ডিআর কঙ্গো: একটু হাসির জন্য...

সশস্ত্র সংঘাত, মানবিক সংকট, মহামারি আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হওয়া আফ্রিকার দেশটার মানুষের কাছে এবারের বিশ্বকাপে প্রাপ্তির পাল্লাটাই ভারি হওয়ার কথা।

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৮ এএম

বিশ্বকাপ তখনও শুরু হয়নি। ডিআর কঙ্গোর ফুটবলার অ্যাক্সেল তুয়ানজেবে একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সবাইকে। খুব বড় কোনো স্বপ্ন নয়। বিশ্বকাপে খুব বেশি দূরে যাওয়ার আশাও নয়৷ তুয়ানবেজে বলেছিলেন, কঙ্গোর মানুষকে উদ্‌যাপনের একটা উপলক্ষ্য এনে দিতে চান, তাদের মুখে হাসি ফুটবে বিশ্বকাপে তারা করতে চান তেমন কিছু।

শেষ ৩২-এ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২-১ গোলে হারের পর এখন নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তারা তা ভালোভাবেই পেরেছেন। পর্তুগালকে গ্রুপ পর্বে ঠেকিয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম পয়েন্ট পেয়েছিল কঙ্গো, ওই ম্যাচেই প্রথম গোলও। ইংল্যান্ডকেও কঠিন একটা পথই পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে তাদের হারাতে।

সশস্ত্র সংঘাত, মানবিক সংকট, মহামারি আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হওয়া আফ্রিকার দেশটার মানুষের কাছে এবারের বিশ্বকাপে প্রাপ্তির পাল্লাটাই ভারি হওয়ার কথা। ফুটবলারদের ট্যাকল, সেভ কিংবা গোল ফুটবল ছাপিয়ে হাসির উপলক্ষ্যই হয়ে ওঠার কথা কঙ্গোর মানুষের কাছে।

যে দেশে দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাত মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে, সেখানে এই বিশ্বকাপ মানুষের জন্য একসঙ্গে আনন্দ করার এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। বিশ্বকাপে খেলতে কঙ্গোর জন্য এই অপেক্ষাটা ছিল দীর্ঘ ৫২ বছরের।

১৯৭৪ সালে প্রথম ও শেষবার যখন তারা বিশ্বকাপ খেলে, তখন তাদের দেশের নাম ছিল ‘জাইরে’। সেই বিশ্বকাপের শেষটাও তাদের জন্য ছিল বেদনার এক স্মৃতি। ব্রাজিলের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট হুমকিই দিয়ে রেখেছিলেন ফুটবলারদের, ‘যদি তোমরা ম্যাচটা ৪-০ গোলে হারো, তাহলে জীবন নিয়ে কেউ দেশে ফিরতে পারবে না।’ কঙ্গো ম্যাচটা হেরেছিল ৩-০ গোলে।

এরপর কঙ্গোর কয়েকটা প্রজন্ম বড় হয়েছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের দেশের নাম না দেখেই। শিশুরা বাবা-মা হয়েছে, বাবা-মায়েরা হয়েছেন দাদা-দাদি বা নানা-নানি। কিন্তু বিশ্বকাপ তাদের জন্য দূর আকাশের স্বপ্নই রয়ে গেছে। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে এবার।

এই পথটাও কঙ্গোর জন্য সহজ ছিল না একেবারেই।

কঠিন, বেদনাদায়ক এবং ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে ভরা এক পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্বকাপে পা রেখেছে তারা। বাছাইপর্বে সেনেগালের বিরুদ্ধে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েও হেরে গিয়েছিল তারা। কিন্তু তারা লড়াই থামায়নি।

ক্যামেরুনকে হারিয়ে, নাইজেরিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে জিতে জায়গা করে নেয় ইন্টারকন্টিনেন্টাল প্লে-অফে। সেখানে অতিরিক্ত সময়ের লড়াইয়ে জ্যামাইকাকে হারিয়ে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে।

কয়েক বছর আগেও কঙ্গো বংশোদ্ভূত অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার কঙ্গোর হয়ে না খেলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিত্ব করত। কিন্তু সম্প্রতি, কঙ্গো ফুটবল ফেডারেশন প্রবাসী খেলোয়াড়দের বোঝাতে সক্ষম হয়, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানো মানে কেবল একটা ফুটবল ফেডারেশনের হয়ে খেলা নয়, বরং এর চেয়েও বড় কিছু। নিজের পরিবার, ঐতিহ্য এবং শেকড়ের প্রতিনিধিত্ব করা।

ডিআর কঙ্গোর এই দলটাকে বদলে দেওয়ার আরেক বড় কারিগর সেবাস্টিয়ান দেসাব্রে। ২০২২ সালে কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই ফরাসি কোচ বদলে দিতে শুরু করেন। তার অধীনে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের সেমিফাইনালে খেলেছে কঙ্গো। পুরো দলটাকে তিনি গড়ে তুলেছেন একটু একটু করে। আর সবচেয়ে বড় কথা, খেলোয়াড়দের মনে এই বিশ্বাস বুনে দিতে পেরেছেন বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ্য আছে তাদের।

নকআউট পর্বে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগেই, দেসাব্রে সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন তার দল ইতোমধ্যেই প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি অর্জন করে ফেলেছে। তারা বিশ্বকাপে ডিআর কঙ্গোর ইতিহাসের প্রথম পয়েন্ট পেয়েছে, প্রথম গোল করেছে, প্রথমবার নকআউটেও উঠেছে।

সেই নকআউটেও ফুটবলের পরাশক্তি, শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর শক্ত ফুটবল কাঠামোর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তারা এগিয়ে ছিল ৭০ মিনিট পর্যন্ত। যুদ্ধবিগ্রহ ভুলে এই সময়টা নিশ্চয়ই ডিআর কঙ্গোর মানুষ উদযাপনই করেছেন।