'তিন শর্তে' ভারতের বিপক্ষে খেলবে পাকিস্তান

ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জন করলে আর্থিক ও ক্রিকেটীয় বিভিন্ন দিক থেকে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে পাকিস্তান। আইসিসির এমন সতর্কবার্তার পর ম্যাচ খেলতে পিসিবির তিনটি শর্তের কথা শোনা যাচ্ছে

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম

চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের অবস্থান থেকে সরে আসতে পারে পাকিস্তান। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) ম্যাচটি খেলতে সম্মত হওয়ার পথে এগোচ্ছে।

তবে এই জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে তিনটি শর্ত জানিয়েছে পিসিবি,বলে শোনা যাচ্ছে। যার অন্যতম শর্ত বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি।

রবিবার লাহোরে আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজার সঙ্গে বৈঠক করেন পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি। ওই বৈঠকে এই অচলাবস্থা কাটানোর চেষ্টা করা হয়। বৈঠকের পর থেকেই পাকিস্তানের অবস্থান নরম হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জন করলে আর্থিক ও ক্রিকেটীয় বিভিন্ন দিক থেকে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে পাকিস্তান, এমন সতর্কবার্তা দেয় আইসিসি।

এরপরই পিসিবির ভেতরে ম্যাচটি খেলার পক্ষে মত বাড়তে থাকে। যদিও চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি এখনো তার অনড় অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসেননি।

এ অবস্থায় সোমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে নাকভির। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানা গেছে।

পিসিবির তিন শর্ত

আইসিসির সঙ্গে আলোচনায় পিসিবি মূলত তিনটি দাবি উত্থাপন করেছে:

১. বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) বাড়তি আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

২. টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়লেও বাংলাদেশকে অংশগ্রহণ ফি দিতে হবে।

৩. ভবিষ্যতে একটি আইসিসি ইভেন্ট আয়োজনের স্বত্ব দিতে হবে।

পিসিবির দাবি, এসব শর্ত পূরণ হলে তারা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে রাজি হবে।

আলোচনায় বাংলাদেশ ও আইসিসি

এদিকে সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল পিসিবির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। লাহোরের ওই মিটিং ছাড়াও পিসিবি'র সঙ্গে আইসিসির দুই শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়মিত আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।

একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় নিশ্চিত। কিছু সূত্র তো ৯৯ শতাংশ সম্ভাবনার কথাও বলছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক বিসিসিআই সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলি। তিনি বলেন, “বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচ গুরুত্বপূর্ণ। এমন ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়ানো অবাক করার মতো।”

কী হতে পারে সামনে

সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান ধীরে ধীরে সমঝোতার পথে হাঁটছে। আইসিসির চাপ, সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি এবং রাজনৈতিক পর্যায়ের আলোচনা— সব মিলিয়ে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলাই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে প্রধানমন্ত্রী ও পিসিবি চেয়ারম্যানের বৈঠকের পর। তবে সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোয় নির্ধারিত ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র পাঁচ দিন আগে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দিয়েছে, দেশটির ক্রিকেট দল টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচটি বর্জন করবে। পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে দেখছে আইসিসি।

এর আগে নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা জানিয়ে বাংলাদেশ ভারতে সফর বাতিল করলে, পাকিস্তানও প্রতিযোগিতা বর্জনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে শুরু করে। সেই প্রেক্ষাপটেই সরকারিভাবে নতুন এই অবস্থান জানানো হয়।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ২০১৩ সালের পর বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের মুখোমুখি হয়নি। পাশাপাশি, ২০০৮ সালের পর থেকে ভারত পাকিস্তানের মাটিতে কোনো ম্যাচ খেলেনি।

গত বছর স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী, আইসিসির কোনো টুর্নামেন্টে ভারত বা পাকিস্তান আয়োজক হলে দুই দলের ম্যাচ নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আয়োজন করতে হবে। সেই চুক্তির আলোকে ২০২৬ বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এক বিবৃতিতে পাকিস্তান সরকার জাতীয় দলকে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার অনুমতি দিলেও জানিয়ে দেয়, আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচে তারা খেলবে না।

এ বিষয়ে আইসিসি জানিয়েছে, পাকিস্তানের এই অবস্থান তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সংস্থাটি পিসিবিকে আলোচনার মাধ্যমে একটি যৌক্তিক ও পারস্পরিক সমঝোতাভিত্তিক সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে।

আইসিসির ভাষ্য অনুযায়ী, এখনো পর্যন্ত তারা পিসিবির কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত সিদ্ধান্ত পায়নি। তবে নির্দিষ্ট ম্যাচ বেছে নিয়ে খেলতে অস্বীকৃতি জানানো একটি বৈশ্বিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের নির্বাচিত অংশগ্রহণ প্রতিযোগিতার মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করে এবং খেলাধুলার ন্যায্যতার পরিপন্থী।

চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মোট ৫৫টি ম্যাচের মধ্যে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এই ম্যাচকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি দর্শক, বিজ্ঞাপন এবং সম্প্রচার আয় হয়। যদিও এককভাবে এটির মূল্যায়ন করা কঠিন, কারণ পুরো টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক প্যাকেজের সঙ্গে এটি যুক্ত।

প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, ভারতের প্রতিটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের বাজারমূল্য প্রায় ১ থেকে ১.১ কোটি মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার সমান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের আর্থিক মূল্য সাধারণ ম্যাচের দ্বিগুণ বা তারও বেশি হতে পারে। তাই এই ম্যাচ বাতিল হলে অন্তত ২০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।