পাকিস্তানকে বাংলাওয়াশ, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে টপকাল বাংলাদেশ

লাঞ্চ বিরতির আগেই ভেঙে পড়ে সফরকারীদের ইনিংস। তাইজুল একাই নেন ৬ উইকেট। আর বাংলাদেশ নিশ্চিত করে পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চারটি টেস্ট জয়।

আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ০১:১৪ পিএম

একের পর এক পারফরম্যান্স। যদি শুধু দ্বিতীয় টেস্টের কথাই ধরা হয় তাহলে কাউকে ছেড়ে কাউকেই একক কৃতিত্ব দেওয়া যায় না। ম্যাচসেরা লিটন দাস তো ছিলেনই, টেস্ট ম্যাচটা পঞ্চম দিন পর্যন্ত এসেছেই তার ব্যাট থেকে আসা রানে। বাংলাদেশের করা মোট ৬৬৮ রানের মধ্যে ১৯৫ রান এসেছে লিটনের ব্যাট থেকে। এর পর মুশফিকুর রহিমের রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরিতে ৪০০ এর বেশি লিড। মাহমুদুল জয়ের ব্যাটে ওয়ানডে স্টাইলের ৫২ রান। তাইজুলের শেষ ইনিংসে ৬ উইকেট, মিরাজ ও তাসকিনের গুরুত্বপূর্ণ সব ব্রেক থ্রু।

এর মাঝেই আবার শেষ দিনে বাংলাদেশের হাত থেকে যখন ম্যাচ বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন মিরাজ আনলেন এক কৌশলগত বিরতি। কারো কারো মনে পড়ে গেল ২০২৪ টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে রিশাভ পন্তের সেই মুহূর্তের কথা। ব্যাটাররা যখন ছন্দে, তখন কিছুটা ছন্দপতন ঘটাতেই এমন বিরতি নিয়ে থাকেন বোলারদের দল। মিরাজও তাই করলেন, আর ফল এলো খুব দ্রুত। যে শরিফুল দুই ইনিংসে একেবারেই উইকেট পাচ্ছিলেন না, তিনিই ফিরিয়ে দিলেন সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠা ৯৪ রানে থাকা রিজওয়ানকে। আর শেষ বেলায় তাইজুল, বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের এক আইকন, তার হাতেই এলো জয়ের মুহূর্ত।

পাকিস্তানকে টানা দুই সিরিজে, টানা চার টেস্টে, দারুণ নৈপুণ্যে হারিয়ে দিল বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে টপকে পাঁচ নম্বরে উঠে এসেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।

তবে এই দলের গল্প শুধু পারফরম্যান্সের নয়, দলীয় ঐক্য আর বোঝাপড়ারও। কিছুদিন আগে বিসিবির এক পডকাস্টে টি টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাস বলেছিলেন, এই দলে সবকিছুই যেন আনন্দের। সেই চিত্রই দেখা গেল ট্রফি উদযাপনে। ক্রিকেটাররা কোলে তুলে নিলেন তাদের সালাহউদ্দিন স্যারকে। বাংলাদেশের এই সহকারী কোচ দেশের ক্রিকেটের বহু সুখ দুঃখের সাক্ষী। ক্রিকেটারদের খুব কাছের মানুষ, অনেকের কাছেই বন্ধুর মতো।

শান্ত আর মিরাজ সেই অনূর্ধ্ব উনিশ দল থেকেই বন্ধু। লিটন দলের অঘোষিত নেতা। মুশফিক আছেন অভিভাবকের ভূমিকায়। তাইজুল ও মমিনুলদের প্রতি দলের সম্মান মাঠের ক্রিকেটেই স্পষ্ট। সব মিলিয়ে পঞ্চপাণ্ডবের ছায়া সরিয়ে এখন সবাই মিলে নতুন এক তাণ্ডব মঞ্চস্থ করছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে।

বাংলাদেশ কি তাহলে অবশেষে খুঁজে পেয়েছে টেস্ট ক্রিকেটের সেই জাদুর ফর্মুলা? হয়তো নির্দিষ্ট কোনো জাদু নেই। তবে পেসারদের শক্তিশালী আক্রমণ, তাইজুল ও মিরাজের মতো অলরাউন্ড স্পিনার, আর ধীরে ধীরে আরও ধারাবাহিক হয়ে ওঠা ব্যাটিং লাইনআপ বাংলাদেশকে ভয়ংকর এক দলে পরিণত করছে।

এই সিরিজেই তার প্রমাণ মিলেছে সবচেয়ে বড়ভাবে। ঘরের মাঠে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ। শুরুটা সহজ ছিল না। মেঘলা আবহাওয়ায় ব্যাট করতে নেমে ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে গিয়েছিল দল। সেখান থেকে লিটনের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি বাংলাদেশকে টেনে তোলে। এরপর বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং এনে দেয় গুরুত্বপূর্ণ লিড। ম্যাচ যত গড়িয়েছে, উইকেটও হয়েছে সহজ। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে মাহমুদুলের ফিফটি, মুশফিকের অনবদ্য সেঞ্চুরি আর লিটনের আরেকটি ফিফটিতে বাংলাদেশ দাঁড় করায় ৪৩৭ রানের বিশাল লক্ষ্য।

পাকিস্তান লড়াই করেছে। রিজওয়ান ও আগার ১৩৪ রানের জুটি, পরে রিজওয়ান ও সাজিদের ইতিবাচক ব্যাটিং কিছুটা আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যটা ছিল অনেক বড়। শেষ পর্যন্ত তাইজুলের ৬ উইকেটেই শেষ হয়ে যায় পাকিস্তানের প্রতিরোধ। শেষ উইকেটটিও তুলে নিয়ে পুরো দলকে ভাসান উল্লাসে।

ম্যাচ শেষে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বললেন, এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব পুরো দলের। ক্রিকেটাররা কঠোর পরিশ্রম করছে, দল গড়ার জন্য বদল আনা হয়েছে মানসিকতায়ও। তিনি বিশেষভাবে কৃতিত্ব দিয়েছেন কিউরেটর, ফাস্ট বোলারদের পারফরম্যান্স এবং ব্যাটারদের পার্টনারশিপ গড়ার সক্ষমতাকে। শান্তর বিশ্বাস, দেশের বাইরে কঠিন সিরিজগুলোতেও এই দল ভালো ক্রিকেট খেলতে পারবে, যদি একই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়।

এই টেস্ট জয়ে র‌্যাংকিংয়ে দুই ধাপ এগিয়ে ৭ নাম্বারে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।