চীনের ডালিয়ান সামার ডাভোস সম্মেলনে যোগদান শেষে ট্রেনে চড়ে বুধবার বিকেলে রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
বিকেলে বেইজিংয়ের চাউমিং রেলওয়ে স্টেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণীকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নতুন সরকারের প্রথম বিদেশ সফরটি ভারত নাকি চীন হবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক পাড়ায় যখন তুমুল জল্পনা-কল্পনা আর স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল, ঠিক তখনই এক চরম চমক দেখাল ঢাকা।
দুই পরাশক্তিকে একপাশে রেখে প্রধানমন্ত্রী তার প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নিলেন মালয়েশিয়াকে, আর সেখান থেকেই সরাসরি উড়াল দিলেন চীনে।
মালয়েশিয়াকে দিয়ে সফর শুরু করার এই দারুণ কৌশলী চাল এবং এরপর বেইজিংয়ে তিন দিনের এই হাই-প্রোফাইল রাষ্ট্রীয় সফরকে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে পুরো এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গন আর সংবাদমাধ্যমগুলোতে চলছে জোর আড্ডা আর চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ঢাকার এই ‘চীন যাত্রা’ কোন দেশ কেমন চোখে দেখছে, তা সেদেশগুলোর সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালে আন্দাজ পাওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা, অবিশ্বাস আর চালের এক ভূ-রাজনৈতিক দাবার ছক।
চীনের সরকারি বয়ান: উন্নয়ন আর বিআরআই’র চেনা সুর
চীনের মূল ভূখণ্ডের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরকে খুব গোছানো একটা চেনা ছকে তুলে ধরেছে। গেল দুই বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিশাল ওলটপালট হয়ে গেছে, বেইজিংয়ের মিডিয়াগুলো যেন সচেতনভাবেই সেটাকে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতার ওপর জোর দিয়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া তাদের প্রতিবেদনে দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিষয়টি সামনে এনেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুনের ব্রিফিংয়ের বরাতে সিনহুয়া বাংলাদেশকে একটি "ঐতিহ্যগত বন্ধুভাবাপন্ন প্রতিবেশী এবং কৌশলগত অংশীদার" হিসেবে বর্ণনা করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সরাসরি আমন্ত্রণে এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানো এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর কাজকে এগিয়ে নেওয়া।
সিনহুয়া দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে যতটা বড় করে দেখিয়েছে, বাংলাদেশের ভেতরের রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে ঠিক ততটাই এড়িয়ে গিয়েছে।
একই সুরে চীনের আন্তর্জাতিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সিজিটিএন পুরো সফরটিকে দেখছে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপট থেকে।
ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত 'সামার ডাভোস' সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক উদারীকরণ নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখিয়েছে সিজিটিএন। তাদের আলোচনা ও প্রতিবেদনে এই সম্পর্ককে দুই পক্ষের জন্যই লাভজনক একটা পার্টনারশিপ হিসেবেই দেখানো হচ্ছে।
বেইজিংকে এমন এক ‘ট্রাস্টেড পার্টনার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যারা কোনো রাজনৈতিক শর্ত ছাড়াই বাংলাদেশের অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে টাকা বিনিয়োগ করতে রাজি।
‘ইন্ডিপেনডেন্ট ব্যালেন্সিং পলিসি’
রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমের চেনা ছকের বাইরে গিয়ে চীনের কিছু আধা-সরকারি কলাম ও থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো বাংলাদেশের নতুন সরকারকে নিয়ে কিছুটা বিশ্লেষণ করেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় নীতিমালার সমান্তরালে চলা পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’-এর এক সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে বাংলাদেশের নির্বাচন-পরবর্তী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কথা বলেছে।
ঢাকার এই ক্ষমতা বদলকে কোনো একক পরাশক্তির লাভ বা ক্ষতি হিসেবে না দেখে, গ্লোবাল টাইমস একে তারেক রহমান সরকারের একটি 'ইন্ডিপেনডেন্ট ব্যালেন্সিং পলিসি' অর্থাৎ স্বাধীন ভারসাম্য নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী আবেগ দিয়ে না চলে একটি বাস্তবসম্মত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি নিয়ে এগোচ্ছেন।
পত্রিকাটি বেশ ইতিবাচকভাবেই বলছে যে, বাংলাদেশের নতুন সরকার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের এই ভরসা দিতে পেরেছে যে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার মানে এই নয় যে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঢাকার পুরনো ও জরুরি অর্থনৈতিক সম্পর্কটি নষ্ট হয়ে যাবে। পাশাপাশি, 'সাংহাই ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাস স্টাডিজ' (এসআইআইএস)-এর মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের বরাতে বলা হচ্ছে, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের স্বার্থেই বেইজিং একটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ঢাকাকে পাশে চায়।
‘স্ট্র্যাটেজিক রুট’ এবং হংকং মিডিয়ার চোখে কিছু খটকা
