জাদুকরের বিদায়: নেইমারের এক স্বর্ণযুগ এখন শুধুই স্মৃতি

সব কিংবদন্তির গল্প ট্রফি দিয়ে শেষ হয় না। কিছু গল্প শেষ হয় চোখের জলে, অপূর্ণ স্বপ্নে আর এমন এক হাসিতে, যা একসময় পুরো পৃথিবীকে মুগ্ধ করেছিল। নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ঠিক তেমনই, অসম্পূর্ণ, বিতর্কিত, তবু অবিশ্বাস্য সুন্দর।

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৩ পিএম

“আমি আমার রক্ত, আমার জীবন, সবকিছুই হলুদ জার্সির জন্য দিয়েছি। কিন্তু এখন আর আমি এটা চাই না।”

একটি বাক্য। আর তাতেই যেন থমকে গেল এক যুগ।

ব্রাজিলের জার্সিতে আর দেখা যাবে না নেইমার জুনিয়রকে। সান্তোসের হয়ে ইউনিভার্সিদাদ সেন্ট্রালের বিপক্ষে ৪-২ গোলের জয়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাটি পুনরায় নিশ্চিত করেন তিনি। নরওয়ের বিপক্ষে নিজের ৮০তম ও শেষ আন্তর্জাতিক গোলটি করে বিদায় নেন সেই ফুটবলার, যিনি পেলের ৭৭ গোলের রেকর্ড ভেঙে হয়েছেন ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল ও ৫৯টি অ্যাসিস্ট নিয়ে হলুদ জার্সির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতা হিসেবেই বিদায় নিলেন তিনি।  আর তার শেষ গোলটিও যেন লিখে দিল এক পূর্ণ বৃত্তের গল্প। ২০১০ সালে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ব্রাজিলের হয়ে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। সেই মাঠেই এসেছিল তার প্রথম আন্তর্জাতিক গোল। ষোলো বছর পর, ২০২৬ বিশ্বকাপে ঠিক সেই মেটলাইফেই খেললেন নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। সেখানেই করলেন হলুদ জার্সিতে নিজের ৮০তম ও শেষ গোল। ম্যাচ শেষে আবেগঘন কণ্ঠে বলেছিলেন, "এখানেই শুরু হয়েছিল, আর এখানেই শেষ হলো।" 

পরিসংখ্যান একজন কিংবদন্তির সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু নেইমারের গল্প কখনোই কেবল সংখ্যার গল্প ছিল না। এটি ছিল একজন শিল্পীর গল্প।  যে শিল্পী বল পায়ে ফুটবলকে কেবল একটি খেলা নয়, বিনোদন, কবিতা আর জাদুতে রূপ দিয়েছিলেন।

সেই জাদুর শুরু হয়েছিল খুব অল্প বয়সেই। ১৭ বছর বয়সে সান্তোসের হয়ে অভিষেক। এরপর কোপা লিবার্তাদোরেস, ফিফা পুসকাস পুরস্কার ও দক্ষিণ আমেরিকার সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, ব্রাজিল তাদের পরবর্তী সুপারস্টারকে পেয়ে গেছে। 

মেসি-রোনালদোকে ঘিরে যখন ফুটবল বিশ্ব বিভক্ত ছিল 'গোট' বিতর্কে, তখন আরেকটি নাম নীরবে গড়ে তুলছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উত্তরাধিকার, নেইমার। ২০১৩ সালে ইউরোপে পা রাখার সময় রিয়াল মাদ্রিদ তাকে প্রায় খালি চেক এগিয়ে দিয়েছিল। পরে নেইমার নিজেই জানান, চাইলে নিজের বেতন নিজেই লিখে দিতে পারতেন। তবু তিনি বেছে নিয়েছিলেন বার্সেলোনাকে। কারণ বেশি অর্থ নয়, তার শৈশবের স্বপ্ন ছিল লিওনেল মেসির পাশে খেলা, আর নিজের আদর্শ রোনালদিনহোর ক্লাবের জার্সি গায়ে তোলা।

