পয়লা জুলাই ২০১৬। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি ২০২৬ সালে—হলি আর্টিসান বেকারিতে ঘটে যাওয়া সেই নৃশংসতম জঙ্গি হামলার পুরো দশ বছর পূর্ণ হলো আজ। এক দশক কম সময় নয়, কিন্তু আমার স্মৃতিতে সেই রাতের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি ফ্ল্যাশিং লাইট আজও এতটাই জীবন্ত যে মনে হয় এই তো সেদিনের কথা।
রমজান মাসের শেষ দিক। চারদিকে ঈদের আমেজ। ঢাকা শহরজুড়ে তখন উৎসবের প্রস্তুতি, কেনাকাটার ধুম। আমি তখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইংলিশ নিউজ সার্ভিসের একজন কর্মী।
সেই শুক্রবারটিতে আমার অফ-ডে ছিল। পেশাগত ব্যস্ততা একপাশে সরিয়ে রেখে আর দশটা সাধারণ মানুষের মতোই ঈদের কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিলাম ঢাকার রাস্তায়। কিন্তু নিয়তি বোধহয় একজন সাংবাদিককে কখনোই পুরোপুরি ‘অফ-ডে’ উপভোগ করতে দেয় না।
শপিংয়ের মাঝেই হুট করে একটা ফোন এলো। পরিচিত একজন জানালেন, গুলশানের কোনো এক রেস্তোরাঁয় নাকি গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। প্রথম শুনতেই খটকা লাগল। গুলশানের মতো একটা কূটনৈতিক ও সুরক্ষিত এলাকায় গোলাগুলি? সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলাম নিউজরুমে। শিফটে থাকা সহকর্মীদের জিজ্ঞেস করলাম, "গুলশানের কোনো খবর পাচ্ছো?" ওপাশ থেকে তখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই, কেবল প্রাথমিক কিছু গুঞ্জন পৌঁছাতে শুরু করেছে।
একই সময়ে ঢাকার অন্য প্রান্তেও সাধারণ মানুষের গল্পগুলো বদলে যাচ্ছিল। যেমন সাংবাদিক শেরিফ আল সায়ার পরে লিখেছিলেন, সেদিন তার পরিবারও গুলশান-বনানীর দিকেই ইফতার করার পরিকল্পনা করছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার মায়ের আপত্তিতে প্ল্যানটি বাতিল হয়। রাত ৯টার দিকে তিনিও যখন খবর পান যে ৭৯ নম্বর রোডের লেকভিউ ক্লিনিকের পাশের রেস্তোরাঁটিতে কোনো বড় 'ঝামেলা' হয়েছে, তখনো কেউ ভাবেনি এটি আসলে একটি পরিকল্পিত ও ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ আত্মঘাতী জঙ্গি হামলা।
নিউজরুম ম্যানেজার হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল ডেস্ক সামলানো; অন-স্পট রিপোর্টিং আমার আনুষ্ঠানিক ডিউটি ছিল না। কিন্তু ভেতরের সেই চিরন্তন ‘জার্নালিস্টিক ইন্সটিংক্ট’ বা সাংবাদিকতার তাড়না আমাকে ঘরে ফিরে যেতে দিল না। হাতের শপিং ব্যাগগুলো কোনোমতে একপাশে রেখে সোজা রওনা হলাম গুলশান-২ নম্বরের দিকে। আমি জানতাম না, আমি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার এক রাতের সাক্ষী হতে যাচ্ছি।
গুলশানের সেই থমথমে বাতাস ও প্রথম ধাক্কা
আমি যখন গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বর পার হয়ে হোলি আর্টিসানের সংলগ্ন লেক রোডের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছি, ততক্ষণে পুরো এলাকার চেহারা বদলে গেছে। ঈদের আনন্দের বদলে বাতাসে তখন এক তীব্র, অবর্ণনীয় আতঙ্ক। পুলিশ এবং র্যাবের গাড়িগুলো সাইরেন বাজিয়ে ছুটে চলেছে। সাধারণ মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে উল্টো পথে ছুটছে। ৭৯ নম্বর রোডের মুখে যখন পৌঁছালাম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ততক্ষণে চারপাশ কর্ডন (ঘেরাও) করা শুরু করেছে।
সেখানে ডিউটিরত রিপোর্টারদের সাথে আমার দেখা হলো। সবার চোখে-মুখে তখন একাধারে তথ্যের ক্ষুধা আর চরম বিস্ময়। ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রথম বড় ধাক্কাটা এলো। ভেতর থেকে জঙ্গিদের ছোঁড়া গ্রেনেড আর বৃষ্টির মতো গুলির শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। একটু পরেই দেখলাম, রক্তাক্ত অবস্থায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ধরাধরি করে বের করে আনা হচ্ছে।
খুব কাছ থেকে দেখলাম সহকারী কমিশনার (ডিবি) রবিউল ইসলাম এবং বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন খানকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চোখের সামনে চেনা পুলিশ কর্মকর্তাদের এভাবে লুটিয়ে পড়তে দেখে উপস্থিত সাংবাদিকদের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধতা নেমে এসেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই আবার শুরু হলো পেশাগত দায়িত্বের তাড়না।
নিউজরুমের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
স্পটে দাঁড়িয়ে যখন আমি ভেতরের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি, তখন আমার মাথায় ঘুরছিল নিউজরুমের কথা। একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের জন্য এই ধরনের ‘লাইভ ক্রাইসিস’ সামলানো কতটা কঠিন, তা কেবল একজন নিউজ এডিটরই জানেন। একদিকে তথ্যের দ্রুততম প্রকাশ, অন্যদিকে তথ্যের শতভাগ নির্ভুলতা—এই দুয়ের মধ্যে এক চুল পরিমাণ ভারসাম্য নষ্ট হলেই মারাত্মক বিপর্যয় ঘটতে পারে।
বিশেষ করে ইংরেজি সার্ভিসের ক্ষেত্রে দায়িত্বটা ছিল আরও সংবেদনশীল, কারণ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং ঢাকায় বিদেশি দূতাবাসগুলো তখন আমাদের ওয়েবসাইটের দিকে চোখ রেখে বসে ছিল। মধ্যরাতের দিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠল। ডেস্কে থাকা সহকর্মীরা আমাকে জানাচ্ছিল যে, আন্তর্জাতিক কিছু জঙ্গি নজরদারি গ্রুপ দাবি করছে আইএস এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। শুধু তাই নয়, রেস্তোরাঁর ভেতরের নৃশংসতার কিছু ভয়াবহ ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
আমরা এক চরম নৈতিক ও পেশাগত সংকটে পড়েছিলাম। স্পটে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছিলাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মিডিয়াকে লাইভ সম্প্রচার বন্ধ করার অনুরোধ জানাচ্ছে, কারণ ভেতরে থাকা জঙ্গিরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাইরের সব মুভমেন্ট ট্র্যাক করছিল। নিউজরুমে বসে আমাদের টিমকে তখন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছিল—কোন তথ্য প্রকাশ করা যাবে আর কোনটা যাবে না, কোন তথ্যটা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ আর কোনটা জনগণের জানার অধিকার। স্পট থেকে আমি রিপোর্টারদের দেওয়া তথ্য আর নিজের চোখের দেখা পরিস্থিতি মিলিয়ে ডেস্কে ইনপুট দিচ্ছিলাম, যাতে কোনোভাবেই কোনো গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য আমাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে না পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও ভেতরের সেই নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ
সেই দীর্ঘ রাতে স্পটে দাঁড়িয়ে এবং পরবর্তী দিনগুলোতে বেঁচে ফেরা জিম্মি ও রেস্তোরাঁর স্টাফদের কাছ থেকে আমরা যে বিবরণগুলো পেয়েছিলাম, তা যেকোনো সুস্থ মানুষকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আজ ১০ বছর পরও সেই বিবরণগুলো মনে পড়লে গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে।
