ভোটকেন্দ্রে মোবাইল বহনে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কি কেউ আছে?
‘শুধুমাত্র বূড়া আঙ্গুলটারে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে বাকী পুরা দেহটারে যে ৪০০ গজের বাইরে রাখতে বলে নাই এই তো অনেক’ - ফেসবুকে লিখেছেন একজন ব্যবহারকারী। ভোটকেন্দ্রের চারশ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন করতে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানিয়ে ইসি ঘেরাও করার হুমকি দিয়েছে জামায়াত ও এনসিপি। বিএনপি নেতারাও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দিয়েছেন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া।
আলাপ রিপোর্ট
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএমআপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
বারোই ফেব্রুয়ারির ভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এক নির্দেশনায় নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
ভোটকেন্দ্র ও এর আশেপাশের মোবাইল ফোন ব্যবহার ও বহন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই চরম অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
রবিবার রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক নির্দেশনায় ইসি বলেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে কোন মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া যাবে না।
কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার, ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ ইনচার্জ, দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার, সাধারণ আনসার বা ভিডিপির 'নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬' অ্যাপ ব্যবহারকারী দুইজন আনসার সদস্য ফোন রাখতে পারবেন।
সোশ্যাল মিডিয়াতে এই নির্দেশনা নিয়ে চলছে তীব্র সমালোচনা। নেটিজেনদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, ভোটকেন্দ্রের বুথে ফোন নিষিদ্ধ করা যৌক্তিক হলেও ৪০০ গজের বিশাল এলাকাকে ফোনমুক্ত রাখা অবাস্তব।
অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে, এটি স্বচ্ছতা কমানোর একটি পদ্ধতি। তাদের মতে, যখন সব কিছু ডিজিটাল করার কথা বলা হচ্ছে, তখন ভোটকেন্দ্রে নাগরিক সাংবাদিকতাকে বা সিটিজেন জার্নালিজমকে গলা টিপে মারার এই চেষ্টা প্রমাণ করে ‘যে পর্দার আড়ালে অন্য কিছু ঘটছে’।
রাজনীতিকরা যা বলছেন
কমিশন এই পদক্ষেপকে ‘সুষ্ঠু পরিবেশের’ দোহাই দিলেও রাজনৈতিক দলগুলো বলছে এই সিদ্ধান্ত একটি ‘বিশেষ দলকে সুবিধা দেওয়ার’ কৌশল ছাড়া আর কিছু না।
নিরাপত্তার কারণে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহার কিছুটা সীমিত করা যেতে পারে মন্তব্য করে বিএনপি’র নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সাইমুম পারভেজ বলেন, “৪০০ গজের মধ্যে আমরা কেন মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবো না, সেইটা নিয়ে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে।“
এই বিষয়গুলো একটা “স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার” মধ্যে থাকা উচিত বলে মনে করছেন তিনি।
“পুরো বিষয়টা আমার কাছে মনে হয় যে,অকারণে অথবা কোন একটি বিশেষ দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য ইলেকশন কমিশন এটি করছেন,” আলাপ-কে বলেন সাইমুম পারভেজ।
ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা শেখ তানভীর বারী হামিম সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন এই সিদ্ধান্ত তাকে “হাসিনার নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে”।
“ভোটকেন্দ্রে মোবাইলের অনুমতি দিলে যারা নকল সিল বানিয়েছে ইতোমধ্যে ধরা পড়েছে সেই দলটির এ ধরণের কাজ সম্পাদন সহজে হবেনা,যারা বিভিন্ন অনিয়ম করতে চায় ওঁৎ পেতে আছে তাদের কাজ কঠিন হবে বলেই কি এ ধরণের নিয়ম জারি?”
“এ নির্বাচন নিয়ে বিন্দুমাত্র টালবাহানা, কোন প্রকার প্রতারণা বা কালিমা লেপন আমরা ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশীরা কিন্তু মেনে নিবোনা,“ লিখেছেন শেখ তানভীর বারী হামিম।
কমিশনের এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জামায়তে ইসলামীও।
সোমবার ঢাকায় একটি জনসভায় দলটির আমীর শফিকুর রহমান বলেছেন মোবাইল ফোন নিয়ে কমিশনের এই সিদ্ধান্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
“আমি পরিস্কার বলে দিতে চাই জুলাইও জনগণও মেনে নেয়নি আজও মেনে নেবে না,” মোহম্মদপুরে দলের মিত্র বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মামুনুল হকের নির্বাচনি প্রচারণায় বলেন জামায়ত প্রধান।
জামায়াত ইসলামি এক বিবৃতিতে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিয়ে ইসির দেওয়া প্রজ্ঞাপন বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে। অবিলম্বে প্রজ্ঞাপন বাতিল করা না হলে জনগণকে সাথে নিয়ে নির্বাচন কমিশন ভবন ঘেরাও করা হবে বলে বলে হুমকি দিয়েছে জামায়াত।
সোমবার সন্ধ্যার মধ্যে এই সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করার হুমকি দিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
এনসিপি’র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে ‘বিএনপি’র জন্য ভোট চুরির ধান্দা’ বলে অভিহিত করেছেন।
সোমবার এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি বলেছেন,”ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের অর্থ হলো সবাইকে নিজের মোবাইল ঘরে রেখে যেতে হবে। এমনকি কোনো মোজো সাংবাদিক বা সিটিজেন জার্নালিজমও এলাউড না। এটা স্পষ্টত হঠকারী সিদ্ধান্ত। ইঞ্জিনিয়ারিং বা জালিয়াতি করার ইচ্ছে থাকলেই কেবল এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।“
অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়ে তুহিন তার পোস্টে বলেন, “এটা সুস্পষ্টভাবে ভোট চুরির সুযোগ করে দেয়া।“
ডাকসু ভিপি ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতা আবু সাদিক কায়েম সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বলেছেন ভোটকেন্দ্র এলাকায় যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তার কোনো তথ্য, ফুটেজ পাওয়া যাবে না, এমনকি স্বয়ং ভুক্তভোগীর কাছেও থাকবেনা।
“এমনকি কোনো মোজো সাংবাদিক বা সিটিজেন জার্নালিজমও এলাউড না।
“নির্বাচন কমিশনের উপর ভর করে এই নব্য ফ্যাসিজম জাতির উপর কারা চাপিয়ে দিলো?”
ভোটকেন্দ্রে “অবশ্যই” মোবাইল নিয়ে যেতে দিতে হবে বলেন গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ফিরোজ আহমেদ।
তার মতে মোবাইল না থাকলে কারচুপির প্রমাণ থাকবে না, যা নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগ, সংশয় ও হানাহানির সম্ভাবনা বৃদ্ধি করবে।
“তাছাড়া, ভোটাররা মোবাইল কোথায় রাখবেন? কেন্দ্রে হাঙ্গামা হতে পারে, মোবাইল ছাড়া যোগযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন, এই আশঙ্কায় বহু মানুষ হয়তো কেন্দ্রে যেতে চাইবেন না,” আলাপ-কে বলেছেন ফিরোজ আহমেদ।
নেটিজেনদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
ভোটকেন্দ্রের ভেতর তো বটেই, এমনকি কেন্দ্রের চারপাশের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন ও ব্যবহারের ওপর যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তা নিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বইছে সমালোচনার ঝড়।
হাসান আল মাহমুদ নামে একজন ফেইসবুক ইউজার এই সিদ্ধান্তকে ‘অশনিসংকেত’ অভিহিত করেছেন।
“ভোটকেন্দ্রের ৪শ' গজের মধ্যে মোবাইল নিষিদ্ধ করা অশনিসংকেত। এটা নির্বাচনে প্রাতিষ্ঠানিক কারচুপির ইঙ্গিত বহন করে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে নির্বাচন ব্যাপকভাবে রিগড হতে যাচ্ছে। কেন্দ্রে থাকা সিসি ক্যামেরাও যান্ত্রিক গোলযোগ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও অজানা কারণে বন্ধ হয়ে যাবে।“
মোবাইলের উপর এই নিষেধাজ্ঞা সিটিজেন জার্নালিজমকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে বলে মনে করেছেন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক দেবব্রত মুখোপধ্যায়।
“সাধারণত আজকাল বেশিরভাগ মিসহ্যাপের ছবি ও ভিডিও আমরা পাই সাধারণ মানুষের মোবাইল থেকে,” তার ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন তিনি।
তবে তার মতে ‘আসল সমস্যা’ হচ্ছে ভোটার উপস্থিতি নগরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে কমে যাবে।
“মোবাইল ছাড়া ভোট দিতে বের হবেন কেবল দলের প্রতি নিবেদিত ভোটাররা। সুইং ভোটাররা ঝামেলা দেখে কেন্দ্রেই যাবে না,” লিখেছেন তিনি।
অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী অবশ্য তাদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন স্যাটায়ারের মধ্যে দিয়ে।
“শুধুমাত্র বূড়া আঙ্গুলটারে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে বাকী পুরা দেহটারে যে ৪০০ গজের বাইরে রাখতে বলে নাই এই তো অনেক। দয়া করে আমাদেরকে ভোট দিতে দেয়া হচ্ছে আর কি চান বলেন,” ফেইসবুক ব্যবহারকারী মৌনতা আলম লিখেছেন তার পোস্টে।
অনলাইন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর অমৃত মলঙ্গী লিখেছেন, “ব্যবসা একটা পাইছি। ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ দূরে যত্নসহকারে ফোন রাখব। প্রতি মিনিট ১০টাকা। এক ঘণ্টা ৫০০ টাকা। কেমন হবে বন্ধুরা?”