সেই সিদ্ধান্তই জন্ম দেয় তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। চার মৌসুমে ১০৫ গোল, ৭৬ অ্যাসিস্ট, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, দুটি লা লিগা, তিনটি কোপা দেল রে। মেসি ও সুয়ারেজকে নিয়ে গড়ে ওঠা 'এমএসএন' ত্রয়ী আজও অনেকের চোখে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগ। আর ২০১৭ সালে পিএসজির বিপক্ষে 'লা রেমন্তাদা', যেখানে শেষ সাত মিনিটে একটি ফ্রি-কিক, একটি পেনাল্টি ও একটি অ্যাসিস্ট দিয়ে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। অনেকের কাছেই সেটিই ছিল নেইমারের ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স। 

ভাগ্যের পরিহাস, 'লা রেমন্তাদা'র নায়ক হওয়ার কয়েক মাস পরই বার্সেলোনা ছেড়ে যান নেইমার। এরপর এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ইউরোপের মুকুট আর জয় করতে পারেনি কাতালান ক্লাবটি। অনেকের কাছেই সেটি নেইমারের গুরুত্বের সবচেয়ে নীরব প্রমাণ।

বার্সেলোনার ঐতিহাসিক ৩-১ গোলের জয়ের পর নেইমার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি তুলে ধরেন  

কিন্তু ভাগ্য যেন আবারও তার জন্য নতুন গল্প লিখে রেখেছিল। সেই ম্যাচের কয়েক মাস পরই রেকর্ড ২২২ মিলিয়ন ইউরোতে প্যারিস সেইন্ট-জার্মেইতে যোগ দিয়ে গড়ে তোলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ট্রান্সফারের রেকর্ড, যা আজও অক্ষত। লক্ষ্য ছিল একটাই, বার্সেলোনায় অর্জন করা সব সাফল্যের পরও মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের গল্প লেখা। সেই লক্ষ্যেই ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ট্রান্সফারে যোগ দেন পিএসজিতে।

পিএসজির হয়ে ছয় মৌসুমে ১৭০টির বেশি ম্যাচে শতাধিক গোল করেন নেইমার। জেতেন পাঁচটি লিগ শিরোপা। ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো ক্লাবটিকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে তোলার পথেও ছিলেন অন্যতম প্রধান নায়ক। যদিও ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যায়। 

কেউ হতে চাইত মেসি, কেউ রোনালদো। কিন্তু মাঠে নেমে ড্রিবল করতে, প্রতিপক্ষকে নাচাতে আর আনন্দ নিয়ে ফুটবল খেলতে প্রায় প্রতিটি শিশুই হতে চাইত নেইমার।

এই প্রভাব কেবল দর্শকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আজকের ফুটবল দুনিয়া শাসন করা নতুন প্রজন্মের অসংখ্য তারকা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, তাদের শৈশবের নায়ক ছিলেন নেইমার। লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এন্দ্রিক, তালিকাটা দীর্ঘ। এমনকি রদ্রিগো একবার বলেছিলেন, "পা যতদিন চলবে, ততদিন নেইমারকে একটি বিশ্বকাপ এনে দেওয়ার জন্য আমি লড়ে যাব।" কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। নেইমারের হাতে বিশ্বকাপ ওঠেনি কখনো।

তবুও ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস, ২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের পর স্পেনের উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামস নিজের শৈশবের নায়ককেই উৎসর্গ করেন সেই শিরোপা। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, "আমার কাছে এটি সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি। নেইমার আমার আদর্শ। আশা করি তিনি আমাদের দেখছেন। এই বিশ্বকাপ তার জন্যও।" সেই ফাইনালে নিকো উইলিয়ামসই ছিলেন ম্যাচ-জয়ী গোলের অ্যাসিস্টের নায়ক, যে পাসটি স্পেনকে বিশ্বকাপ এনে দেয়, সেটিও আসে তার পা থেকেই।

হয়তো বিশ্বকাপ ট্রফিটি কখনো নেইমারের হাতে ওঠেনি। কিন্তু যে মানুষটি একটি প্রজন্মকে ফুটবলের প্রেমে ফেলেছেন, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হাত দিয়েই ইতিহাসে লেখা হয়ে গেল। 

ব্রাজিল বহু কিংবদন্তি জন্ম দিয়েছে। কিন্তু পেলের পর এমন খুব কম ফুটবলারই এসেছেন, যাকে ঘিরে পুরো পৃথিবী আবারও ব্রাজিলের খেলা দেখার জন্য অপেক্ষা করেছে। নেইমার ছিলেন তাদেরই একজন।

 এই ভালোবাসাই তাকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। কিন্তু এই ভালোবাসার সঙ্গে এসেছিল এক বিশাল দায়িত্বও। সেই দায়িত্বের সঙ্গে ছিল আরেকটি অভিশাপও। বল পায়ে নেইমার মানেই ছিল প্রতিপক্ষের আতঙ্ক। তার একটি ড্রিবল, একটি দিক বদল কিংবা একটি স্কিলই মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের গতি পাল্টে দিতে পারত। তাই তাকে থামানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হয়ে উঠেছিল ফাউল। ক্যারিয়ারের প্রায় প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টেই প্রতিপক্ষের প্রথম লক্ষ্য ছিল নেইমারকে খেলার বাইরে রাখা। অনেক ডিফেন্ডার পরে স্বীকারও করেছেন, তাকে থামানোর একমাত্র উপায় ছিল শরীর দিয়ে আঘাত করা। আধুনিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ফাউলের শিকার হওয়া খেলোয়াড়দের তালিকায় তাই বছরের পর বছর শীর্ষেই ছিল নেইমারের নাম।  তবুও তিনি থামেননি। 

২০১০ সালে অভিষেকের পর থেকেই পুরো একটি জাতির প্রত্যাশা এসে পড়েছিল তার কাঁধে। ব্রাজিল তখনও খুঁজছিল তাদের পরবর্তী নম্বর দশকে। খুঁজছিল এমন কাউকে, যে আবারও বিশ্বকে ব্রাজিলের 'জোগো বনিতো', সৌন্দর্যের সেই সাম্বা ফুটবলের প্রেমে ফেলবে।  সেই দায়িত্ব কিশোর বয়সেই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন নেইমার।

সেই চাপের সবচেয়ে নির্মম পরীক্ষা এসেছিল ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে। 

২০১৪ বিশ্বকাপ ছিল নেইমারের বিশ্বকাপ। নিজের দেশের মাটিতে, ছয় নম্বর শিরোপার স্বপ্নে বিভোর পুরো ব্রাজিল তাকিয়েছিল মাত্র ২২ বছর বয়সী এক তরুণের দিকে। সেলেসাওর 'নম্বর দশ' তখন আর কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না, ছিলেন ২০ কোটিরও বেশি মানুষের আশা।

গ্রুপ পর্ব থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল, প্রতিটি ম্যাচেই সেই প্রত্যাশার ভার নিজের কাঁধে বয়ে বেড়িয়েছিলেন তিনি। গোল করেছেন, করিয়েছেন, প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে আতঙ্ক ছড়িয়েছেন। মনে হচ্ছিল, এতদিন পর বুঝি আবারও বিশ্বকাপ ঘরে তুলতে চলেছে ব্রাজিল।

কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো সবচেয়ে নির্মম গল্পও লিখে ফেলে।

কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ৮৮তম মিনিট। হঠাৎই হুয়ান কামিলো জুনিগার হাঁটুর আঘাত সজোরে এসে লাগে নেইমারের পিঠে। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে পরীক্ষার পর জানা যায়, তার মেরুদণ্ডের তৃতীয় কশেরুকা ভেঙে গেছে। চিকিৎসকেরা পরে জানান, আঘাতটি যদি আর মাত্র দুই সেন্টিমিটার অন্য জায়গায় লাগত, তাহলে হয়তো জীবনের বাকি সময় তাকে হুইলচেয়ারেই কাটাতে হতো।

এক নিমেষে শেষ হয়ে গেল নেইমারের বিশ্বকাপ। আর যেন সেই মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল পুরো ব্রাজিল। 

জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগে জাতীয় সংগীত চলাকালীন ডেভিড লুইজ ও হুলিও সেজার হাতে তুলে ধরেছিলেন নেইমারের ১০ নম্বর জার্সি। অনেক খেলোয়াড়ের চোখে তখন জল। মাঠে নামার আগেই যেন তারা বিশ্বাস করে ফেলেছিল, তাদের সবচেয়ে বড় শক্তিকে ছাড়া এই যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়।

তারপর যা ঘটেছিল, তা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি।

মাত্র ছয় মিনিটের ব্যবধানে চার গোল। শেষ পর্যন্ত ৭-১। নিজেদের মাটিতে ব্রাজিলের ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক পরাজয়।

অন্যদিকে, শত শত কিলোমিটার দূরে বাড়িতে বসে টেলিভিশনের সামনে অসহায় দর্শক হয়ে ছিলেন নেইমার। পরে জানা যায়, জার্মানির তৃতীয় গোলের পরই আর দেখতে পারেননি ম্যাচটি। কান্নায় ভেঙে পড়ে টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

কয়েক দিন পর হুইলচেয়ারে বসে সংবাদ সম্মেলনে এসে চোখের জল আটকে রাখতে পারেননি তিনি।

"ঈশ্বর আমাকে বাঁচিয়েছেন। আঘাতটা যদি আর দুই সেন্টিমিটার ভেতরে লাগত, তাহলে আজ হয়তো আমি হুইলচেয়ারেই থাকতাম। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার স্বপ্নটা আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।"

সেই দিন শুধু একটি বিশ্বকাপ শেষ হয়নি। মনে হয়েছিল, শেষ হয়ে গেছে একটি প্রজন্মের স্বপ্নও।

কিন্তু নেইমারের গল্প কখনোই ট্র্যাজেডিতে শেষ হওয়ার ছিল না।

তারও চার বছর আগে, ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে সোনার খুব কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত মেক্সিকোর কাছে হেরে রুপা নিয়েই ফিরতে হয়েছিল ব্রাজিলকে। ফুটবলের জন্মভূমি না হলেও, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশটির ট্রফি কেবিনেটে তখনও একটি শূন্যতা রয়ে গিয়েছিল, অলিম্পিক ফুটবলের স্বর্ণপদক।

চার বছর পর সেই সুযোগ ফিরে এল, তবে এবার নিজের দেশের মাটিতে।

রিও অলিম্পিকের শুরুটা অবশ্য স্বপ্নের মতো ছিল না। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইরাকের বিপক্ষে টানা দুটি গোলশূন্য ড্রয়ের পর সমালোচনার তীর ছুটে আসে নেইমারের দিকেই। কেউ কেউ জার্সি থেকে তার নাম কেটে লিখে দেন ব্রাজিল নারী দলের কিংবদন্তি মার্তার নামও।

কিন্তু ঠিক সেখান থেকেই বদলে যায় গল্প।  

কলম্বিয়ার বিপক্ষে ফ্রি-কিক, হন্ডুরাসের বিপক্ষে মাত্র ১৪ সেকেন্ডে অলিম্পিক ইতিহাসের দ্রুততম গোল, আবারও দলের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন নেইমার। 

এরপর ফাইনাল। প্রতিপক্ষ জার্মানি। মাত্র দুই বছর আগে যে দলের কাছে ৭-১ ব্যবধানে ভেঙে পড়েছিল পুরো ব্রাজিল।

মারাকানা স্টেডিয়ামে যেন পুরো দেশ অপেক্ষা করছিল সেই ক্ষতটুকু অন্তত কিছুটা সারিয়ে তোলার জন্য। ২৭ মিনিটে অবিশ্বাস্য এক ফ্রি-কিক থেকে ব্রাজিলকে এগিয়ে দেন নেইমার। পরে জার্মানি সমতা ফেরায়। ১২০ মিনিটেও নিষ্পত্তি না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। 

চার-চার সমতা।

জার্মানির শেষ শট ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক ওয়েভারটন।

এরপর এগিয়ে আসেন নেইমার। পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ।

ধীরে ধীরে দৌড়ে এসে বল জড়িয়ে দেন জালে। পরের মুহূর্তেই হাঁটু গেড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সেই কান্না আর ২০১৪ সালের অসহায়ত্বের কান্না ছিল না। সেটি ছিল মুক্তির কান্না।

ব্রাজিল প্রথমবারের মতো জিতে নেয় অলিম্পিক ফুটবলের স্বর্ণপদক। আর নেইমার, যে ছেলেটি দুই বছর আগে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বিশ্বকাপের স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেখেছিল, সেই ছেলেই মারাকানার মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে একটি পুরো জাতিকে আবারও বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল।

জার্মানিকে হারিয়ে ব্রাজিলকে প্রথম অলিম্পিক ফুটবল স্বর্ণপদক এনে দেওয়ার পর পোডিয়ামে উল্লাসিত নেইমার

কিন্তু একটি অলিম্পিক স্বর্ণপদকও বিশ্বকাপের শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি। ব্রাজিলে দ্বিতীয় হওয়া মানেই ব্যর্থতা। আর তাই চার বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরেছিলেন নেইমার।

২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে বিদায়, ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে হৃদয়ভাঙা পরাজয়। আর শেষ পর্যন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপেও অপূর্ণ থেকে গেল সেই স্বপ্ন। সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, উরুগুয়ের বিপক্ষে ভয়াবহ চোটে মাঠ ছাড়ার ঠিক ৯৮১ দিন পর আবারও হলুদ জার্সি গায়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরেছিলেন নেইমার। কিন্তু সেই বহুল প্রতীক্ষিত প্রত্যাবর্তনও স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৩৭ মিনিট। কোটি সমর্থকের কাছে সেটি ছিল অসমাপ্ত বিদায়। কারণ ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটি তিনি নিজের মতো করে শেষ করার সুযোগই যেন পাননি।

এরই মধ্যে ক্লাব ক্যারিয়ারও ঢুকে পড়েছিল শেষ অধ্যায়ে। ২০২৩ সালে প্রায় ৯০ মিলিয়ন ইউরোতে আল হিলালে যোগ দিয়ে নতুন এক অধ্যায় শুরু করেছিলেন নেইমার। কিন্তু ব্রাজিলের জার্সিতেই এসিএল ও মেনিস্কাসের গুরুতর চোট তার সেই স্বপ্ন ভেঙে দেয়। প্রায় দুই বছরে মাত্র আটটি ম্যাচ খেলেই শেষ হয়ে যায় তার সৌদি অধ্যায়। করেছিলেন একটি গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট। যে স্বপ্ন নিয়ে আল হিলালে গিয়েছিলেন, চোট সেটি পূরণ হতে দেয়নি।  

অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার বুঝি সত্যিই শেষ। অথচ নেইমারের গল্প যেন কখনোই 'শেষ' শব্দটা মানত না। ২০১৪-তে ভেঙে যাওয়া মেরুদণ্ড, বারবার গোড়ালির চোট, একের পর এক অস্ত্রোপচার, শেষ পর্যন্ত এসিএল ছিঁড়ে যাওয়া, প্রতিবারই মনে হয়েছে, এবার আর হয়তো ফিরবেন না। কিন্তু প্রতিবারই তিনি ফিরে এসেছেন। কারণ নেইমারকে সংজ্ঞায়িত করেছে শুধু তার প্রতিভা নয়, ফিরে আসার অবিশ্বাস্য ক্ষমতাও। 

আর শেষ পর্যন্ত ফুটবল যেন তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ঠিক যেখানে গল্পটা শুরু হয়েছিল।  ২০২৫ সালে শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরে আসেন তিনি। যে সান্তোস একদিন বিশ্বকে উপহার দিয়েছিল এক কিশোর নেইমারকে, ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়েও সেই ক্লাবই তাকে আবার আপন করে নেয়। যেন গল্পটা শেষ পর্যন্ত নিজের বাড়িতেই ফিরে এল। আর ২০২৬ সালে, নিজের চতুর্থ অপূর্ণ বিশ্বকাপ শেষে, ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতা হিসেবে বিদায় জানান হলুদ জার্সিকে। যেন শুরু আর শেষ, দুটোই ফিরে পেল নিজের ঠিকানা। 

