‘বেয়ারা’ ক্রিকেটারদের হাত ধরে ভারত যেভাবে সুপারপাওয়ার

ভারত এখন ক্রিকেট বিশ্বের শক্তিধর এক চরিত্র, যার কথায় টুর্নামেন্ট কীভাবে খেলা হবে সেটাও নির্ধারিত হয়। ক্রিকেটকে ভারতে নিয়ে এসেছিল ব্রিটিশরা। আর সেই ব্রিটিশদের খেলায় এখন রাজ করছে ভারত !

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম

একটা সময় ভারত কোনও আইসিসি টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠতে পারলে, সেটাকেই একটা বিরাট সাফল্য হিসাবে দেখা হতো, যেমন ২০০৩ সালে সৌরভ গাঙ্গুলির দলের সাফল্য। অস্ট্রেলিয়ার সাথে ফাইনালে সেই হারকে ভারতের ক্রিকেটে খুব একটা নেতিবাচকভাবে দেখা হয় না।

এখন চলুন সময়টাকে টেনে ২০ বছর এগিয়ে নিয়ে আসি, ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনালের থমথমে মাঠের কথা মনে আছে? এবারেও ভারতের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া। ফলাফল একই; বেশ দাপুটে জয় পেয়েছে অজিরা।

তবে ভারতের মধ্যে এই হার ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছিল; গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। উনিশে নভেম্বর ২০২৩ লিখে সার্চ করলে সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন বহু পোস্ট পাওয়া যাবে যেখানে এই দিনটিকে বলা হয়েছে ভারতের ক্রিকেট ফ্যানদের জন্য একটা শোকের দিন।

সেই সময়ে রাজনৈতিক বিতর্কও উঠে আসে। 

আহমেদাবাদ এখন ভারতের রাজনৈতিক প্রতীক। সেখানকার স্টেডিয়ামের নাম নরেন্দ্র মোদী আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আর সেখানেই ফাইনাল খেলা হচ্ছে। মানে মুম্বাই বা ইডেন থেকে ভারতের ক্রিকেটের কেন্দ্র এখন গুজরাটের দিকে নেয়া হয়েছে।

মোদীকে যারা ভালোবাসেন তারা মনে করেন এই স্টেডিয়ামই নতুন ভারতের চেহারা, আবার ভারতে যারা মোদী বিরোধী তাদের একটা অংশের দাবি এটা ভারতের ক্রিকেটের রাজনীতিকরণ।

তাই এই নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে ভারতের ২০২৩ সালের হারটা মনে রাখেন দুই পক্ষই। সেখানে এসে ২০২৬ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল জয় কি সেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হারের ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ হিসেবে কাজ করবে?

এখন প্রলেপের কথা আসলে কথা ঘুরে ভিন্নখাতে চলে যাবে, কারণ ২০২৩ সাল এখন এই সেদিন বলে মনে হলেও এরপরে কেটে গেছে তিনটি বছর।

এর মাঝে বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মা ভারতের টি-টোয়েন্টি ও টেস্ট দল থেকে বিদায় নিয়ে নিয়েছেন। অর্থাৎ একটা যুগের ইতি টেনে দিয়েছেন ভারতের ক্রিকেটকে বয়ে নিয়ে চলা এই দুই মহারথী।

এর মাঝে তারা জিতে নিয়েছেন ২০২৪ সালে আমেরিকার মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। আর তার পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপা এবং টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের এশিয়া কাপ।

এর মাঝে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্ক নেমে এসেছে ইতিহাসের সবচেয়ে তলানিতে, এমনই যে ভারত এখনও তাদের এশিয়া কাপের শিরোপা গ্রহণ করেনই, কারণ সেই ট্রফি তুলে দেয়ার কথা ছিল মহসিন নকভীর, যিনি পাকিস্তান ক্রিকেটের শীর্ষ কর্মকর্তা।

এমনই যে এবারের বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের খেলারই কথা ছিল না, ম্যাচ শুরুর দিন দুয়েক আগে আন্তর্জাতিক-রাজনৈতিক নানা কাটাছেঁড়ার পরে পাকিস্তান খেলতে রাজি হয়।

এই সময়ের একটা কথা বলে রাখি, পাকিস্তান যখন ভারতের বিপক্ষে খেলবে না বলে সরকারি ঘোষণা দিয়েছিল হার্শা ভোগলেসহ ভারতের বেশ কজন ক্রিকেট পণ্ডিত তখন বলেছিলেন, পাকিস্তান অবশ্যই খেলবে।

আর শেষ পর্যন্ত হয়েছেও তাই। পাকিস্তান ভারতের বিপক্ষে খেলেছে, নিজেদের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় খেলেছে এবং সবই হয়েছে যা পরিকল্পনায় ছিল।

এর মাঝে মোস্তাফিজের আইপিএল বিড়ম্বনার পরে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে খেলাই হলো না!

কিন্তু ছুটে চলা থামেনি ভারতের। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এতোটাই দুর্বার ছিল তারা, যে ভুলিয়েই দিয়েছে যে অস্ট্রেলিয়া নামের কোন দল খেলেছে আর নিউজিল্যান্ড নক আউটের মঞ্চে কতটা শক্তিশালী! যেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারত কখনই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কোন ম্যাচে জেতেনি সেই কিউইদেরই ফাইনালে হারাল ৯৬ রানের বিশাল ব্যবধানে।

ভারত এখন ক্রিকেট বিশ্বের শক্তিধর এক চরিত্র, যার কথায় টুর্নামেন্ট কীভাবে খেলা হবে সেটাও নির্ধারিত হয়। ক্রিকেটকে ভারতে নিয়ে এসেছিল ব্রিটিশরা। আর সেই ব্রিটিশদের খেলায় এখন রাজ করছে ভারত!

ক্রিকেটকে প্রায়শই বলা হয়, “একটি ভারতীয় খেলা যা দুর্ঘটনাক্রমে ইংরেজরা আবিষ্কার করেছিল।”

ইতিহাসের একটি কৌতুক, যে খেলা আগে ঔপনিবেশিক ধনী সম্প্রদায়ের জন্য একচেটিয়াভাবে সংরক্ষিত ছিল, তা আজ প্রাক্তন উপনিবেশিত ভারতের জাতীয় আবেগ। আরও আশ্চর্যজনক হলো, ভারত আজ বিশ্ব ক্রিকেটের একমাত্র সুপারপাওয়ার।

ভারতীয়রা এই ব্যাপারটাকে অত্যন্ত উপভোগ করে। তাদের কাছে ‘টিম ইন্ডিয়া’ কেবল একটি দল নয়, দেশের একতা ও বৈচিত্র্যতার প্রতীক।

সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার রাহুল দ্রাবিড় ২০১১ সালে বলেছিলেন, “গত দশকে ভারতীয় দল আরও স্পষ্টভাবে আমাদের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে — যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম এবং শ্রেণির মানুষ একত্রিত।”

কিন্তু ক্রিকেট ও জাতির সংযোগ স্বাভাবিক বা অনিবার্য ছিল না। প্রথম ভারতীয় ক্রিকেট দলের মাঠে নামতে ১২ বছর এবং তিনটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা লেগেছিল।

বলিউড মুভি ‘লাগান’-এ দেখানো হয়েছে, এই “জাতীয় দল” গঠিত হয়েছিল উপনিবেশের বিরুদ্ধে, তবে আসল দলটির রূপ ছিল ভিন্ন, উপনিবেশের সঙ্গে সমন্বয়ে।

ভারতীয় ব্যবসায়ী, রাজকীয় অভিজাত ও পাবলিসিস্টরা ব্রিটিশ গভর্নর, প্রশাসক, সাংবাদিক, সৈনিক ও পেশাদার কোচদের সঙ্গে মিলিত হয়ে এই দল গঠন করেছিলেন।

এই ঔপনিবেশিক ও স্থানীয় অভিজাতদের সংযুক্তির কারণে, ভারতীয় দল শতাধিক বছর আগে ইম্পেরিয়াল ব্রিটেনে প্রতিনিধিত্ব করেছিল।

ভারতীয় ক্রিকেট দল গঠনের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও জটিল ছিল। প্রথম ধারণা আসে ১৮৯৮ সালে, যখন ভারতীয় রাজপুত্র কুমারশ্রী রঞ্জিত সিংহজি বা রঞ্জি ব্রিটিশদের বিস্তৃত উপনিবেশকে মুগ্ধ করেছিলেন তার অসাধারণ ব্যাটিং দিয়ে।

ভারতীয় ক্রিকেট প্রমোটররা রঞ্জির খ্যাতি কাজে লাগিয়ে দল গঠন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রঞ্জি, যিনি ক্রিকেট খ্যাতি ব্যবহার করে নওয়ানগড়ের শাসক হন, এমন প্রজেক্টে সতর্ক ছিলেন যা তার নাগরিকত্ব বা ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

ইংরেজ অভিজাতদের মধ্যে, বিশেষ করে লর্ড হ্যারিস, তখনকার বোম্বের প্রাক্তন গভর্নর, রঞ্জির সাফল্যকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি।

চার বছর পরে পরিস্থিতি বদলায়। ঔপনিবেশিক ভারতীয় ইউরোপীয়রা, যারা নিজ দেশে দল আনার আকাঙ্ক্ষা রাখতেন, ক্ষমতাশালী স্থানীয় অভিজাতদের সঙ্গে মিলেমিশে ভারতীয় দল গঠন করেন।

এখন ভারতই পৃথিবীতে ক্রিকেট রপ্তানি করছে; অনেক দেশের জাতীয় দলেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার আছেন।

ভারতের ক্রিকেট গত কয়েক বছরে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এতোটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, দেশের সেরা খেলোয়াড়রা বিপুল আয় করছেন এবং তাদের প্রতি সমর্থকদের উন্মাদনা ফুটবল বা এনএফএল-এর বড় তারকার মতো।

টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া বিরাট কোহলির ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ারে সংখ্যা ২৭৪ মিলিয়ন! তার এই জনপ্রিয়তা ক্রিকেটকে ২০২৮ সালের অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। খোদ অলিম্পিক আয়োজকরাই কোহলিকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছেন।

ভারতের ক্রিকেটের আরেকটি শক্তি হলো আইপিএল। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে আলোচিত টুর্নামেন্টগুলোর মধ্যে একটি। ২০২৩ সাল থেকে পাঁচ বছরের স্ট্রিমিং ও টিভি রাইটস বিক্রি হয়েছে ৬.২ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে একটি মৌসুমে ৭৪টি ম্যাচ খেলা হয়।

বিসিসিআই-এর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আয় ছিল ১.২ বিলিয়ন ডলার, যা পরবর্তী সর্বোচ্চ আয়কারী বোর্ড ইংল্যান্ডের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। যদি আইপিএলের মোট আয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে বিসিসিআই-এর মোট বার্ষিক আয় ১.৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

ভারতের এই অর্থনৈতিক শক্তি অন্যান্য দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলছে। তারা প্রায় ৪০ শতাংশ আইসিসি আয় পান, এবং অনেক ক্রিকেটীয় দেশের অর্থনৈতিক স্থিতি প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল।

উদাহরণস্বরূপ, পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় রাজনৈতিক কারণে ভারত ম্যাচ খেলতে অস্বীকার করলেও তাদের সব খেলা দুবাইয়ে আয়োজন করা হয়েছিল। এছাড়া এশিয়া কাপে পাকিস্তানের সঙ্গে হাত মেলাতে রাজি হয়নি ভারত। এসব ঘটনার মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, ভারত কেবল মাঠের খেলোয়াড় নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করছে।

ভারতের ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা শুধু অর্থ ও রাজনীতি নয়, এটি দেশের সামাজিক সংহতিরও প্রতীক।

সাবেক ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেটার দীপ দাসগুপ্তের মতে, ভারতে ক্রিকেট একটি 'ধর্মের মতো'। "দেশের বৈচিত্র্য ও সংহতি বজায় রাখে ক্রিকেট।”

ভারতীয় ক্রিকেট কমেন্টেটর ও স্পোর্টস শো হোস্ট হার্শা ভোগলে বলছেন, ভারতীয় খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাহিদা এবং সমর্থকদের উপস্থিতি ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। খেলোয়াড়দের রোজকার জীবনে বড় সুযোগ এবং আর্থিক সমৃদ্ধি দিতে সক্ষম এখন ভারত।

বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেমন ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া বা ওয়েস্ট ইন্ডিজ এখন আর ভারতকে উপেক্ষা করতে পারে না। বিসিসিআই, আইপিএল এবং ভারতের অর্থনৈতিক ক্ষমতা বিশ্ব ক্রিকেটে অন্য দেশগুলোর ওপর প্রভাব তৈরি করছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্তগুলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন নিয়ম ও চ্যালেঞ্জ আনছে। ভারত ছাড়া অন্যান্য দেশের টুর্নামেন্ট আয় বা আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ এখন ভারতকে কেন্দ্র করে। আইপিএল এবং বিসিসিআই-এর শক্তি বিশ্বকে প্রভাবিত করছে, কেবল মাঠে নয়, অর্থনীতি, ক্রীড়া নীতি এবং সামাজিক প্রভাবের ক্ষেত্রেও। ভারতীয় ক্রিকেটের উত্থান কেবল দেশের গর্ব নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের ক্রিকেট মানচিত্রকে রূপান্তরিত করছে।

ভারত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয় থেকে প্রতি ১ টাকার জন্য ৮০ পয়সার বেশি তৈরি করে। আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারত যা বলে, তাই কার্যত মেনে চলা হয়।

যেখানে ইংল্যান্ডের ক্রিকেট ভক্তদের কাছে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে অ্যাশেজ সিরিজের কোনো বিকল্প নেই, সেখানে ইংল্যান্ড এখন ভারতের সফরে তার সেরা দল পাঠায়। এমনকি ইংল্যান্ডও ভারতকে ট্যুরের আমন্ত্রণ দিতে আগ্রহী। এটি একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন।

১৯৩২ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে মাত্র ৬৪ বছরে ভারত ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছে ১৩ বার, আর ২০০২ সালের পর থেকে আটবার সফর করেছে। কারণ, ভারতীয় টিভি ব্রডকাস্ট রাইটস বিক্রির মাধ্যমে ভারতীয় সফর অস্ট্রেলিয়ার সফরের চেয়ে বেশি আয় করে, যা ইংল্যান্ডে ক্রিকেটকে চালিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দখল এক দক্ষিণ এশিয়ার দেশের দ্বারা হওয়া অনন্য। সৌদি আরবের অর্থ অনেক খেলায় ঢুকেছে, যেমন গলফ ও ফুটবল, কিন্তু সেখানকার খেলা চালানোর নিয়ন্ত্রণ এখনও ইউরোপ ও আমেরিকার হাতে। কিন্তু ভারত এবং ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা মোটেই তেমন না।

যেই ভারতীয় ক্রিকেটারদের তুচ্ছ করতে ব্রিটিশ মিডিয়া ১৯৫৯ সালে ‘গ্রে ডগস অব ক্রিকেট’ নামে আখ্যায়িত করেছিল, তারা এখন এত শক্তিশালী যে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মতো প্রথিতযশা শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং একসময়ের প্রভাবশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পরাজিত করেছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারতীয়রা ইংরেজদের প্রতিটি কৌশল গ্রহণ করে সেটিকে নিজেদের মতো করে তুলেছে। ফলস্বরূপ, শুধু তারা বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে না, বরং ইংল্যান্ডকে তাদের ঐতিহাসিক ক্রিকেট কাঠামো পরিবর্তনের পথেও বাধ্য করেছে। এর পেছনে মূল কারণ হলো ইংল্যান্ড ও ভারতের সমাজে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে, বিশেষ করে শেষ কয়েক দশকে ঘটে যাওয়া বিশাল পরিবর্তন।

ফুটবলের তুলনায় ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা কমে গেছে। এজন্য ৬০-এর দশকে নতুন ফরম্যাট উদ্ভাবন করা হয়, যেমন ওয়ান-ডে ক্রিকেট; বিদেশি খেলোয়াড়দের কাউন্টি খেলায় খেলার অনুমতি। সত্তরের দশকে বিশ্বকাপ, ২০০৩ সালে টি-টোয়েন্টি এবং ২০২১ সালে ‘দ্য হান্ড্রেড’। এ সময় ভারতের ক্রিকেটাররা ইংল্যান্ডের সহায়ক ভূমিকায় উপস্থিত থাকতো।

নব্বইয়ের দশকে ভারতের মধ্যবিত্ত উত্থান (৪০০ মিলিয়ন মানুষ প্রায়) এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা ভারতের জন্য নতুন সম্ভাবনার সূচনা করে।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) যাত্রা শুরু হয় ২০০৮ সালে।

জনপ্রিয় ব্রিটিশ-ভারতীয় লেখক, সাংবাদিক ও উপস্থাপক মিহির বোসের মতে আইপিএল তৈরি হয়েছিল ভারতীয় দর্শকদের কথা মাথায় রেখে। “গরমের ছুটিতে সন্ধ্যায় ম্যাচগুলো হয়। বেশির ভাগ ভারতীয় পরিবারের একটি টিভি থাকে। আর সন্ধ্যাবেলায় সেটার রিমোট থাকে নারীদের নিয়ন্ত্রণে। আইপিএলকে তাই ক্রিকেটের ধারাবাহিক নাটকও বলা যায়।"

আইপিএল-এর জন্য সম্পূর্ণ নতুন দল গঠিত হয়, যা নতুন ভারতকে প্রতিফলিত করে। যে ভারত আর পুরনো শক্তিশালী দেশগুলোর কাছে সাহায্য চাইতে বাধ্য নয়। গত দুই দশকে আইপিএল ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি সৌদি বিনিয়োগকারীরাও আইপিএল ধরনের টুর্নামেন্ট করার পরিকল্পনা করছে।

ফলস্বরূপ, ভারতীয় ক্রিকেট শুধু মাঠের মধ্যে নয়, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ব্যবস্থাপনাতেও বিশ্বকে প্রভাবিত করছে।