ক্রাইম রিপোর্টার নুরুজ্জামান লাবুর অনুসন্ধানী বিবরণী এবং ‘হোলি আর্টিজান: একটি জার্নালিস্টিক অনুসন্ধান’ থেকে জানা যায় কীভাবে পুরো হামলাটি নিখুঁত ও ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করা হয়েছিল। হোলি আর্টিসানের শেফ ও স্টাফদের একাংশ পেছনের ছাদ দিয়ে লাফিয়ে পড়ে প্রাণে বেঁচেছিলেন। তাদেরই একজন পরে জানিয়েছিলেন, রাত ৯টা ২০ মিনিটের দিকে যখন একঝাঁক তরুণ "আল্লাহু আকবার" ধ্বনি দিয়ে ভেতরে ঢোকে, তখন কেউ ভাবতেই পারেনি এরা কাস্টমার নয়, যমদূত। তারা একে-টুয়েন্টি টু রাইফেল, পিস্তল আর ধারালো চাপাতি নিয়ে ডাইনিং রুমে তাণ্ডব শুরু করে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ছিল জিম্মিদের আলাদা করার সেই প্রক্রিয়া। জঙ্গিরা দেশি এবং বিদেশি নাগরিকদের আলাদা করেছিল। বেঁচে যাওয়া একজন স্টাফের বয়ানে জানা যায়, জঙ্গিরা বাংলাদেশি মুসলিমদের আশ্বস্ত করে বলেছিল, "আমরা শুধু বিদেশিদের মারতে এসেছি।" তারা জিম্মিদের কোরআনের আয়াত পড়তে বলেছিল। যারা পেরেছিল, তাদের কিছুটা সমীহ করা হলেও, বাকিদের ওপর চালানো হয়েছিল মধ্যযুগীয় বর্বরতা। ডাইনিং টেবিলের নিচে, চেয়ারের পাশে রক্তের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। আর সেই নারকীয় উল্লাসের মাঝেই জঙ্গিরা রেস্তোরাঁর ওয়াইফাই ব্যবহার করে লাশের ছবিগুলো বাইরে পাঠাচ্ছিল। স্পটে দাঁড়িয়ে যখন আমরা ভবনের ভেতরের থমথমে অন্ধকার দেখছিলাম, তখন ভাবতেও পারিনি মাত্র কয়েক গজ দূরে এতটা নৃশংসতা সয়ে নিচ্ছিল মানবতা।
সাইফুলের ট্র্যাজেডি এবং অপারেশনাল খণ্ডচিত্র
এই দশ বছরে হোলি আর্টিসান নিয়ে বহু বিশ্লেষণ হয়েছে, যার মধ্যে অনেক নির্দোষ মানুষের ট্র্যাজেডিও জড়িয়ে আছে। এমন একটি ঘটনা সেদিন স্পটে থাকা আমাদের মতো সাংবাদিকদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল, যা আমাদের পেশাগতভাবে অনেক বেশি সতর্ক হতে শিখিয়েছে।
সেটি হলো হোলি আর্টিসানের পিৎজা শেফ সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের ট্র্যাজেডি। পরদিন সকালে যখন সামরিক অভিযান শুরু হয়, তখন চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে সাইফুল রান্নাঘর থেকে বাঁচার জন্য দৌড়ে বের হচ্ছিলেন। কিন্তু সেই ঝড়ের গতিতে চলা অপারেশনের মুখে কমান্ডোরা তাকে হামলাকারী ভেবে গুলি করেন। পরে তদন্তে প্রমাণিত হয় সাইফুল নির্দোষ একজন কর্মচারী ছিলেন। এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, যুদ্ধের ময়দানে বা এই ধরনের কাউন্টার-টেররিজম অপারেশনের সময় লাইভ রিপোর্টিং কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং কত দ্রুত দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে। স্পটে দাঁড়িয়ে পরদিন সকালে যখন জিম্মিদের এবং স্টাফদের একে একে উদ্ধারের খবর আসছিল, তখন এই ধরণের বিভ্রান্তি ও জটিলতা মাঠের সাংবাদিকদের প্রতি মুহূর্তে এক মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে রাখছিল।
‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’
রাত গড়িয়ে যখন ভোর হলো, তখন গুলশানের আকাশে কুয়াশা আর বারুদের গন্ধের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। আমরা সারারাত এক ফোঁটা চোখের পাতা এক করতে পারিনি। গণমাধ্যমগুলো তখন ঢাকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কাভারেজ দিচ্ছে। সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর ১ম প্যারা-কমান্ডো ব্যাটালিয়নের নেতৃত্বে শুরু হলো ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’।
সাঁজোয়া যান নিয়ে কমান্ডোরা রেস্তোরাঁর দেয়াল ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করছে। চারদিক প্রচণ্ড গোলাগুলি আর বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠল। মাত্র ১৩ মিনিটের সেই মূল অভিযান। এরপর যখন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চারপাশ শান্ত হলো, তখন জানা গেল ভেতরের সবকজন হামলাকারী মারা গেছে।
কিন্তু ভেতরের মূল দৃশ্যটি যখন একে একে গণমাধ্যমে আসতে শুরু করল, তখন পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে গেল। বিশজন জিম্মির রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হলো, যাদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, যারা বাংলাদেশের মেট্রোরেল প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছিলেন, একজন ভারতীয় এবং তিনজন বাংলাদেশি। জাপানি নাগরিকদের সেই নিথর দেহগুলোর কথা ভেবে আজ এক দশক পরও অপরাধবোধ হয়—যারা আমাদের দেশের উন্নয়নের জন্য এসেছিলেন, তাদের আমরা নিরাপত্তা দিতে পারিনি সেদিন।
রাজনীতি, শব্দার্থ ও ‘জঙ্গি’ তত্ত্বের ১০ বছরের টানাপোড়েন
আজ ১০ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে যখন এই ঘটনার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের দিকে তাকাই, তখন এক অদ্ভুত ও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। হলি আর্টিসানের সেই ঘটনার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশজুড়ে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে এবং জঙ্গিবাদ দমনের কৃতিত্ব দাবি করে। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্র এবং প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই 'জঙ্গি' শব্দটিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই এক দশকে প্রশ্ন উঠেছে—দেশে আসলে ‘জঙ্গি’ আছে নাকি নাই? নাকি পুরোটাই ছিল একটা রাজনৈতিক হাতিয়ার?
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলীর কাছে যখন হলি আর্টিসান হামলার বার্ষিকীতে জঙ্গিবাদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাওয়া হয়, তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, "দেশে কোনো জঙ্গি নাই, এখন ঠেকাতে হবে ছিনতাই। জঙ্গি থাকলে না জঙ্গি নিয়ে ভাবব। আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ছেলেপেলেদের মারছে, কীসের জঙ্গি?" এমনকি হলি আর্টিসান হামলা সাজানো ঘটনা ছিল কিনা—এমন প্রশ্নে তার উত্তর ছিল, "ওটা সম্পর্কে আমি জানি না; তবে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নাই।"
বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ একটি অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে বলেন, "আমি ওই শব্দকে (জঙ্গি) রিকগনাইজ করি না। আমাদের দেশে এরকম কোনো তৎপরতা নেই... আগে সেই শব্দটা উচ্চারিত হত ফ্যাসিবাদী আমলের সময়; তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত।"
তবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কিন্তু ভিন্ন এক বিপদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেছেন, "বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিটেন্সি-জঙ্গিবাদ ছিল, আছে। সেটাকে আমরা আসলে কমব্যাট করতে চাই।" তিনি আরও সতর্ক করে বলেন যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের ‘ট্রানজিশন পিরিয়ডে’ এই প্রবণতার মানুষদের ‘ওপেনলি’ বা ‘পাবলিকলি’ আসার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা খানিকটা ঝুঁকি তৈরি করছে। এর আগে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধানরাও বারবার বলে গেছেন যে, অভিযানের ফলে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক দুর্বল হলেও 'জঙ্গিবাদের বীজ' বা মতাদর্শের শেকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি।
এই স্ববিরোধী ও বিভ্রান্তিকর বয়ান আজ দশ বছর পর আমাদের এক গভীর ভাবনায় ফেলে। এক পক্ষ যখন একে বিগত সরকারের 'রাজনৈতিক নাটক বা ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার' বলে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিতে চায়, অন্য পক্ষ তখন এর সুপ্ত ও পুনরুত্থিত ঝুঁকি নিয়ে সতর্কবার্তা দেয়। কিন্তু একজন সাংবাদিক হিসেবে, যে সেদিন গুলশানের বাতাসে বারুদের গন্ধ শুঁকেছিল, যে চোখের সামনে লাশ স্ট্রেচারে করে নিয়ে যেতে দেখেছিল—তার কাছে বিষয়টিকে স্রেফ ‘শব্দার্থের লড়াই’ বা ‘রাজনৈতিক ফায়দা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া অসম্ভব। সেদিন দেশি-বিদেশি নাগরিকদের যে রক্ত গুলশানের মাটিতে মিশে গিয়েছিল, তা কোনো 'নাটক' ছিল না। তা ছিল এক নির্মম, বাস্তব এবং ভয়াবহ ট্র্যাজেডি।
১০ বছর পর একজন গণমাধ্যমকর্মীর আত্মোপলব্ধি
২০১৬ সালের সেই ১লা জুলাইয়ের রাতটিকে আমার ক্যারিয়ারের এবং ব্যক্তিগত জীবনের অন্যতম একটা টার্নিং পয়েন্ট । হামলার পর বেশ কয়েক মাস ধরে এক অদ্ভুত ট্রমা কাজ করত মনে। শেরিফ আল সায়ার যেভাবে তার ব্লগে উল্লেখ করেছিলেন, "আশেপাশে পরিপাটি, স্মার্ট কোনো ছেলের কাঁধে ব্যাগ দেখলেই বুকটা কেঁপে উঠত, রাতে ঘুম আসত না"—ঠিক একই ধরনের এক মনস্তাত্ত্বিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাদের অনেককেই। ‘আমি যদি সেদিন ওদিকে যেতাম?’ কিংবা ‘আমার কোনো প্রিয়জন যদি সেখানে থাকত?’— এই ভাবনাগুলো দীর্ঘ দিন তাড়া করেছে।
সেই রাতের পর বাংলাদেশের মিডিয়া ল্যান্ডস্কেপ চিরতরে বদলে গেছে। ক্রাইসিস রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে আমরা আরও অনেক বেশি পরিপক্ব, দায়িত্বশীল এবং সংবেদনশীল হতে শিখেছি। লাইভ সম্প্রচারের সীমা কতটুকু, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তথ্যের প্রবাহকে কীভাবে ফিল্টার করতে হয়—এই শিক্ষাগুলো আমরা পেয়েছিলাম অত্যন্ত চড়া মূল্যের বিনিময়ে।
রাজনৈতিক বয়ান যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, অথবা ‘জঙ্গি’ শব্দের সংজ্ঞা নিয়ে আজ টেবিলে যতই বিতর্ক চলুক—১লা জুলাইয়ের সেই ক্ষত বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। সময়ের আবর্তনে নিহত পুলিশ কর্মকর্তাদের স্মরণে গুলশান থানার সামনে নির্মিত ভাস্কর্য 'দীপ্ত শপথ' হয়তো ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং তা আর পুনর্নির্মাণ করা হয়নি, হয়তো বা এবার ঘটনাস্থলে শ্রদ্ধা জানানোর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিও আর নেই—কিন্তু মানুষের স্মৃতির মিনার ভাঙা অত সহজ নয়।
আমি হয়তো সেদিন অফ-ডিউটিতে ছিলাম, হয়তো আমার গুলশানে যাওয়ার কোনো এসাইনমেন্ট ছিল না। কিন্তু একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে সেদিন যে নাগরিক ও পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকে ছুটে গিয়েছিলাম, তার রেশ আমার বাকি জীবনের সাংবাদিকতায় থেকে যাবে। হলি আর্টিসানের সেই ২০ জন জিম্মি এবং দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মৃতি আজ ১০ বছর পরও অম্লান। এই আত্মত্যাগ মনে করিয়ে দেয়—মতাদর্শ বা রাজনীতির সমীকরণ ডেস্কে বসে পাল্টে ফেলা যতোই সহজ হোক না কেন, মাঠের সাংবাদিকতা ও সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর দায়বদ্ধতা চিরকাল একই থাকে।



