“আমাদের দেশে কবে সেই ছেলে হবে! কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।”
বাংলাদেশের ক্রিকেটে এই প্রশ্নটা অনেক দিনের। বহু ফাস্ট বোলারই বলেছেন, ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে চান। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝে যে ফাঁক, সেটাই বারবার চোখে পড়েছে। সেই জায়গাটাতেই নীরবে পরিবর্তন আনছেন নাহিদ রানা। মুখে নয়, বল হাতে নিজের কাজ দিয়েই তিনি আলাদা হয়ে উঠছেন।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একদিনের ম্যাচে তার বোলিং ছিল এই বদলের স্পষ্ট উদাহরণ। ১৯টি বল ১৪৫ কিলোমিটারের ওপরে, পুরো স্পেলজুড়ে গতি ও নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা। তীব্র গরমেও গতি কমেনি, বরং শেষ পর্যন্ত একই ছন্দে বোলিং করে গেছেন। প্রথম পাওয়ারপ্লেতেই হেনরি নিকোলস ও উইল ইয়াংকে আউট করে ম্যাচে প্রভাব ফেলেন। পরে বাউন্সার আর লেন্থের মিশেলে আরও উইকেট তুলে নেন। তিন স্পেলে পাঁচ উইকেট, তবু উদযাপনে কোনো বাড়াবাড়ি নেই, শুধু দায়িত্ব পালন।
এই পারফরম্যান্স হঠাৎ করে আসেনি। এর আগেই পাকিস্তানের বিপক্ষে একদিনের ম্যাচে ২৪ রানে পাঁচ উইকেট নিয়ে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছিলেন তিনি।
পরপর দুই সিরিজে ফাইভ উইকেট, বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ে যা নতুন এক অধ্যায়ের ইঙ্গিত দেয়। তাসকিন ও শরীফুলের সঙ্গে তার সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে ২০০ রানের নিচে আটকে রাখার দৃশ্যও এখন আর অচেনা নয়। স্পিন নির্ভরতার বাইরে এসে গতি দিয়েও যে ম্যাচ জেতা যায়, সেই আত্মবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে।
নাহিদের শক্তি শুধু গতি নয়, ভাবনাতেও পরিণত। তার পরিকল্পনা সহজ, দলের প্রয়োজনটাই আগে। কখন আক্রমণাত্মক হতে হবে, কখন মিতব্যয়ী, পরিস্থিতি বুঝেই সিদ্ধান্ত নেন। পিচ পড়া, ব্যাটার বোঝা, ভ্যারিয়েশন ব্যবহার, সব মিলিয়ে তিনি এখন একজন চিন্তাশীল পেসার। একই সঙ্গে ফিটনেস নিয়ে তার সচেতনতা আলাদা করে চোখে পড়ে। দীর্ঘ স্পেল ধরে গতি ধরে রাখার লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন নিয়মিত।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাধারণ পরিবেশ থেকে উঠে আসা এই তরুণের গল্পটাও তাই গুরুত্বপূর্ণ। টেপ টেনিস দিয়ে শুরু, তারপর রাজশাহীর একাডেমি, ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। জাতীয় ক্রিকেট লিগে উইকেটের ঝুলি, বিপিএলে গতির ঝলক, এসবই তাকে জাতীয় দলের দরজায় নিয়ে আসে। এরপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৫২ কিলোমিটার গতির বল করে দেশের দ্রুততম বোলারের রেকর্ড গড়া যেন সেই যাত্রার স্বাভাবিক পরিণতি।
এখন নাহিদ রানা শুধু সম্ভাবনার নাম নন, তিনি বাস্তব। তার বোলিংয়ে গতি আছে, পরিকল্পনা আছে, আর আছে নিরব ধারাবাহিকতা। বহুদিন ধরে খোঁজা সেই ছেলেটির ছায়া যেন এখন স্পষ্ট, যে কথায় নয়, কাজে বড় হতে চায়, প্রতিটি ওভারে, প্রতিটি ম্যাচে।


বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ আলকারাজ–সাবালেঙ্কা, বিশ্বসেরা দল পিএসজি
