মন্তব্য প্রতিবেদন

ঢাকার রাস্তায় আর কতকাল ভাসবে নাগরিক জীবন

ঢাকা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে, কথাটা শুনতে হয়তো নির্মম লাগে, কিন্তু বাস্তবতা এটাই। ছোট ছোট অনিয়ম, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বদলে তাৎক্ষণিক মুনাফাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং নগরের প্রাকৃতিক হাইড্রোলজিকে উপেক্ষা করার ফল আজ আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে।

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:১০ পিএম

রাতভর থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে ঢাকায়। ভোরের আলো ফুটতেই কাঁঠালবাগানের বাসায় জানালার পর্দা সরিয়ে সাইফুল আজিম দেখলেন, বাইরের দৃশ্যটা একদম অচেনা না হলেও প্রতিদিনের মতো না।

রাস্তার ধারের ড্রেন উপচে নোংরা পানি গ্রাস করে ফেলেছে নিচতলার গ্যারেজের অর্ধেকটা। সকালে গুলশানের অফিসে তার গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে, কিন্তু বাসার সামনেই হাঁটু সমান নোংরা পানি। স্যান্ডেল হাতে নিয়ে পানির ওপর দিয়েই সাবধানে গ্যারেজের দিকে পা বাড়ালেন তিনি। গাড়ির চাকা পানির নিচে—স্টার্ট নেওয়া তো দূরের কথা, গ্যারেজ থেকেই বের করা অসম্ভব। ল্যাপটপের ব্যাগটা উঁচুতে ধরে, রিকশার আশায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, এই শহরটা যেন নিজেই নিজের গলা টিপে ধরেছে।

একই সময়ে ঘরের ভেতরে তার জীবনসঙ্গিনী নুসরাত জাহানের কপালে চিন্তার ভাঁজ। তাদের ছয় বছরের মেয়ের স্কুলে অ্যাসেসমেন্ট ছিলো। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের পানির স্রোত দেখে নুসরাত বুঝতে পারলো, স্কুলে যাওয়ার কোনো পথ নেই। বাসার নিচতলার অবস্থা শোচনীয়, পানির তোড়ে গলির রাস্তাটা যেন কোনো এক ছোটখাটো নদী। ফ্রিজও খালি, কিন্তু পানির মধ্যে গলির মোড়ের দোকান পর্যন্ত যাওয়ার সাহসটুকু নেই।

রিকশাওয়ালাদের হাঁকডাক নেই, সবাই যেন নিথর জলমগ্ন শহরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। গত সপ্তাহের বৃষ্টির ভোগান্তি এখনো কাটেনি, তার মধ্যেই রাতের দুর্যোগ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এলো। ছেলেমেয়ের স্কুল কামাই, সংসারের কাজের জট আর দিনভর এই বন্দি জীবন—ঢাকা শহরে যেন এটাই এখন ‘নিউ নর্মাল’।

রাস্তার জমে থাকা এই পানি কেবল শুধুই বৃষ্টির পানি না, এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

আজিম কিংবা নুসরাতের মতো ঢাকা শহরের প্রতিটি মানুষের নিত্যদিনের এই ভোগান্তি আজ আর কেবল ‘আবহাওয়া’ নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত দুর্যোগ। কয়েক দশকের ভুল পরিকল্পনা, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং দায়িত্বহীনতার খেসারত দিচ্ছে আমাদের এই প্রিয় শহর।

শহরের ধমনীগুলো কেটে দিয়েছি আমরা নিজেরাই। ঢাকা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে ঢাকা শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় জলাশয়ের পরিমাণ ছিল মোট ভূমির ২০ দশমিক ৫৭ শতাংশ। যা ২০২৩ সাল নাগাদ তা এসে ঠেকেছে মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশে। এটি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের শহরের প্রাকৃতিক ‘স্পঞ্জ’ বা পানি শোষণ ক্ষমতার ধ্বংসলীলার দালিলিক প্রমাণও।

শহরের এই সবুজ এলাকা ও জলাশয়গুলো হারিয়ে যাওয়ার কারণেই বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে যাওয়ার জায়গা পাচ্ছে না; উপচে পড়ছে আমাদের বসতবাড়িতে।

বৃষ্টির হিসাব আর বন্যার গাণিতিক বাস্তবতা

ঢাকার বন্যা এখন আর কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি যেন এক গাণিতিক নিশ্চয়তা। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতই দায়ী নয়, শহরের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

ছোটো ছোটো খাল আর জলাধারগুলো দখল করে গড়ে উঠেছে কংক্রিটের অট্টালিকা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স-এর ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, ২০১০ সালের ড্যাপ ঘোষণার পর থেকে ঢাকা হারিয়েছে অন্তত ৩,৪৪০ একর বন্যাপ্রবাহ এলাকা ও জলাশয়।

সামান্য বৃষ্টিতেই যে শহর স্থবির হয়ে পড়ে, সেখানে আবহাওয়া অধিদপ্তর হয়তো জলবায়ু পরিবর্তনের দোহাই দেয়। কিন্তু শহরের শারীরিক কাঠামোর যে করুণ দশা, তা অস্বীকার করা বা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমাদের এখন ‘কংক্রিটের শহর’ নয়, বরং ‘স্পঞ্জ সিটি’-এর ধারণা নিয়ে ভাবতে হবে। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

‘ড্রেনেজ প্রজেক্টের’ মরীচিকা

ঢাকাকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে বাঁচাতে ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দুই সিটি কর্পোরেশন ২৬২ কোটি টাকারও বেশি খরচ করেছে। নতুন নতুন ড্রেন আর বক্স কালভার্ট তৈরি হয়েছে ৩৩৪ কিলোমিটারেরও বেশি। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, এতো টাকার কাজ গেল কোথায়?

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলছেন, শুধু ড্রেন বানিয়ে কোনো লাভ নেই, যদি না শহরের প্রাকৃতিক নালার সংযোগগুলো সচল থাকে। আর দায়সারা কাজের নমুনা তো প্রতি পদক্ষেপে। শহরের ড্রেনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে পানির বদলে জমে আছে পলিথিন, বর্জ্য আর অব্যবস্থাপনার স্তূপ।

বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার অভাব এখানে প্রকট। পানির পাইপ, ইন্টারনেটের তার আর বিদ্যুতের লাইন ড্রেনের মাঝখান দিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে আটকে দিচ্ছে। এককথায়, কোটি কোটি টাকা খরচ করে আমরা নিজেরাই পানি চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছি।

সমন্বয়হীনতার বৃত্তে বন্দি শহর

ঢাকার পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব এখন কার? ঢাকা ওয়াসা, দুই সিটি কর্পোরেশন, রাজউক—সবাই যেন একে অপরের দিকে আঙুল তুলে দায় সারছে। এই খণ্ডিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে একটি প্রকল্পের কোনো সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না।

২০২১ সালে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দায়িত্ব ওয়াসার কাছ থেকে সিটি কর্পোরেশনের হাতে আসলেও অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি। উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) কর্মকর্তাদের দাবি, তারা ২৯টি খালের দায়িত্ব পেলেও সেগুলোর বেশিরভাগই এখন দখল হয়ে আছে বা ভরাট করে ফেলা হয়েছে। পুরো শহরের জন্য একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান না থাকায় আজ এক এলাকার পানি গিয়ে পড়ছে অন্য এলাকায়, যা জলাবদ্ধতাকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলছেন, শুধু ড্রেন বানিয়ে কোনো লাভ নেই, যদি না শহরের প্রাকৃতিক নালার সংযোগগুলো সচল থাকে। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

ঢাকার ধমনীগুলো বাঁচানো প্রয়োজন

ঢাকা আজ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। তবে এখনো যদি নীতিনির্ধারকরা বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। বেসরকারি সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)-এর ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, নতুন নতুন কালভার্ট না বানিয়ে যদি শুধু দখল হয়ে যাওয়া ১৫টি খাল—যেমন, রূপনগর, বাউনিয়া, কল্যাণপুর ও মান্দা খাল—পুনরুদ্ধার করা যায়, তবে ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকটের ৮০ শতাংশ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমাদের এখন ‘কংক্রিটের শহর’ নয়, বরং ‘স্পঞ্জ সিটি’-এর ধারণা নিয়ে ভাবতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন:

কঠোর আইন প্রয়োগ: যেকোনো মূল্যে নদী, খাল আর জলাভূমি ভরাট বন্ধ করা এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা।

একটিই কর্তৃপক্ষ: পানি নিষ্কাশন ও জলাধার রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী এবং একক কর্তৃপক্ষ তৈরি করা, যারা সব সংস্থা ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাজের সমন্বয় করবে।

প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান: কংক্রিটের বক্স কালভার্টের পরিবর্তে মাটির শোষণক্ষমতা বজায় রাখা এবং সবুজ এলাকা বৃদ্ধি করা।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ড্রেনে বর্জ্য ফেলার সংস্কৃতি বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

ঢাকা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে, কথাটা শুনতে হয়তো নির্মম লাগে, কিন্তু বাস্তবতা এটাই। ছোট ছোট অনিয়ম, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বদলে তাৎক্ষণিক মুনাফাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং নগরের প্রাকৃতিক হাইড্রোলজিকে উপেক্ষা করার ফল আজ আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে।

রাস্তার জমে থাকা এই পানি কেবল শুধুই বৃষ্টির পানি না, এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। আমরা যদি এখনো সচেতন না হই, পরিকল্পনা ও উন্নয়নের ধরনে পরিবর্তন না আনি, তবে আগামী দিনের বর্ষাকালগুলো কেবল ভোগান্তি নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।