চীনের মূলধারার সরকারি মিডিয়ার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও একটু ‘ক্রিটিকাল’ দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে হংকংভিত্তিক নামকরা সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর প্রতিবেদনে। তারা প্রধানমন্ত্রীর এই প্রথম বিদেশ সফরের খুঁটিনাটি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে বেশ চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের একটা দারুণ পর্যবেক্ষণ ছিল সফরের 'টাইমিং' বা ‘রুট’ নিয়ে। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরেই ভারতের মাটিতে পা না রেখে, প্রথমে মালয়েশিয়া এবং তারপর সরাসরি চীন সফর করাকে আঞ্চলিক বিশ্লেষকেরা ঢাকার একটা সচেতন ও কৌশলী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন, বলে তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পত্রিকাটি বলছে, প্রথম সফরেই নয়াদিল্লিকে তালিকায় না রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিকে আর কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের প্রথাগত প্রভাব বলয়ে আটকে রাখতে রাজি নয়।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে প্রতিরক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়েও কিছু ভেতরের খবর ও গুঞ্জন উঠে এসেছে। যেমন, চীন ও পাকিস্তানের যৌথ প্রযুক্তিতে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের ফ্লাইট সিমুলেটর সাপোর্টের মতো বিষয়গুলো।
পত্রিকাটির বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা একে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বললেও, নয়াদিল্লির জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। কারণ ভারতের পূর্ব সীমান্তে এবং বঙ্গোপসাগরের আকাশ ও জলসীমায় যেকোনো ধরনের কৌশলগত নড়াচড়াকে দিল্লি সবসময় কড়া নজরে রাখে।
দিল্লির চোখে কেবলই সংশয় আর কড়া নজরদারি
বেইজিংয়ের এই সহযোগিতার চেনা সুরের ঠিক উল্টো পিঠে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফরকে বেশ সন্দেহের চোখে এবং কড়া নজরদারির সাথে দেখছে।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে এবং সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) তাদের রিপোর্টে স্পষ্ট বলেছে যে, এই সফরটি ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের "পরবর্তী ধাপের রূপরেখা" তৈরি করবে, যার ওপর দিল্লির কড়া নজর রয়েছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকেরা ২০২৪ সালের শেষের দিকে শেখ হাসিনার আকস্মিক ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ টেনে বলছেন, ওই ঘটনা নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের চেনা প্রতিবেশ নীতিকে বেশ বড় একটা ধাক্কা দিয়েছিল।
দিল্লির কূটনৈতিক প্রতিবেদকেরা এখন খতিয়ে দেখছেন যে, বাংলাদেশ সরকার চীনের 'গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (জিডিআই)-এ আনুষ্ঠানিকভাবে পা বাড়াচ্ছে কি না। একই সাথে, আরসিইপি, এসসিও এবং ব্রিকস-এর মতো বড় বড় আঞ্চলিক জোটে যোগ দেওয়ার জন্য ঢাকার পক্ষ থেকে বেইজিংয়ের জোরালো সমর্থন চাওয়ার বিষয়টিকেও ভারতের মিডিয়া বেশ উদ্বেগের সাথে দেখাচ্ছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এর ফলে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে ভারতের যে চিরাচরিত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দাপট ছিল, তা হয়তো অনেকটাই কমে যেতে পারে।
আসিয়ান সাপ্লাই চেইন ও মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ান অঞ্চলের সংবাদমাধ্যমগুলো, বিশেষ করে মালয়েশিয়ার দ্য স্টার ও নিউ স্ট্রেইটস টাইমস এবং সিঙ্গাপুরের চ্যানেল নিউজএশিয়া (সিএনএ), প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দুই দেশ সফরকে কোনো রাজনৈতিক চোখে না দেখে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখছে।
আসিয়ান অঞ্চলের মিডিয়াগুলোর মতে, এই সফরটি কোনো আদর্শিক জোট গঠনের ব্যাপার নয়, বরং পূর্ব এশিয়ার ম্যানুফ্যাকচারিং ও সাপ্লাই চেইনের সাথে বাংলাদেশকে জোড়া দেওয়ার একটা বাস্তবসম্মত চেষ্টা।
২০২৯ সালে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময় যত এগিয়ে আসছে, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের গণমাধ্যমগুলো বলছে যে, আরসিইপি জোটে ঢোকার জন্য ঢাকার এই দৌড়ঝাঁপ খুবই সময়োপযোগী।
প্রথমে আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ দেশ মালয়েশিয়া এবং ঠিক পরপরই চীনের মতো অর্থনৈতিক পরাশক্তির সাথে বৈঠক করে তারেক রহমান আসলে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারকে আসিয়ানের সামুদ্রিক বাণিজ্য পথের সাথে যুক্ত করার একটা অর্থনৈতিক সেতু বানাতে চাইছেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের মিডিয়ার এই নানামুখী বিশ্লেষণ থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশ এখন তার বৈদেশিক কূটনীতিতে বেশ বাস্তবসম্মত একটা চাল চালতে শুরু করেছে।
বেইজিং যেখানে একে দেখছে ব্যবসার নতুন সুযোগ হিসেবে, আর দিল্লি যেখানে নজর রাখছে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য হারানোর ভয়ে; বিশ্লেষকদের চোখে এর আসল রূপটি অনেক বেশি সোজা-সাপ্টা। এটি আসলে একটি সময়োপযোগী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ অর্থনৈতিক মিশন, যার লক্ষ্য ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কাটানোর জন্য জরুরি আন্তর্জাতিক পুঁজি ও সমর্থন জোগাড় করা।





