২০০৭ সালে সংবাদ-ভিত্তিক একটি স্যাটেলাইট চ্যানেল তাদের কার্যক্রম শুরু করার আগে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের জন্য কয়েক সপ্তাহের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। প্রশিক্ষকরা প্রত্যেকে বিদেশি। কার্যকর নিউজরুম অপারেশনের পাশাপাশি আধুনিক সাংবাদিকতা, ভবিষ্যতের গণমাধ্যম এবং সম্প্রচার-মাধ্যম বিষয়ে দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রবণতা বিষয়ে বিশদ আলোচিত হচ্ছিল। আমি সেই প্রশিক্ষণার্থী দলের অংশ ছিলাম, এইসব গুরুতর তাত্ত্বিক আলোচনার বড় অংশ আমার মাথার ওপর দিয়ে গিয়েছে, ওই সময় প্রায় কিছুই বুঝিনি।
প্রশিক্ষকদের একজন একদিন ক্লাসে একটা কথা বললেন, আমরা এখন ব্রডকাস্টের যুগে রয়েছি। গণমাধ্যমগুলো নিজেদের সম্পাদকীয় নীতির আলোকে কনটেন্ট (সংবাদ, তথ্য, বিনোদন ইত্যাদি) বানিয়ে নিজেদের সময় ও সুবিধামতো প্রচার বা প্রকাশ করছে এবং দর্শক-পাঠক সেই সময়সূচি অনুযায়ী কনটেন্ট উপভোগ করছে। তবে, খুব তাড়াতাড়ি এমনও সময় আসবে, যেটাকে বলা হবে ন্যারোকাস্ট যুগ, যেখানে দর্শক-পাঠক নিজেদের সুবিধামতো সময়ে পছন্দের কনটেন্ট উপভোগ করতে পারবে। এমনকি আরও ক্ষুদ্র, প্রায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে কনটেন্ট ডেলিভারির ঘটনাও ঘটবে যাকে বলা হবে ন্যানোকাস্ট।
২০০৭ সালে শোনা ওই কথাটার তাৎপর্য কিছুতেই আমার কল্পনায় আসছিল না। এটা কেমন করে সম্ভব? কোন কনটেন্ট কখন কীভাবে দেখতে চাওয়া উচিত, দর্শক-পাঠক তা কেমন করে বুঝবে? সংবাদ বা কনটেন্ট বানিয়ে প্রকাশ না করা পর্যন্ত দর্শক-পাঠক কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা তার আগ্রহের বিষয় কিনা!
যে সময়ের কথা বলছি, তখনও ফেসবুক বাংলাদেশে সেভাবে আসেনি, ইউটিউবের নাম শোনেনি বেশিরভাগ মানুষ। মোবাইল ইন্টারনেটের গতিও সুবিধার নয়। লোকের হাতে-হাতে স্মার্টফোন নামক বস্তুটিও সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি।
অথচ, কী আশ্চর্য! আমরা কিন্তু ২০২৪ সালের এই সময়টাতে সেই পূর্বাভাসকৃত ন্যারোকাস্ট বা ন্যানোকাস্টের যুগেই বাস করছি। আমি নিজে টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ করলেও, ব্যক্তিগতভাবে সময় করে টেলিভিশন দেখতে বসি না– সেটাও বহু বছর হয়ে গিয়েছে। কোভিড মহামারির সময় থেকে মুদ্রিত খবরের কাগজ পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেটা আর শুরু করা হয়নি। কিন্তু তাই বলে পাঠক বা দর্শক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বা আলোচিত কোনো সংবাদ বা তথ্য আমার জানতে বাকি থাকে না। সুপারহিট কোনো বিনোদনমূলক কনটেন্টও আমার চোখ এড়ায় না। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, ফেসবুক আর ইউটিউব, কেমন করে যেন ঠিকই সেগুলো চোখের সামনে নিয়ে আসে অথবা আমি নিজেই সেগুলোকে খুঁজে বের করে ফেলি!
এর বাইরে ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, লিংকডইন, স্ন্যাপচ্যাট, নেটফ্লিক্স, আমাজন প্রাইম– এই নামগুলো আমাদের এখনকার জীবনযাপনে সুগভীরভাবে জড়িয়ে গেছে, যেগুলো না হলে এখন আমাদের চলেই না– প্রত্যেকটাই কিন্তু ন্যারোকাস্ট বা ন্যানোকাস্টের উদাহরণ।
সত্যি কথা বলতে কি, গত এক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে তো বটেই, বাংলাদেশেও গণমাধ্যমের প্রকৃতি, কর্মপদ্ধতি ও উপস্থাপন ভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন চলমান রয়েছে। সেটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা প্রত্যেকেই হয়তো প্রতিনিয়ত অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এই পরিবর্তন-প্রক্রিয়ার গভীরে গিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি ভালোভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করছেন, এমন মানুষের সংখ্যা সম্ভবত খুব বেশি নয়।
ব্রডকাস্ট যুগ থেকে ন্যানো-কাস্ট বা ন্যারো-কাস্ট যুগে প্রবেশ করার পর প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল, এর পরের যুগ কেমন হতে যাচ্ছে? ক্রমপরিবর্তনশীল প্রযুক্তি আমাদের কোথায় নিয়ে ফেলবে? বাংলাদেশের গণমাধ্যম এই পরিবর্তনের সঙ্গে কতখানি পরিচিত কিংবা আদৌ কি সচেতন?

আমি নিজে আড়াই যুগের বেশি সময় ধরে মূলধারার গণমাধ্যমে সক্রিয় সাংবাদিকতায় জড়িত ছিলাম। এরপর সাম্প্রতিক কয়েক বছর পেশাদার গণমাধ্যম-পরামর্শক হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছি, তাই বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তির বিস্তার, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের গতিবিধি ও প্রবণতার দিকে নিয়মিত নজর রাখতে হয়।
সেই ভাসা-ভাসা জ্ঞান নিয়ে যেটুকু বুঝতে পারি, ভবিষ্যতের যুগ বা তৃতীয় যুগ হিসেবে আমরা সম্ভবত যে যুগের দিয়ে এগিয়ে চলেছি, তাকে সম্ভবত বলা হবে ‘মাইক্রোকাস্ট’ বা ‘কাস্টোমাইজড কাস্ট’ বা ‘পার্সোনালাইজড/ইমার্সিভ মিডিয়া’– যা পুরোপুরি এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) দিয়ে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে। এই যুগে কনটেন্ট এমনভাবে প্রস্তুত করা হবে যেন তা নির্দিষ্ট ব্যক্তির রুচি, আগ্রহ ও পছন্দ অনুযায়ী হয়। এআই ও মেশিন লার্নিংয়ের সাহায্যে আজকাল যে কারুর ব্যক্তিগত পছন্দ, আচরণ এবং পূর্ববর্তী কনটেন্ট উপভোগের ইতিহাস সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তার উপযোগী কনটেন্টই সরবরাহ করা হবে।
ইন্টারনেটের বিস্তার ও স্ট্রিমিং সেবার উত্থানের কারণে আমরা এরই মধ্যে প্রযুক্তির নানা দিক সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে গণমাধ্যমে আরও কী কী পরিবর্তন আসতে পারে, তার যদি তালিকা করি, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা (তথ্য-উপাত্ত) বিশ্লেষণ, মিথষ্ক্রিয়া বা ইন্টারেক্টিভিটি, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর), সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম– এ ধরনের নামগুলো থাকা উচিত।
ভব্যিষতের প্রযুক্তি নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তারা আগেই ঘোষণা দিয়ে বসে আছেন, খুব শিগগিরই গণমাধ্যমের বার্তাকক্ষে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এর সুবাদে কনটেন্ট পরিকল্পনা, প্রস্তুত, সম্পাদনা ও বিতরণ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর করে উঠবে। নির্দেশনা বা প্রম্পট ব্যবহার করে এক নিমিষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিউজ কনটেন্ট লেখা বা ছবি-ভিডিও সৃষ্টি, সম্পাদনা, প্রকাশ ও বিস্তৃত পরিসরে প্রচারের মতো কাজে এআই-এর প্রয়োগ এরই মধ্যে বিশ্বের বহু দেশে শুরু হয়ে গিয়েছে। কনটেন্ট বাছাই ও পরিবেশন ধীরে ধীরে এআই আলগরিদম ও মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
ডেটা অ্যানালাইসিস বা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এ মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ের একটি। পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ পেশাজীবী প্রস্তুত হয়ে গেলে গণমাধ্যমের কর্মপদ্ধতিতে এ প্রযুক্তির বিপুল অন্তর্ভুক্তি ঘটতে পারে। কনটেন্ট তৈরি ও সরবরাহের প্রক্রিয়াটি সে ক্ষেত্রে পুরোপুরি নির্ভর করবে দর্শক-পাঠকের আচরণ, পছন্দ, আগ্রহ ও ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে যে ফলাফল আসবে, তার ওপর। এর অর্থ হলো, কনটেন্ট-ভোক্তা বা ব্যবহারকারী খুব সহজে অপ্রয়োজনীয় বা অনাগ্রহের কনটেন্টের পরিবর্তে সরাসরি নিজের পছন্দ ও আগ্রহের কনটেন্ট উপভোগ করতে পারবেন।
প্রযুক্তি-বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস আরও বলছে, পুরো প্রক্রিয়াটি কনটেন্ট নির্মাতা ও গ্রহণকারীর মধ্যে অভিনব মিথষ্ক্রিয়া বা ইন্টারেক্টিভিটির পরিবেশ সৃষ্টি করবে। কেউই তখন নিষ্ক্রিয় দর্শক-পাঠক-শ্রোতা হয়ে থাকবেন না, ইমারসিভ মিডিয়া অর্থাৎ এআর/ভিআর, মেটাভার্সে কনটেন্ট অভিজ্ঞতায় তারা সরাসরি সম্প্রচার ও কনটেন্ট নির্মাণেও অংশ নেবেন। এর ফলে গণমাধ্যম আরও বেশি আকর্ষণীয় ও যোগাযোগমূলক হয়ে উঠবে।
সরল উদাহরণ দেওয়া যাক। যিনি অভিনেতা শাকিব খানের ভক্ত, তার কাছে তার প্রিয় এই অভিনেতার খবরই বেশি বেশি পৌঁছাবে। হিরো আলম যার পছন্দের মানুষ, এআই অ্যালগরিদমিক ফিডের কল্যাণে তিনি বেশিরভাগ সময় হিরো আলমের কর্মকাণ্ডের খবর পাবেন। ব্যবসা-বাণিজ্য বা অর্থনীতির গতিপ্রবাহ যার আগ্রহের বিষয়, তিনি দেখবেন সেই সংক্রান্ত খবরের সাজেশন। রাজনীতি নিয়ে যিনি বেশি মনোযোগী, তার কাছে রাজনীতি-বিষয়ক খবরগুলোই বেশি বেশি প্রদর্শিত হবে। এহেন প্রযুক্তি যে ভবিষ্যতের অভিনব কোনো ঘটনা, তা নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা আজকাল যে ধরনের কনটেন্টে বেশি সময় ব্যয় করি, পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ সেই ধরনের কনটেন্টই নিউজ ফিডে আসতে থাকে। কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি বোঝা যায়। গুগল, ফেসবুক, ইউটিউবের মতো পোর্টালের ক্যাশিং প্রযুক্তি আপনার ব্রাউজারে সংরক্ষিত উপাত্ত ব্যবহার করে সারাক্ষণ নজরদারি করছে, আপনি কোন কোন বিষয়ে আগ্রহী, পরবর্তী সময়ে যেন সেগুলোই আপনার সামনে হাজির করা যায়।
আজ থেকে পঁচিশ-তিরিশ বছর আগেও খবরের কাগজে লিখিত প্রতিবেদন পাঠ করে বা ছবি দেখে পাঠক হয়তো পুরো ঘটনাটি নিজের মতো কল্পনা করে নিতেন। টেলিভিশন সংবাদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর ভিডিও প্রতিবেদনের কারণে পাঠক পরিণত হলেন দর্শকে। নিজেরে মতো কল্পনা করে নেওয়ার প্রয়োজন ফুরাল, দর্শক সরাসরি বাস্তব ধারণা পেতে শুরু করলেন সংশ্লিষ্ট ঘটনার। এরপর এলো লাইভ সম্প্রচার, যেটি তাৎক্ষণিকভাবে খুঁটিনাটি জানার প্রেক্ষাপট তৈরি করল– গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, দুটোতেই। এ রকম পরিস্থিতিতে খুব শিগগিরই সম্ভবত কনটেন্ট উপভোগের অতীতের যাবতীয় অভিজ্ঞতা বদলে দিতে আসতে যাচ্ছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) ও অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর) প্রযুক্তি। এই বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতাপূর্ণ কনটেন্ট-প্রবাহে দর্শক অনুভব করবেন তিনি যেন ঘটনার কেন্দ্রে বা ঘটনাস্থলেই আছেন!
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এরই মধ্যে মূল ধারার গণমাধ্যমের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন– ভব্যিষতে কনটেন্ট প্রচার ও প্রসারে এই ধরনের ডিজিটাল প্লাটফরমই মূল ভূমিকা পালন করবে। এমনকি, এখনই মূল গণমাধ্যমকে নিজস্ব কনটেন্টের সর্বোচ্চ প্রচার বা ভাইরাল করার জন্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায়, এইসব পরিবর্তনে প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের আয়ের উৎস বা বিজ্ঞাপনের ভবিষ্যত কী হতে যাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বজুড়ে তো বটেই, বাংলাদেশেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিজ্ঞাপনদাতা বা স্পন্সররা প্রচলিত স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল ও প্রিন্ট মিডিয়ার চেয়ে অনলাইন, ডিজিটাল প্ল্যাটফরম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এইসব মাধ্যমে প্রযুক্তির সম্পৃক্ততা বেশি থাকায় সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে সহজে পৌঁছাতে পারা যায়, এমনকি টার্গেট অডিয়েন্সের ডেমোগ্রাফিক ডেটাও সহজে হাতে পাওয়া যায়, যেটা পরবর্তী প্রচার-কৌশল স্থির করতে সহায়ক হয়।
আমার ব্যক্তিগত বিস্ময় ও হতাশার জায়গাটি হলো, বাংলাদেশে গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মধ্যে এসব বিষয়ে কোনো সেই অর্থে কোনো আলোচনা নেই, আগ্রহ নেই, এমনকি পরিবর্তিত প্রযুক্তিনির্ভর সময়কাল কেমন হতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে ধারণা পর্যন্ত নেই। গণমাধ্যম-মালিকদের বড় অংশই প্রকৃত গণমাধ্যম-উদ্যোক্তা নন। গণমাধ্যম-কর্মীদের মধ্যে যারা কয়েক দশক ধরে নেতৃস্থানীয়, তাদের বড় অংশ মনপ্রাণ উজাড় করে কেবল চাকরি করে যাচ্ছেন, অথবা নিজের পেশাগত সম্পাদকীয় বা সাংবাদিকতানির্ভর বিষয়েই বেশি মনোযোগী কিংবা প্রযুক্তি ভয় পান বলে ‘আমি ভাই টেকনিক্যাল বিষয় কম বুঝি’ বলে এটা থেকে দূরে থাকেন। নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে যাদের সিদ্ধান্ত-গ্রহণ বা সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার ক্ষমতা রয়েছে, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ রাজনৈতিক মতাদর্শে সক্রিয় অথবা ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করায় বেশি মনোযোগী, ফলে গণমাধ্যমের আসন্ন পরিবর্তনের বিষয়ে তাদের দৃশ্যমান কোনো মনোযোগ বা কর্মকাণ্ড চোখে পড়ে না।
গণমাধ্যম খাতটি বাংলাদেশে বরাবরই দুঃস্থ ও রুগ্ণ হয়েই ছিল এবং এখনও হয়তো সে রকমই আছে। সাম্প্রতিক দশকে অসংখ্য গণমাধ্যম অনুমোদন পেয়েছে, বহু ধর্নাঢ্য ব্যক্তি ও পক্ষ নিজেদের সুরক্ষার লক্ষ্যে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান শুরু করেছেন। সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় বিজ্ঞাপনের বাজারে বিপুল প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানে শতশত নতুন পদ সৃষ্টি হয়েছে। সেগুলো পূরণ করতে তুলনামূলক অল্প বেতনে কর্মসংস্থান হয়েছে বিপুলসংখ্যক অনভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণবিহীন সংবাদ-কর্মীর, যাদের দক্ষতা বা যোগ্যতা নিয়ে কেউ যদি প্রশ্ন তোলে, তাহলে তাকে হয়তো দোষ দেওয়া যাবে না।
বিপুল অর্থের প্রবাহ তৈরি হলেও, বাংলাদেশের গণমাধ্যম তাই কখনই সুসংহত ও নিরাপদ পেশা-খাত হিসেবে কোমর শক্ত করে দাঁড়াতে পারেনি বলেই অনেকে মনে করেন। প্রায়ই শোনা যায়, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা ঠিকমতো বেতন পান না। মেধাবীরা সাংবাদিকতা পেশায় আসতে সব সময় আগ্রহী হন না। পেশাজীবীদের একটি অংশ হয়তো খুব সহজেই দুর্নীতি বা অপসাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়েন। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মাঝেমধ্যেই আমরা কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া বা গণছাঁটাইয়ের খবর পাই। প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ সম্ভবত সীমিত বলে এ মুহূর্তে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বা আধিপত্য বিষয়ে কাউকে কথা বলতে দেখা যায় না, কিন্তু কর্মরত সাংবাদিক বা সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই নিজেদের মধ্যে আলাপ করেন।
এই বাস্তবতায় প্রযুক্তি যেভাবে ‘বেপরোয়া’-রকম দ্রুত গতিতে পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তা আমলে না নিলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান যে বাণিজ্যিকভাবে হুমকির মুখে পড়বে, এমনকি কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে, সে কথা আমরা কেউই বলছি না।
অবশ্য সময় যেহেতু ফুরিয়ে যায়নি, প্রকৃত গণমাধ্যম-উদ্যোক্তারা চাইলে এখন থেকেই কয়েকটি বিষয়ে চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা শুরু করতে পারেন। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবহারে সক্ষমতা বাড়াতে একটু একটু করে বিনিয়োগ করতে হবে। কর্মরত মানবসম্পদকে প্রযুক্তি-দক্ষ করে তুলতে হবে। সেই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে শক্তিশালী উপস্থিতি।
বলা হচ্ছে, নিউজপ্রিন্ট ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের ভবিষ্যত অনেকটাই নির্ভর করবে তাদের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন কীভাবে হচ্ছে, তার ওপর। ডিজিটাল মাধ্যমে স্থানান্তর ও পাঠকের আগ্রহ অনুযায়ী কনটেন্ট তৈরি ও সরবরাহ করতে পারা প্রতিষ্ঠানই যে কেবল দীর্ঘ সময়ের জন্য টিকে থাকবে, সেটা বলে দেওয়ার জন্য নিশ্চয়ই জ্যোতিষী হওয়ার দরকার পড়ে না।
গণমাধ্যমের বর্তমান ও ভবিষ্যতের পেশাজীবীরাও পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্য নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জনে মনোযোগী হতে পারেন। বার্তাকক্ষের সম্পাদকীয় ও কারিগরি জ্ঞানের পাশাপাশি ডেটা অ্যানালাইসিস বা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট দর্শকগোষ্ঠী-ভিত্তিক কনটেন্টের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে পারার কাজটি জরুরি দক্ষতা হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করবে হয়তো খুব শিগগিরই। প্রয়োজন হবে মেশিন লার্নিং, এআই-ভিত্তিক টুলস এবং অ্যালগরিদম তৈরি ও পরিচালনা করতে সক্ষমতা। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও অগমেন্টেড রিয়েলিটির উপযোগী কনটেন্ট প্রস্তুতে পারদর্শিতাও।
এইসব বিষয়ে বেসিক জ্ঞানের উৎস কিন্তু দুর্লভ নয়। অনলাইনে খোঁজাখুঁজি করলেই বিস্তর তথ্য পাওয়া সম্ভব। চাইলে বিনামূল্যে সার্টিফাইড অনলাইন কোর্সও পর্যন্ত করে ফেলা যায়, যেটা হয়তো যে কাউকে চাকরির বাজারে অমূল্য করে তুলবে। আর আজকাল চ্যাট-জিপিটি, জেমিনাই, কো-পাইলটের মতো এআই টুলস বিনামূল্যেই যেসব তথ্য, এমনকি প্রশিক্ষণ কনটেন্ট দিয়ে সাহায্য করার সুবিধা দিচ্ছে, সেগুলো আয়ত্ত করেই যে কেউ নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মীতে পরিণত করতে পারে।
মনে রাখা দরকার, আজ থেকে কুড়ি-পঁচিশ বছর আগেও সংবাদকর্মীরা কাগজ-কলম ব্যবহার করে লিখতেন। আর এখন কম্পিউটার ব্যবহারের দক্ষতা না থাকাটা গুরুতর অদক্ষতা হিসেবে বিবেচিত। একটু খোঁজখবর করলে যে কেউই জানতে পারবেন, কয়েক বছরের মধ্যে এমন দিনও আসতে যাচ্ছে, যখন একজন সংবাদকর্মীকে নিজের পেশায় টিকে থাকতে হলে অতি অবশ্যই প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে হবে। বিশেষ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আর ডেটা সায়েন্স বিষয়ক জ্ঞান ও দক্ষতা না থাকলে তিনি এ পেশায় দাঁড়াতেই পারবেন না।
(নওরোজ ইমতিয়াজ: সাংবাদিক ও গণমাধ্যম-পরামর্শক)


মৃত্যুর মুখে এক ঐতিহ্যবাহী আন্তর্জাতিক মিডিয়া 
