জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুন চ্যালেঞ্জ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মুখোমুখি হয়েছে। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক নৈকট্য সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট দৃশ্যমান।
পাঁচই অগাস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলজুড়ে বারবার দুই দেশের তরফে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা বার্তা বিনিময় হলেও কার্যত তা হয়নি। বলা হচ্ছিলো বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার এলে অস্বস্তি কাটবে।
যদিও বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে নির্বাচনের পর প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি। দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া ক্ষমত্যচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন, ঝুলন্ত তিস্তা মহাপরিকল্পনা, সীমান্ত জটিলতা এসব নিয়েই আস্থার সংকট।
ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যোগ দেওয়া না দেওয়া নিয়ে কূটনৈতিক দোলাচল দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বকে আরো বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক বোঝাপড়া ছাড়া এই কূটনৈতিক জট খোলা কঠিন।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের হাইকমিশনারের সাথে সাক্ষাৎ
গত ১২ই জুন বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে আসেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ২৫এ জুন রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র দিয়ে দায়িত্ব নেন।
এর দেড় মাস পর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করলেন দীনেশ ত্রিবেদী। সোমবার সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান তিনি।
বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “দুই নেতার দেখা হলে সেখানে অবশ্যই আলোচনা হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতভেদ থাকবেই, না হলে সেটা গণতন্ত্র না। জনগণের চাওয়া একটাই, সুসম্পর্ক। এটা পারস্পরিক লাভজনক ও কল্যাণকর (উইন-উইন)।”
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “আমি কোনো কূটনীতিক নই। এটি জনপ্রতিনিধির সাথে জনপ্রতিনিধির আলোচনার মতো। আমাদের দেখা হওয়ায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত। তার সাথে যে প্রথমবার দেখা হয়েছে, এমনটা আমার একেবারেই মনে হয়নি। তিনি অত্যন্ত ভালো, ভীষণ বিনয়ী ও একদম মাটির মানুষ। আর আমাদের আলোচনার বিষয়ই জনগণের সাথে জনগণের সম্পর্ক।”
এই সৌজন্য সাক্ষাত নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও। তিনি জানিয়েছেন বৈঠকে শেখ হাসিনা ও ওসমান হাদীর ‘হত্যাকারীদের’ ফিরিয়ে দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
অস্বস্তির নাম ‘শেখ হাসিনা’
ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের বরফ গলার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার ইস্যু। গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর যিনি একাধিকবার অনলাইনে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কথা বলেছেন।
এ নিয়ে বারবারই উষ্মা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। তবে গত ৫ই অগাস্ট। অনলাইনে সরাসরি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া এবং রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার পর কঠিন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ঢাকা।
ওইদিনই কড়া ভাষায় প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, “পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। সেখানে তিনি এবং তার সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়িয়েছেন। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ”।
পরদিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছিলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ঠিক কেমন সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, সেই সিদ্ধান্ত নয়াদিল্লিকেই নিতে হবে।
সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সাথে দীনেল ত্রিবেদী বৈঠকেও এই প্রসঙ্গ উঠেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, “পাঁচ আগস্টের ব্যাপারে (দিল্লির অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি শেখ হাসিনার যোগদান) আমাদের যে পজিশন আমরা ক্লিয়ারলি বলে দিয়েছি। এবং এটা গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এটা গতকালকেও আমাকে জানিয়েছেন, আজকেও তারা প্রধানমন্ত্রীকে সেটা বলেছেন।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য একাধিক চিঠি দিয়েছে। কিন্তু জবাব দেয়নি দিল্লি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য বারবার বলেছে, তারা এই অনুরোধের আইনি বিষয় পর্যালোচনা করছে।
পাঁচই অগাস্ট গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার কথা বলা প্রসঙ্গে গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিধিবদ্ধ সরকারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্য ভারত সরকার সমর্থন করে না।
শিক্ষক ও গবেষক আসিফ বিন আলী বলছেন, “শেখ হাসিনা ভারতে বসে যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন, তা ভারতের নীরব সম্মতিতেই হচ্ছে। এটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক গতিকে আটকে দিচ্ছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের থিংক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান জাপানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়াকে বলেছেন, ভারত চাইলে এই সংবাদ সম্মেলন ঠেকাতে পারতো। এটি সম্ভবত দিল্লির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রকে প্রশ্রয় দেওয়া হিসাবেই গণ্য করবে ভারত।”
গঙ্গা থেকে তিস্তা
চলমান কূটনৈতিক উত্তাপের মধ্যেই উভয় দেশের সামনে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে পানি কূটনীতি। ১৯৯৬ সালে সই হওয়া ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষের পথে। তবে এর নবায়ন নিয়ে এখনও কোনো আলোচনা নেই দুই দেশের।
অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি। এর বিকল্প হিসাবে “তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প” নিয়েও ভাবছে বাংলাদেশ। এই প্রকল্পই তিস্তা মহাপরিকল্পনা নামে পরিচিত।
কয়েক বছর আগেই এই প্রকল্পে চীনের সহযোগিতার খবর প্রকাশ্যে আসার পর এ নিয়ে ভারতের অস্বস্তিও প্রকাশ্যে আসে। ভারতও এই প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ জানায়।
চীনের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় নয়াদিল্লির নিজস্ব কৌশলগত উদ্বেগ আছে। শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর কাছাকাছি চীনের উপস্থিতি ভারতের নিরাপত্তার দৃষ্টিতে সংবেদনশীল বলেই বিবেচিত হয়।
শিক্ষক আসিফ বিন আলী বলেন, “কেবল এজেন্ডা নির্ধারণ করে তাদের সঙ্গে দর-কষাকষিতে সুবিধা করা যাবে না। গঙ্গা চুক্তির নবায়ন কিংবা তিস্তা ইস্যুতে অধিকার আদায় করতে হলে বাংলাদেশকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও গবেষণাভিত্তিক তথ্যপ্রমাণের দিকে জোর দিতে হবে।”
তবে দিল্লির ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর শ্রীরাধা দত্ত বলেন, “চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে নয়াদিল্লির ততটা দুশ্চিন্তা না থাকলেও, পাকিস্তান বা তুরস্কের সঙ্গে ঢাকার সম্ভাব্য কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক অক্ষ তৈরি হওয়া নিয়ে ভারতের উদ্বেগ আছে।”
বিমসটেকে কি প্রধানমন্ত্রী যাবেন
আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে বসছে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বের আসর। এতে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত।
তবে আমন্ত্রণের ধরন ও শব্দচয়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে ওই আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নয় বরং বিমসটেক চেয়ার হিসাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও বলেছেন যে প্রধানমন্ত্রীকে বিমসটেকের চেয়ার হিসাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি লিখে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, “এসব নিয়ে আমরা এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি।
অস্বস্তি কি কাটবে
“গত কয়েক মাসে দুই দেশের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত আস্থা তৈরি করা যায়নি, এটা মেনে নিতেই হবে”, বলছিলেন প্রফেসর শ্রীরাধা দত্ত। এ নিয়ে দুই দিকেরই সদিচ্ছা থাকা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমাদের এমইএ (মিনিস্ট্রি অব এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স) থেকে বাইল্যাটারাল প্রস্তুতির জন্য একাধিকবার এজেন্ডা পাঠানো হয়েছিলো। ঢাকা থেকে কোনো রেসপন্স পাওয়া যায়নি। আবার বিমসটেকের চেয়ার হিসাবে আমন্ত্রণ জানালেও সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী না বলাওতো ঠিক হয়নি। তো দুই দিকের তরফেই বোঝাপড়ার অভাব আছে বলে মনে হয়।”
এই সব কিছু ছাপিয়ে বাংলাদেশ-ভারতকে দুই দেশ, আঞ্চলিক এমনকি বৈশ্বিক স্বার্থেই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এমনকি এক্ষেত্রে ‘শেখ হাসিনা’ ইস্যুকে ছাপিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।
ভারতীয় গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলেও এ নিয়ে আলোচনা চলছে। দেশটির ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কোনো একক ব্যক্তি বা বিশেষ স্বার্থের কাছে জিম্মি হওয়া উচিত নয়। অতিথিকে সুরক্ষা দিলেও ভারতীয় মাটিকে রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করতে দেওয়া সমীচীন নয়।”
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনেও বিষয়টি তুলে আনা হয়েছে। তাতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, নয়া দিল্লির পরামর্শ না শোনায় এক সময়ের পরীক্ষিত মিত্র শেখ হাসিনা এখন ভারতের জন্যও এক ধরনের ‘বোঝা’ হয়ে উঠেছেন কি-না।
শ্রীরাধা দত্ত বলছেন, “দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিশাল পরিসর বিবেচনায় শেখ হাসিনা ইস্যুকে ছাপিয়ে উভয় দেশেরই সামনের দিকে এগোনো প্রয়োজন।”
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এড়িয়ে দুই দেশের স্বার্থ মাথায় রেখেই সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত।



