ভারী বৃষ্টিতে থমকে দেশ, বাড়ছে বন্যা-পাহাড়ধসের শংকা

নিম্নচাপের প্রভাবে কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে, স্থগিত হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা, আর পাহাড়ি এলাকায় বেড়েছে ভূমিধসের ঝুঁকি। 

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম

বর্ষা মৌসুম বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই বেশি বৃষ্টিপাত হয়, তবে গত কয়েকদিনের বিরামহীন বৃষ্টিতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জনজীবন। কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও সড়কে ধীরগতি। স্থগিত করতে হয়েছে চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষাও। 

কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রামের ৬ হাজার পরিবারও পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে আশংকা করা হচ্ছে। 

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এরমধ্যে রাঙামাটিতে ২৮৭ মিলিমিটার, চট্টগ্রামে ২৮৪ মিলিমিটার এবং কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ২৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। ময়মনসিংহে হয়েছে ১৫১ ও হাতিয়ায় ১৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত।  রাজধানী ঢাকাতে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৫৯ মিলিমিটার।

কেন এত বৃষ্টি

ভারী বৃষ্টির মুল কারণ হিসেবে বঙ্গেসাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপ দায়ী করা হচ্ছে।  নিম্নচাপটি বর্তমানে ভারতের মধ্যপ্রদেশের দিকে সরে গেলেও এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হচ্ছে। 

আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য থাকায় উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব মধ্য প্রদেশ ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে উত্তরপশ্চিম মধ্য প্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। 

এটি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ু চাপের তারতম্যের আধিক্য রয়েছে। 

দেশের বিভিন্ন স্থানে চলছে ভারী বৃষ্টি

সমুদ্র বন্দরসমূহ, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার উপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে বলেও আবহাওয়া অফিস থেকে জানানো হয়েছে।  

ভারী বর্ষণের প্রভাবে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে মানুষের চলাচলে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। অফিসগামী মানুষকে ছাতা নিয়ে বের হতে হচ্ছে, অনেক সড়কে যানবাহনের গতি কমেছে। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না অনেকে।

বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রমেও। ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বুধবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বুধবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

যোগাযোগ বিঘ্নিত

ভারী বৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন শহরের রাস্তায় পানি উঠে গেছে। ফলে ব্যহত হচ্ছে স্বাভাবিক যোগাযোগ। সড়ক, রেল ও নৌপথ সবখানেই বিপাকে পড়ছেন যাত্রীরা।  

লঘুচাপের প্রভাবের কারণে দ্বীপ জেলা ভোলায় বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করেছে। মেঘনা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর ও নৌবন্দরে ১ নম্বর সতর্কতা সংকেত জারি করায় ভোলা-মনপুরা-হাকিমুদ্দনসহ ৫টি নৌ রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

টানা ভারী বৃষ্টির প্রভাবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগও ব্যাহত হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুরের সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকার কাছে রেললাইনে পানি উঠে যাওয়ায় এই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। 

রেলওয়ে জানিয়েছে, ষোলোশহর-জানালিহাট সেকশনের মধ্যবর্তী ওই এলাকায় প্রায় দুই ফুট পানি জমে থাকায় রেলপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ফলে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কক্সবাজার এক্সপ্রেস চট্টগ্রাম স্টেশনে আটকে যায় এবং কক্সবাজারের উদ্দেশে যাত্রা করতে পারেনি। একই কারণে বুধবার সকালে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সৈকত এক্সপ্রেসের যাত্রা বাতিল করা হয়। 

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে প্রতিদিন আটটি ট্রেন চলাচল করে; এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে দুটি করে ট্রেন কক্সবাজারে যাওয়া-আসা করে। 

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রেললাইনের পানি নেমে নিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি হলে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু করা হবে। 

বাড়ছে পাহাড়ধসের ঝুঁকি

ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ পাহাড়ি এলাকাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এরই মধ্যে দেশের কয়েকটি স্থানে পাহাড়ধস ও দেয়াল ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরে অস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস হতে পারে।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া উখিয়ায় ভারী বৃষ্টিতে দেয়াল ধসে একজনের প্রাণ হারিয়েছেন। 

এই শংকার মধ্যেই চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি পাহাড়ে এখনো বসবাস করছে ৬ হাজার ৫৫৮ পরিবার। 

পরিবেশকর্মী ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব আলাপ-কে বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের পাহাড়গুলো দেখতে শক্ত মনে হলেও এগুলো মূলত নরম মাটির স্তর দিয়ে গঠিত। এসব পাহাড়ের মাটির গঠন এমন যে, অতিবৃষ্টি হলে সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। পাহাড়ের প্রাকৃতিক স্থিতিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটালে তা ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে। 

ইকবাল হাবিবের মতে, পাহাড়ে বসতি স্থাপনের ধরন পরিবর্তনের কারণেও ঝুঁকি বেড়েছে। আগে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী পাহাড়ের চূড়া বা টিলার উপরে বসতি স্থাপন করলেও পরবর্তী সময়ে সমতলের মানুষের বসতি স্থাপনের ধরন পাহাড় কাটার প্রবণতা বাড়িয়েছে। 

এর ফলে পাহাড়ধসের ঘটনাও বাড়ছে বলে জানান বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক। 

নদী ও উপকূলে সতর্কতা জারি

ভারী বৃষ্টিতে নদীবন্দরগুলোর জন্যও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

উপকূলীয় এলাকার জন্যও সতর্কতা রয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এখন বর্ষা মৌসুমের মধ্যভাগ চলছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাসে ঘন ঘন মেঘ তৈরি হচ্ছে। ফলে আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

বন্যার শংকা

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগের গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়েছে। আগামী তিন দিন এসব নদীর পানি আরও দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। পাশাপাশি ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির কিছু এলাকায় নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।

এদিকে বান্দরবানের সাঙ্গু নদী ও কক্সবাজারের লামায় মাতামুহুরী নদী ইতোমধ্যে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভূগাই নদীর পানিও বাড়ছে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় এসব নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের নিম্নাঞ্চলে সাময়িক বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

রংপুর বিভাগেও বাড়ছে নদীর পানি। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এতে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুরের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বাড়ায় লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের কিছু এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, আগামী তিন দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গের উজান এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাবে নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।

বর্তমানে দেশের প্রধান নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আগামী কয়েক দিনে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং ভারতের উজান এলাকাগুলোতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

নদীবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে সতর্কতা

বৃষ্টির সঙ্গে দমকা ও ঝড়ো হাওয়ার আশঙ্কায় দেশের বিভিন্ন নদীবন্দরকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। 

সতর্কতায় বলা হয়েছে, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, টাংগাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, খুলনা, যশোর, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্রগ্রাম, কক্রবাজার এবং সিলেট অঞ্চল সমূহের উপর দিয়ে দক্ষিণ/দক্ষিণ-পূর্বদিক থেকে ঘন্টায় ৪৫-৬০ কি.মি. বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা/ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি/বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দর সমূহকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। 

অন্যদিকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।