতাসীনরা হয়তো ভেবেছিলেন দেশে এমন অবস্থা তৈরি হতে পারে যা নিয়ন্ত্রণ করতে বেগ পেতে হবে রাষ্ট্রকে। প্রথম সংশোধনীর দুই মাস পরই ফের সংশোধন।
এবার যোগ হলো জরুরি অবস্থা জারির বিধান। সাথে আবার ৩৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বলা হলো, কোনো কারণ না দেখিয়েই কাউকে আটক রাখা যাবে ছয় মাস পর্যন্ত। যদিও মূল সংবিধানে ছিল যত দ্রুত সম্ভব গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে হবে। ১৯৭৩ সালের ২০ই সেপ্টেম্বর পাস হওয়া সেই সংশোধনীতে এমন বিধানও যুক্ত করা হয় যে, জরুরি অবস্থার সময় কারো মৌলিক অধিকার থাকবে না। বিলটি পাসের সময় সে সময়ের বিরোধীদল এবং স্বতন্ত্র কয়েকজন সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন।
মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি
সাতচল্লিশের দেশভাগের পর ভারত পাকিস্তানের মধ্যে অনেক সীমানা বিরোধ থেকে যায়। যেমন এক দেশের জমি অন্য দেশের ভেতরে থাকা, যাকে বলা হয় ছিটমহল। কিছু জমি আবার দুই দেশই নিজেদের বলে দাবি করে, এমন আরো অনেক কিছু।
একাত্তরে স্বাধীনতার পরও সেসব ঝক্কি বয়ে চলতে হচ্ছিল বাংলাদেশকে। সেসব মেটাতে ১৯৭৪ সালে স্থলসীমানা চুক্তি করেন শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধী। তবে চুক্তি হলেইতো বাস্তবায়ন হয় না। কারণ দেশের জমি অন্য কাউকে দিয়ে দেয়ার বৈধতা ছিল না সংবিধানে। তাই সংসদে উঠল তৃতীয় সংশোধনী। পক্ষে ২৬১ ভোটের বিপরীতে ৭টি বিপক্ষের ভোট নিয়ে বিলটি পাস হয় ১৯৭৪ সালের ২৩এ নভেম্বর।
বাকশাল গঠন ও একদলীয় শাসন
ততদিন বাংলাদেশ চলছিল বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে। এরপর যা ঘটল তা হলো, ইতিহাসের বাঁক বদল। তারই নাম বাকশাল।
স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায়, দেশের শাসন ব্যবস্থাকে আমূল বদলে ফেলেছিল সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী। বহুদলীয় সরকার পদ্ধতি বাদ দিয়ে চালু করা হয় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার। ক্ষমতার সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। মাত্র চারটি চালু রেখে, বন্ধ করে দেয়া হয় সব সংবাদপত্র। এই শাসন ব্যবস্থার নামই ছিল বাকশাল।
বিলটি সংসদে পাস হয় ১৯৭৫ সালের ২৫এ জানুয়ারি। ওই সময়ের সরকারি দল আওয়ামী লীগেরই দুই জন সংসদ সদস্য অধিবেশন বর্জন করেন। একজন মুক্তিবাহিনীর প্রধান এম এ জি ওসমানী আর ব্যরিস্টার মঈনুল হোসেন। পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ২৯৪ জন। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতির এই একদলীয় শাসন ব্যবস্থার পদক্ষেপ নিয়ে এখনও বিতর্ক হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৬এ মার্চ ঢাকায় এক জনসভায় বাকশাল নিয়ে বক্তব্যে ঘুনেধরা সমাজ পাল্টানোর কথা বলেছিলেন। তবে তার আগেই তাকে হত্যা করা হয়।
সামরিক শাসনের বৈধতা ও জাতীয়তাবাদের পরিবর্তন
খন্দকার মোশতাক ছিলেন আওয়ামী লীগেরই নেতা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের প্রবাসী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বাধীনতার পর প্রথমে ছিলেন বিদ্যুৎ ও সেচমন্ত্রী। তিয়াত্তর সালে দায়িত্ব নেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। পঁচাত্তরের ১৫ই অগাস্ট শেখ মুজিবকে হত্যার পর এই খন্দকার মোশতাকই নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। জারি করেন সামরিক শাসন। শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেন তিনি। এরপর কারাগারে চার নেতা হত্যা আর একের পর এক অভ্যুত্থান পাল্টা অভ্যুত্থানে তথৈবচ অবস্থা।
সাত নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনিই একদলীয় শাসন ব্যবস্থার বদলে বহুদলীয় ব্যবস্থা আবার চালু করেন। তবে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে না গিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি বহাল রাখেন। বাঙালির বদলে সংবিধানে যুক্ত হয় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টের পর থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ই এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক শাসনামলে নেয়া এসব সিদ্ধান্তেরই বৈধতা দেয়া হয় পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে। এই সংশোধনীতেই সংবিধানে যুক্ত হয় বিসমিল্লাহির-রহমানির-রহিম। ২০১০ সালে উচ্চ আদালত এই পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে।
সাত্তারের প্রার্থিতা ও লাভজনক পদের সংজ্ঞা
১৯৮১ সালের ৩০এ মে মধ্যরাত। সারা দেশের মানুষ তখন গভীর ঘুমে। ঘুমাচ্ছিলেন জিয়াউদ্দিন চৌধুরীও। তখন তিনি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক। তিনি তার 'দুই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড' বইতে লিখেছেন সেই ভোরের কথা, যেদিন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হত্যা করা হয়।
তখন উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন আবদুস সাত্তার। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তিনি। ক্ষমতাসীন বিএনপি বিচারপতি সাত্তারকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে তিনি কি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন? কারণ সংবিধান বলছিল লাভজনক পদে থেকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করা যাবে না। বিচারপতি সাত্তারের প্রার্থিতা বৈধ করার জন্যই ষষ্ঠ সংশোধনী আনা হয়। এই সংশোধনীর কারণেই এখন রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর পদকে প্রজাতন্ত্রের লাভজনক কাজ বলে গণ্য করা হয় না।
এরশাদের সামরিক শাসন ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম
রাষ্ট্রপতি সাত্তার অবশ্য এক বছরও টেকেননি। রাজনীতির ময়দানে আবির্ভূত হন আরেক জেনারেল, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করেন সে সময়ের এই সেনাপ্রধান। সেনা শাসন জারি থাকে চার বছর। জেনারেল এরশাদের সেই সেনা শাসন এবং তার অন্যান্য কার্যক্রমের বৈধতা দিতেই সপ্তমবারের সংশোধন হয় দেশের সর্বোচ্চ আইন। যেখানে বলা হয় এই আদেশগুলো নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।
চার বছর পর সামরিক আইন উঠিয়ে নেন এরশাদ। কিন্তু ক্ষমতায় তখনও এরশাদই। ছোট ছোট কয়েকটি রাজনৈতিক দল নিয়ে ১৯৮৮ সালে সংসদ নির্বাচন করেন। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে তৈরি হয় চতুর্থ সংসদ। এবার অষ্টম সংশোধনী ওঠে সংসদে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পুরোপুরি পাল্টে দেয়া হয়। এতে সংবিধানে যুক্ত হয় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। যদিও এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিসহ বেশির ভাগ দলই ঐ সংসদ নির্বাচনটি বর্জন করেছিল।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ও সাহাবুদ্দীন আহমদের মধ্যবর্তী সরকার
একজন মানুষ কয়বার রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন? সেই বিধান আগে ছিল না সংবিধানে। ১৯৮৯ সালে সংসদ ভাবলো লাগাম পরাতে হবে। নবম সংশোধনী পাস হওয়ার পর তাই এখন কেউ দুইবারের বেশি রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না।
ততোদিনে এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। রাজপথ উত্তাল। এরশাদও বুঝতে পারছিলেন মসনদে আর থাকা হবে না তার। কিন্তু নির্বাচনী বন্দোবস্ত কি হবে? ১৯৯০ সালের ১২ই জুন দশ নাম্বার সংশোধনী পাস হয়। যেখানে স্পষ্ট করা হয়, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে।
কিন্তু এই কয়দিন সরকার চালাবেন কে? তখনই দৃশ্যপটে হাজির হন ওই সময়ের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। নির্বাচন আয়োজনের জন্য তিন মাসের অস্থায়ী সরকার করা হয়। আন্দোলনকারী দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সাহাবুদ্দীন আহমদকে প্রধান করা হয়। প্রথমে তিনি উপরাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব নেন। পরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালন শেষে ফের ফিরে গিয়েছিলেন এজলাসে। এই দুটি বিষয়কেই বৈধতা দেয়ার জন্যই ছিল একাদশ সংশোধনী। একানব্বইয়ের নির্বাচনের মাধ্যমে হওয়া পঞ্চম সংসদে এই সংশোধনী পাস করা হয়।
সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন
একাদশ সংশোধনী পসের দিন, একই অধিবেশনে পাস হয়েছিল দ্বাদশ সংশোধনীও। দীর্ঘ ১৬ বছর পর বাংলাদেশ চলেছে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায়। কিন্তু রাজনীতিকরা ফিরতে চাইলেন সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে। জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী আর শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেতা। আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতৃত্বে দু'টি জোট আর বামপন্থি পাঁচটি দল মিলে একটি জোট—এই তিন জোটের রূপরেখার অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল এই সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। ১৯৯১ সালের ৬ই অগাস্ট সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাসের বিপক্ষে ভোট পড়েনি একটিও।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা
একটা সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর। কিন্তু বাংলাদেশে একটি সংসদ টিকেছিল মাত্র বারোদিন। ১৯৯৬ সালে। তার বেশ আগে থেকেই প্রশ্ন উঠছিল সংসদের মেয়াদ শেষে কি হবে? নির্বাচন আয়োজনের সময়ে দেশ চালাবে কে? দলীয় সরকার থাকলে কি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে? ঠিকঠাক কাজ করবে পুলিশ আর প্রশাসন? এমন নানা প্রশ্ন তখনকার বিরোধীদের মুখে।
তারা চাইছিল নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে যেতে হবে নির্বাচনের দায়িত্ব। শুরু হয় আন্দোলন। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলোর ১৪৭ জন সংসদ সদস্য একসাথে পদত্যাগ করেন ১৯৯৪ সালের ২৮শে ডিসেম্বর।
শেষমেষ ১৯৯৫ সালের ২৪শে নভেম্বর পঞ্চম সংসদ ভেঙে দিয়েছিল বিএনপি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ফের নির্বাচন হয়, যা বর্জন করেছিল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি আর বামপন্থি দলগুলো। থামেনি আন্দোলনও। পরে তীব্র আন্দোলনের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আনার জন্যই ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস হয় ১৯৯৬ সালের ২৭এ মার্চ। তিনদিন পর ভেঙে দেয়া হয় মাত্র বারোদিন বয়সী সংসদ। এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে কম বয়সী সংসদ।
বিচারপতিদের বয়সসীমা বিতর্ক
পরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। তবে সেবার আর সংবিধানে কাটাকুটি হয়নি। ২০০১ সালের শেষে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। উদ্যোগ নেয়া হয় চতুর্দশ সংশোধনীর। এতে সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসন ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৪৫টি করা হয়েছিল। সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত সব প্রতিষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি রাখার বিধান করা হয়।
কিন্তু গোল পাকে অন্য জায়গায়। এই সংশোধনীতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়। এই নিয়েই উত্তাল হয়ে ওঠে রাজনীতির ময়দান। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে জটিলতায় রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ শেষপর্যন্ত সংঘাত ও জরুরি অবস্থায় রূপ নেয়। ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর সমর্থনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়, যা 'ওয়ান-ইলেভেন সরকার' নামে পরিচিতি পায়।
এবার বাতিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার
দুই বছরের কাঠখড় পুড়িয়ে ২০০৮ সালের শেষে নির্বাচন হয়। দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতা নেয়ার দুই বছরের মধ্যেই ১৯৭২ সালের সংবিধানের মৌলিক কিছু বিষয় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়। এটিই এ যাবত সংবিধানের সবচেয়ে বড় সংশোধনী।
সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ফিরে আসে। তবে বহাল থাকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতার স্বীকৃতি দেয়া হয়। ফিরে আসে বাহাত্তরের সংবিধানের মূল কাঠামোর রূপ। বাতিল হয় গণভোট। পঞ্চাশটিরও বেশি অনুচ্ছেদকে মৌলিক কাঠামো হিসাবে চিহ্নিত করে সংশোধনের অযোগ্য করা হয়। অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানও করা হয় এই সংশোধনীতে।
এখানেই শেষ নয়। যে অংশটি নিয়ে গত এক দশকেরও বেশি সময় রাজনীতির চায়ের কাপে ঝড় উঠেছে তা হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যে ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা, সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন তোলে আওয়ামী লীগ। বিষয়টি আদালতে গড়ালে ২০১১ সালের মে মাসে সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সর্ম্পকিত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেয়। আদালত অবশ্য বলেছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আরও দু'টি সংসদ নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার সেই সুযোগ না রেখে পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করে দেয়। ফিরিয়ে আনা হয় রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচনী ব্যবস্থা।
বিচারক অপসারণের ক্ষমতা
২০১৪ সালে ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণ বা অব্যাহতি দেয়ার ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনা হয়, যা আগে ছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে। তবে এ নিয়ে সরকারের সাথে আদালতের টানাপোড়েন তৈরি হয় এবং আপিল বিভাগ এই সংশোধনী বাতিল করে দেয়। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর ২০২৪ সালের শেষ দিকে এর রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি হয়। ফলে কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে অসমর্থতা ও পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে তা নিষ্পত্তির ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতেই বহাল থাকে।
সংবিধানে ২০১৮ সালে সপ্তদশ সংশোধনী আসে, যার মাধ্যমে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন আরও ২৫ বছর বহাল রাখার বিধান আনা হয়।
আঠারোতম সংশোধনীর দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ
১৭টি সংশোধনীর পরও বাংলাদেশের সংবিধান কতটুকু গণআকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে এখনও। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুরু করে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ, যার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে সংবিধান সংস্কারের বিষয়।
এজন্য ঐকমত্য কমিশন, জুলাই সনদ অনেক কিছুই হয়। তবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচেনর পর বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি।
সংসদ সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু সেখানে যুক্ত হয়নি বিরোধীরা। শোনা যাচ্ছে আগামী জানুয়ারিতে সংসদে উঠবে সংবিধানের আঠারোতম সংশোধনী।
বিষয়: