ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার একটি বিবৃতি মুহূর্তের মধ্যে বিশ্ব ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
বিবৃতিতে ছিল মাত্র ১১টি শব্দ।
“উয়েফা এবং এর সদস্য জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলো ফিফার প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না।”
শব্দগুলো ছোট হলেও এর সম্ভাব্য অভিঘাত বিশাল। কারণ, এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে বিশ্বকাপসহ ফিফার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলো ইউরোপের দলগুলোকে ছাড়াই আয়োজন করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তবে এই বয়কট এখনই কার্যকর হচ্ছে না। এর ভবিষ্যত নির্ভর করছে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি বিতর্কিত পরিকল্পনার ওপর।
বিতর্কের শুরু কোথায়
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা হলো, ফিফার প্রতিযোগিতাগুলো পরিচালনার জন্য একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন করা। বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম এই প্রতিষ্ঠানের অধীনেই পরিচালিত হবে।

এই প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জশুয়া কুশনারও।
ইনফান্তিনোর যুক্তি, এই বিনিয়োগ ফিফার আয় বাড়াবে এবং ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতাগুলোকে আর্থিকভাবে আরও শক্তিশালী করবে।
কিন্তু উয়েফা এবং একাধিক জাতীয় ফুটবল সংস্থার অভিযোগ ভিন্ন। তাদের দাবি, এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সদস্যদের সঙ্গে কোনো অর্থবহ আলোচনা বা পরামর্শ করা হয়নি। আর সেই ক্ষোভই এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
এরপর কী হতে পারে
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—এরপর কী?
মজার বিষয় হলো, এই প্রশ্নের উত্তর এখনই কেউ নিশ্চিতভাবে দিতে পারছেন না। এমনকি ইউরোপীয় ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও বলছেন, পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
উয়েফার বয়কট কার্যকর হবে তখনই, যদি ফিফার সদস্য দেশগুলো ইনফান্তিনোর অর্থায়নের পরিকল্পনা অনুমোদন করে।
সদস্য দেশগুলোর সামনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শেষ সময় ১৯ সেপ্টেম্বর। প্রস্তাবে সম্মতি দিলে আগামী ১লা জানুয়ারি প্রতিটি দেশ ২ কোটি ডলার করে পাবে।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে জটিলতা।
সেপ্টেম্বরে পোল্যান্ডে শুরু হওয়ার কথা অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ। যদি টুর্নামেন্ট চলাকালেই বয়কট কার্যকর হয়, তাহলে কোয়ার্টার ফাইনাল কিংবা সেমিফাইনালের আগেই ইউরোপীয় দলগুলো সরে দাঁড়ানোর মতো নজিরবিহীন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
এরপর অক্টোবরে রয়েছে নারী বিশ্বকাপের প্লে-অফ। সেখানে খেলবে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের মতো দল।
উয়েফার সহ সভাপতি এবং সাবেক ওয়েলস আন্তর্জাতিক লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার বলেন, “ওয়েলস প্রথমবারের মতো নারী বিশ্বকাপে ওঠার সুযোগের সামনে। এমন অবস্থায় টুর্নামেন্টে না থাকার কথা কল্পনাও করা যায় না।”
তবে তিনি একই সঙ্গে ফিফাকেই দায়ী করেন।
“এই সংকট উয়েফা তৈরি করেনি। এটি পুরোপুরি ফিফার সৃষ্টি। আমরা চাই না খেলোয়াড় বা কোনো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হোক। কিন্তু আমাদের এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে ফিফাই।”
ইনফান্তিনোর অবস্থান কি নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে
এই ঘটনার পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—জিয়ান্নি ইনফান্তিনো কি ফিফার সভাপতি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন?
