তারেক রহমানের সরকারের প্রথম ছয় মাস কেমন গেলো

ক্ষমতায় যাওয়ার পর ছয় মাসের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার সফল হয়েছে বলে দাবি করছে বিএনপি। তবে কিছু চ্যালেঞ্জও দেখছেন বিশ্লেষকরা। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। এগুলো কি ছাপিয়ে যেতে পারবে সামাজিক সুরক্ষা, কৃষক সহায়তা, খাল খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ?

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪২ এএম

প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম ছয় মাসের পথচলায় নানা সফলতার কথা উঠে আসছে বিএনপি সরকারের।

সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি-কৃষক সহায়তা এবং খাল খননের মতো উদ্যোগগুলোতে প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের স্বাক্ষর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

পাশাপাশি রয়েছে চ্যালেঞ্জও। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিভিন্ন রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা করছেন অনেকেই।

গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভা (২৪ জন মন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী) গঠন করে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান।

এরপর প্রথম ছয় মাসের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ছয় মাসেই তারা প্রতিশ্রুতির সিংহভাগ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে।

তবে বিরোধী দল এনসিপির মতে, প্রতিশ্রুত চুক্তি ভেঙে সরকার হাঁটছে বিপরীত পথে।

এই দুই রাজনৈতিক অবস্থান পেরিয়ে নতুন এক প্রশাসনিক ও সামাজিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেখছেন স্বাধীন বিশ্লেষকেরা।

'জবান' সম্পাদক রেজাউল করিম রনি সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আলাপ-কে বলেন, “ছয় মাসে আমার মূল্যায়ন হলো- যতোটা ভালো হওয়ার কথা ছিলো, ততোটা ভালো না হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্থায়ী পরিবর্তনের ইঙ্গিত তারেক রহমান দিয়ে যাচ্ছেন।”

“এই যে ডেমোক্রেটিক লিডারশিপ, আমাদের এখানে আগে এটা ছিলো না। এই সরকার ভুল করে, সেটা স্বীকার করে, জনগণের কাছে যায়। ক্ষমতার সাথে সরকারের সম্পর্ক স্থাপন- এই কালচারের মধ্যে ফেরা তারেক রহমানের হাত ধরে। এটা একটা বড় অর্জন সরকারের,” যোগ করেন তিনি।  

বিএনপি সরকারের সফলতা কোথায় কোথায়?

সরকার গঠনের পর বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের অন্যতম টার্গেট ছিলো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, কৃষি ঋণ মওকুফ এবং বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ।

ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ড চালুর মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণের চেষ্টা করেছে সরকার।

কৃষি ও কৃষক সহায়তা ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। এতে ১৪ লাখের বেশি কৃষক ঋণমুক্ত হয়েছেন বলে সরকারের মূল্যায়নে উঠে আসছে।

এছাড়া খাদ্যশস্যের মজুত বৃদ্ধি এবং প্রতি মাসে ৬৭ লাখেরও বেশি সুবিধাবঞ্চিত পরিবার প্রতি কেজি ৩০ টাকা দরে চাল পাচ্ছে।

দেশব্যাপী খাল খনন কার্যক্রম এবং লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবকের মধ্যে ঋণ বিতরণ এবং স্টার্ট-আপদের জন্য ফান্ড গঠন করা হয়েছে। কৃষি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, সবুজ শিল্প এবং অন্যান্য খাতের জন্য ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্প চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

‘এক শিক্ষক, এক ট্যাব’, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য নতুন ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপন, নতুন করে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং বন্ধ পাটকল চালুর কথাও সরকারের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হচ্ছে।

এছাড়া খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারের ভাতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সংসদে ১০৫টি বিল পাস, বেশকিছু হাই-প্রোফাইল ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত বিচারকেও সরকারের সফলতা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

গত ১৪ই অগাস্ট প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি সরকারের ছয়মাস পূর্তিতে নির্বাচনি ইশতেহার এবং ৩১ দফায় দেওয়া অঙ্গীকারের অধিকাংশ কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে।

তিনি বলেন, “ছয় মাসের লক্ষ্য অনুযায়ী কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ, আবার কোথাও ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে। এ বিষয়ে লিখিত একটি বর্ণনা বা বুকলেট আগামীকাল বা পরশুর মধ্যে দেওয়া হবে”।

তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের থেকেও ছয় মাসের সফলতা হিসেবে বাংলাদেশের নেতৃত্বের ‘গণতান্ত্রিক রূপান্তর’কেই বড় করে দেখছেন জবান-এর সম্পাদক রেজাউল করিম রনি।

তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের পরে আপনি যদি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন কী? তারমধ্যে অন্যতম হলো তারেক রহমানের লিডারশিপটা পাওয়া।”

“কারণ, আমরা তারেক রহমান সম্পর্কে একটা ভুয়া ন্যারেটিভের মধ্যে ছিলাম। সেটা পার করে এসে একটা ডেমোক্রেটিক লিডারশিপ, যে লিডার নিজে আইন মানে। যে লিডার ঘণ্টার পর ঘণ্টা জনগণকে আটকে রেখে নিজে এগিয়ে যায় না। যে নিজে জ্যামে বসে থাকে, যে নিজে কৃচ্ছতা সাধন করে এবং যখন সরকার পারে না কোনোকিছু তখন দুঃখ প্রকাশ করে, সত্যিকারের কারণটা তুলে ধরার চেষ্টা করে।”

