ইউরোপে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ হারে বাড়ছে তাপমাত্রা। চলমান ‘ওমেগা ব্লক’ তাপপ্রবাহে ফ্রান্সেই মারা গেছেন ১৮ জন। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বাতাসে উচ্চ ‘ডিউ পয়েন্ট’ বা অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে এবারের ভ্যাপসা গরম আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
তানজিলা রহমান
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৬, ০৬:০১ পিএমআপডেট : ২৩ জুন ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম
ইউরোপজুড়ে চলছে তীব্র তাপপ্রবাহ। বেশ কয়েকটি শহর ভেঙেছে আগের সব রেকর্ড। তীব্র প্রবাহে শুধু ফ্রান্সেই মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গরম মোকাবিলায় দেশটিতে স্কুলের সূচিতে আনা হয়েছে পরিবর্তন। এ ছাড়া ১ হাজার ৩৫০টি স্কুল বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। ইংল্যান্ড ও ওয়েলস-এ ২৪৮টি স্কুল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় কাউন্সিল।
জুন মাসেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, তীব্র গরমে গত চার বছরে ইউরোপে প্রাণ হারিয়েছেন দুই লাখেরও বেশি মানুষ।
ব্রিটেনের আবহাওয়াবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন- এই সপ্তাহে জুনের তাপমাত্রা আগের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলতে পারে।
ইতোমধ্যে ফ্রান্সের বোর্দোতে তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।
মধ্য ফ্রান্সের পোয়াতিয়েতে তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৪৭ সালের পর এই শহরে কখনো এতো গরম পড়েনি।
তীব্র গরম পড়েছে ইউরোপের আরেক দেশ স্পেনে। তুলনামূলকভাবে শীতল উত্তরাঞ্চলীয় শহর সান সেবাস্তিয়ানে তাপমাত্রা পৌঁছাতে পারে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
রয়টার্স ক্লাইমেট মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিশ্বের অন্যান্য যেকোনো অঞ্চলের আবহাওয়া থেকে ইউরোপ ছিলো অস্বাভাবিক। অর্থাৎ স্বাভাবিক তাপমাত্রা থেকে অনেক বেশি উষ্ণ ছিলো ইউরোপের আবহাওয়া।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার এপ্রিল মাসের এক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিলো, সারাবিশ্বের তুলনায় ইউরোপের তাপমাত্রা বাড়ছে দ্বিগুণ হারে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক গবেষণা সহযোগী ক্লেয়ার বার্নস রয়টার্সকে বলেছেন, ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়া তাপপ্রবাহটির নাম ‘ওমেগা ব্লক’।
এই ধরনের তাপপ্রবাহে উষ্ণ বাতাস মাঝখানে আটকে থাকে এবং দুই পাশে তুলনামূলক শীতল বাতাস থাকে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ও ঝড় আরও তীব্র হচ্ছে, যা তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতও বাড়াচ্ছে।
বাড়ছে মৃত্যু
তীব্র এই দাবদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ফ্রান্সে প্রচণ্ড গরমে গাড়ির ভেতর আটকে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের কার্পেনট্রাসের একজন প্রসিকিউটর রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বাড়ির বাইরে পারিবারিক গাড়ির ভেতর থেকে বাচ্চাদের মা অচেতন অবস্থায় তাদের উদ্ধার করেন। দুই শিশুর মধ্যে একজনের বয়স ছিলো ২ আরেকজন ৪ বছর। উদ্ধারের পর তাদের বাঁচাতে পারেননি।
রবিবার সন্ধ্যায় ফ্রান্স টিভিকে স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা সোফি ব্রোকাস জানান, বোর্দো অঞ্চলে সপ্তাহ শেষে স্বাস্থ্য সমস্যায় ৮০ থেকে ৯৫ বছর বয়সী তিনজন প্রবীণ মারা গেছেন। তাদের স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ ছিলো তীব্র তাপপ্রবাহ।
এদিকে তীব্র গরম থেকে স্বস্তি পেতে এবং শরীর শীতল করতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষ নদী ও হ্রদের মতো উন্মুক্ত জলাশয়গুলোতে ভিড় করছেন। কিন্তু তা করতে গিয়ে জার্মানিতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন অনেকেই।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বেচ্ছাসেবী লাইফগার্ড সংস্থা 'জার্মান লাইফ সেভিং অ্যাসোসিয়েশন' (ডিএলআরজি) জানিয়েছে, প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি খুঁজতে গিয়ে জার্মানির বিভিন্ন প্রান্তে পানিতে ডুবে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
