সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি: আদালতে দোষী সাব্যস্ত মেটা ও ইউটিউব

গেল ফেব্রুয়ারিতে টেক জায়ান্ট গুগল ও মেটার কারণে মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন অভিযোগে মামলা করেছিলেন ২০ বছর বয়সী এক মার্কিন নারী। তার দাবি, গুগলের ইউটিউব ও মেটার ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের কারণে শিশু বয়সে তার মনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৫:০৪ পিএম

শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে মেটা ও গুগল। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের  লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি আদালত জুরি বোর্ড টেক জায়ান্ট দুটিকে ৬০ লাখ মার্কিন ডলার জরিমানা করেছেন, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৭৩ কোটি টাকারও বেশি।

এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে গুগল ও মেটার কারণে মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে মামলা করেছিলেন ক্যালি নামের এক ২০ বছর বয়সী মার্কিন নারী। তিনি অভিযোগ এনেছিলেন গুগলের ইউটিউব ও মেটার ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের কারণে শিশু বয়সে তার মনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে ক্যালি বলছেন, ধূমপান কিংবা ‘ডিজিটাল ক্যাসিনোর’ চেয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তি কোনো অংশে কম নয়।

বুধবার ক্যালির পক্ষে রায় দেয় জুরি। তারা বলেন, মেটা ও গুগল এই দুই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমনভাবে তাদের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে যা তরুণ ব্যবহারকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

তবে মেটা এবং গুগল জানিয়েছে তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবে।

মেটার এক মুখপাত্র দাবি করেছেন, “কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল, একে কেবল একটি নির্দিষ্ট অ্যাপের সাথে জুড়ে দেওয়া ঠিক নয়।” 

নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার কথা উল্লেখ করে তারা দাবি করেছে, অনলাইনে তরুণদের সুরক্ষায় তাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর ওপর তাদের "পূর্ণ আস্থা" আছে।

অন্যদিকে গুগলের মুখপাত্র জানিয়েছেন,“ইউটিউব কোনো সোশ্যাল মিডিয়া সাইট নয় বরং এটি অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে তৈরি করা একটি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম। এটিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।”

রায়ে বলা হয়, মোট ক্ষতিপূরণের মধ্যে ৭০ শতাংশ বহন করবে মেটা, আর বাকি ৩০ শতাংশ দিতে হবে গুগলকে। অর্থাৎ মেটাকে ৪২ লাখ ডলার এবং ইউটিউবের কর্ণধার প্রতিষ্ঠান গুগলকে ১৮ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। 

মামলায় কী ছিল

এই মামলায় লস অ্যাাঞ্জেলেসের আদালতে হাজির হয়েছিলেন মেটার চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ। তিনি বলেন, ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য তাদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয় না।

তবে ক্যালি জানান, তিনি মাত্র ৯ বছর বয়স থেকে ইনস্টাগ্রাম এবং ৬ বছর বয়স থেকে ইউটিউব ব্যবহার শুরু করেছিলেন। সে সময় তার বয়স এ সকল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

তিনি বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় কাটানোর কারণে আমি পরিবারের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলাম।”

মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই নিজের মধ্যে অ্যাংগজাইটি এবং ডিপ্রেশনের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল বলে জানান জানান ক্যালি। কয়েক বছর পর একজন থেরাপিস্টের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছিলেন তিনি।   

ক্যালি এখন ‘বডি ডিসমরফিয়া’ নামক সমস্যায় ভুগছেন। এই সমস্যায় আক্রান্ত মানুষ তাদের শারীরিক গঠন নিয়ে সারাক্ষণ অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে এবং অন্যেরা তাকে যেভাবে দেখছে, তিনি নিজে নিজেকে সেভাবে দেখতে পান না।

ক্যালির আইনজীবীরা জানান, মেটা এবং ইউটিউব মূলত ‘অ্যাডিকশন মেশিন’ তৈরি করেছে এবং শিশুদেরকে তাদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার রোধে এবং নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

তাদের দাবি, ইনস্টাগ্রামের ‘ইনফিনিট স্ক্রল’ এর মতো ফিচারগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারীরা দ্রুত এতে আসক্ত হয়ে পড়ে।

শুরুতে স্ন্যাপচ্যাট এবং টিকটকও এই মামলায় অভিযুক্ত থাকলেও পরে আগেই ক্যালির সাথে তারা ব্যাপারটি  আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি করে নেয়।

কী পরিবর্তন আসবে? 

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতগুলোতে একই ধরনের শত শত মামলা চলছে। ক্যালিফোর্নিয়াতেই এমন আরও আটটি মামলা চলছে। 

সেগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে ক্যালির এই রায়।

একদিন আগেই মঙ্গলবার নিউ মেক্সিকোর একটি আদালত মেটাকে তাদের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিশুদের "বিপদের মুখে ফেলার" এবং "যৌন বিষয়বস্তু এবং অপরাধীদের সাথে যোগাযোগের" জন্য দায়ী ঘোষণা করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরেস্টারের রিসার্চ ডিরেক্টর মাইক প্রুলাক্সের মতে পরপর এই দুটি রায় সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেকার সম্পর্কের একটি 'ব্রেকিং পয়েন্ট' এনেছে।

“সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি এতদিন ধরে মানুষের মনে যে নেতিবাচক ধারণা ও ক্ষোভ জমেছিল তা এই মামলার মাধ্যমে বের হয়ে এসেছে।”

তবে লস অ্যাঞ্জেলেসের আদালতের এই রায় টেক জায়ান্টদের এমন ‘আগ্রাসী নীতির’ বিরুদ্ধে প্রাথমিক জয় হিসেবে দেখা হলেও এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে সন্দিহান আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়ার ফেলো ক্লে কালভার্ট।

“এখনো অনেক বহুদূর যেতে হবে। যদি সবগুলো রায় টেক জায়ান্টদের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে হয়তো তারা নিজেদের ডিজাইন পালটাবেন এবং শিশুদের কথা মাথায় রেখে কনটেন্ট পরিবর্তন করবেন," তিনি বলেন। 

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বন্ধ বা সীমিত করার জন্য বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। 

যুক্তরাজ্যও একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে যেখানে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করলে কী ফল আসে তা দেখা হচ্ছে।

 

(বিবিসি ও নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে)