যে সাঈদের মৃত‍্যুতে বিদায়ঘণ্টা বেজেছিল হাসিনার

তিউনিসিয়ার মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতি ১৭টি আরব দেশে জ্বালিয়ে দিয়েছিলো দ্রোহের আগুন 'আরব বসন্তের' নামের সেই বিপ্লবে ক্ষমতার মসনদ হারিয়েছিলো ৭টি দেশের সরকারপ্রধান। যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেয়। ইতিহাসের সেই বিশেষ সন্ধিক্ষণগুলো প্রমাণ করে, একজন মানুষের মৃত্যু কখনো কখনো পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণের জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠে। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে আবু সাঈদের মৃত্যু ছিল ঠিক তেমনই এক মুহূর্ত।

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪০ পিএম

হুমায়ুন আহমেদ তার বই ‘মাতাল হাওয়া’র উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন, ‘কোনো মৃত মানুষ মহান আন্দোলন চালিয়ে নিতে পারেন না। একজন পেরেছিলেন। আমানুল্লাহ মোহম্মদ আসাদুজ্জামান। তার রক্তমাখা শার্ট ছিল উনসত্তরের গণআন্দোলনের চালিকাশক্তি’।

ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায়, ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদের মৃত্যু আইয়ুব খানের এক দশকের স্বৈরশাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।

আসাদের মৃত্যুর মাত্র দুই মাসের মাথায় প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন আইয়ুব খান।

তারও আগে, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, এদিন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বাররা কেবল ভাষার অধিকার নিশ্চিত করতে রক্তে রাজপথ রঞ্জিতই করেননি, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বীজ বপন করেছিলেন।

মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ, লেখক এবং রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর তার 'পূর্ববঙ্গের ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি' বইয়ে লিখেছিলেন, ছাত্রদের ওপর সেই গুলি চালানোর ঘটনাই ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর ভাঙনের প্রথম সুর। রাষ্ট্রের বন্দুক যখন তারুণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, তখন রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা হারায়।

আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিন শার্প তার অহিংস গণআন্দোলনের তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, কোনো দমনমূলক সরকার যখন অহিংস প্রতিবাদীদের, বিশেষ করে তরুণদের ওপর সহিংসতা চালায়, তখন জনমনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে রূপ নেয়, যা শেষ পর্যন্ত সেই শাসনের পতন ঘটায়।

চব্বিশের ষোলোই জুলাই, কোটা সংস্কার আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ওইদিন দুপুরে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেইটের সামনে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীদের হটাতে মুখোমুখি অবস্থান নেয় পুলিশ।

পুলিশের বন্দুকের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়ায় কালো টি-শার্ট পরা এক তরুণ। হাতে কেবল একটা লাঠি।

আর তখনই তাকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে গুলি ছোড়ে পুলিশ। পরপর দুইবার। গুলি খেয়েও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে সে। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সেই তরুণ। সহপাঠীরা ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন দায়িত্বরত চিকিৎসক।

সেদিনের সেই তরুণই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ।

আবু সাঈদের মৃত্যু মোড় ঘুরিয়ে দেয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের। খালি হাতে বন্দুকের নলের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর সেই ভিডিও মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

যেটি ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন, তাতে যোগ দেয় দেশের আপামর জনগণ। কোটা আন্দোলন পরিণত হয় শেখ হাসিনার সরকার পতনের এক দফার এক গণঅভ্যুত্থানে। আবু সাঈদের নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়ার সেই দৃশ্যটি একটি পতনোন্মুখ শাসনের কফিনে গেঁথে দেয় শেষ পেরেক।

আন্দোলনের মূল অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠেন আবু সাঈদ। তার ছবি হয়ে ওঠে বিপ্লবের পোস্টার।

যা বলেছিলো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো

আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং ভিডিও ফুটেজের সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনাকে একটি 'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড' হিসেবে চিহ্নিত করেছিল কেউ কেউ।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, "আবু সাঈদ পুলিশের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক শারীরিক হুমকি তৈরি করেননি, অথচ তাকে অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে।" একে 'বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড' হিসেবে আখ্যা দেয় সংস্থাটি।

আবু সাঈদের ঘটনায় পুলিশের বলপ্রয়োগের সমালোচনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচও। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহার করার আন্তর্জাতিক নিয়ম মানেনি বলে জানায় তারা।

বাংলাদেশে জুলাই-অগাস্টের সহিংসতা নিয়ে একটি বিস্তারিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট প্রকাশ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর। রিপোর্টে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডকে পুলিশের 'অপ্রয়োজনীয় এবং অপ্রাসঙ্গিক বলপ্রয়োগের' একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে নিরস্ত্র ব্যক্তির ওপর এভাবে সরাসরি গুলি চালানো যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য দমন পীড়ন।

অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ল্যাবরেটরি ভিডিওর মেটাডেটা বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছে যে, পুলিশ কেবল আবু সাঈদকে গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি, তাকে চিকিৎসা সেবা দিতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এসব রিপোর্টগুলোর কারণেই বিশ্বব্যাপী হাসিনা সরকারের ওপর তৈরি হয় প্রবল চাপ। একদিকে বাড়তে থাকা গণআন্দোলন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ। আন্দোলনের শেষের দিকে এসে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না চালানোর সিদ্ধান্ত জানায় সামরিক বাহিনীও। শেষ পর্যন্ত প্রবল আন্দোলনের মুখে ৫ই আগস্ট দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা।

প্রায় দুই বছরের আইনি প্রক্রিয়া শেষে ঘোষণা হয় আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়।

রায়ে ২ জনের মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুই আসামি হলেন পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।

এছাড়াও রায়ে ৩ জনের যাবজ্জীবন আর ২৪ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ায় একজনকে খালাসও দেওয়া হয়।

দেশ থেকে দেশান্তর: ছাত্রহত্যার পরিণতি

ইতিহাসের আয়নায় তাকালে দেখা যায়, শাসক যখন ছাত্রের রক্তে হাত রাঙায়, তখন তার মসনদের আয়ু ফুরিয়ে আসে। নেপাল থেকে ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ইরান - সবখানেই ছাত্র হত্যার পর শাসকের সিংহাসন ধুলোয় মিশে গেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'প্যারাডক্স অব রিপ্রেশন'।

নেপালের ইতিহাসে 'জন আন্দোলন ২' এমনই  এক অধ্যায়। রাজা জ্ঞানেন্দ্রের জরুরি অবস্থা জারির বিরুদ্ধে ২০০৬ সালে কাঠমান্ডুর রাজপথে নেমে আসে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের সেই আন্দোলনে গুলি চালায় নিরাপত্তা বাহিনী। নিহত হন ২১ জন তরুণ।

এই হত্যাকাণ্ড ক্ষুব্ধ করে নেপালের সাধারণ মানুষকে। ফলাফল, মাত্র ১৯ দিনের মাথায় ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন রাজা জ্ঞানেন্দ্র। অবসান ঘটে ২৪০ বছরের রাজতন্ত্রের।

তিন দশকের বেশি ইন্দোনেশিয়ার ক্ষমতায় থাকা জেনারেল সুহার্তো হয়ত ভাবেতেও পারেননি, ত্রিসাকতি বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন ছাত্রকে হত্যা করার মাত্র মাত্র ১০ দিনের মাথায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হবেন তিনি।

ইতিহাসবিদ এম. সি. রিকলেফস তার 'এ হিস্ট্রি অফ মডার্ন ইন্দোনেশিয়া' বইয়ে এই ঘটনাকে সুহার্তোর পতনের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার স্বৈরশাসক চুন দু ওয়ানও।

কিন্তু পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের সোল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র বাক জং চোলের মারা যাওয়ার ঘটনা ফাঁস হলে ছাত্রদের পাশে দাঁড়ায় কোরিয়ার মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

লক্ষ লক্ষ মানুষের 'জুন ডেমোক্রেসি মুভমেন্ট'-এর মুখে সরাসরি নির্বাচন দিতে বাধ্য হন স্বৈরশাসক চুন দু-ওয়ান।

ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি মনে করতেন তার শক্তিশালী সাভাক বাহিনী দিয়ে সব দমন করা সম্ভব।

কিন্তু ১৯৭৮ সালে কোম শহরে ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়ে যে স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়েছিলো সাভাক বাহিনী, তার শেষ হয় দেশ ছেড়ে শাহের পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শাহের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ছাত্রদের রাজনৈতিক শক্তির পরিবর্তে কেবল 'বিশৃঙ্খলাকারী' হিসেবে দেখা।

কেন ছাত্র হত্যা শাসনের পতন ত্বরান্বিত করে

সমাজবিজ্ঞানী এবং অহিংস আন্দোলন বিশেষজ্ঞ জিন শার্প তার তত্ত্বে ব্যাখ্যা করেন, কেন ছাত্র হত্যা সরকারের জন্য আত্মঘাতী।

তিনি বলেন, ছাত্ররা সমাজের 'ভবিষ্যৎ' এবং 'আদর্শবাদী' অংশ। তাদের ওপর আঘাত মানে পুরো জাতির ভবিষ্যতের ওপর আঘাত। এতে করে নিরপেক্ষ জনতাও সরকারের বিপক্ষে চলে যায়।

অনেক সময় ছাত্র হত্যার পর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের সন্তানদের কথা ভেবে এবং বিবেকের তাড়নায় অস্ত্র চালাতে অস্বীকার করেন। ফলে পতন ঘটে শাসন ব্যবস্থার।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান ড্যাভেনপোর্ট তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, যখন রাষ্ট্র কোনো 'নিরপরাধ' এবং 'আদর্শবাদী' ছাত্রকে হত্যা করে, তখন শাসনের নৈতিক ভিত্তি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
ইতিহাস গবেষক এরিক চেনোওয়েথ তার 'হোয়াই সিভিল রেজিস্ট্যান্স ওয়ার্কস' বইয়ে দেখিয়েছেন, যে আন্দোলনে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সাধারণ নাগরিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে, সে আন্দোলন কখনো ব্যর্থ হয় না। আর এই ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষকে রাজপথে নামানোর সবচেয়ে শক্তিশালী অনুঘটক বা 'ক্যাটালিস্ট' হলো ছাত্রদের রক্ত।

আবু সাঈদ সেই অমোঘ নিয়মেরই এক দলিল। আবু সাঈদরা প্রমাণ করেছেন, ইতিহাসের চাকাকে যখন ছাত্ররা রক্ত দিয়ে ঘোরাতে চায়, তখন পৃথিবীর কোনো স্বৈরশাসকই তার গতির সামনে টিকতে পারে না।