মোবাইল ফোন থাকলে নিরাপত্তা ঝুঁকি কি আসলেই আছে?
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সাবেক অফিসার বলছেন মোবাইলের মাধ্যমে বিস্ফোরক বহন করার নজির আছে।
“সাধারণত এই ধরনের বিস্ফোরকগুলো ৩০০ গজের মধ্যে হাই-ইমপ্যাক্ট ফেলে। এরপর কমতে থাকে,” আলাপ-কে বলেছেন মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহমেদ।
সেই চিন্তা করে যদি ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল বহন নিষিদ্ধ করা হয় তা নিরাপত্তার কারণে যৌক্তিক বলে মনে করেন তিনি।
তবে মেটাল ডিটেক্টরের মতো এক্সপ্লোসিভ ডিটেক্টর দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যেত বলে মত তার। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক সক্ষমতা আছে। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব ছিল। সেজন্যই এই প্রশ্ন উঠেছে। চাইলে এটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে সমাধান করা যেত।“
তবে আগের নির্বাচনগুলো অনেক অনিয়ম ব্যক্তিগত মোবাইলেই উঠে এসেছে জানিয়ে এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা বলেন, “মূলধারার গণমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনের আপত্তিকর পরিস্থিতির খবর দেয়। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার হার বহুগুণ। তাই মোবাইল নিষিদ্ধ করায় এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।“
তার মতে আগে থেকে পরিকল্পনা করলে এই প্রশ্ন এড়ানো যেতো।
“কারণ আপত্তিকর কিছু না থাকলে তো ছবি তুললে সমস্যা নেই। আর বিস্ফোরক ডিটেক্টের প্রযুক্তি ও সক্ষমতা আমাদের ছিলই।“
ভোটকেন্দ্রে মোবাইল বহনে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কি কেউ আছে?
‘শুধুমাত্র বূড়া আঙ্গুলটারে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে বাকী পুরা দেহটারে যে ৪০০ গজের বাইরে রাখতে বলে নাই এই তো অনেক’ - ফেসবুকে লিখেছেন একজন ব্যবহারকারী। ভোটকেন্দ্রের চারশ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন করতে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানিয়ে ইসি ঘেরাও করার হুমকি দিয়েছে জামায়াত ও এনসিপি। বিএনপি নেতারাও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দিয়েছেন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া।
বারোই ফেব্রুয়ারির ভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এক নির্দেশনায় নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
ভোটকেন্দ্র ও এর আশেপাশের মোবাইল ফোন ব্যবহার ও বহন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই চরম অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
রবিবার রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক নির্দেশনায় ইসি বলেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে কোন মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া যাবে না।
কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার, ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ ইনচার্জ, দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার, সাধারণ আনসার বা ভিডিপির 'নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬' অ্যাপ ব্যবহারকারী দুইজন আনসার সদস্য ফোন রাখতে পারবেন।
সোশ্যাল মিডিয়াতে এই নির্দেশনা নিয়ে চলছে তীব্র সমালোচনা। নেটিজেনদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, ভোটকেন্দ্রের বুথে ফোন নিষিদ্ধ করা যৌক্তিক হলেও ৪০০ গজের বিশাল এলাকাকে ফোনমুক্ত রাখা অবাস্তব।
অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে, এটি স্বচ্ছতা কমানোর একটি পদ্ধতি। তাদের মতে, যখন সব কিছু ডিজিটাল করার কথা বলা হচ্ছে, তখন ভোটকেন্দ্রে নাগরিক সাংবাদিকতাকে বা সিটিজেন জার্নালিজমকে গলা টিপে মারার এই চেষ্টা প্রমাণ করে ‘যে পর্দার আড়ালে অন্য কিছু ঘটছে’।
রাজনীতিকরা যা বলছেন
কমিশন এই পদক্ষেপকে ‘সুষ্ঠু পরিবেশের’ দোহাই দিলেও রাজনৈতিক দলগুলো বলছে এই সিদ্ধান্ত একটি ‘বিশেষ দলকে সুবিধা দেওয়ার’ কৌশল ছাড়া আর কিছু না।
নিরাপত্তার কারণে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহার কিছুটা সীমিত করা যেতে পারে মন্তব্য করে বিএনপি’র নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সাইমুম পারভেজ বলেন, “৪০০ গজের মধ্যে আমরা কেন মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবো না, সেইটা নিয়ে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে।“
এই বিষয়গুলো একটা “স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার” মধ্যে থাকা উচিত বলে মনে করছেন তিনি।
“পুরো বিষয়টা আমার কাছে মনে হয় যে,অকারণে অথবা কোন একটি বিশেষ দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য ইলেকশন কমিশন এটি করছেন,” আলাপ-কে বলেন সাইমুম পারভেজ।
ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা শেখ তানভীর বারী হামিম সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন এই সিদ্ধান্ত তাকে “হাসিনার নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে”।
“ভোটকেন্দ্রে মোবাইলের অনুমতি দিলে যারা নকল সিল বানিয়েছে ইতোমধ্যে ধরা পড়েছে সেই দলটির এ ধরণের কাজ সম্পাদন সহজে হবেনা,যারা বিভিন্ন অনিয়ম করতে চায় ওঁৎ পেতে আছে তাদের কাজ কঠিন হবে বলেই কি এ ধরণের নিয়ম জারি?”
“এ নির্বাচন নিয়ে বিন্দুমাত্র টালবাহানা, কোন প্রকার প্রতারণা বা কালিমা লেপন আমরা ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশীরা কিন্তু মেনে নিবোনা,“ লিখেছেন শেখ তানভীর বারী হামিম।
কমিশনের এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জামায়তে ইসলামীও।
সোমবার ঢাকায় একটি জনসভায় দলটির আমীর শফিকুর রহমান বলেছেন মোবাইল ফোন নিয়ে কমিশনের এই সিদ্ধান্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
“আমি পরিস্কার বলে দিতে চাই জুলাইও জনগণও মেনে নেয়নি আজও মেনে নেবে না,” মোহম্মদপুরে দলের মিত্র বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মামুনুল হকের নির্বাচনি প্রচারণায় বলেন জামায়ত প্রধান।
জামায়াত ইসলামি এক বিবৃতিতে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিয়ে ইসির দেওয়া প্রজ্ঞাপন বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে। অবিলম্বে প্রজ্ঞাপন বাতিল করা না হলে জনগণকে সাথে নিয়ে নির্বাচন কমিশন ভবন ঘেরাও করা হবে বলে বলে হুমকি দিয়েছে জামায়াত।
সোমবার সন্ধ্যার মধ্যে এই সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করার হুমকি দিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
এনসিপি’র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে ‘বিএনপি’র জন্য ভোট চুরির ধান্দা’ বলে অভিহিত করেছেন।
সোমবার এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি বলেছেন,”ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের অর্থ হলো সবাইকে নিজের মোবাইল ঘরে রেখে যেতে হবে। এমনকি কোনো মোজো সাংবাদিক বা সিটিজেন জার্নালিজমও এলাউড না। এটা স্পষ্টত হঠকারী সিদ্ধান্ত। ইঞ্জিনিয়ারিং বা জালিয়াতি করার ইচ্ছে থাকলেই কেবল এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।“
অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়ে তুহিন তার পোস্টে বলেন, “এটা সুস্পষ্টভাবে ভোট চুরির সুযোগ করে দেয়া।“
ডাকসু ভিপি ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতা আবু সাদিক কায়েম সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বলেছেন ভোটকেন্দ্র এলাকায় যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তার কোনো তথ্য, ফুটেজ পাওয়া যাবে না, এমনকি স্বয়ং ভুক্তভোগীর কাছেও থাকবেনা।
“এমনকি কোনো মোজো সাংবাদিক বা সিটিজেন জার্নালিজমও এলাউড না।
“নির্বাচন কমিশনের উপর ভর করে এই নব্য ফ্যাসিজম জাতির উপর কারা চাপিয়ে দিলো?”
ভোটকেন্দ্রে “অবশ্যই” মোবাইল নিয়ে যেতে দিতে হবে বলেন গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ফিরোজ আহমেদ।
তার মতে মোবাইল না থাকলে কারচুপির প্রমাণ থাকবে না, যা নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগ, সংশয় ও হানাহানির সম্ভাবনা বৃদ্ধি করবে।
“তাছাড়া, ভোটাররা মোবাইল কোথায় রাখবেন? কেন্দ্রে হাঙ্গামা হতে পারে, মোবাইল ছাড়া যোগযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন, এই আশঙ্কায় বহু মানুষ হয়তো কেন্দ্রে যেতে চাইবেন না,” আলাপ-কে বলেছেন ফিরোজ আহমেদ।
নেটিজেনদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
ভোটকেন্দ্রের ভেতর তো বটেই, এমনকি কেন্দ্রের চারপাশের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন ও ব্যবহারের ওপর যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তা নিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বইছে সমালোচনার ঝড়।
হাসান আল মাহমুদ নামে একজন ফেইসবুক ইউজার এই সিদ্ধান্তকে ‘অশনিসংকেত’ অভিহিত করেছেন।
“ভোটকেন্দ্রের ৪শ' গজের মধ্যে মোবাইল নিষিদ্ধ করা অশনিসংকেত। এটা নির্বাচনে প্রাতিষ্ঠানিক কারচুপির ইঙ্গিত বহন করে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে নির্বাচন ব্যাপকভাবে রিগড হতে যাচ্ছে। কেন্দ্রে থাকা সিসি ক্যামেরাও যান্ত্রিক গোলযোগ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও অজানা কারণে বন্ধ হয়ে যাবে।“
মোবাইলের উপর এই নিষেধাজ্ঞা সিটিজেন জার্নালিজমকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে বলে মনে করেছেন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক দেবব্রত মুখোপধ্যায়।
“সাধারণত আজকাল বেশিরভাগ মিসহ্যাপের ছবি ও ভিডিও আমরা পাই সাধারণ মানুষের মোবাইল থেকে,” তার ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন তিনি।
তবে তার মতে ‘আসল সমস্যা’ হচ্ছে ভোটার উপস্থিতি নগরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে কমে যাবে।
“মোবাইল ছাড়া ভোট দিতে বের হবেন কেবল দলের প্রতি নিবেদিত ভোটাররা। সুইং ভোটাররা ঝামেলা দেখে কেন্দ্রেই যাবে না,” লিখেছেন তিনি।
অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী অবশ্য তাদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন স্যাটায়ারের মধ্যে দিয়ে।
“শুধুমাত্র বূড়া আঙ্গুলটারে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে বাকী পুরা দেহটারে যে ৪০০ গজের বাইরে রাখতে বলে নাই এই তো অনেক। দয়া করে আমাদেরকে ভোট দিতে দেয়া হচ্ছে আর কি চান বলেন,” ফেইসবুক ব্যবহারকারী মৌনতা আলম লিখেছেন তার পোস্টে।
অনলাইন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর অমৃত মলঙ্গী লিখেছেন, “ব্যবসা একটা পাইছি। ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ দূরে যত্নসহকারে ফোন রাখব। প্রতি মিনিট ১০টাকা। এক ঘণ্টা ৫০০ টাকা। কেমন হবে বন্ধুরা?”
মোবাইল ফোন থাকলে নিরাপত্তা ঝুঁকি কি আসলেই আছে?
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সাবেক অফিসার বলছেন মোবাইলের মাধ্যমে বিস্ফোরক বহন করার নজির আছে।
“সাধারণত এই ধরনের বিস্ফোরকগুলো ৩০০ গজের মধ্যে হাই-ইমপ্যাক্ট ফেলে। এরপর কমতে থাকে,” আলাপ-কে বলেছেন মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহমেদ।
সেই চিন্তা করে যদি ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল বহন নিষিদ্ধ করা হয় তা নিরাপত্তার কারণে যৌক্তিক বলে মনে করেন তিনি।
তবে মেটাল ডিটেক্টরের মতো এক্সপ্লোসিভ ডিটেক্টর দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যেত বলে মত তার। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক সক্ষমতা আছে। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব ছিল। সেজন্যই এই প্রশ্ন উঠেছে। চাইলে এটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে সমাধান করা যেত।“
তবে আগের নির্বাচনগুলো অনেক অনিয়ম ব্যক্তিগত মোবাইলেই উঠে এসেছে জানিয়ে এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা বলেন, “মূলধারার গণমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনের আপত্তিকর পরিস্থিতির খবর দেয়। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার হার বহুগুণ। তাই মোবাইল নিষিদ্ধ করায় এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।“
তার মতে আগে থেকে পরিকল্পনা করলে এই প্রশ্ন এড়ানো যেতো।
“কারণ আপত্তিকর কিছু না থাকলে তো ছবি তুললে সমস্যা নেই। আর বিস্ফোরক ডিটেক্টের প্রযুক্তি ও সক্ষমতা আমাদের ছিলই।“
বিষয়: