বাংলাদেশের রাজনীতি বুঝতে হলে শুধু সরকার বদলের হিসাব করলে হবে না। বুঝতে হবে সেই শক্তিগুলোকে, যারা রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো ভেঙে আবার নতুনভাবে গড়ে তোলে। আর এই আলোচনা শুরু করলেই আসবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি'র প্রসঙ্গ।
বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে দলটির সঙ্গে।
বিএনপি'র জন্ম রাষ্ট্রক্ষমতার ভেতর থেকে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক শূন্যতা, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক, জাতীয়তাবাদের নতুন সংজ্ঞা এবং ধর্ম-রাজনীতির পুনর্গঠনের এক জটিল পরিক্রমার ভেতর দিয়ে উত্থান হয় বিএনপি'র।
একাধিকবার ভেঙে পড়েছে, নেতৃত্ব হারিয়েছে, রাজনৈতিক প্রান্তে কোণঠাসা হয়েছে, আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে ফিনিক্স পাখির মতো।
১৯৭৫ সালের পরের কঠিন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় উত্থান হয় বিএনপি'র। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম বড় ধাক্কা। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আবার ঘুরে দাঁড়ানো।
২০০১ সালের জোট রাজনীতি ও বিতর্ক। এক-এগারোর সময়ে জটিল এক সমীকরণে অস্তিত্ব সংকটে পড়া এবং এরপর টানা প্রায় দুই দশক বিরোধী রাজনীতির পথে ক্লান্ত পথচলা।
কিন্তু এরপর আবার আলোচনায় বিএনপি, আরও প্রাসঙ্গিকভাবে। সর্বোপরি, বিএনপিই এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় দল এবং সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দেশ পরিচালনা করছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি কেবল বিএনপি'র সাংগঠনিক শক্তির ফল, নাকি রাষ্ট্র ও অর্থনীতির সংকটই বিএনপিকে সামনে ঠেলে দিচ্ছে? কেন বিএনপি এতটা জনপ্রিয় দল হয়ে উঠলো? কীভাবে একটি দল গড়ে উঠেছিল একজনের প্রচেষ্টায় এবং রাজনীতির কোন কোন উপাদান এই দলকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তুলেছিল?
২০২২ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে। বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হয়নি। দলটির তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তখন গৃহবন্দী। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত।
আওয়ামী লীগ তখন নিজ দলের 'ডামি' প্রার্থীদের দিয়ে নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনাম।
তিনি লিখেছিলেন, “এবারও যদি বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে, তাহলে তা হবে বিএনপি'র দ্বিতীয় নির্বাচন বয়কট। এই অঞ্চলে তো বটেই, সম্ভবত কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই কোনো রাজনৈতিক দল এক দশকের মধ্যে দুটি নির্বাচন বয়কট করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেনি। এবারের নির্বাচন বয়কটও কি বিএনপির অস্তিত্ব সংকট সৃষ্টি করতে পারে?”
তখন আরও অনেকেই বিএনপি'র অস্তিত্ব সংকট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেই নির্বাচনের মাত্র সাত মাসের মাথায় পতন ঘটে টানা দেড় দশক ধরে চলা শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের।
আর ফিনিক্স পাখির মতো পুনরুত্থান হয় বিএনপি'র। প্রবল পরাক্রমে রাজনীতিতে ফিরে আসে দলটি এবং এতটাই শক্তিশালী হয়ে ফিরেছে যে, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই সরকার গঠন করেছে।
প্রায় ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকেও নেতাকর্মীদের লড়াই, সংগ্রাম এবং নেতৃত্ব কাঠামো কীভাবে দলটিকে টিকিয়ে রেখেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে, যেতে হবে ইতিহাসের গভীরে।
বিএনপির জন্ম যেভাবে হলো

২২এ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮ সাল। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল বা জাগদল নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিলেন জিয়াউর রহমান। তখন তিনি রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। নতুন দলে জিয়াউর রহমান সরাসরি যুক্ত হননি, ছিলেন নেপথ্যে। এর পরের বছর ১লা মে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট। জিয়াউর রহমান হন ফ্রন্টের চেয়ারম্যান। এর চার মাসের মাথায় ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি। এরপর থেকে দ্রুত জনপ্রিয় হতে থাকে দলটি এবং বর্তমানে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
একাত্তরে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই নানা রাজনৈতিক জটিলতায় জড়িয়ে পড়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্ভিক্ষ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের তখন বেসামাল অবস্থা। আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র ক্ষমতা কাঠামো বিশেষ করে, 'বাকশাল' দল গঠন করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন, বিরোধী মত দমন ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণে জনগণের বড় একটি অংশ হতাশ হয়।
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সংকট ও বিশৃঙ্খলা চূড়ান্ত রূপ নেয়। সেসময় দেশে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির শূন্যতা তৈরি হয়। বিএনপির উত্থান এই শূন্যতার মধ্যেই।
জিয়াউর রহমান এমন একটি ভারসাম্যের মধ্যে ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে ডান-বাম ও মধ্যপন্থি, সবারই প্রবেশ ছিলো অবাধ। এর ফলে দ্রত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে দলটি। জিয়াউর রহমান তখন পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভূমিকার জন্য তিনি দ্রুত সামনে চলে আসেন। ২৭এ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন, যা তখন অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা ছিলো বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।
তার নেতৃত্বে গঠিত ‘জেড ফোর্স’ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন তিনি।
পনেরোই অগাস্টের পর দ্রুত দৃশ্যপটে চলে আসেন জিয়াউর রহমান। সাতই নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রথমে সেনাপ্রধান, এরপর উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, এরপর রাষ্ট্রপতি হন।
নতুন রাজনৈতিক ধারা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সূচনা

বিএনপির প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে নতুন একটি রাজনৈতিক ধারার সূচনা হয়। আওয়ামী লীগের ভিত্তি ছিলো দীর্ঘ জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম। আর বিএনপির জন্ম হয় রাষ্ট্রক্ষমতার জটিলতার মধ্যে। পনেরোই অগাস্টের পরই একদলীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, সেনাবাহিনীর ভূমিকা রাজনীতিতে দৃশ্যমান হয়, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাইরে নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরির সুযোগ তৈরি হয়।
স্বাধীনতার পর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় আসে আওয়ামী লীগ। দলটির ঘোষিত মূল আদর্শ হলো, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পরিচালনার বাস্তবতায় নানা সমস্যা দেখা দেয়। সেসময়েই রাষ্ট্রভাবনার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে থাকে।
রওনক জাহান লেখক ও গবেষক, একইসঙ্গে একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি লিখেছেন, “পূর্ব বাংলার রাজনীতি কখনো একমাত্রিক ছিল না। বাঙালি জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয় ও মুসলিম সামাজিক বাস্তবতা কখনো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি।”
আর এই দ্বৈততাই, অর্থাৎ ভাষা বনাম ধর্ম, সংস্কৃতি বনাম বিশ্বাস পরবর্তীতে বিএনপির আদর্শিক ভিত্তির জায়গা তৈরি করে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করে দেওয়া, গ্রাম সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা, খাল খনন কর্মসূচি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এমন পদক্ষেপগুলো জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি করে।
সদ্য স্বাধীন দেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় একচেটিয়া প্রাধান্য ছিলো 'বাঙালি জাতীয়তাবাদের'। এই ধারণা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠে। ভৌগোলিক সীমানার ভেতরের সব নাগরিককে ধারণ করবে এমন এক জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের অভাব বা শূন্যতা ছিলো। এটা পূরণ করতেই ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের’ ধারণা প্রবর্তন করে বিএনপি। জাতিগত পরিচয়ের বদলে ভূখণ্ডের সব নাগরিকের একাত্মতার ওপর জোর দেয় এবং আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি বিকল্প ন্যারেটিভ হিসেবে দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরেন। রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে ইসলামি সংস্কৃতির উপস্থিতি ঘটান। সংবিধানে যুক্ত করা হয় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’। এসব ধারণার মাধ্যমে ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভূগোলকে জাতীয় পরিচয়ের অংশ করা হয়। ভারতের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান তৈরি করা হয়। জাতীয়তাবাদী এই ধারণা গ্রামবাংলা, মধ্যবিত্ত ও ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে প্রায় পুরোপুরি আলাদা রাখার নীতি গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। সংবিধানে মূলনীতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয় 'ধর্মনিরপেক্ষতা'। কিন্তু মুসলিমপ্রধান দেশে সমাজের একটি বড় অংশ ধর্মীয় মূল্যবোধকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে চাইছিল। এই মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা পূরণে বিএনপি প্রতিষ্ঠার সময়ই দলীয় আদর্শে 'আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও আস্থা' যুক্ত করে। জিয়াউর রহমান সরাসরি ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না করলেও তিনি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বদলে দেন। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ায় ইসলামী দলগুলোকে রাজনীতিতে ফিরে আসে।
জিয়াউর রহমানের এই অবস্থানই আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপিকে আলাদা করে তোলে। ফলে ধর্মভিত্তিক ও রক্ষণশীল জনগোষ্ঠী বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
বিশ্লেষকরা বলেন, এটি ছিলো এক ধরনের 'প্রাগম্যাটিক আইডোলজি' যেখানে ধর্মকে বাদ দেওয়া হয় না, আবার রাষ্ট্রকে পুরোপুরি ধর্মীয়করণও করা হয়নি। এর মাধ্যমেই ধর্মনিরপেক্ষতার সমালোচক এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর সমর্থন নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয় বিএনপি।
গবেষক রওনক জাহানের ভাষায়, “জিয়াউর রহমান ধর্মকে রাষ্ট্রের শত্রু না বানিয়ে, রাষ্ট্রের সঙ্গে সহাবস্থানের জায়গা তৈরি করেন।”
জনপ্রিয় কেন হলো বিএনপি

স্বাধীন দেশে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতর যে অর্থনৈতিক দর্শন প্রবেশ করিয়েছিল, সেখানে পরিবর্তন আনেন জিয়াউর রহমান। ‘সেন্টার লেফট’ হিসেবে আওয়ামী লীগের আদর্শ ছিল সমাজতন্ত্র। কিন্তু তখন সারা পৃথিবীতে মুক্ত অর্থনীতির ধারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল। বিএনপি নীতিগতভাবে মুক্তবাজার বা উদার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেণির কাছে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়ে ওঠে।
বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন চালু হয়েছিল দেশে। যখন এটা ভেঙে দেয়া হয় তখন বাকশাল অভিজ্ঞতার পর জনগণের কাছে বহুদলীয় গণতন্ত্র ছিলো সবচেয়ে আকর্ষণীয় শব্দ।
জিয়াউর রহমান নতুন নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ দেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বাড়ান, নির্বাচনের আয়োজন করেন। ১৯৭৮ সালে বিএনপি গঠনের সময় দলটি নিজেকে তুলে ধরে ‘একদলীয় শাসনের বিপরীতে প্রতীক’ হিসেবে। এই পরিচয় বিএনপিকে দ্রুত জনপ্রিয় করে।
'রেজিমেন্টেড' দলের পরিবর্তে বিএনপি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয় হয়।
এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিএনপি শুরু থেকেই ছিল একটি 'ক্যাচ-অল পার্টি', রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যার মানে হলো, এমন একটি রাজনৈতিক দল যা কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সর্বাধিক ভোটারের সমর্থন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন মতাদর্শ ও শ্রেণীর মানুষকে একসাথে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে।
সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, আওয়ামী লীগবিরোধী গোষ্ঠী, ডানপন্থি এবং বামপন্থি উভয় আদর্শের রাজনীতিবিদ, আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, শ্রমিক সবাই দলটিতে জায়গা পায়। এই সব শক্তিকে একত্র করে গড়ে ওঠে দলটি। জিয়াউর রহমানের প্রশাসনিক ও সামরিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশব্যাপী শক্ত সংগঠন গড়ে ওঠে।
রাজনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, এমন দলগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয়। কারণ, তারা সমাজের বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীকে এক ছাতার নিচে আনে।
১৯৭৯ সাল। অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপি জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে। আর এই নির্বাচনই নতুন দলটিতেক গণভিত্তি তৈরি করে দেয়। এর আগে সামরিক শাসনের কথা শুনতে হতো। সেই অভিযোগ কিছুটা প্রশমিত করে বিএনপিকে ‘জনগণের দলের’ কাতারে নিয়ে যায় ওই নির্বাচন।
জিয়া নিহত: এলোমেলো বিএনপি

১৯৮১ সালের ৩০এ মে ভোর। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ঘটে যায় এক রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থান। বিদ্রোহী সেনাদের হাতে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। দেশের রাজনীতিতে নেমে আসে গভীর শোক আর অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। নেতৃত্বশূন্য বিএনপি এক রকম এলোমেলো হয়ে যায়।
সেই সময় উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। জিয়ার মৃত্যুর পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। আর দেশের সেনাবাহিনীর শীর্ষে ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ।
১৯৮২ সালের ২৪এ মার্চ। বাংলাদেশ আবারও মুখোমুখি হয় সামরিক অভ্যুত্থানের। সেনাপ্রধান এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। জারি করেন সামরিক শাসন। জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন। সংবিধান স্থগিত করেন। এবং রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে দেন। শুরু হয় তার দীর্ঘ স্বৈরশাসন।
জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড শুধু দেশকে নাড়িয়েই দেয়নি, বিএনপিকেও বিভক্ত করে দিয়েছিল। এমন সংকটময় মুহূর্তে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার দায়িত্ব নিতে খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানান বিএনপির নেতারা। কিন্তু শুরুতে তিনি রাজি ছিলেন না। তবুও দলীয় নেতাকর্মীদের অবিরাম অনুরোধ ও পরিস্থিতির চাপে খালেদা জিয়া রাজনীতির কঠিন পথে পা বাড়ান। ১৯৮২ সালের শুরুতে তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নেন।
পরের বছর ভাইস-চেয়ারপারসন এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই পদে ছিলেন বিএনপির সবচাইতে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী মুখ হিসেবে।
খালেদা জিয়ার অধ্যায়

১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়ার উদ্যোগে বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত হয় সাত দলীয় ঐক্যজোট। এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে সেই ঘটনাই সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিরোধের আনুষ্ঠানিক সূচনা বলে মনে করেন অনেকে। এরপর শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। এরশাদ ভোট আয়োজন করেন। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
তখন আওয়ামী লীগও ছিলো এরশাদবিরোধী আন্দোলনে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আন্দোলন ছেড়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলনে অটল থাকে।
১৯৮৭ সালে খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন এক দফা, 'এরশাদ হঠাও'। এই কর্মসূচি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে নাড়িয়ে দেয়। এরপর ১৯৮৮ সালে এরশাদ আরেকটি বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করলে বিএনপি সেটিও বর্জন করে।
একের পর এক গ্রেপ্তার, হয়রানি, কারাবাস, কিছুই তাকে আন্দোলন থেকে সরাতে পারেনি। কারামুক্ত হয়ে তিনি আবার রাজপথে ফিরেছেন। টানা সংগ্রাম, অবিচল অবস্থান এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় ভূমিকার জন্য দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে উপাধি দেন, 'আপসহীন নেত্রী'।
১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর। গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে এরশাদের নয় বছরের শাসনের। অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সেই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিএনপি। ক্ষমতায় আসে দলটি। আর খালেদা জিয়া শপথ নেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
প্রথম মেয়াদে খালেদা জিয়া বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেন এবং বিস্তৃত অর্থনৈতিক সংস্কার আরও গতিশীল করে তোলেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদের বহু সাফল্য রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝড়ে আড়াল হয়ে যায়।
বিরোধী দলগুলো দাবি তোলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে। কিন্তু বিএনপি তখন সেই দাবি মানতে প্রস্তুত ছিলো না।
পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হতে থাকে। একদিকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। অন্যদিকে বিরোধীদের একের পর এক হরতাল-অবরোধে দেশ অচল হয়ে পড়ে। টানা আন্দোলন অর্থনীতিকে নড়বড়ে করে দেয়।
আন্দোলনের মুখেই ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অধিকাংশ দলই ভোট বর্জন করে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। তবে সময়টা খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
বিরোধী আন্দোলনের চাপ এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস হওয়ার কয়েক দিনের মাথায় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। ওই বছরের জুন মাসে আরেক দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যার মাধ্যমে ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ।
কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধান খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলে বিএনপি আবারও ক্ষমতায় ফেরে।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। কিন্তু এই মেয়াদে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠন, দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান এবং লাগামগীন দুর্নীতির কারণে নানা সমালোচনায় পড়তে হয়। আর এই মেয়াদের শেষে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘিরে বড় ধরনের রাজনৈতিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয় বিএনপিকে।
ওয়ান ইলেভেন, আবারও সংকটে বিএনপি

২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি ক্ষমতায় আসে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যা পরে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকার নামে পরিচিতি পায়। তখনই শোনা যায় ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার কথা। অর্থাৎ, দুই শীর্ষ রাজনৈতিক নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা চলছে, এমন খবর ছড়িয়ে পড়ত প্রতিদিনই। কিন্তু নত হননি তিনি; অনড় থাকেন নিজের অবস্থানে। শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
ওয়ান-ইলেভেনের সময় নানা চাপে ও সংকটে পড়েছিল বিএনপি। খালেদা জিয়ার ওপর এই চাপ ছিলো আরও বেশি। দলের অনেক নেতা বিশ্বাসভঙ্গ করতে থাকেন। কেউ হয়ে যান নিস্ক্রিয়। এমনকি প্রভাবশালী নেতা, দলের মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়াকে বহিস্কার করতে বাধ্য হন খালেদা জিয়া।
২০০৭ সালের ৭ই মার্চ। ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তারেক রহমানকে। পরে যখন তাকে আদালতে হাজির করা হয় তখন তার পরনে র্যাব লেখা বুলেটপ্রুফ ভেস্ট, মাথায় হেলমেট। তারেক রহমানকে রিমান্ডে নেয়া হয়।
ওই সময়ে মাঝে মাঝেই পত্রিকায় খবর আসতো তারেক রহমানকে রিমান্ডে নির্যাতন করা হচ্ছে। আঠারো মাস পর তারেক যখন জামিনে মুক্তি পান, তখন তিনি হাসপাতালে, হাঁটতে পারেন না। চারদিন পর লন্ডনে চলে যান তিনি। সেখানেই ১৭ বছর নির্বাসনে ছিলেন তিনি।
খালেদা জিয়ার চেষ্টায় আবারও দল পুনর্গঠনে বিএনপি

একবছরের বন্দীদশা থেকে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে জেল থেকে ছাড়া পান খালেদা জিয়া।
তখন বিএনপি একেবারেই এলোমেলো। কারামুক্ত হয়েই দল পুনর্গঠনে সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমে পড়েন খালেদা জিয়া। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি সারাদেশে জনসভা ও পথসভা করে দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করেন। সেই নির্বাচনের পর তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হন।
এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। এর প্রতিবাদে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ পরের ১০ বছরের জন্য ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে।
২০১৮ সাল। ভোটের আগে খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় সাজা দিয়ে কারাবন্দি করা হয়। বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশ নিলেও ভোটের দিন তা বর্জনের ঘোষণা দেয়।
এরপর ২০২৪ সালে আরেকটি একতরফা নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ। বিএনপিও সেখানেও অনুপস্থিত থাকে। এই সময়ই একের পর এক বিপর্যয়ে বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেন।
কিন্তু রাজনীতিতে উত্থান-পতন মুহূর্তেই ঘটে। ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট, গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় শেখ হাসিনার টানা দেড় দশকের শাসনামল। ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু, তারেক রহমান দলীয় প্রধান

দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিএনপির জন্য ফিরে আসে সুদিন। ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়া। ফিরে পান তার রাজনৈতিক অধিকার ও মর্যাদা। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর সফলতার মুখ দেখেন তিনি।
পঁচিশে ডিসেম্বর ২০২৫, সতেরো বছর পর দেশে ফিরলেন তারেক রহমান। স্বাগত জানাতে লাখ লাখ মানুষ জড়ো হয় ঢাকায়।
তার পাঁচ দিনের মাথায়,৩০এ ডিসেম্বর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অধ্যায় সমাপ্ত হয় বেগম খালেদা জিয়ার। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। খালেদা জিয়ার জানাজায় সংসদ ভবন এলাকা ছিল লোকে লোকারণ্য।
পিতার হাতের তৈরি বিএনপির হাল ধরেছেন ছেলে তারেক রহমান, মাঝে স্বামীর হাতের গড়া দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে জনপ্রিয়তার শিখরে নিয়ে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া। শুধু তাই নয়, দলকে দেশের ক্ষমতায় এনেছেন। কারাবরণ করেছেন একাধিকবার, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ছোট ছেলে কোকো রহমানকে হারিয়েছেন। বিদেশ বিভূঁইয়ে আরেক ছেলেও প্রায় দেড় দশক থেকেছেন নির্বাসনে। মায়ের মৃত্যুর পর দলের ভার পুরোপুরি নিয়েছেন ছেলে তারেক রহমান। দলীয় পদবী থেকে ভারপ্রাপ্ত সরে গিয়ে হয়েছেন পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান।
বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের ভেতরেই গণতান্ত্রিক চর্চা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএনপিও এর বাইরে নয়।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপির ভেতরে সংস্কার হবে কিনা, হলে কতটা হবে, বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার ঘোষিত ৩১ দফাকে কতটা সফলতার সাথে বাস্তবায়ন করতে পারবেন, তার জন্য হয়ত অপেক্ষা করতে হবে আরও।