তিনি আরো বলেন, “বাংলাদেশের জনগণ বিএনপির নেতাকর্মীর ওপর খুশি না হলেও তারেক রহমানের প্রতি তারা কিন্তু এক ধরনের সন্তুষ্টি প্রকাশ করছে। তারা তারেক রহমানের নেতৃত্বকে প্রশংসা করছে।”  

বিএনপির সরকারের ব্যর্থতা কোথায়

তবে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয়মাসে সফলতার পাশাপাশি গলার কাঁটা হয়ে আছে কিছু বিষয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সংকট।

সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই শুরু হয় আমেরিকা-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ। সেই ধাক্কা এসে লাগে বাংলাদেশে।

যানবাহনের তেল সংকটে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। সেই তেল সংকট কাটতে না কাটতেই শুরু হয়েছে গ্যাসের সংকট।

জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানা, সার কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে।

এদিকে মূল্যস্ফীতির পারদও চড়া। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে নাভিশ্বাস উঠেছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি সফল না হওয়ায় জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে ক্রমাগতভাবে। চুরি, খুন, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন স্থানে মব সহিংসতার ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কঠোরতা দেখা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

দলীয় ও রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে অনেকেই নিন্দা জানাচ্ছে সরকারকে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় সরকার সংস্থায় দলীয় নেতাকর্মী ও শিক্ষকদের চুক্তিভিত্তিক ও রাজনৈতিক পদায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা হয়েছে।

দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর আলাপ-কে বলেন, “এখন বিএনপিকে জনগণের সম্মুখে দাঁড়াতে হবে। জনগণ কিন্তু দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপিকে দিয়েছে হাই এক্সপেকটেশন থেকে।”

“যতো বেশি ভোট দিয়েছে, ততো বেশি চাহিদা। এখন বিএনপিকে পর্যালোচনা করতে হবে যে- এই প্রত্যাশার কতটুকু তারা পূরণ করেছে।”

এই সম্পাদক মনে করেন, “প্রধানত আমরা দেখি, মানুষের নিরাপত্তা হচ্ছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে আমার কাছে মনে হচ্ছে, বিএনপি এখন পর্যন্ত খুব একটা আত্মতুষ্টির লেভেলে যেতে পারেনি।”

“অতীতে যে চর্চাটা ছিলো- চাঁদাবাজি বা ইত্যাদি ইত্যাদি, সেখানেও বিএনপি কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে পারেনি,” যোগ করেন তিনি।

সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, “দ্রব্যমূল্য এই সময়ে কিছু বাড়ে, কিছু কমে। কিন্তু একটা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে হবে। সেইখানেও বিএনপি খুব বেশি মনোযোগ দিতে পেরেছে বলে আমি মনে করি না।”

“আমি আশা করবো, এই ছয়মাসে ভুলত্রুটিগুলোকে দেখতে হবে তাদের (বিএনপি)। যেগুলো ভালো, সেগুলোতে বেশি আত্মপ্রসাদ লাভ না করে, যেগুলো করতে পারেনি, সেগুলোতে তারা যেন মনোযোগী হয়,” যোগ করেন তিনি।

এদিকে বিএনপির সমালোচনায় মাঠে নেমেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

১৩ই অগাস্ট দলটির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, “নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার সময় বিএনপি বলেছিল লুটপাট নয়, উৎপাদন; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা। কিন্তু ছয় মাস পরই নিজের প্রতিশ্রুত চুক্তি ভেঙে সরকার ঠিক বিপরীত পথে হাঁটছে।”

কিন্তু জবান-এর সম্পাদক রেজাউল করিম রনি প্রশ্ন তুলছেন, সরকারের নানা যে ব্যর্থতা, সেই ব্যর্থতাগুলোর কারণ কী, কনসিকোয়েন্স কী?

“এগুলো বেশিরভাগই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া,” যোগ করেন তিনি।

রনি বলেন, “এখানে পলিটিক্সের মধ্যে যে ধরনের ভায়োলেন্স হওয়ার কথা ছিলো। এমনকি আওয়ামী লীগ যে আশংকা করেছিলো যে- ৫/১০ লাখ লোক মারা যাবে। সেখানে একটা পিসফুল এনভায়রনমেন্ট বজায় রাখা এবং সমস্ত নাগরিকের জন্য যথাসম্ভব অধিকার নিশ্চিত করার একটা কালচার ডেভেলপ করার চেষ্টা চলছে।”

“তারেক রহমানের এই যে, ইনসাফপূর্ণ লিডারশিপ, এইটা অনেক বড় অর্জন,” মন্তব্য করেন তিনি।

রনি আরো বলেন, সরকার চাচ্ছে, দ্রুত কোনো ফল না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে, যেটার মধ্য দিয়ে একটা সাসটেইনেবল পরিবর্তন করা সম্ভব।

“সরকার কোনো পপুলিজমের দিকে যাচ্ছে না। ফলে ছয় মাসে কোনো আহামরি পরিবর্তনের গল্প আমি বলতে পারবো না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য যা যা করা দরকার, তার মধ্যে এই সরকার প্রবেশ করেছে।”