ফ্রান্সের সিভিল সিকিউরিটি সার্ভিসের মুখপাত্র জেরোম বুলাঞ্জার তাপপ্রবাহের কারণে নাগরিকদের সতর্ক করেন। তিনি শুধুমাত্র নিরাপদ স্থানে নাগরিকদের সাঁতার কাটতে নির্দেশনা দেন। কারণ রবিবার থেকে সোমবারের মধ্যে অন্তত ১৩ জন পানিতে ডুবে মারা গেছেন।
তিনি আরও জানান, পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার গত বছরের তুলনায় ১৭২ শতাংশ বেশি।
‘ব্রিটেনে রেকর্ড উষ্ণতা’
ব্রিটেনের জাতীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থা মেট অফিস সোমবার জানিয়েছে, চার দিনের তাপপ্রবাহ কিছু কিছু জায়গায় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে নিয়ে যেতে পারে, যা ১৯৫৭ এবং ১৯৭৬ সালে জুন মাসের ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ড সহজেই ভেঙে দেবে।
ফ্রান্সের সরকারি ও জাতীয় আবহাওয়া পরিষেবা সংস্থা মেটিও-ফ্রান্সের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্যারিসে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
স্পেনের আবহাওয়া সংস্থার মুখপাত্র রুবেন দেল কাম্পো বলেছেন, “বছরের এই সময়ের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে আমরা ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রা দেখছি। উত্তরের এলাকাগুলোতে শীতল আবহাওয়া থাকলে তা আগের চেয়েও গড়ে ১০ ডিগ্রি বেশি।”
ইতালিতে ‘রেড হিটওয়েভ অ্যালার্ট’
সোমবার ইতালির ১২টি শহরে তাপপ্রবাহের কারণে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে সরকার।
তীব্র তাপদাহের কারণে বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হওয়ায় ইতালির তুরিন শহরে শুরু হয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় ইউটিলিটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান 'আইরেন' তাদের কর্মীদের কাজের শিফট দ্বিগুণ করেছে। একইসঙ্গে জরুরি ব্যাকআপ হিসেবে অতিরিক্ত জেনারেটর যুক্ত করছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের একজন মুখপাত্র।
অস্বাভাবিক তাপমাত্রার প্রভাব পড়েছে বন্যপ্রাণীদের ওপরও।
বেলজিয়ামের টেম্পলুক্সে অবস্থিত একটি বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা রোমেইন দে জেগেরে জানান, ঘরের চালের কার্নিশে বাসা বানানো পাখিদেরও স্বাভাবিক চলাফেরা হুমকির মুখে পড়েছে।
জেগেরে বলেন, "তীব্র রোদে ঘরের ছাদ বা চালের তাপমাত্রা কখনো কখনো ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। ফলে পাখিরা লাফিয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে। কারণ তীব্র গরমে নিজের বাসাতেও তারা থাকতে পারছে না।"
তিনি আরও জানান, গত তিন দিনে তাদের বন্যপ্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে এমন ১৫০টি পাখিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছে।
কেন এবারের তাপপ্রবাহ সাধারণ মানুষের জন্য বেশি কষ্টদায়ক হতে পারে?
এবারের তাপপ্রবাহ আগের সব রেকর্ড তো ভাঙবেই, সঙ্গে ভোগান্তিও বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়াবিদরা।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস মেট, বিবিসিকে জানায়, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ফলে মানুষের শরীর থেকে ঘাম সহজে শুকাচ্ছে না। তারা মনে করছেন এ বছরের গরম সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ এটি। বৃহস্পতিবারের মধ্যে যুক্তরাজ্যে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
তবে আবহাওয়াবিদরা এবার শুধু তাপমাত্রার দিকেই নজর রাখছেন না, বরং তাদের মূল মনোযোগ এখন ‘ডিউ পয়েন্ট’-এর দিকে। ‘ডিউ পয়েন্ট’ বা শিশিরাঙ্ক হলো বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ এবং এটি কতটা জলীয় বাষ্প ধরে রেখেছে তার পরিমাপ।
মেট অফিস সতর্ক করেছে যে, এবারের তাপপ্রবাহে এই শিশিরাঙ্কের মাত্রা ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত যেতে পারে।
২০২২ সালের জুলাই মাসে যখন ইউরোপে ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখনও এই শিশিরাঙ্কের মাত্রা ছিল মাত্র এক অঙ্কের ঘরে। সেই তুলনায় এবারের ২২ ডিগ্রি শিশিরাঙ্ক অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ, ভাঙছে পুরনো সব রেকর্ড
