বর্ষা বিপ্লব: ৩৬ দিনের মাসটি যেভাবে শুরু হয়েছিলো

দুই বছর পেরিয়েছে। নানা তত্ত্বকথা বেরিয়েছে, ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছে। কিন্তু সংখ্যাই থেকে গেছে নিহতরা। হাজারো তত্ত্বের ভিড়েও লাশ মিথ্যা হয় না। যে বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষায় ৩৬ জুলাই, তা কতোটা পেয়েছে বাংলাদেশ?

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম

আলটিমেটাম শেষ হয়েছে ৩০এ জুন। পহেলা জুলাই সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হন অসংখ্য শিক্ষার্থী।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান ক্যাম্পাসের চারিদিকে। কলাভবন, শ্যাডো ও মল চত্বর হয়ে মাস্টারদা সূর্য সেন হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও বসুনিয়া তোরণ হয়ে আবার টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে ফিরে আসে মিছিল।

দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভ থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‍ধ্বনিত হয় মুখে মুখে। কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাতে ‘থোড়াই কেয়ার’ করছিলো।

সরকার ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ স্লোগানই ছিলো, আওয়ামী লীগ পতনের গোড়াপত্তন।

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে জুলাই মাস ৩১ দিন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইকে বাংলাদেশে বলা হয় ৩৬ দিনের মাস। ৫ই অগাস্ট, যেদিন পতন হয় আওয়ামী লীগের সেদিন শেষ হয় চব্বিশের রক্তাক্ত জুলাই।

কোটা আন্দোলনের শুরু হয়েছিলো ২০১৮ সালে। ওইবার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেয়।

ওই বছরের ১১ই এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বলেন, “যখন কেউই কোটা চায় না, তখন কোন কোটাই থাকবে না।” তিনি বলেন, “কোটা পদ্ধতি বাতিল।”

সংসদে শেখ হাসিনা বলেন, “সংস্কার করতে গেলে কয়েকদিন পর আবার আরেক দল এসে বলবে আবার সংস্কার চাই। কোটা থাকলেই সংস্কার করতে হবে। আর না থাকলে সংস্কারের কোনো ঝামেলাই নাই। কাজেই কোটা পদ্ধতি থাকারই দরকার নাই।”

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ ৫৬ শতাংশ কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করা হয়। কিন্তু কোটা ফের আলোচনায় আসে ২০২৪ সালে।

আদালতে একটি রিট দায়ের হয় কোটা বাতিলের বিরুদ্ধে। শুনানির পর ৫ই জুন সরাসরি চাকরির ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত চাকরিতে কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন উচ্চ আদালত।

ওই রায়ই ফের আলোচনায় আনে কোটা। ওই দিন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী আন্দোলনে নামে।

আদালতের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির ৪ঠা জুলাই তারিখ ঠিক করা হয়। কিন্তু শিক্ষর্থীরা চাইছিলেন নির্বাহী সিদ্ধান্ত।

ঈদের ছুটি হওয়ায় ক্যাম্পাস খালি হয়ে যায়। ১০ই জুন দাবি মানতে সরকারকে ৩০এ জুন পর্যন্ত আলটিমেটাম দিয়ে আন্দোলনে বিরতি টানা হয়।

আলটিমেটাম শেষ হলেই ফের রাজপথ উত্তাল হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবারো স্লোগানে মুখর হয়।

সরকার তখন ক্যাম্পাস বন্ধ করতে চাইছিলো। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তা মেনে নেয়নি।

দৃশ্যপটে শিক্ষকরা

একদিকে শিক্ষার্থীরা যখন কোটাবিরোধী আন্দোলনে ব্যস্ত তখন আলোচনায় ছিলো শিক্ষকদের ’প্রত্যয় স্কিম’।

সেই পহেলা জুলাই থেকেই ওই স্কিম কার্যকর হয়। সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় শিক্ষকদের জন্য ছিলো ‘প্রত্যয়’। যেখানে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছিলো। কিন্তু শিক্ষকরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে।

ওই আন্দোলন ঘিরেই ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয় শিক্ষকরা। কিন্তু কোটাবিরোধী আন্দোলন তাতে স্তিমিত হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়।

সেসময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, “প্রত্যয় স্কিমের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের দাবির সঙ্গে আমরা একাত্মতা পোষণ করি। কিন্তু আমাদের সুযোগ-সুবিধাগুলো যেন বন্ধ না হয়।”

তিনি স্পষ্টতই ঘোষণা দেন, “বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে গ্রন্থাগার খোলা থাকতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে শিক্ষার্থীদের হলসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো হল বন্ধ করা যাবে না, গ্রন্থাগারও বন্ধ করা যাবে না।”

এরপর আর ক্যাম্পাস শান্ত হয়নি। চৌঠা জুলাই পর্যন্ত সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।

এর মধ্যেই আইনি সুরাহার স্পষ্ট দাবি ছিলো তাদের কণ্ঠে। তিনদিনের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। দোসরা জুলাই সারা দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গণপদযাত্রার কর্মসূচির আহ্বান জানানো হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সারজিস আলম বলেছিলেন, “বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মনে করি। তাদের সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনে আরও বৃদ্ধি করা হোক। কিন্তু কোটাবৈষম্য দূর হওয়া প্রয়োজন। আমরা বৈষম্য মেনে নিতে পারি না।”

পঞ্জিকার পাতায় জুলাই

পরদিন ২রা জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে আন্দোলন গড়ায় শাহবাগে। প্রথমে এক ঘণ্টা, পরদিন দেড় ঘণ্টা অবরোধ থাকে শাহবাগ।

চৌঠা জুলাই আপিল বিভাগ শুনানি না করে তা পিছিয়ে দেয়। তাতে আন্দোলন আরও গতি পায়।

আর রাজপথ থেকে ওঠেনি শিক্ষার্থীরা। ক্রমেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ-আন্দোলন। আসে ‘বাংলা ব্লকেড’।

আটই জুলাই ঢাকার ১১টি স্থানে অবরোধ, ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ, ৩টি স্থানে রেলপথ অবরোধ এবং ৬টি মহাসড়ক অবরোধ হয়।

এক দফার দাবি ওঠে। বলা হয়, বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংসদে আইন পাস করতে হবে। আদালত নয় শিক্ষার্থীরা চাইছিলো নির্বাহী সিদ্ধান্ত।

‘তুমি কে আমি কে’

চীন সফরে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ফিরে এসে সংবাদ সম্মেলনে কোটা আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এক প্রশ্নের উত্তরে আন্দোলনকারীদের নিয়ে বলতে গিয়ে ‘রাজাকার’ শব্দের ব্যবহারে ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা।

মধ্যরাতে শিক্ষার্থীরা জড়ো হন টিএসসিতে। স্লোগান দেন ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’, ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার রাজাকার।’

পরে অনেক আন্দোলনকারী ফেইসবুকে লেখেন স্লোগান ছিলো, ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে  বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’।

পরদিন আন্দোলন রূপ নেয় সহিসংতায়। ১৫ই জুলাই ছাত্রলীগ হামলা চালায় আন্দোলনকারীদের ওপর।

হামলায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। হামলার ছবি তুলতে গিয়ে সংবাদকর্মীরা মারধরের শিকার হন। ফুঁসে ওঠে শিক্ষার্থীরা।

অতঃপর আবু সাঈদ ও ওয়াসিম

আন্দোলনের পালে হাওয়া লাগে ১৬ই জুলাই। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবু সাঈদ প্রাণ হারান পুলিশের গুলিতে।

একইদিন আন্দোলনকারীদের সাথে ছাত্রলীগের সংঘর্ষে মারা যান ছাত্রদলকর্মী ওয়াসিম। ওইদিন মোট ৬ জন মারা যান।

এরপর থেকে পুলিশের গুলি থামেনি। আন্দোলনও থামেনি।

পরের ঘটনাতো সবারই জানা। কারফিউ এসেছে, ইন্টারনেট বন্ধ হয়েছে, ব্ল্যাকআউট করা হয়েছে পুরো দেশ।

বিপরীতে পুলিশ হত্যা হয়েছে, আগুন লাগানো হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনায়। সারা দেশ হয়ে উঠেছিলো রণক্ষেত্র।

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চৌহদ্দি পেরিয়ে হয়ে ওঠে ছাত্র-জনতার আন্দোলন। সেনাবাহিনী গুলি না চালানোর ঘোষণা আসে।

অতঃপর এক দফা। ক্যালেন্ডারের পাতায় ৫ই অগাস্ট, লাখো ছাত্র-জনতার কাছে, ৩৬ জুলাই। দেশ ছেড়ে যান শেখ হাসিনা। পতন হয় দেড় দশকের সাম্রাজ্য।

এরপর দুই বছর পেরিয়েছে। নানা তত্ত্বকথা বেরিয়েছে, ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছে। কিন্তু সংখ্যাই থেকে গেছে নিহতরা। হাজারো তত্ত্বের ভিড়েও লাশ মিথ্যা হয় না। যে বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষায় ৩৬ জুলাই, তা কতোটা পেয়েছে বাংলাদেশ?