হাজার কোটি টাকা ক্ষতির মুখে ক্রিকেট অর্থনীতি

ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট কূটনীতির রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের যে ফলাফল তাতে বড় ধরনের ধাক্কায় পড়বে বাংলাদেশের ক্রিকেট অর্থনীতি। যা নিঃসন্দেহে প্রভাব ফেলবে আইসিসির টার্নওভারেও। ক্রিকেটের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের লোকসানের এই আর্থিক ক্ষতি আগামীতে ছাপিয়ে যেতে পারে হাজার কোটি টাকার ল্যান্ডমার্ক।

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম

আত্মমর্যাদা বনাম ক্রিকেট রাজনীতির দ্বৈরথের ফলাফল বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে ’আউট’, স্কটল্যান্ড ’ইন’।

এই ঘটনা শুধু টাইগার ক্রিকেট বোর্ডের ব্যাংক ব্যালেন্সেই প্রভাব ফেলবে না, বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলবে পুরো বিশ্ব ক্রিকেটের অর্থনীতিকেই।

বিসিবি, আইসিসি, ক্রিকেটার, পৃষ্ঠপোষকসহ ক্রিকেটের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের লোকসানের এই আর্থিক ক্ষতি আগামীতে ছাপিয়ে যেতে পারে হাজার কোটি টাকার ল্যান্ডমার্ক।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমের সংবাদ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভীতিকর এমন পরিসংখ্যান।

ক্রীড়া সাংবাদিক ও বিশ্লেষক নোমান মোহাম্মদ মনে করেন, আইসিসি ও বিসিবির রাজস্বে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না খেলার সিদ্ধান্ত। 

আলাপকে বলেন, “বিসিবির আয়ে অন্তত ৪৭০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর বাইরে সামনে অন্যান্য সিরিজ ও নানা বিষয় আমলে নিলে এর পরিমাণ অনেক বড় হবে। যে ক্ষতি বাংলাদেশ কাটিয়ে উঠতে পারবে না।”

এটা একই সঙ্গে আইসিসির আয়েও বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন তিনি।

তার শঙ্কা, বিশ্বকাপে অংশ না নিয়ে বিসিবি আইসিসির কোড অব কনডাক্ট ভেঙেছে, নিশ্চিত ভাবেই যার মাশুল গুনতে হবে। 

বিসিবি’র সাবেক পরিচালক এবং ক্রীড়া সংগঠক খন্দকার জামিল উদ্দিন আলাপকে বলেন, “বিসিবির রাজস্ব আয়ে যে প্রভাব পড়বে তা কাটিয়ে ওঠা বিসিবির জন্য কঠিন হবে।”

ক্রিকেট অর্থনীতিতে ধাক্কা

ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট কূটনীতির রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের যে ফলাফল তাতে বড় ধরনের ধাক্কায় পড়বে বাংলাদেশের ক্রিকেট অর্থনীতি। যা নিঃসন্দেহে প্রভাব ফেলবে আইসিসির টার্নওভারেও।

দেশ দুটির এই মারকাটারি বিনোদনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার দর্শক। টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রিতে যে হাইপ তৈরি হতো বাংলাদেশের অনুপস্থিতিতে তাতে নিঃসন্দেহে ভাটা পড়বে।

এর ফলে পার্টনারশিপে ধস নামাবে আইসিসির সম্প্রচার স্বত্বের আয়েও।

ভুলে গেলে চলবে না বাংলাদেশে ক্রিকেট কতটা জনপ্রিয়।

সম্প্রতি বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল দাবি করেছেন, বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করলে আইসিসি প্রায় ২০ কোটি দর্শক হারাবে।

আর তাতে প্রভাব পড়বে বিজ্ঞাপন ও স্পন্সরশিপেও। কারণ বর্তমানে আইসিসির অনেক বড় স্পন্সর বাংলাদেশি বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ না খেললে স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোও ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য বিজ্ঞাপন দিতে আগ্রহী হবে না। অর্থাৎ এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আইসিসির আয়ের ওপর।

আইসিসির এই ক্ষতির পরিমাণ কত শত কোটি তা এখনই বলা মুশকিল। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেট অর্থনীতিকে এই ক্ষতির সম্ভাব্য পরিমাণ সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা থেকে ৮০০ কোটি টাকার মধ্যে।

বার্ষিক আয় হারানোর শঙ্কা

চুক্তি অনুযায়ী ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর আইসিসির মোট বাৎসরিক আয় থেকে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ অর্থ পাওয়ার কথা বাংলাদেশের। ওয়ান ক্রিকেটের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে আইসিসির মোট বাৎসরিক আয় ছিল ৬০০ মিলিয়ন ডলার।

এক ডলার ১২২ টাকা হিসাবে বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ৩২৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।

বিশ্বকাপ বয়কটের সিদ্ধান্তের পর রাজস্বের এই ভাগাভাগিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের আয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে সম্প্রতি জানিয়েছিলেন সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল।

আইসিসির ওপর বিসিবির আর্থিক নির্ভরশীলতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “সবার আগে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যতের কথা ভাবা উচিত। আপনি যদি দেখেন আমাদের ৯০-৯৫ ভাগ ফাইনান্স কিন্তু আইসিসি থেকেই আসে।”

যদিও পরে বিসিবি বস আমিনুল ইসলাম বুলবুল জানিয়েছিল আইসিসি থেকে প্রাপ্ত আয় বিসিবির মোট আয়ের ৬০ শতাংশ।

আসবে না বিশ্বকাপের টাকা

টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার আগে কেবল প্রস্তুতির জন্যই ‘প্রিপারেশন মানি’ হিসেবে ৫ লাখ মার্কিন ডলার পেয়েছে বিসিবি। টাকার হিসাবে যার পরিমাণ ৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। বিশ্বকাপে অংশ না নিলে এ টাকা ফেরত দিতে হবে কিনা তা এখনও জানা নেই বিসিবির।

এরপরই আসা যাক অংশগ্রহণ ফি’র হিসাবে। এ বছর বিশ্বকাপে শুধু অংশ নেয়ার জন্য প্রতি দল পাবে ৩ লাখ ডলার। তার মানে ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা পাওয়া হচ্ছে না বিসিবির।

এবার ধরুন গ্রুপ পর্যায়ের ম্যাচ থেকে জয়ের অর্থ। যদি কেবল দুর্বল নেপাল এবং ইটালির বিপক্ষে থাকা দুই ম্যাচ জয়ের হিসাব করেন তাহলেও আরও ৭৬ লাখ টাকা পাওয়া হবে না বাংলাদেশের।

ধরুন এরপরও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের কাছে হেরে সুপার এইট-এ খেলা হলো না বাংলাদেশের।

ঠাঁই হলো কেবল সেরা ১২ দলের তালিকায়। তাতেও প্রাইজ মানি হিসাবে আরও ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার মতো পাওয়ার সুযোগ হতো। যা আর হবে না।

যে টাকার একটা অংশ ম্যাচ ফিসহ, বোনাস হিসাবে আসে ক্রিকেটারদের কাছে। বাংলাদেশি খেলোয়াড়রা সাধারণত প্রতি টিটোয়েন্টি ম্যাচের জন্য ম্যাচ ফি হিসাবে দুই লাখ টাকা করে পেয়ে থাকেন।

এছাড়া ম্যাচসেরা হলে সেই অর্থ এবং স্মারক আলাদা করেই পেতেন ক্রিকেটাররা। যে স্মৃতিচিহ্ন তাদের শোকেসে ওঠার সম্ভাবনা এই বছরের বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে নেই হয়ে গেল।

সম্প্রচারস্বত্ব ও স্পনসরশিপের ক্ষতি

বিসিবি ও ক্রিকেটারদের বাইরে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে অফিশিয়ালি সম্প্রচার স্বত্ব কেনা চ্যানেল টি-স্পোর্টস এর। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম রেভস্পোর্টজ জানিয়েছে, প্রায় ৩০০ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়তে পারে চ্যানেলটি।

অন্যদিকে আরও ১০০ কোটি টাকা লোকসান হতে পারে বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর।

জরিমানায় পড়বে বিসিবি

শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার গ্রহণযোগ্য কারণ না দেখাতে পারলে আইসিসি বড় ধরনের জরিমানা করতে পারে টাইগার বোর্ডকে।

সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এবার এই জরিমানা হতে পারে প্রায় ২০ লাখ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ২৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

এখানেই শেষ নয়

ক্রিকেট মাঠের স্লগওভারের স্লেজিংয়ের মতো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, তাতে কাটা পড়তে পারে ভারতীয় দলের আসন্ন বাংলাদেশ সফর ও আগামীর দ্বিপক্ষীয় সিরিজগুলো।

সিরিজটি বাতিল হলে প্রচুর অর্থ আয়ের সুযোগ হারাবে টাইগার ক্রিকেট।

কারণ, ভারতের সঙ্গে সিরিজ মানেই সম্প্রচার ও বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর তুমুল আগ্রহ আর বিপুল অর্থের লেনদেন।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অর্থনীতি বিবেচনা করলে বাংলাদেশের এই ‘না’ আদতে ওলট-পালট করে দেবে বিশ্ব ক্রিকেটের হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি।
আর তাতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের। যাতে আখেরে রুগ্‌ণ হবে টাইগার কোষাগার।