সৈকত এবং মদে ডুবে যেভাবে দুর্বল অস্ট্রেলিয়ার কাছে অ্যাশেজ হারালো ইংল্যান্ড
মাত্র এগারো দিনে অ্যাশেজ হার - ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে এটি মনে থাকবে। এটি ছিল একটি সুযোগ অস্ট্রেলিয়ার দুর্বলতম দল থেকে অ্যাশেজ ফিরিয়ে নেওয়ার।
আলাপ স্পোর্টস
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৩:৩৩ পিএমআপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:৩৯ পিএম
বেশ একটা চমকই এটা, ইংল্যান্ডের জন্য তো বটেই ক্রিকেট সমর্থকদের জন্যও।
ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে এটি মনে থাকবে, এটি ছিল একটি সুযোগ অস্ট্রেলিয়ার দুর্বলতম দল থেকে অ্যাশেজ ফিরিয়ে নেওয়ার।
ইংল্যান্ড কিভাবে নিজেদের কোনো সুযোগই রাখল না—সিলেকশন ও প্রস্তুতি থেকে শুরু করে, সমুদ্রের পারে অবসর সময় কাটানো সবকিছুর মাঝেই তিন টেস্টে হেরে বসলো ইংল্যান্ড।
অনেক আগেই এই হেরে যাওয়া নিশ্চিত ছিল।
চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে, ঠিক তেমন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে আমরা সবাই ‘বিশেষজ্ঞ’ হয়ে যাই, কিন্তু এই সফরের ব্যর্থতা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে জ্যাক ক্রলি আঘাত পেলে সত্যিকারের কোনো ওপেনারকে সুযোগ দেয়া হয়নি, তার পরিবর্তে ড্যান লরেন্সকে এমন কাজ করার জন্য বলা হয়েছিল যা তার জন্য তিনি উপযুক্ত নন।
এছাড়া ছিল চোটের মিছিল, জর্ডান কক্স নিউজিল্যান্ডে ও মার্ক উড চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে গিয়ে চোট পান।
এমন একটি টুর্নামেন্টে যেখানে তারা জিততেই পারত না, তাদের দ্রুততম বোলারকেই দুর্বল করে দিল।
সহকারী কোচ পল কলিংউড গ্রীষ্মের শুরুতেই অনুপস্থিত হয়ে গেছেন এবং তার জায়গা পূরণ করা হয়নি, আর ইংল্যান্ডের ফাস্ট-বোলিং কোচের পরিচয় পুরো সফরের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানা যায়নি।
ক্রিস ওকসের কাঁধের চরম আঘাত তাকে অ্যাশেজ থেকে কার্যত বাদই করে দিল। কিন্তু ইংল্যান্ডের ভারতের বিরুদ্ধে শেষ টেস্টের স্কোয়াডে আরও দুই খেলোয়াড় ছিলেন যারা অস্ট্রেলিয়ায় যেতে পারেনি। একজন জেমি ওভারটন। আরেকজন লিয়াম ডসন।
অ্যাশেজ স্কোয়াডের ঘোষণা ইংল্যান্ডের জন্য ভবিষ্যতের ব্যর্থতার ইঙ্গিত দিয়েছিল।
ইংল্যান্ড প্রেস রিলিজের মাধ্যমে তাদের দল ঘোষণা করেছিল, কিংবদন্তি আম্পায়ার ডিকি বার্ডের মৃত্যুর খবর জানার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, কোনো নোটিশ ছাড়াই।
যেখানে আসে, ১২ মাস ধরে ওলি পোপের জায়গা নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব চলতে থাকে আবার ক্রিকেট পরিচালক রব কী স্কোয়াড ব্যাখ্যা করতে ২৪ ঘণ্টা পরে বক্তব্য দেন, তখনই ওকসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়, ততক্ষণে আর ওকসের অবসরের সময়টায় ওকসই ফোকাস থেকে সরে যান।
প্রস্তুতিতে ব্যর্থতা, ব্যর্থ হতেই প্রস্তুতি
অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজের আগে ইংল্যান্ডের পরিকল্পনার জন্য যতই সমালোচনা করা হোক, লাল বলে ইংল্যান্ড দলের গা গরমের ম্যাচের আগে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল নিউজিল্যান্ডর মাটিতে খেলা সাদা বলের সিরিজ যা পূর্বনির্ধারিত।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান রিচার্ড থম্পসন দাবি করেন, নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজ ছিল শক্তিশালী অ্যাশেজ প্রস্তুতি, ইংল্যান্ড শেষপর্যন্ত চারটি ম্যাচের মধ্যে তিনটিতেই হেরে যায়।
শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড প্রস্তুতির জন্য পেয়েছিল ইন্ট্রা স্কোয়াড লাল বলের ম্যাচ, তবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্রস্তুতিমূলক ম্যাচ নিয়ে কিছুটা দর কষাকষিও হয়েছিল, যা থেকে স্পষ্ট হয় যে প্রস্তুতির ধরন নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিল না বেন স্টোকসের দল।
যদি কোনো রাজ্য দলের বা অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলের বিরুদ্ধে ম্যাচের প্রস্তাব থেকেও থাকতো, নিউজিল্যান্ড সফরের সঙ্গে এত কাছাকাছি হওয়ায় ইংল্যান্ড তা আয়োজন করতে পারল না।
ইংল্যান্ড দাবি করছে তারা ওয়াকা গ্রাউন্ডে সময় চেয়েছিল, কিন্তু বলা হয়েছিল মাঠ তখন পাওয়া যাবে না। যদিও তারা কখন অনুরোধ করেছিল তা স্পষ্ট নয়। ইংল্যান্ডের সমর্থক গোষ্ঠী- বার্মি আর্মি সেখানে একটি ম্যাচ বুক করতে পেরেছিল।
মোট কথা হচ্ছে পুরো সিরিজেই ইংল্যান্ডের আচরণ ছিল বেশ হালকা ঘরানার, ঢিমেতালে।
ইংল্যান্ড দলের বিশ্লেষক রুপার্ট লুইস ম্যাচ চলাকালীন পানীয় দেওয়ার জন্য সাদা পোশাক পরে মাঠে ঢোকেন এবং তিনদিন ধরে ড্রেসিং রুম থেকে মিউজিক শোনা যাচ্ছিল। হ্যারি ব্রুকের শটগুলো দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, তিনি এই অনুশীলনের প্রতি কতটা উদাসীন।
যখন লায়ন্স দলের যে খেলোয়াড়দের ম্যাচ ছিল না, তাদেরকে কঠিন ফিটনেস প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে পার্কে দৌড়াতে পাঠানো হয়েছিল।
বশিরের বোলিং-এ নিজের দলের ব্যাটাররাই বেশ অনায়াসে ব্যাট করেছে এবং উডকে চোট থেকে মাঠে নামানোর মাত্র আট ওভারের পর হ্যামস্ট্রিং স্ক্যান করাতে হলো।
একটুখানি মজাও হয়ে গেল এর মাঝেই, যখন স্কোরকার্ডে উডকে ব্যাটিং দেখাচ্ছিল, অথচ তিনি তখন হাসপাতালে ছিলেন।
ছয় দিনে দুই হার
প্রথম টেস্টের আগে প্রস্তুতির দিকটা ইংল্যান্ড ভালোভাবেই সামলেছিল। জশ টং ও জেমি স্মিথ গলফ, স্টাম্পিং ও ‘নৈতিক জয়’ নিয়ে প্রশ্নগুলো সহজেই এড়িয়ে যান।
পার্থে দ্বিতীয় দিনের লাঞ্চ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ছিল স্পষ্টভাবে এগিয়ে, কিন্তু একই দিনের স্টাম্পসের আগেই তারা ম্যাচ হেরে বসে।
ম্যাচের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে স্টোকস বলেন, তিনি মানসিকভাবে হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন। সেই মন্তব্যগুলোই পরে অধিনায়কের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয় এবং টেস্টের পরের দিনগুলোতে গণমাধ্যমের সাথে লড়াইয়েও ইংল্যান্ড হেরে যায়।
ইংল্যান্ড দলের পিছু নেয় আলোকচিত্রীরা - গলফ কোর্সে, এমনকি একটি অ্যাকুয়ারিয়াম পর্যন্ত। ক্যাসিনোর সঙ্গে যুক্ত একটি হোটেলে দলকে রাখা ছিল সম্ভবত ভুল সিদ্ধান্ত। দলের কয়েকজন সদস্য অস্ট্রেলীয় একটি টেকঅ্যাওয়ে ফ্রোজেন ইয়োগার্ট ব্র্যান্ডের প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়েন।
ক্যানবেরায় প্রধানমন্ত্রীর একাদশের বিরুদ্ধে লায়ন্সের দিন-রাতের ম্যাচে আরও খেলোয়াড় না পাঠানোর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া হয় রাজধানী শহর ও ব্রিসবেনের মাঠের মধ্যে দূরত্বের কারণে।
তবে টানা এক সপ্তাহ কোনো বক্তব্য না দেওয়াটা সফরকারী দলের জন্য মোটেও সহায়ক হয়নি। সাবেক অস্ট্রেলীয় পেস বোলার মিচেল জনসন তাদের ‘অহংকারী’ বলে মন্তব্য করেন।
এর বদলে ইংল্যান্ড ব্রিসবেনে পাঁচ দিনের অনুশীলন বেছে নেয়। পরে প্রধান কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম দাবি করেন, এ প্রস্তুতিই দ্বিতীয় টেস্টের জন্য দলকে “অতিরিক্তভাবে প্রস্তুত” করে ফেলেছিল।
শেষ পর্যন্ত স্টোকস যখন সংবাদমাধ্যমের কাছে নীরবতা ভাঙেন, জনসনের কথার জবাবে বলেন, ইংল্যান্ডকে অহংকারী না বলে “জঘন্য” বলা যেতে পারে।
টেস্টের প্রস্তুতি চলাকালে স্টোকস ও পোপকে আবার ব্যাখ্যা দিতে হয়, স্টোকস, উড ও স্মিথকে হেলমেট ছাড়া ই-স্কুটারে চড়ার ছবির বিষয়ে। কুইন্সল্যান্ড আইনে এটি জরিমানাযোগ্য অপরাধ।
মাঠের খেলায়, অস্ট্রেলিয়ায় রুটের বহু প্রতীক্ষিত প্রথম সেঞ্চুরি কোনো কাজে আসেনি, কারণ তার সতীর্থদের কিছু বাজে শট আর পাঁচটি ক্যাচ মিসে সব ভেস্তে যায়।
গ্যাবায় আরেকটি হারের পর স্টোকস বলেন, তার ড্রেসিংরুম “দুর্বল মানুষের জায়গা নয়", এমন কথা যা সফরের বাকি সময়টায় দলটাকে আরও কোনঠাসা করে ফেলে।
নুসা সমুদ্রসৈকতে চার রাত
ইংল্যান্ড জানিয়েছে, নুসার সমুদ্রসৈকত রিসোর্টে তাদের চার রাতের অবস্থান এক বছরেরও বেশি আগে থেকেই সূচিতে ছিল, যা সম্ভবত পুরো সফরের সবচেয়ে ভালভাবেই পরিকল্পিত অংশগুলোর একটি।
কেউ কেউ এটাকে যেভাবে ভেবেছেন, সেভাবেই কাজে লাগিয়েছেন। যেমন রুট—তিনি ভিড় থেকে দূরে পরিবারের সঙ্গে ছিলেন এবং কখনোই কোনো পানশালার আশপাশে তাকে দেখা যায়নি।
তবে যেটা চোখে পড়েছে, অ্যাশেজ থেকে বিরতির নামে যে সময়টা রাখা হয়েছিল, তাতে আরও বেশি পরিবারের সদস্য কেন উপস্থিত ছিলেন না, তা ছিল বেশ কৌতূহলের বিষয়।
অন্যদের জন্য বিষয়টি যেন জমকালো ব্যাচেলর পার্টিতে রূপ নেয়। দলের কয়েকজন সদস্য ব্রিসবেনে টানা দুই দিন মদ্যপানের পর নুসায় আরও চার দিন কাটান, মোট ছয় দিন - যা এই সফরে তখন পর্যন্ত খেলা টেস্ট ক্রিকেটের দিনের সংখ্যার সমান।
ইংল্যান্ড দল মোটেও চোখের আড়ালে ছিল না, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পানাহার, আর অনেকের মাথায় ঐতিহ্যবাহী টুপি, যা যেন ছুটির দিনের ইউনিফর্মে পরিণত হয়েছিল।
সমুদ্রসৈকতে একটি হালকা ফুটবল ম্যাচে উপস্থিত থাকার জন্য কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়। সেখানে স্থানীয় রেডিও ডিজেরা ইংল্যান্ডকে নিয়ে মন্তব্য করেন এবং দলের খেলোয়াড়রা অন্য পর্যটকদের সঙ্গেও মিশে যান।
স্টোকসকে এমনিতে দৌড়াতেও দেখা গেছে। তবে শক্তি ও ফিটনেস কোচ পিট সিম যখন সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে উপকূল ধরে দৌড়ানোর জন্য পুরো দলকে আমন্ত্রণ জানান, স্মিথ, বশির ও টং, এই তিনজনই কেবল হাজির হন।
ভ্রমণের শেষে ব্রিসবেন বিমানবন্দরে টিভি নেটওয়ার্ক সেভেন-এর এক ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার পর ইংল্যান্ড দলের নিরাপত্তাকর্মীদের একজনের বিরুদ্ধে শারীরিক সংঘর্ষের অভিযোগ ওঠে।
সমুদ্রসৈকতে কাটানো সময় নিয়ে অস্ট্রেলীয় গণমাধ্যমের ঠাট্টা-তামাশা ও অতিরিক্ত নজরদারি সত্ত্বেও, নুসার আনন্দভ্রমণের পরের টেস্টে ইংল্যান্ড সম্ভবত এই বাজে সফরের মধ্যে তাদের সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্সটাই দেখিয়েছিল।
অ্যাডেলেইডের পরিস্থিতি
তৃতীয় টেস্টে এসে ইংল্যান্ড দলের মধ্যে স্পষ্টভাবে সংকট ও দ্বিধা দেখা যায়। আগের তিন বছর ধরে দল থেকে চাপ কমানোর চেষ্টা করা স্টোকস হঠাৎই বলেন, তিনি “চাপ উপভোগ করছেন”।
ব্রুক বলেন, নুসায় তারা ক্রিকেট নিয়ে কোনো কথাই বলেননি, অথচ স্টোকস স্বীকার করেন সেখানে কিছু “খোলাখুলি” আলোচনা হয়েছিল। পরে ক্রলি দাবি করেন, তিনি স্টোকসের করা “দুর্বল মানুষ” মন্তব্যের কথাই জানতেন না।
সম্ভবত ফিল্ডিংয়ের দুর্বলতা বুঝতে পেরে ইংল্যান্ড কিছু বিরল ফিল্ডিং অনুশীলনেও অংশ নেয়।
স্পিনারদের সহায়ক হিসেবে পরিচিত অ্যাডিলেডের মাঠে ইংল্যান্ড বশিরকে বাদ দেয়। সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় বলা হয়, আট নম্বরে উইল জ্যাকসের ব্যাটিং প্রয়োজন ছিল।
ফাস্ট বোলিংয়ের ওপর এত জোর দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ওভার করতে হয় পার্ট-টাইম স্পিনার জ্যাকসকেই। বাইরে থেকে ইংল্যান্ডকে তখনো বেশ নিশ্চিন্তই মনে হচ্ছিল।
প্যাটেল এক সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন এই বলে, “আপনাদের সন্ধ্যাটা উপভোগ করুন। একটা পাইন্ট (বিয়ার) খান, কারণ আমিও তাই করব।”
ইংল্যান্ড অবশেষে কিছুটা হলেও প্রত্যাশিত লড়াই দেখায় এবং টেস্ট ম্যাচটিকে শেষ দিন পর্যন্ত নিয়ে যায়। তবু ১১ দিনের ক্রিকেটেই অ্যাশেজ হাতছাড়া হয়ে যায়। ৫-০ ব্যবধানটা অবশ্যম্ভাবী মনে হলেও, দলটা ভেঙে পড়বে, এমনটা এখনো মনে হচ্ছে না।
