একদিকে হোটেলে গেলেন বিদেশি পাসপোর্টধারীরা, অন্যদিকে লাউঞ্জেই থেকে গেলেন ১৭৪ বাংলাদেশি। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের দুর্ভোগে যোগ হয় খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়ে উদ্বেগ।
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৬ পিএমআপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৩ পিএম
কেউ চেয়ারে বসে পার করছেন দুই রাত, কেউ সেই চেয়ারটুকুও না পেয়ে বসেছেন ঠান্ডা মেঝেতেই।
ছোট্ট এক শিশুকে কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছেন এক মা। পাশে বয়স্ক যাত্রী। বিমানে থাকা কারও লাগেজে আটকে আছে প্রয়োজনীয় ওষুধ। কারও চোখে ঘুম নেই। কেউ চেয়ারে বসে পার করছেন দুই রাত, কেউ সেই চেয়ারটুকুও না পেয়ে বসেছেন ঠান্ডা মেঝেতেই।
একজন বলছেন, “তিন রাত ঘুমাইনি।” আরেকজনের অভিযোগ, “না খেয়ে, না ঘুমিয়ে আছি।” কেউ আবার বলছেন, “আমরা উদ্বাস্তুর মতো হয়ে গেছি।”
অথচ এরা কেউ উদ্বাস্তু নন। ইউক্রেন বা ইরানের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসেননি তারা। এমনকি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের পুশইন-পুশব্যাকের মাঝে নোম্যানস ল্যান্ডে আটকে যাওয়া মানুষের চিত্রও এটা নয়।
এরা সবাই পয়সা খরচ করে ভ্রমণ করছিলেন বাংলাদেশ বিমানের আধুনিকতম এয়ারক্রাফটে। প্রথমে বলা হয়েছিল, এক থেকে সোয়া ঘণ্টার মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
ঘড়ির কাঁটা চলেছে। রোমের লিওনার্দো দা ভিঞ্চি-ফিউমিচিনো বিমানবন্দরের ব্যস্ততা চলেছে। থেমে ছিল শুধু তাদের যাত্রাটাই।
বিমানবন্দরে থেকেও যেন সীমান্তের ওপারে
এই ঘটনার সবচেয়ে অদ্ভুত দিক ছিল, যাত্রীরা ইতালিতে পৌঁছেও যেন ছিলেন ইতালির বাইরে।
বিমান থেকে নেমেছেন, কিন্তু বিমানবন্দরের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। বাইরে রোমের রাত, অথচ ভেতরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল লাউঞ্জের চেয়ার ও মেঝে।
এই জায়গাতেই টম হ্যাঙ্কস অভিনীত ‘দ্য টার্মিনাল’ সিনেমার সঙ্গে ঘটনাটির অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
পার্থক্য হলো, সিনেমার গল্পটি ছিল কল্পনা। রোমে আটকে পড়া এই বাংলাদেশিদের জন্য সেটিই হয়ে উঠেছিল বাস্তব।
সিনেমার চরিত্রের হাতে ছিল গল্প। এই যাত্রীদের হাতে ছিল টিকিট, পাসপোর্ট আর বাড়ি ফেরার অপেক্ষা।
টরন্টো থেকে উড়ল বিমান, রোমে থেমে গেল যাত্রা
বাংলাদেশ বিমানের বিজি-৩০৬। টরন্টো-রোম-ঢাকা রুটের নিয়মিত ফ্লাইট। ২৫৯ জন যাত্রী নিয়ে বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনারটি বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে উড়েছিল।
সূচি অনুযায়ী, রোমে কিছু সময়ের জন্য থামবে, জ্বালানি নেবে, তারপর আবার আকাশে উঠবে।
কিন্তু টরন্টো থেকে প্রায় আট ঘণ্টা উড়ার পর শুক্রবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে রোমের বিমানবন্দরে অবতরণের পর বদলে গেল পুরো গল্প।
বিমানে ধরা পড়ল কারিগরি ত্রুটি। উড়োজাহাজটি হয়ে গেল ‘এয়ারক্রাফট অন গ্রাউন্ড’ বা এওজি। অর্থাৎ, আর উড়তে পারবে না।
তখনও যাত্রীরা ভাবেননি, একটি কারিগরি ত্রুটি বদলে দেবে তাদের পরের দুই দিনের জীবন।
প্রথম কয়েক ঘণ্টা এসি ছাড়া বিমানে আটকে থাকার পর লাউঞ্জে ঠাঁই হলো। যাত্রীদের মধ্যে যাদের বিদেশি পাসপোর্ট বা প্রয়োজনীয় শেনজেন ভিসা ছিল, তারা দীর্ঘ অপেক্ষার পর হোটেলে যাওয়ার সুযোগ পান।
কিন্তু প্রায় ১৭৪ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীর সামনে তখন বন্ধ ইমিগ্রেশনের দরজা। না এয়ারক্রাফট, না হোটেল দুই দরজাই বন্ধ।
এক ঘণ্টার অপেক্ষা গড়াল দুই দিনে
বিমান থেকে নামার পর যাত্রীদের বলা হয়েছিল, “এক থেকে সোয়া ঘণ্টার মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
সেই আশ্বাস নিয়েই অপেক্ষা শুরু। এক ঘণ্টা গেল, দেড় ঘণ্টা গেল, তারপর কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু সেই ‘এক ঘণ্টা’ আর শেষ হলো না।
যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানের ভেতরেই তাদের প্রায় আট ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় এসি নিয়েও সমস্যা ছিল বলে অভিযোগ করেন তারা। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকার কারণে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
একজন যাত্রীর জন্য কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা হয়তো কষ্টকর। কিন্তু তিন রাত ঘুম না হওয়া একজন বৃদ্ধার জন্য সেটি কতটা কঠিন, তা বোঝা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে।
সেখানে ওই নারী যাত্রীকে বলতে শোনা যায়, “তিন রাত ঘুমাইনি।”
আরেক যাত্রী বলেন, “সবচেয়ে অবস্থা খারাপ যারা একা যাত্রী। বিশেষ করে বয়স্ক মহিলা এবং পুরুষ যারা আছেন।”
এই ফ্লাইটে পাঁচ থেকে সাত মাস বয়সী কয়েকটি শিশুও ছিল। তাদের নিয়েও উদ্বেগ বাড়ে। এক যাত্রীর বর্ণনায়, “যারা বাচ্চা নিয়ে আসছে। ৫ থেকে ৭ মাসের বেবিও আছে এখানে দুই-তিন জনের। তাদের অবস্থা আরও খারাপ।”
এক ঘণ্টা গেল। দুই ঘণ্টা। তারপর রাত নামল। রাত পেরিয়ে আবার সকাল হলো। সকাল পেরিয়ে আরেকটি দীর্ঘ রাত। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষার হিসাব দাঁড়াল প্রায় ৪০ ঘণ্টায়।
এই ৪০ ঘণ্টা শুধু সময়ের হিসাব ছিল না। ছিল ক্ষুধা, ঘুমহীনতা, অসুস্থতা, ওষুধের দুশ্চিন্তা আর বাড়ি ফেরার অনিশ্চয়তায় কেটে যাওয়া এক দীর্ঘ মানবিক দুর্ভোগ।
লাউঞ্জই যখন শেষ ভরসা
প্রায় ১৭৪ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রী ইতালিতে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় বিমানবন্দরের ভেতরেই থেকে যান।
বিমান কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, ইমিগ্রেশন পার হতে না পারায় বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের বিমানবন্দরের বাইরে নিয়ে হোটেলে রাখা সম্ভব হয়নি।
কিন্তু যাত্রীদের প্রশ্ন ছিল, হোটেল না হোক, অন্তত ঘুমানোর জায়গা কোথায়?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাত্রীদের শেয়ার করা বিভিন্ন ভিডিও এবং গণমাধ্যম ও টেলিভিশনে প্রকাশিত সংবাদে উঠে এসেছে সেই অপেক্ষার ছবি।
কেউ মেঝেতে শুয়ে আছেন, কেউ চেয়ারে বসে আছেন, কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করছেন।
এক যাত্রী বলেন, “না খেয়ে, না ঘুমিয়ে আছি। সবারই একই অবস্থা। সবাই এখানে ফ্লোরিং করছে। যারা বাচ্চা নিয়ে এসেছেন, তাদের অবস্থা খুব খারাপ। আর যারা একা জার্নি করছেন, বিশেষ করে সিনিয়র সিটিজেন, তাদের দুর্ভোগ আরও বেশি।”
আরেকজনের ভাষায়, “এখানে আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি। এখানে আমরা উদ্বাস্তুর মতো হয়ে গেছি। আমাদের নাই কোনো থাকার জায়গা, নাই কোনো বসার জায়গা, শোয়ার জায়গা।”
মেঝেতেই রাত, চেয়ারে দিন
দীর্ঘ অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা না হওয়ায় যাত্রীদের অনেকেই বিমানবন্দরের মেঝেতে রাত কাটান। রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি লাউঞ্জে থাকার সুযোগ মিললেও সেখানে খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও শোয়ার মতো জায়গা ছিল না বলে জানান তারা।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েন বয়স্ক, অসুস্থ ও একা ভ্রমণ করা যাত্রীরা। তাদের কারও নিয়মিত ওষুধ লাগছে, কারও ডায়াবেটিস, কারও উচ্চ রক্তচাপ। লাগেজে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ইনসুলিন থাকায় অনেকে সময়মতো তা ব্যবহার করতে পারেননি বলেও অভিযোগ করেন।
ওই ফ্লাইটের যাত্রী ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মো. আবু সাঈদ জানান, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে বয়স্ক যাত্রী, শিশু ও অসুস্থদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের রাতের সময় মেঝে ও চেয়ারে কাটাতে হয়েছে।
আরেক যাত্রী মোহাম্মদ রোকনুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবেটিস রোগী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। যাত্রীদের পর্যাপ্ত তথ্য ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
দীর্ঘ অপেক্ষার সঙ্গে যোগ হয় খাবারের সংকট ও অনিয়মের অভিযোগ।
এক যাত্রী সকালের নাশতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “সকালের নাস্তা নিয়ে আমার বলার ভাষা নাই। অনেক বলার পর তারা সকাল সাড়ে নয়টার দিকে নাস্তা দিয়েছে। একটা ক্রোসাঁ, এক কাপ কফি। এটা কোনো নাস্তা হলো?”
যাত্রীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত খাবার ও পানি পেতে দেরি হয়েছে। পাঁচ-সাত মাস বয়সী শিশুর জন্য ডায়াপার ও শিশুখাদ্য না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন।
ফলে দীর্ঘ অপেক্ষা শুধু ঘুম কেড়ে নেয়নি, বাড়িয়েছে ক্ষুধা ও অসুস্থতার ঝুঁকিও।
ঢাকায় পরিবারের অপেক্ষা
রোমের বিমানবন্দরে অপেক্ষার আরেকটি গল্প চলছিল ঢাকায়। যাত্রীদের স্বজনেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, ভিডিও আর ফোনকলের মাধ্যমে পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করছিলেন।
আমিনা আনজুম তন্নীর বাবা-মা ছিলেন ওই ফ্লাইটে।
একটি গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে ২৮ ঘণ্টার বেশি হয়ে গেছে। আমার বাবার তিনবার বাইপাস সার্জারি হয়েছে। তিনি একটুও ঘুমাতে পারেননি। পুরো সময় সোজা হয়ে বসে ছিলেন।”
একজন মেয়ের কাছে এর চেয়ে অসহায় মুহূর্ত আর কী হতে পারে—বাবা কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে, অসুস্থ অবস্থায় বিমানবন্দরের চেয়ারে বসে আছেন; আর তিনি ঢাকায় বসে শুধু অপেক্ষা করছেন।
আটকে পড়া যাত্রীদের একজনের মা ওই ফ্লাইটে ছিলেন। মো. ওহিদুল হক ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, দীর্ঘ অপেক্ষায় যাত্রীরা তীব্র শারীরিক ও মানসিক কষ্টের মধ্যে পড়েছেন। পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও নিয়মিত তথ্য না পাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তার মা দীর্ঘ অপেক্ষায় চরমভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন বলেও জানান তিনি।
অর্থাৎ রোমের লাউঞ্জে শুধু যাত্রীরাই আটকে ছিলেন না। তাদের সঙ্গে ঢাকায় থাকা পরিবারগুলোর উদ্বেগও আটকে ছিল।
যাত্রীদের অভিযোগের বিপরীতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, অসুস্থ, বয়স্ক ও শিশুদের বিশেষভাবে দেখভাল করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, রোমে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারাও সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রেখেছেন।
বিমানের জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জানিয়েছেন, বিদেশি পাসপোর্টধারীদের হোটেলে নেওয়া হলেও বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ইতালির ইমিগ্রেশন পার হতে না পারায় তাদের বাইরে হোটেলে রাখার সুযোগ হয়নি।
এদিকে উড়োজাহাজটি সচল করতে শনিবার ঢাকা থেকে প্রকৌশলী দল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ নিয়ে বিজি-৩০৫ রোমে পৌঁছে। এরপর শুরু হয় মেরামতের কাজ।
অবশেষে রোম ছেড়ে ঢাকার পথে উড়াল দেয় বিজি-৩০৬।
রবিবার সকালে বোসরা ইসলাম আলাপ-কে বলেন, “ফ্লাইটটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুপুর ১২টা ২৪ মিনিটে অবতরণ করবে।”
প্রায় দুই দিনের অপেক্ষার পর যাত্রীরা ফিরেছেন ঘরে। কিন্তু তাদের সঙ্গে ফিরছে রোমের সেই রাতগুলোর ক্লান্তি, ক্ষোভ আর তিক্ত স্মৃতি।
যে স্মৃতিতে থাকবে ঠান্ডা মেঝেতে ঘুমানোর কষ্ট, চেয়ারে অপেক্ষা, শিশুর কান্না, ওষুধের দুশ্চিন্তা আর এক কাপ কফি-ক্রোসাঁর নাশতা নিয়ে ক্ষোভ।
বিমান শেষ পর্যন্ত আকাশে উঠেছে। কিন্তু রোমে ফেলে আসা সেই দুই রাত ১৭৪ বাংলাদেশির কাছে হয়তো এই যাত্রার সবচেয়ে দীর্ঘ স্মৃতি হয়ে থাকবে।
ইতালির বিমানবন্দরে ১৭৪ বাংলাদেশির ৪০ ঘণ্টার ‘যন্ত্রণা’
একদিকে হোটেলে গেলেন বিদেশি পাসপোর্টধারীরা, অন্যদিকে লাউঞ্জেই থেকে গেলেন ১৭৪ বাংলাদেশি। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের দুর্ভোগে যোগ হয় খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়ে উদ্বেগ।
ছোট্ট এক শিশুকে কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছেন এক মা। পাশে বয়স্ক যাত্রী। বিমানে থাকা কারও লাগেজে আটকে আছে প্রয়োজনীয় ওষুধ। কারও চোখে ঘুম নেই। কেউ চেয়ারে বসে পার করছেন দুই রাত, কেউ সেই চেয়ারটুকুও না পেয়ে বসেছেন ঠান্ডা মেঝেতেই।
একজন বলছেন, “তিন রাত ঘুমাইনি।” আরেকজনের অভিযোগ, “না খেয়ে, না ঘুমিয়ে আছি।” কেউ আবার বলছেন, “আমরা উদ্বাস্তুর মতো হয়ে গেছি।”
অথচ এরা কেউ উদ্বাস্তু নন। ইউক্রেন বা ইরানের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসেননি তারা। এমনকি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের পুশইন-পুশব্যাকের মাঝে নোম্যানস ল্যান্ডে আটকে যাওয়া মানুষের চিত্রও এটা নয়।
এরা সবাই পয়সা খরচ করে ভ্রমণ করছিলেন বাংলাদেশ বিমানের আধুনিকতম এয়ারক্রাফটে। প্রথমে বলা হয়েছিল, এক থেকে সোয়া ঘণ্টার মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
ঘড়ির কাঁটা চলেছে। রোমের লিওনার্দো দা ভিঞ্চি-ফিউমিচিনো বিমানবন্দরের ব্যস্ততা চলেছে। থেমে ছিল শুধু তাদের যাত্রাটাই।
বিমানবন্দরে থেকেও যেন সীমান্তের ওপারে
এই ঘটনার সবচেয়ে অদ্ভুত দিক ছিল, যাত্রীরা ইতালিতে পৌঁছেও যেন ছিলেন ইতালির বাইরে।
বিমান থেকে নেমেছেন, কিন্তু বিমানবন্দরের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। বাইরে রোমের রাত, অথচ ভেতরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল লাউঞ্জের চেয়ার ও মেঝে।
এই জায়গাতেই টম হ্যাঙ্কস অভিনীত ‘দ্য টার্মিনাল’ সিনেমার সঙ্গে ঘটনাটির অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
সিনেমায় ভিক্টর নাভরস্কি বিমানবন্দরে আটকে গিয়ে সেটিকেই নিজের অস্থায়ী পৃথিবী বানিয়ে ফেলেছিলেন।
পার্থক্য হলো, সিনেমার গল্পটি ছিল কল্পনা। রোমে আটকে পড়া এই বাংলাদেশিদের জন্য সেটিই হয়ে উঠেছিল বাস্তব।
সিনেমার চরিত্রের হাতে ছিল গল্প। এই যাত্রীদের হাতে ছিল টিকিট, পাসপোর্ট আর বাড়ি ফেরার অপেক্ষা।
টরন্টো থেকে উড়ল বিমান, রোমে থেমে গেল যাত্রা
বাংলাদেশ বিমানের বিজি-৩০৬। টরন্টো-রোম-ঢাকা রুটের নিয়মিত ফ্লাইট। ২৫৯ জন যাত্রী নিয়ে বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনারটি বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে উড়েছিল।
সূচি অনুযায়ী, রোমে কিছু সময়ের জন্য থামবে, জ্বালানি নেবে, তারপর আবার আকাশে উঠবে।
কিন্তু টরন্টো থেকে প্রায় আট ঘণ্টা উড়ার পর শুক্রবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে রোমের বিমানবন্দরে অবতরণের পর বদলে গেল পুরো গল্প।
বিমানে ধরা পড়ল কারিগরি ত্রুটি। উড়োজাহাজটি হয়ে গেল ‘এয়ারক্রাফট অন গ্রাউন্ড’ বা এওজি। অর্থাৎ, আর উড়তে পারবে না।
তখনও যাত্রীরা ভাবেননি, একটি কারিগরি ত্রুটি বদলে দেবে তাদের পরের দুই দিনের জীবন।
প্রথম কয়েক ঘণ্টা এসি ছাড়া বিমানে আটকে থাকার পর লাউঞ্জে ঠাঁই হলো। যাত্রীদের মধ্যে যাদের বিদেশি পাসপোর্ট বা প্রয়োজনীয় শেনজেন ভিসা ছিল, তারা দীর্ঘ অপেক্ষার পর হোটেলে যাওয়ার সুযোগ পান।
কিন্তু প্রায় ১৭৪ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীর সামনে তখন বন্ধ ইমিগ্রেশনের দরজা। না এয়ারক্রাফট, না হোটেল দুই দরজাই বন্ধ।
এক ঘণ্টার অপেক্ষা গড়াল দুই দিনে
বিমান থেকে নামার পর যাত্রীদের বলা হয়েছিল, “এক থেকে সোয়া ঘণ্টার মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
সেই আশ্বাস নিয়েই অপেক্ষা শুরু। এক ঘণ্টা গেল, দেড় ঘণ্টা গেল, তারপর কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু সেই ‘এক ঘণ্টা’ আর শেষ হলো না।
যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানের ভেতরেই তাদের প্রায় আট ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় এসি নিয়েও সমস্যা ছিল বলে অভিযোগ করেন তারা। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকার কারণে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
একজন যাত্রীর জন্য কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা হয়তো কষ্টকর। কিন্তু তিন রাত ঘুম না হওয়া একজন বৃদ্ধার জন্য সেটি কতটা কঠিন, তা বোঝা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে।
সেখানে ওই নারী যাত্রীকে বলতে শোনা যায়, “তিন রাত ঘুমাইনি।”
আরেক যাত্রী বলেন, “সবচেয়ে অবস্থা খারাপ যারা একা যাত্রী। বিশেষ করে বয়স্ক মহিলা এবং পুরুষ যারা আছেন।”
এই ফ্লাইটে পাঁচ থেকে সাত মাস বয়সী কয়েকটি শিশুও ছিল। তাদের নিয়েও উদ্বেগ বাড়ে। এক যাত্রীর বর্ণনায়, “যারা বাচ্চা নিয়ে আসছে। ৫ থেকে ৭ মাসের বেবিও আছে এখানে দুই-তিন জনের। তাদের অবস্থা আরও খারাপ।”
এক ঘণ্টা গেল। দুই ঘণ্টা। তারপর রাত নামল। রাত পেরিয়ে আবার সকাল হলো। সকাল পেরিয়ে আরেকটি দীর্ঘ রাত। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষার হিসাব দাঁড়াল প্রায় ৪০ ঘণ্টায়।
এই ৪০ ঘণ্টা শুধু সময়ের হিসাব ছিল না। ছিল ক্ষুধা, ঘুমহীনতা, অসুস্থতা, ওষুধের দুশ্চিন্তা আর বাড়ি ফেরার অনিশ্চয়তায় কেটে যাওয়া এক দীর্ঘ মানবিক দুর্ভোগ।
লাউঞ্জই যখন শেষ ভরসা
প্রায় ১৭৪ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রী ইতালিতে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় বিমানবন্দরের ভেতরেই থেকে যান।
তাদের ঠিকানা হয়ে ওঠে ‘প্রিমা ভিস্তা’ লাউঞ্জ।
সেখানেই রাত, সেখানেই সকাল, সেখানেই পরের দিনের অপেক্ষা।
বিমান কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, ইমিগ্রেশন পার হতে না পারায় বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের বিমানবন্দরের বাইরে নিয়ে হোটেলে রাখা সম্ভব হয়নি।
কিন্তু যাত্রীদের প্রশ্ন ছিল, হোটেল না হোক, অন্তত ঘুমানোর জায়গা কোথায়?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাত্রীদের শেয়ার করা বিভিন্ন ভিডিও এবং গণমাধ্যম ও টেলিভিশনে প্রকাশিত সংবাদে উঠে এসেছে সেই অপেক্ষার ছবি।
কেউ মেঝেতে শুয়ে আছেন, কেউ চেয়ারে বসে আছেন, কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করছেন।
এক যাত্রী বলেন, “না খেয়ে, না ঘুমিয়ে আছি। সবারই একই অবস্থা। সবাই এখানে ফ্লোরিং করছে। যারা বাচ্চা নিয়ে এসেছেন, তাদের অবস্থা খুব খারাপ। আর যারা একা জার্নি করছেন, বিশেষ করে সিনিয়র সিটিজেন, তাদের দুর্ভোগ আরও বেশি।”
আরেকজনের ভাষায়, “এখানে আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি। এখানে আমরা উদ্বাস্তুর মতো হয়ে গেছি। আমাদের নাই কোনো থাকার জায়গা, নাই কোনো বসার জায়গা, শোয়ার জায়গা।”
মেঝেতেই রাত, চেয়ারে দিন
দীর্ঘ অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা না হওয়ায় যাত্রীদের অনেকেই বিমানবন্দরের মেঝেতে রাত কাটান। রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি লাউঞ্জে থাকার সুযোগ মিললেও সেখানে খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও শোয়ার মতো জায়গা ছিল না বলে জানান তারা।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েন বয়স্ক, অসুস্থ ও একা ভ্রমণ করা যাত্রীরা। তাদের কারও নিয়মিত ওষুধ লাগছে, কারও ডায়াবেটিস, কারও উচ্চ রক্তচাপ। লাগেজে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ইনসুলিন থাকায় অনেকে সময়মতো তা ব্যবহার করতে পারেননি বলেও অভিযোগ করেন।
ওই ফ্লাইটের যাত্রী ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মো. আবু সাঈদ জানান, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে বয়স্ক যাত্রী, শিশু ও অসুস্থদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের রাতের সময় মেঝে ও চেয়ারে কাটাতে হয়েছে।
আরেক যাত্রী মোহাম্মদ রোকনুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবেটিস রোগী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। যাত্রীদের পর্যাপ্ত তথ্য ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এক কাপ কফি আর একটি ক্রোসাঁর নাশতা
দীর্ঘ অপেক্ষার সঙ্গে যোগ হয় খাবারের সংকট ও অনিয়মের অভিযোগ।
এক যাত্রী সকালের নাশতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “সকালের নাস্তা নিয়ে আমার বলার ভাষা নাই। অনেক বলার পর তারা সকাল সাড়ে নয়টার দিকে নাস্তা দিয়েছে। একটা ক্রোসাঁ, এক কাপ কফি। এটা কোনো নাস্তা হলো?”
যাত্রীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত খাবার ও পানি পেতে দেরি হয়েছে। পাঁচ-সাত মাস বয়সী শিশুর জন্য ডায়াপার ও শিশুখাদ্য না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন।
ফলে দীর্ঘ অপেক্ষা শুধু ঘুম কেড়ে নেয়নি, বাড়িয়েছে ক্ষুধা ও অসুস্থতার ঝুঁকিও।
ঢাকায় পরিবারের অপেক্ষা
রোমের বিমানবন্দরে অপেক্ষার আরেকটি গল্প চলছিল ঢাকায়। যাত্রীদের স্বজনেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, ভিডিও আর ফোনকলের মাধ্যমে পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করছিলেন।
আমিনা আনজুম তন্নীর বাবা-মা ছিলেন ওই ফ্লাইটে।
একটি গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে ২৮ ঘণ্টার বেশি হয়ে গেছে। আমার বাবার তিনবার বাইপাস সার্জারি হয়েছে। তিনি একটুও ঘুমাতে পারেননি। পুরো সময় সোজা হয়ে বসে ছিলেন।”
একজন মেয়ের কাছে এর চেয়ে অসহায় মুহূর্ত আর কী হতে পারে—বাবা কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে, অসুস্থ অবস্থায় বিমানবন্দরের চেয়ারে বসে আছেন; আর তিনি ঢাকায় বসে শুধু অপেক্ষা করছেন।
আটকে পড়া যাত্রীদের একজনের মা ওই ফ্লাইটে ছিলেন। মো. ওহিদুল হক ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, দীর্ঘ অপেক্ষায় যাত্রীরা তীব্র শারীরিক ও মানসিক কষ্টের মধ্যে পড়েছেন। পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও নিয়মিত তথ্য না পাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তার মা দীর্ঘ অপেক্ষায় চরমভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন বলেও জানান তিনি।
অর্থাৎ রোমের লাউঞ্জে শুধু যাত্রীরাই আটকে ছিলেন না। তাদের সঙ্গে ঢাকায় থাকা পরিবারগুলোর উদ্বেগও আটকে ছিল।
বিমানের আশ্বাস, অবশেষে অপেক্ষার অবসান
যাত্রীদের অভিযোগের বিপরীতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, অসুস্থ, বয়স্ক ও শিশুদের বিশেষভাবে দেখভাল করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, রোমে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারাও সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রেখেছেন।
বিমানের জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জানিয়েছেন, বিদেশি পাসপোর্টধারীদের হোটেলে নেওয়া হলেও বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ইতালির ইমিগ্রেশন পার হতে না পারায় তাদের বাইরে হোটেলে রাখার সুযোগ হয়নি।
এদিকে উড়োজাহাজটি সচল করতে শনিবার ঢাকা থেকে প্রকৌশলী দল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ নিয়ে বিজি-৩০৫ রোমে পৌঁছে। এরপর শুরু হয় মেরামতের কাজ।
অবশেষে রোম ছেড়ে ঢাকার পথে উড়াল দেয় বিজি-৩০৬।
রবিবার সকালে বোসরা ইসলাম আলাপ-কে বলেন, “ফ্লাইটটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুপুর ১২টা ২৪ মিনিটে অবতরণ করবে।”
প্রায় দুই দিনের অপেক্ষার পর যাত্রীরা ফিরেছেন ঘরে। কিন্তু তাদের সঙ্গে ফিরছে রোমের সেই রাতগুলোর ক্লান্তি, ক্ষোভ আর তিক্ত স্মৃতি।
যে স্মৃতিতে থাকবে ঠান্ডা মেঝেতে ঘুমানোর কষ্ট, চেয়ারে অপেক্ষা, শিশুর কান্না, ওষুধের দুশ্চিন্তা আর এক কাপ কফি-ক্রোসাঁর নাশতা নিয়ে ক্ষোভ।
বিমান শেষ পর্যন্ত আকাশে উঠেছে। কিন্তু রোমে ফেলে আসা সেই দুই রাত ১৭৪ বাংলাদেশির কাছে হয়তো এই যাত্রার সবচেয়ে দীর্ঘ স্মৃতি হয়ে থাকবে।