এখনও পর্যন্ত উয়েফার বিবৃতির কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি ফিফা।
তবে বিরোধিতা শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নেই।
উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফ জানিয়েছে, তাদের ৪১টি সদস্য দেশও এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
অর্থাৎ আপত্তির পরিধি এখন বৈশ্বিক রূপ নিতে শুরু করেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফিফার ভেতর থেকেই ইনফান্তিনোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ডেবি হিউইট, যিনি ফিফার সহ সভাপতিও, জরুরি বৈঠকে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন। ইংলিশ এফএ বলেছে, তারা “ইউরোপীয় সহকর্মীদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে” রয়েছে।
স্কটিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং ফিফার অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান মাইক মুলরেনিও উয়েফার অবস্থানকে “পূর্ণ সমর্থন” জানিয়েছেন।
ফুটবল অঙ্গনের বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য, আপত্তি শুধু পরিকল্পনাটি ঘিরে নয়; ক্ষোভের বড় কারণ হলো ইনফান্তিনোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং সদস্যদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করা।
উয়েফার জরুরি বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র বিবিসিকে এক শব্দে বৈঠকের পরিবেশের বর্ণনা দিয়েছে— “রাগ”।
ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে কি প্রতিদ্বন্দ্বী আসছে
২০১৬ সালে ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। আগামী মার্চে তিনি চতুর্থ মেয়াদের জন্য নির্বাচন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিছুদিন আগেও মনে করা হচ্ছিল, তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারও নির্বাচিত হবেন।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, কনকাকাফের বেশিরভাগ সদস্য এখন ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেছে। ফলে তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো প্রার্থী খোঁজার আলোচনা শুরু হয়েছে।
সম্ভাব্য নাম হিসেবে উঠে এসেছে প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের সভাপতি নাসের আল খেলাইফির নাম।
ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে তিনি অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ইউরোপিয়ান সুপার লিগ ভেঙে যাওয়ার পর ইউরোপিয়ান ক্লাব সংগঠনকে নতুনভাবে সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।
তবে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, ফিফা সভাপতির পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কোনো আগ্রহ তার নেই।
ইউরোপ ছাড়া বিশ্বকাপ কতটা সম্ভব
সংখ্যার হিসাবে ফিফার ২১১ সদস্য দেশের মধ্যে উয়েফার সদস্য মাত্র ৫৫টি।
কিন্তু ফুটবলের মান, জনপ্রিয়তা এবং বাণিজ্যিক গুরুত্বের বিচারে ইউরোপের অবস্থান একেবারেই আলাদা।
সর্বশেষ পুরুষ বিশ্বকাপ, নারী বিশ্বকাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপ—এই তিনটি টুর্নামেন্টেই চার সেমিফাইনালিস্টের মধ্যে তিনটিই ছিলো ইউরোপের দল।
তাই ইউরোপ যদি সত্যিই ফিফার প্রতিযোগিতা বর্জন করে, তাহলে শুধু মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নয়, সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ, দর্শকসংখ্যা এবং বাণিজ্যিক মূল্য—সব ক্ষেত্রেই বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
ইনফান্তিনো সদস্য দেশগুলোকে লেখা এক চিঠিতে এই নতুন উদ্যোগের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৪০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে দাবি করেছিলেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় দলগুলোকে ছাড়া সেই লক্ষ্য অর্জন প্রায় অসম্ভব।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে
ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টেইনের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ফিফা ও উয়েফার মধ্যে স্থায়ী বিভাজন কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না।
তার ভাষায়, “ফিফা ইউরোপ ছাড়া বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারবে না। আবার ইউরোপও বিশ্বকাপের বাইরে থাকতে চাইবে না। তাই শেষ পর্যন্ত সমাধান বের করতেই হবে।”
তবে সমাধানের পথ নিয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট।
“এই মুহূর্তে ইনফান্তিনোকেই পিছু হটতে হবে। বর্তমান প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। এটি বন্ধুদের জন্য বানানো একটি চুক্তির মতো দেখাচ্ছে। যদি মূলধন সংগ্রহ করতেই হয়, তাহলে আরও স্বচ্ছ এবং ভালো উপায় রয়েছে।”
এখন বিশ্ব ফুটবলের নজর ১৯ সেপ্টেম্বরের দিকে। সেদিনই স্পষ্ট হবে, ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা এগিয়ে যায় কিনা, নাকি ইউরোপের তীব্র বিরোধিতার মুখে ফিফাকে নতুন করে পথ ভাবতে হয়।