সৈকত এবং মদে ডুবে যেভাবে দুর্বল অস্ট্রেলিয়ার কাছে অ্যাশেজ হারালো ইংল্যান্ড
মাত্র এগারো দিনে অ্যাশেজ হার - ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে এটি মনে থাকবে। এটি ছিল একটি সুযোগ অস্ট্রেলিয়ার দুর্বলতম দল থেকে অ্যাশেজ ফিরিয়ে নেওয়ার।
বেশ একটা চমকই এটা, ইংল্যান্ডের জন্য তো বটেই ক্রিকেট সমর্থকদের জন্যও।
ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে এটি মনে থাকবে, এটি ছিল একটি সুযোগ অস্ট্রেলিয়ার দুর্বলতম দল থেকে অ্যাশেজ ফিরিয়ে নেওয়ার।
ইংল্যান্ড কিভাবে নিজেদের কোনো সুযোগই রাখল না—সিলেকশন ও প্রস্তুতি থেকে শুরু করে, সমুদ্রের পারে অবসর সময় কাটানো সবকিছুর মাঝেই তিন টেস্টে হেরে বসলো ইংল্যান্ড।
অনেক আগেই এই হেরে যাওয়া নিশ্চিত ছিল।
চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে, ঠিক তেমন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে আমরা সবাই ‘বিশেষজ্ঞ’ হয়ে যাই, কিন্তু এই সফরের ব্যর্থতা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে জ্যাক ক্রলি আঘাত পেলে সত্যিকারের কোনো ওপেনারকে সুযোগ দেয়া হয়নি, তার পরিবর্তে ড্যান লরেন্সকে এমন কাজ করার জন্য বলা হয়েছিল যা তার জন্য তিনি উপযুক্ত নন।
এছাড়া ছিল চোটের মিছিল, জর্ডান কক্স নিউজিল্যান্ডে ও মার্ক উড চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে গিয়ে চোট পান।
এমন একটি টুর্নামেন্টে যেখানে তারা জিততেই পারত না, তাদের দ্রুততম বোলারকেই দুর্বল করে দিল।
সহকারী কোচ পল কলিংউড গ্রীষ্মের শুরুতেই অনুপস্থিত হয়ে গেছেন এবং তার জায়গা পূরণ করা হয়নি, আর ইংল্যান্ডের ফাস্ট-বোলিং কোচের পরিচয় পুরো সফরের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানা যায়নি।
ক্রিস ওকসের কাঁধের চরম আঘাত তাকে অ্যাশেজ থেকে কার্যত বাদই করে দিল। কিন্তু ইংল্যান্ডের ভারতের বিরুদ্ধে শেষ টেস্টের স্কোয়াডে আরও দুই খেলোয়াড় ছিলেন যারা অস্ট্রেলিয়ায় যেতে পারেনি। একজন জেমি ওভারটন। আরেকজন লিয়াম ডসন।
অ্যাশেজ স্কোয়াডের ঘোষণা ইংল্যান্ডের জন্য ভবিষ্যতের ব্যর্থতার ইঙ্গিত দিয়েছিল।
ইংল্যান্ড প্রেস রিলিজের মাধ্যমে তাদের দল ঘোষণা করেছিল, কিংবদন্তি আম্পায়ার ডিকি বার্ডের মৃত্যুর খবর জানার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, কোনো নোটিশ ছাড়াই।
যেখানে আসে, ১২ মাস ধরে ওলি পোপের জায়গা নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব চলতে থাকে আবার ক্রিকেট পরিচালক রব কী স্কোয়াড ব্যাখ্যা করতে ২৪ ঘণ্টা পরে বক্তব্য দেন, তখনই ওকসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়, ততক্ষণে আর ওকসের অবসরের সময়টায় ওকসই ফোকাস থেকে সরে যান।
প্রস্তুতিতে ব্যর্থতা, ব্যর্থ হতেই প্রস্তুতি
অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজের আগে ইংল্যান্ডের পরিকল্পনার জন্য যতই সমালোচনা করা হোক, লাল বলে ইংল্যান্ড দলের গা গরমের ম্যাচের আগে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল নিউজিল্যান্ডর মাটিতে খেলা সাদা বলের সিরিজ যা পূর্বনির্ধারিত।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান রিচার্ড থম্পসন দাবি করেন, নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজ ছিল শক্তিশালী অ্যাশেজ প্রস্তুতি, ইংল্যান্ড শেষপর্যন্ত চারটি ম্যাচের মধ্যে তিনটিতেই হেরে যায়।
শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড প্রস্তুতির জন্য পেয়েছিল ইন্ট্রা স্কোয়াড লাল বলের ম্যাচ, তবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্রস্তুতিমূলক ম্যাচ নিয়ে কিছুটা দর কষাকষিও হয়েছিল, যা থেকে স্পষ্ট হয় যে প্রস্তুতির ধরন নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিল না বেন স্টোকসের দল।
যদি কোনো রাজ্য দলের বা অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলের বিরুদ্ধে ম্যাচের প্রস্তাব থেকেও থাকতো, নিউজিল্যান্ড সফরের সঙ্গে এত কাছাকাছি হওয়ায় ইংল্যান্ড তা আয়োজন করতে পারল না।
ইংল্যান্ড দাবি করছে তারা ওয়াকা গ্রাউন্ডে সময় চেয়েছিল, কিন্তু বলা হয়েছিল মাঠ তখন পাওয়া যাবে না। যদিও তারা কখন অনুরোধ করেছিল তা স্পষ্ট নয়। ইংল্যান্ডের সমর্থক গোষ্ঠী- বার্মি আর্মি সেখানে একটি ম্যাচ বুক করতে পেরেছিল।
মোট কথা হচ্ছে পুরো সিরিজেই ইংল্যান্ডের আচরণ ছিল বেশ হালকা ঘরানার, ঢিমেতালে।
ইংল্যান্ড দলের বিশ্লেষক রুপার্ট লুইস ম্যাচ চলাকালীন পানীয় দেওয়ার জন্য সাদা পোশাক পরে মাঠে ঢোকেন এবং তিনদিন ধরে ড্রেসিং রুম থেকে মিউজিক শোনা যাচ্ছিল। হ্যারি ব্রুকের শটগুলো দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, তিনি এই অনুশীলনের প্রতি কতটা উদাসীন।
যখন লায়ন্স দলের যে খেলোয়াড়দের ম্যাচ ছিল না, তাদেরকে কঠিন ফিটনেস প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে পার্কে দৌড়াতে পাঠানো হয়েছিল।
বশিরের বোলিং-এ নিজের দলের ব্যাটাররাই বেশ অনায়াসে ব্যাট করেছে এবং উডকে চোট থেকে মাঠে নামানোর মাত্র আট ওভারের পর হ্যামস্ট্রিং স্ক্যান করাতে হলো।
একটুখানি মজাও হয়ে গেল এর মাঝেই, যখন স্কোরকার্ডে উডকে ব্যাটিং দেখাচ্ছিল, অথচ তিনি তখন হাসপাতালে ছিলেন।
ছয় দিনে দুই হার
প্রথম টেস্টের আগে প্রস্তুতির দিকটা ইংল্যান্ড ভালোভাবেই সামলেছিল। জশ টং ও জেমি স্মিথ গলফ, স্টাম্পিং ও ‘নৈতিক জয়’ নিয়ে প্রশ্নগুলো সহজেই এড়িয়ে যান।
পার্থে দ্বিতীয় দিনের লাঞ্চ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ছিল স্পষ্টভাবে এগিয়ে, কিন্তু একই দিনের স্টাম্পসের আগেই তারা ম্যাচ হেরে বসে।
ম্যাচের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে স্টোকস বলেন, তিনি মানসিকভাবে হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন। সেই মন্তব্যগুলোই পরে অধিনায়কের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয় এবং টেস্টের পরের দিনগুলোতে গণমাধ্যমের সাথে লড়াইয়েও ইংল্যান্ড হেরে যায়।
ইংল্যান্ড দলের পিছু নেয় আলোকচিত্রীরা - গলফ কোর্সে, এমনকি একটি অ্যাকুয়ারিয়াম পর্যন্ত। ক্যাসিনোর সঙ্গে যুক্ত একটি হোটেলে দলকে রাখা ছিল সম্ভবত ভুল সিদ্ধান্ত। দলের কয়েকজন সদস্য অস্ট্রেলীয় একটি টেকঅ্যাওয়ে ফ্রোজেন ইয়োগার্ট ব্র্যান্ডের প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়েন।
ক্যানবেরায় প্রধানমন্ত্রীর একাদশের বিরুদ্ধে লায়ন্সের দিন-রাতের ম্যাচে আরও খেলোয়াড় না পাঠানোর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া হয় রাজধানী শহর ও ব্রিসবেনের মাঠের মধ্যে দূরত্বের কারণে।
তবে টানা এক সপ্তাহ কোনো বক্তব্য না দেওয়াটা সফরকারী দলের জন্য মোটেও সহায়ক হয়নি। সাবেক অস্ট্রেলীয় পেস বোলার মিচেল জনসন তাদের ‘অহংকারী’ বলে মন্তব্য করেন।
এর বদলে ইংল্যান্ড ব্রিসবেনে পাঁচ দিনের অনুশীলন বেছে নেয়। পরে প্রধান কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম দাবি করেন, এ প্রস্তুতিই দ্বিতীয় টেস্টের জন্য দলকে “অতিরিক্তভাবে প্রস্তুত” করে ফেলেছিল।
শেষ পর্যন্ত স্টোকস যখন সংবাদমাধ্যমের কাছে নীরবতা ভাঙেন, জনসনের কথার জবাবে বলেন, ইংল্যান্ডকে অহংকারী না বলে “জঘন্য” বলা যেতে পারে।
টেস্টের প্রস্তুতি চলাকালে স্টোকস ও পোপকে আবার ব্যাখ্যা দিতে হয়, স্টোকস, উড ও স্মিথকে হেলমেট ছাড়া ই-স্কুটারে চড়ার ছবির বিষয়ে। কুইন্সল্যান্ড আইনে এটি জরিমানাযোগ্য অপরাধ।
মাঠের খেলায়, অস্ট্রেলিয়ায় রুটের বহু প্রতীক্ষিত প্রথম সেঞ্চুরি কোনো কাজে আসেনি, কারণ তার সতীর্থদের কিছু বাজে শট আর পাঁচটি ক্যাচ মিসে সব ভেস্তে যায়।
গ্যাবায় আরেকটি হারের পর স্টোকস বলেন, তার ড্রেসিংরুম “দুর্বল মানুষের জায়গা নয়", এমন কথা যা সফরের বাকি সময়টায় দলটাকে আরও কোনঠাসা করে ফেলে।
নুসা সমুদ্রসৈকতে চার রাত
ইংল্যান্ড জানিয়েছে, নুসার সমুদ্রসৈকত রিসোর্টে তাদের চার রাতের অবস্থান এক বছরেরও বেশি আগে থেকেই সূচিতে ছিল, যা সম্ভবত পুরো সফরের সবচেয়ে ভালভাবেই পরিকল্পিত অংশগুলোর একটি।
কেউ কেউ এটাকে যেভাবে ভেবেছেন, সেভাবেই কাজে লাগিয়েছেন। যেমন রুট—তিনি ভিড় থেকে দূরে পরিবারের সঙ্গে ছিলেন এবং কখনোই কোনো পানশালার আশপাশে তাকে দেখা যায়নি।
তবে যেটা চোখে পড়েছে, অ্যাশেজ থেকে বিরতির নামে যে সময়টা রাখা হয়েছিল, তাতে আরও বেশি পরিবারের সদস্য কেন উপস্থিত ছিলেন না, তা ছিল বেশ কৌতূহলের বিষয়।
অন্যদের জন্য বিষয়টি যেন জমকালো ব্যাচেলর পার্টিতে রূপ নেয়। দলের কয়েকজন সদস্য ব্রিসবেনে টানা দুই দিন মদ্যপানের পর নুসায় আরও চার দিন কাটান, মোট ছয় দিন - যা এই সফরে তখন পর্যন্ত খেলা টেস্ট ক্রিকেটের দিনের সংখ্যার সমান।
ইংল্যান্ড দল মোটেও চোখের আড়ালে ছিল না, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পানাহার, আর অনেকের মাথায় ঐতিহ্যবাহী টুপি, যা যেন ছুটির দিনের ইউনিফর্মে পরিণত হয়েছিল।
সমুদ্রসৈকতে একটি হালকা ফুটবল ম্যাচে উপস্থিত থাকার জন্য কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়। সেখানে স্থানীয় রেডিও ডিজেরা ইংল্যান্ডকে নিয়ে মন্তব্য করেন এবং দলের খেলোয়াড়রা অন্য পর্যটকদের সঙ্গেও মিশে যান।
স্টোকসকে এমনিতে দৌড়াতেও দেখা গেছে। তবে শক্তি ও ফিটনেস কোচ পিট সিম যখন সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে উপকূল ধরে দৌড়ানোর জন্য পুরো দলকে আমন্ত্রণ জানান, স্মিথ, বশির ও টং, এই তিনজনই কেবল হাজির হন।
ভ্রমণের শেষে ব্রিসবেন বিমানবন্দরে টিভি নেটওয়ার্ক সেভেন-এর এক ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার পর ইংল্যান্ড দলের নিরাপত্তাকর্মীদের একজনের বিরুদ্ধে শারীরিক সংঘর্ষের অভিযোগ ওঠে।
সমুদ্রসৈকতে কাটানো সময় নিয়ে অস্ট্রেলীয় গণমাধ্যমের ঠাট্টা-তামাশা ও অতিরিক্ত নজরদারি সত্ত্বেও, নুসার আনন্দভ্রমণের পরের টেস্টে ইংল্যান্ড সম্ভবত এই বাজে সফরের মধ্যে তাদের সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্সটাই দেখিয়েছিল।
অ্যাডেলেইডের পরিস্থিতি
তৃতীয় টেস্টে এসে ইংল্যান্ড দলের মধ্যে স্পষ্টভাবে সংকট ও দ্বিধা দেখা যায়। আগের তিন বছর ধরে দল থেকে চাপ কমানোর চেষ্টা করা স্টোকস হঠাৎই বলেন, তিনি “চাপ উপভোগ করছেন”।
ব্রুক বলেন, নুসায় তারা ক্রিকেট নিয়ে কোনো কথাই বলেননি, অথচ স্টোকস স্বীকার করেন সেখানে কিছু “খোলাখুলি” আলোচনা হয়েছিল। পরে ক্রলি দাবি করেন, তিনি স্টোকসের করা “দুর্বল মানুষ” মন্তব্যের কথাই জানতেন না।
সম্ভবত ফিল্ডিংয়ের দুর্বলতা বুঝতে পেরে ইংল্যান্ড কিছু বিরল ফিল্ডিং অনুশীলনেও অংশ নেয়।
স্পিনারদের সহায়ক হিসেবে পরিচিত অ্যাডিলেডের মাঠে ইংল্যান্ড বশিরকে বাদ দেয়। সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় বলা হয়, আট নম্বরে উইল জ্যাকসের ব্যাটিং প্রয়োজন ছিল।
সহকারী কোচ জিতান প্যাটেল জোর দিয়ে বলেন, বশির “খেলার অযোগ্য” হয়ে যাননি।
ফাস্ট বোলিংয়ের ওপর এত জোর দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ওভার করতে হয় পার্ট-টাইম স্পিনার জ্যাকসকেই। বাইরে থেকে ইংল্যান্ডকে তখনো বেশ নিশ্চিন্তই মনে হচ্ছিল।
প্যাটেল এক সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন এই বলে, “আপনাদের সন্ধ্যাটা উপভোগ করুন। একটা পাইন্ট (বিয়ার) খান, কারণ আমিও তাই করব।”
ইংল্যান্ড অবশেষে কিছুটা হলেও প্রত্যাশিত লড়াই দেখায় এবং টেস্ট ম্যাচটিকে শেষ দিন পর্যন্ত নিয়ে যায়। তবু ১১ দিনের ক্রিকেটেই অ্যাশেজ হাতছাড়া হয়ে যায়। ৫-০ ব্যবধানটা অবশ্যম্ভাবী মনে হলেও, দলটা ভেঙে পড়বে, এমনটা এখনো মনে হচ্ছে না।
(বিবিসি অবলম্বনে)