ক্রিকেটে অচলাবস্থা: নাজমুলের অপসারণ, ক্রিকেটারদের খেলা বয়কট ও স্টেডিয়ামে ভাঙচুর

নাজমুল ইসলামকে ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে সরালেও তার পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত খেলা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে কোয়াব। অচলাবস্থায় বিপিএলের ম্যাচ বাতিল এবং স্টেডিয়ামে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এবং সার্বিক স্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি)  ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে পরিচালক এম নাজমুল ইসলামকে তাৎক্ষণিকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিসিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বোর্ডের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে সভাপতিকে দেওয়া ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, বোর্ডের কার্যক্রম যেন স্বাভাবিক ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, সে লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিসিবি সভাপতি নিজেই ফাইন্যান্স কমিটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন বলেও জানানো হয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে বুধবার বিসিবির আয়োজনে দোয়া মাহফিলের পর ক্রিকেটারদের নিয়ে ‘বিতর্কিত’ মন্তব্য করেন নাজমুল।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেললে খেলোয়াড়দের আর্থিক ক্ষতিপূরণ সম্পর্কিত এক প্রশ্নে তিনি উত্তর দেন, “ওরা গিয়ে যদি কিছুই না করতে পারে, তাহলে ওদের পেছনে আমরা যে এত কোটি কোটি টাকা খরচ করছি, আমরা ওদের কাছ থেকে ওই টাকা ফেরত চাইছি নাকি?”

আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমরা যে ওদের পেছনে এত খরচ করছি, বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ওরা কিছুই করতে পারছে না।...আমরা তাহলেতো প্রত্যেকবারই বলতে পারি, তোমরা খেলতে পারোনি, তোমাদের পেছনে যা খরচ করেছি, এটা এবার তোমাদের কাছ থেকে আমরা নিতে থাকি, ফেরত দাও।”

নাজমুলের এই মন্তব্যের পর বুধবার জুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন তাকে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন।

ক্রিকেটারদের স্বার্থ নিয়ে বিসিবির বক্তব্য

বিসিবি তাদের বক্তব্যে দাবি করেছে, ক্রিকেটারদের স্বার্থই বোর্ডের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বোর্ডের আওতাধীন সব ক্রিকেটারের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। একই সঙ্গে চলমান সংকটের মধ্যেও ক্রিকেটাররা যেন পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখেন—এমন প্রত্যাশার কথাও জানানো হয়।

এছাড়া বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকবে বলেও আশা প্রকাশ করেছে বোর্ড।

কোয়াবের অনড় অবস্থান: পদত্যাগ না হলে খেলা নয়

তবে বিসিবির এই সিদ্ধান্তের পরও এম নাজমুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন দেশের ক্রিকেটাররা। ক্রিকেটারদের সংগঠন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দাবি পূরণ না হলে তারা মাঠে নামবেন না।

ঢাকার বনানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন বলেন, “এম নাজমুল ইসলাম পদত্যাগ না করা পর্যন্ত ক্রিকেটারদের সামনে খেলা বর্জন ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ক্রিকেটারদের স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষায় আমরা এই কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছি।”

পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরলো কোয়াব

সংবাদ সম্মেলনে কোয়াব জানায়, খেলা বয়কটের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পেছনে পাঁচটি মূল কারণ রয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে চলমান সংকটের দ্রুত সমাধান, নারী ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হয়রানির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা এবং নারী ক্রিকেটারদের সুযোগ–সুবিধা বৃদ্ধি।

এছাড়া বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের পদত্যাগের দাবি এবং বিপিএল-এ নয়জন ক্রিকেটারকে অঘোষিতভাবে বাদ দেওয়ার কারণ স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

কোয়াব নেতারা সতর্ক করে বলেন, এসব দাবি উপেক্ষিত থাকলে দেশের ক্রিকেটে অচলাবস্থা আরও গভীর হতে পারে। ক্রিকেটাররা খেলতে প্রস্তুত থাকলেও ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন না।

খেলা বন্ধ, স্টেডিয়ামে ভাঙচুর

এই অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে মাঠে। বিপিএলের নির্ধারিত ম্যাচ মাঠে না গড়ানোকে কেন্দ্র করে স্টেডিয়ামে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ক্রিকেটারদের বয়কটের কারণে ম্যাচটি বাতিল হলে স্টেডিয়ামের ভেতর ও বাইরে থাকা দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একপর্যায়ে কিছু মানুষ স্টেডিয়ামের গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে।

পরে স্টেডিয়ামের সামনে বিসিবির বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয়। বিপিএলের বিলবোর্ড ও ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং স্টেডিয়ামের ভেতরে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে।

খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন। বর্তমানে স্টেডিয়ামের আশপাশে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।