তবে বিশ্বকাপের আক্ষেপই নেইমারের পুরো গল্প নয়। ক্লাব ও দেশের হয়ে করেছেন ৪৬১টি অফিসিয়াল গোল, ২৬২টি অ্যাসিস্ট এবং জিতেছেন ৩০টিরও বেশি দলীয় শিরোপা। ফুটবলের প্রায় প্রতিটি বড় মঞ্চেই নিজের স্বাক্ষর রেখে গেছেন তিনি। সেই সঙ্গে পেলের পর একমাত্র ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হিসেবে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তিও গড়েছেন। শুধু দুটি স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত অধরা রয়ে গেল, বিশ্বকাপ আর ব্যালন ডি'অর। 

বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও বিশ্বকাপে তার প্রভাব ছিল অসাধারণ। চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা পেলের পর মাত্র দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান তিনি। বিশ্বকাপে মাত্র ১৪ ম্যাচ খেলেই করেছেন ৯ গোল। অথচ তার আগের প্রজন্মের চার মহাতারকা, রোনালদিনিয়ো, কাকা, আদ্রিয়ানো ও রবিনহো মিলে ৩৮ ম্যাচে করেছিলেন মোট ৭ গোল। পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বিশ্বকাপের মঞ্চেও ব্রাজিলের আক্রমণের মুখ ছিলেন নেইমার।

নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের হয়ে নেইমারের ৮০তম গোল 

হয়তো এ কারণেই ফুটবল ইতিহাসে নেইমারের নামের পাশে জুড়ে গেছে একটি অদ্ভুত পরিচয় 'দ্য প্রিন্স হু নেভার বিকেম কিং'।  পেলের পর ব্রাজিলের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন তিনি। প্রতিভায়, জনপ্রিয়তায়, প্রভাবে সবকিছুই ছিল একজন রাজার মতো। কিন্তু ভাগ্য তাকে কখনো বিশ্বকাপ কিংবা ব্যালন ডি'অরের মুকুট পরতে দেয়নি। রাজা হওয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন ছিল, তার প্রায় সবই ছিল নেইমারের। শুধু শেষ মুকুটটাই অধরা থেকে গেল। 
মেসি-রোনালদোর যুগে নেইমার ছিলেন প্রতিভার এক অপূর্ণ মহাকাব্য। রাজমুকুট হয়তো কখনোই তার মাথায় ওঠেনি, কিন্তু ফুটবলকে সুন্দর করে তোলার শিল্পে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। সীমাহীন প্রতিভা, অগণিত জাদু আর কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন মিলিয়েই গড়ে উঠেছিল তার উত্তরাধিকার।   হয়তো তিনি বিশ্বকাপ জেতেননি। কিন্তু ফুটবলকে আবারও শিল্পে পরিণত করেছিলেন। আজকের প্রজন্মের অসংখ্য উইঙ্গার, ড্রিবলার আর স্ট্রিট ফুটবলপ্রেমীদের খেলায় এখনও দেখা যায় সেই নেইমারের ছাপ। 

তবে নেইমারের প্রভাব শুধু ফুটবলার তৈরিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থকের কাছে তিনি ছিলেন এমন এক তারকা, যার সঙ্গে দূরত্ব বলে কিছু ছিল না। মাঠে ঢুকে পড়া শিশুদের নিরাপত্তারক্ষীদের হাত থেকে বাঁচিয়ে কোলে তুলে নেওয়া, জার্সি উপহার দেওয়া কিংবা ছবি তোলা, এসব যেন ছিল তার স্বভাব। 

কবার ক্যানসারে আক্রান্ত এক শিশু তাকে অনুরোধ করেছিল, ‘গোল করলে এই নাচটা করবেন।’ নেইমার সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে যাননি। গোল করার পর ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ঠিক সেই নাচই করেছিলেন, যাতে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা শিশুটি তা দেখতে পারে। নিজের ছেলে দাভি লুক্কার সঙ্গে করা মজার মুখভঙ্গিও পরে হয়ে উঠেছিল তার গোল উদ্‌যাপনের অংশ, যেটির অপেক্ষায় থাকত হাজারো শিশু। 

শুধু তা-ই নয়, নিজের ‘ইনস্টিটুতো প্রোজেতো নেইমার জুনিয়র’-এর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ইউরোপে নিয়ে গিয়ে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের সঙ্গে দেখা করানো, মাঠে নামার সুযোগ করে দেওয়া কিংবা তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টাও করে গেছেন তিনি। তাই অনেকের কাছে নেইমার শুধু একজন সুপারস্টার ছিলেন না; ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি খ্যাতির মাঝেও নিজের ভেতরের শিশুটিকে হারিয়ে ফেলেননি।

মাঠের প্রতিপক্ষের প্রতিও ছিল তার একই রকম সম্মান। জয় কিংবা পরাজয়, ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন, আলিঙ্গন কিংবা সান্ত্বনা জানানো ছিল তার স্বভাব। নিজের চোখে জল থাকলেও অন্যের কাঁধে হাত রাখতে কখনো দ্বিধা করেননি তিনি। প্রতিপক্ষের অসংখ্য ফুটবলারের কাছ থেকেও তাই বারবার এসেছে একই স্বীকৃতি, নেইমার শুধু অসাধারণ প্রতিভাই নন, একজন অসাধারণ স্পোর্টসম্যানও। 

তবুও তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হয়ে থাকবে বিশ্বকাপ। যে ট্রফিটির জন্য তিনি বারবার নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন, সেটিই আর ছোঁয়া হলো না। কিন্তু একজন ফুটবলারের মূল্য কি কেবল একটি ট্রফি দিয়েই মাপা যায়? 

নেইমার এমন এক প্রজন্ম তৈরি করেছেন, যারা ফলাফলের আগে ভালোবেসেছে 'জোগো বনিতো'কে। স্কোরলাইন নয়, তার পায়ে বল এলেই কী অসম্ভব কিছু ঘটতে পারে, সেই অপেক্ষায় বসে থাকত তারা। একটি ড্রিবল, একটি নো-লুক পাস কিংবা অসম্ভব কোনো স্কিল, প্রতিটি স্পর্শেই যেন লুকিয়ে থাকত বিস্ময়ের প্রতিশ্রুতি। কেউ হয়তো ব্রাজিলের জন্য নয়, বার্সেলোনার জন্যও নয়, শুধু নেইমারের জন্যই প্রথম ফুটবল দেখতে বসেছিল। 

সময়ের সঙ্গে ট্রফির সংখ্যা ভুলে যায় মানুষ। কিন্তু কিছু ফুটবলার স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকেন। যে বিকেলে প্রথম কোনো শিশু একা একা ড্রিবল শেখার চেষ্টা করেছিল, যে রাতে বন্ধুদের সঙ্গে 'লা রেমন্তাদা' দেখে বিশ্বাস করেছিল ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই, কিংবা যে বিশ্বকাপে কোটি মানুষ স্কোরলাইনের জন্য নয়, শুধু ১০ নম্বর জার্সির একটি মুহূর্ত দেখার অপেক্ষায় ছিল—সেই সব স্মৃতির মাঝেই বেঁচে থাকবেন নেইমার। 

অনেকেই তাকে ভালোবেসেছেন। অনেকেই সমালোচনা করেছেন। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই, নেইমারকে উপেক্ষা করা কখনোই সম্ভব ছিল না। তিনি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু, আর একই সঙ্গে কোটি মানুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু।

হয়তো ইতিহাস তাকে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে মনে রাখবে না। হয়তো ব্যালন ডি'অরজয়ী হিসেবেও নয়।

ইতিহাস তাকে মনে রাখবে সেই ফুটবলার হিসেবে, যার পায়ে বল থাকলে পুরো স্টেডিয়াম বিশ্বাস করত, পরের মুহূর্তে অসম্ভব কিছু ঘটতে পারে।

হলুদ জার্সিতে নেইমারের অধ্যায় শেষ হয়েছে। কিন্তু যে মানুষটি একটি প্রজন্মকে ফুটবলের প্রেমে পড়তে শিখিয়েছিলেন, তিনি কখনোই কেবল অতীত হয়ে যাবেন না। কিছু জাদু ট্রফিতে নয়, মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। নেইমার হয়তো সেই বিরল জাদুকরদেরই একজন।