ইউরোপে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ হারে বাড়ছে তাপমাত্রা। চলমান ‘ওমেগা ব্লক’ তাপপ্রবাহে ফ্রান্সেই মারা গেছেন ১৮ জন। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বাতাসে উচ্চ ‘ডিউ পয়েন্ট’ বা অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে এবারের ভ্যাপসা গরম আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ইউরোপজুড়ে চলছে তীব্র তাপপ্রবাহ। বেশ কয়েকটি শহর ভেঙেছে আগের সব রেকর্ড। তীব্র প্রবাহে শুধু ফ্রান্সেই মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গরম মোকাবিলায় দেশটিতে স্কুলের সূচিতে আনা হয়েছে পরিবর্তন। এ ছাড়া ১ হাজার ৩৫০টি স্কুল বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। ইংল্যান্ড ও ওয়েলস-এ ২৪৮টি স্কুল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় কাউন্সিল।
জুন মাসেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, তীব্র গরমে গত চার বছরে ইউরোপে প্রাণ হারিয়েছেন দুই লাখেরও বেশি মানুষ।
ব্রিটেনের আবহাওয়াবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন- এই সপ্তাহে জুনের তাপমাত্রা আগের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলতে পারে।
ইতোমধ্যে ফ্রান্সের বোর্দোতে তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।
মধ্য ফ্রান্সের পোয়াতিয়েতে তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৪৭ সালের পর এই শহরে কখনো এতো গরম পড়েনি।
তীব্র গরম পড়েছে ইউরোপের আরেক দেশ স্পেনে। তুলনামূলকভাবে শীতল উত্তরাঞ্চলীয় শহর সান সেবাস্তিয়ানে তাপমাত্রা পৌঁছাতে পারে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
রয়টার্স ক্লাইমেট মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিশ্বের অন্যান্য যেকোনো অঞ্চলের আবহাওয়া থেকে ইউরোপ ছিলো অস্বাভাবিক। অর্থাৎ স্বাভাবিক তাপমাত্রা থেকে অনেক বেশি উষ্ণ ছিলো ইউরোপের আবহাওয়া।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার এপ্রিল মাসের এক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিলো, সারাবিশ্বের তুলনায় ইউরোপের তাপমাত্রা বাড়ছে দ্বিগুণ হারে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক গবেষণা সহযোগী ক্লেয়ার বার্নস রয়টার্সকে বলেছেন, ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়া তাপপ্রবাহটির নাম ‘ওমেগা ব্লক’।
এই ধরনের তাপপ্রবাহে উষ্ণ বাতাস মাঝখানে আটকে থাকে এবং দুই পাশে তুলনামূলক শীতল বাতাস থাকে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ও ঝড় আরও তীব্র হচ্ছে, যা তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতও বাড়াচ্ছে।
বাড়ছে মৃত্যু
তীব্র এই দাবদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ফ্রান্সে প্রচণ্ড গরমে গাড়ির ভেতর আটকে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের কার্পেনট্রাসের একজন প্রসিকিউটর রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বাড়ির বাইরে পারিবারিক গাড়ির ভেতর থেকে বাচ্চাদের মা অচেতন অবস্থায় তাদের উদ্ধার করেন। দুই শিশুর মধ্যে একজনের বয়স ছিলো ২ আরেকজন ৪ বছর। উদ্ধারের পর তাদের বাঁচাতে পারেননি।
রবিবার সন্ধ্যায় ফ্রান্স টিভিকে স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা সোফি ব্রোকাস জানান, বোর্দো অঞ্চলে সপ্তাহ শেষে স্বাস্থ্য সমস্যায় ৮০ থেকে ৯৫ বছর বয়সী তিনজন প্রবীণ মারা গেছেন। তাদের স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ ছিলো তীব্র তাপপ্রবাহ।
এদিকে তীব্র গরম থেকে স্বস্তি পেতে এবং শরীর শীতল করতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষ নদী ও হ্রদের মতো উন্মুক্ত জলাশয়গুলোতে ভিড় করছেন। কিন্তু তা করতে গিয়ে জার্মানিতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন অনেকেই।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বেচ্ছাসেবী লাইফগার্ড সংস্থা 'জার্মান লাইফ সেভিং অ্যাসোসিয়েশন' (ডিএলআরজি) জানিয়েছে, প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি খুঁজতে গিয়ে জার্মানির বিভিন্ন প্রান্তে পানিতে ডুবে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
ফ্রান্সের সিভিল সিকিউরিটি সার্ভিসের মুখপাত্র জেরোম বুলাঞ্জার তাপপ্রবাহের কারণে নাগরিকদের সতর্ক করেন। তিনি শুধুমাত্র নিরাপদ স্থানে নাগরিকদের সাঁতার কাটতে নির্দেশনা দেন। কারণ রবিবার থেকে সোমবারের মধ্যে অন্তত ১৩ জন পানিতে ডুবে মারা গেছেন।
তিনি আরও জানান, পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার গত বছরের তুলনায় ১৭২ শতাংশ বেশি।
‘ব্রিটেনে রেকর্ড উষ্ণতা’
ব্রিটেনের জাতীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থা মেট অফিস সোমবার জানিয়েছে, চার দিনের তাপপ্রবাহ কিছু কিছু জায়গায় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে নিয়ে যেতে পারে, যা ১৯৫৭ এবং ১৯৭৬ সালে জুন মাসের ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ড সহজেই ভেঙে দেবে।
ফ্রান্সের সরকারি ও জাতীয় আবহাওয়া পরিষেবা সংস্থা মেটিও-ফ্রান্সের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্যারিসে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
স্পেনের আবহাওয়া সংস্থার মুখপাত্র রুবেন দেল কাম্পো বলেছেন, “বছরের এই সময়ের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে আমরা ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রা দেখছি। উত্তরের এলাকাগুলোতে শীতল আবহাওয়া থাকলে তা আগের চেয়েও গড়ে ১০ ডিগ্রি বেশি।”
ইতালিতে ‘রেড হিটওয়েভ অ্যালার্ট’
সোমবার ইতালির ১২টি শহরে তাপপ্রবাহের কারণে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে সরকার।
তীব্র তাপদাহের কারণে বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হওয়ায় ইতালির তুরিন শহরে শুরু হয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় ইউটিলিটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান 'আইরেন' তাদের কর্মীদের কাজের শিফট দ্বিগুণ করেছে। একইসঙ্গে জরুরি ব্যাকআপ হিসেবে অতিরিক্ত জেনারেটর যুক্ত করছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের একজন মুখপাত্র।
অস্বাভাবিক তাপমাত্রার প্রভাব পড়েছে বন্যপ্রাণীদের ওপরও।
বেলজিয়ামের টেম্পলুক্সে অবস্থিত একটি বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা রোমেইন দে জেগেরে জানান, ঘরের চালের কার্নিশে বাসা বানানো পাখিদেরও স্বাভাবিক চলাফেরা হুমকির মুখে পড়েছে।
জেগেরে বলেন, "তীব্র রোদে ঘরের ছাদ বা চালের তাপমাত্রা কখনো কখনো ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। ফলে পাখিরা লাফিয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে। কারণ তীব্র গরমে নিজের বাসাতেও তারা থাকতে পারছে না।"
তিনি আরও জানান, গত তিন দিনে তাদের বন্যপ্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে এমন ১৫০টি পাখিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছে।
কেন এবারের তাপপ্রবাহ সাধারণ মানুষের জন্য বেশি কষ্টদায়ক হতে পারে?
এবারের তাপপ্রবাহ আগের সব রেকর্ড তো ভাঙবেই, সঙ্গে ভোগান্তিও বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়াবিদরা।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস মেট, বিবিসিকে জানায়, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ফলে মানুষের শরীর থেকে ঘাম সহজে শুকাচ্ছে না। তারা মনে করছেন এ বছরের গরম সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ এটি। বৃহস্পতিবারের মধ্যে যুক্তরাজ্যে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
তবে আবহাওয়াবিদরা এবার শুধু তাপমাত্রার দিকেই নজর রাখছেন না, বরং তাদের মূল মনোযোগ এখন ‘ডিউ পয়েন্ট’-এর দিকে। ‘ডিউ পয়েন্ট’ বা শিশিরাঙ্ক হলো বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ এবং এটি কতটা জলীয় বাষ্প ধরে রেখেছে তার পরিমাপ।
মেট অফিস সতর্ক করেছে যে, এবারের তাপপ্রবাহে এই শিশিরাঙ্কের মাত্রা ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত যেতে পারে।
২০২২ সালের জুলাই মাসে যখন ইউরোপে ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখনও এই শিশিরাঙ্কের মাত্রা ছিল মাত্র এক অঙ্কের ঘরে। সেই তুলনায় এবারের ২২ ডিগ্রি শিশিরাঙ্ক অত্যন্ত বিপজ্জনক।
(রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসি অবলম্বনে)
বিষয়: