এক রাতেই দুই ইউরোপীয় পরাশক্তির বিদায়: পৃথিবীর সুন্দর সত্যটাই কি সামনে এল আবার?

প্যারাগুয়ে আর মরক্কো হয়তো পৃথিবীর সেই সুন্দর সত্যটাকেই মনে করিয়ে দিল আরও একবার —পরাশক্তিরাও হার মানতে পারে!

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ১১:৩৩ এএম

গত বিশ্বকাপের সময় কিলিয়ান এমবাপ্পের কথাটা বিতর্ক তৈরি করেছিল বেশ। ফ্রেঞ্চ তারকা বলে দিয়েছিলেন, ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা তো ‘হাই লেভেলেন’ ফুটবল খেলে না। দক্ষিণ আমেরিকার (তারাই যদি না হয়, বাকি পৃথিবীর তো প্রশ্নই আসে না!) ফুটবল ইউরোপের মতো উন্নত নয়।

এমবাপ্পে জবাবটা পেয়ে গিয়েছিলেন ওই বিশ্বকাপের ফাইনালেই। আর্জেন্টিনা তাদের হারিয়েই বিশ্বকাপ জিতেছিল। চার বছর পর বিশ্বকাপের নকআউটের আরেকটা রাতও ইউরোপীয় অহমে বেশ জোরাল একটা আঘাতই করল—এক রাতেই দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার দলের বিপক্ষে হেরে শেষ বত্রিশে থেকেই বিদায় নিয়েছে দুই ইউরোপীয় পাওয়ারহাউজ।

পশ্চিম ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে একটা অদ্ভুত অহংকার মিশে থাকে— ‘আন্ডারডগ’ দল যতই জানপ্রাণ দিয়ে লড়ুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তাদের আসলে হারতেই হবে।

ইয়োহান ক্রুইফের দেখিয়ে দেওয়া ‘টোটাল ফুটবলের’ দর্শন আছে নেদারল্যান্ডসের, জার্মানির কাছে আছে আপসহীন রণকৌশলের নীল নকশা—সেই রূপকথার ‘ডাই মানশাফট’—বৈরী পরিস্থিতিতেও যাদের চোখের পলকও পড়ে না।

কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের এক রুদ্ধশ্বাস রাতে ইতিহাস কেবল মচকেই যায়নি, বরং একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। বোস্টন ও মন্টেরিতে যখন ম্যাচের উত্তেজনা থেমে গেছে, ততক্ষণে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ফুটবল সাম্রাজ্যগুলোর পতন ঘটেছে।

ম্যাচের শুরুর বাঁশি বাজার পর থেকেই প্যারাগুয়ে তাদের অতীতের সব হৃদয়ভাঙার স্মৃতি সঙ্গী করে মাঠে লড়েছে। জার্মানির মিডফিল্ডের চেনা ছন্দ তারা বন্ধ করে রেখেছে পুরোটা সময়। বিয়াল্লিশ মিনিটে সবাইকে শূন্যে ভেসে হুলিও এনসিসো বলটা জড়িয়ে দেন জার্মানিরই জালে।

চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কাছ থেকে এর পাল্টা জবাব আসাটা ছিল অবধারিত। চুয়ান্ন মিনিটের সময় কাই হাভার্টজের এক দুর্দান্ত হেডারে সেই কাঙ্ক্ষিত সমতা আসে। তবে অতীত জার্মানির সেই চেনা ছক কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল এই ম্যাচে। অতিরিক্ত সময়ে জোনাথান প্যারাগুয়ের জালে বল জড়ালেও, গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের ওপর ফাউল করার অপরাধে ভিএআর সেই গোলটি বাতিল করে দেয়।

পরের গল্পটা এতক্ষণে সবারই জানা—বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার জার্মানি পেনাল্টি শুটআউটে হেরে গেছে, তাও দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের দুর্বল দলগুলোর একটির বিপক্ষে।

এমন বিস্ময়কর ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর, একইরকম যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে নেদারল্যান্ডসকেও। এই গল্পটা তো আরও বেশি ঝাঁঝালো। মরক্কানদের বড় একটা কমিউনিটি আছে নেদারল্যান্ডস। এই দলের অনেক ফুটবলারও বেড়ে উঠেছেন সেখানে। কিন্তু তারা নেদারল্যান্ডসকে নয়, বেছে নিয়েছেন মরক্কোকে।

এ নিয়ে নিয়মিতই তাদের কথা শুনতে হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের হয়ে খেলার ‘যথেষ্ট কোয়ালেটি’ না থাকায় তারা মরক্কোকে বেছে নিয়েছেন, এমন কথা বলেছেন কেউ কেউ।

ডাচ কিংবদন্তি বেন বাস্তন তো বলেই দিয়েছিলেন, “ওরা কী বোকা? তা না হলে তো মরক্কো বেছে নেওয়ার কথা নয়…”  তার এমন মন্তব্যের এক দশক পার হয়ে গেছে। দশ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে এসে সেই নেদারল্যান্ডসকেই হারিয়ে দিয়েছে মরক্কো।

মন্টেরি বলের নিয়ন্ত্রণে আধিপত্য বিস্তার করেছে নেদারল্যান্ডস, কিন্তু মরক্কো এমনভাবে তার পাল্টা জবাব দিয়েছে যে বোঝা গেছে ডাচ ফুটবলের ‘ডিএনএ’ তাদের ভালো জানা আছে। একাত্তর মিনিটে কোডি গাকপো অবশেষে যখন ডাচদের হয়ে গোল করেন, তখন মনে হয়েছিল হয়তো নেদারল্যান্ডসের ঐতিহ্যই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে।

কিন্তু মরক্কোর এই দলটা খেলে ভিন্ন এক মানসিকতা ও আবেগ নিয়ে। ম্যাচের সময় যখন অতিরিক্ত সময়ে  গড়ায়, শেমশাদিন তালবি ডি-বক্সে বলটা ভাসিয়ে দেন, ইসা দিওপ এক বুলেট হেডারে সমতা ফিরিয়ে মরক্কোর সমর্থকদের উল্লাসে ভাসান। অতিরিক্ত সময়েও ম্যাচের কোনো ফয়সালা হয়নি। টাইব্রেকারের পুরোনো ট্রমায় আরও একবার আটকে গেছে নেদারল্যান্ডস।

জার্মানির জন্য হারটা অস্তিত্ব হারানোর শঙ্কা, শেষ বত্রিশে প্যারাগুয়ের কাছে হার তাদের গত এক যুগে নিচে না থাকা ফুটবলের ‘নতুন লো’। নেদারল্যান্ডসের জন্য পেনাল্টি শ্যুটআউটে আরও একটি দুঃস্বপ্নের রাত।

এবারের বিশ্বকাপ তার দুই বড় আকর্ষণকে হারালো একই রাতে। কিন্তু তাদের জায়গায়, শেষ ষোলোতে উঠা প্যারাগুয়ে আর মরক্কো হয়তো পৃথিবীর সেই সুন্দর সত্যটাকেই মনে করিয়ে দিল আরও একবার—পরাশক্তিরাও হার মানতে পারে!