বাঙালির খাদ্য তালিকাটা বড় বিচিত্র। খাবার তালিকায় যেমন বিষ আছে, তেমনই আছে ছ্যাঁকা, উষ্ঠা, ধাক্কা, চড়, থাপ্পড় ও চুমু। কিন্তু থাপ্পড় আর চুমুর সাথে মিল কোথায়? মানুষ সবকিছু মনে রাখে না। যেদিন সে প্রথম চড় বা থাপ্পড় কিংবা চুমু খায় সেদিনের কথা সে কখনো ভুলতে পারে না।
২১এ অক্টোবর ২০২৬ গাজীপুরের টঙ্গিতে সাত বছর বয়সী এক মেয়ে শিশু (মাদ্রাসায় নাকি ছেলে শিশুরাও রক্ষা পায় না) যৌন নির্যাতনের শিকার হলে মেয়ের পিতা নির্যাতনকারী শিক্ষককে থাপ্পড় মারলে মুহূর্তেই সেই ভিডিও ভাইরাল হয় এবং অবস্থাদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ এই থাপ্পড়ের ঘটনা কখনো ভুলবে না।
প্রিয় পাঠক, জানিয়ে রাখি যে ২০২০ সালের ২৮এ ফেব্রুয়ারি একটা হিন্দি ছবি মুক্তি পেয়েছিল যার নাম থাপ্পড়। অনুভব সিনহা ছবিটি বানিয়েছিলেন যার প্রধান চরিত্রে ছিলেন তাপসী পান্নু। ছবির অমৃতার (পান্নু) সাথে বিক্রমের সেটেল ম্যারেজ হয়। অনেকের সামনে বিক্রম একদিন অমৃতাকে থাপ্পড় মারলে ঘর ছাড়ে অমৃতা। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন দিক নিয়েই ছবির কাহিনি।
বাংলাদেশে নির্যাতনের শিকার সেই কন্যাশিশুর পিতা শাহজালাল রুমীও শিকার হয়েছেন ছবিময় বাস্তবতা বা সিনেম্যাটিক রিয়েলিটির। ছবির নায়কদের মতো আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরও তিনি নায়কই আছেন। তার কাণ্ডকীর্তি নিয়ে যে ছবি তার নাম দেওয়া যেতে পারে থাপ্পড়ম্যান: দ্য সিনেমাটিক রিয়েলিটি।
প্রচলিত অনেক ছবির কাহিনি কেমন? বাবা-মা বা ভাই-বোনকে মেরে ফেলার পর নায়ক বা নায়িকা বড় হয়ে যে বা যারা মেরেছে তাদের ওপর প্রতিশোধ নেয়। ডায়ালগ দেওয়া হয় এভাবে, ‘‘কেউ সন্ত্রাসী হয়ে জন্মায় না সমাজই তাকে সন্ত্রাসী বানায়!’’
ধরুন ইংরেজি জেসি’স গার্ল বা হিন্দি ছবি জাখমি আওরাত-এর কথা। জেসি’স গার্ল-এর জেসিকে স্বামীর সামনে ধর্ষণ করা হয় স্বামীকে বেঁধে রেখে। এরপর স্বামীকে মেরে ফেলা হলে জেসি ও তার বান্ধবীরা ধর্ষকদের খুঁজে বের করে হত্যা করে। জখমী আওরাত মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮৮ সালে, যার মূল ভূমিকায় ছিলেন ডিম্পল কাপাডিয়া। পুলিশ অফিসার হওয়া সত্ত্বেও ছবিতে তিনি গণধর্ষণের শিকার হন। এরপর আদালতে ধর্ষকরা ছাড়া পেয়ে যায়। সিনেমাটিক রিয়েলিটি নিয়ে এবার ডিম্পল কাপাডিয়া নেমে পড়েন প্রতিশোধ পরায়ণতায়। তিনি একজন একজন করে ধর্ষকদের ধরে একজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হতেন যিনি ধর্ষকদের পুরষাঙ্গ কেটে দিতেন! এই ছবি সেসময়ে যেমন সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল তেমনি আলোচিত ও ব্যবসা সফল হয়েছিল। মানুষ ভেবেছিল এটা সিনেম্যাটিক রিয়েলিটি।
‘সিনেম্যাটিক রিয়েলিটির’ সিনেমায় শেষমেষ নায়ক পুলিশের হাতে ধরা পড়ে বড় বড় লেকচার ঝাড়ে, বলে, “যখন আমার বাবা মাকে খুন হরা হয়েছিল তখন কোথায় ছিল পুলিশ, কোথায় ছিল আইন?”
হোক সেটা র্যাম্বো খ্যাত সিলভেস্টার স্ট্যালোন কিংবা এদেশের নায়ক মান্না। সিনেমার শেষদৃশ্যে পুলিশ আসে। এরপর বিচারের সম্মুখীন হলে সমাজের ঘৃণিত ব্যক্তিদের হত্যার কারণে তার সাজা মওকুফ করা হয়। একদম শেষে দেখা যায় নায়কের মা ও তার প্রেমিকা মালা নিয়ে জেলগেটে দাঁড়িয়ে আছেন। ‘সিনেম্যাটিক রিয়েলিটির’ ছবির গৎ এমনই। অসংখ্যবার এমন ছবি দেখতে দেখতে মানুষের মনে কেমন ভাবনা তৈরি হতে পারে?
কয়েকটা ডায়ালগ বা বিশ্লেষণ শুনলেই বোঝা যাবে। পুলিশের ডায়ালগ, “আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না!”
আইনজীবীর ডায়ালগ, “আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিন!”
নায়কের ডায়ালগ, “গরিব মানুষ আইনের জালে আটকায়, জেলে যায়। বড়লোকরা টাকা দিয়া কাঁচি কিনে আর এই জাল কেটে বেরিয়ে যায়। বিচার পেতে লাগে এক যুগ আর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলতে হয় ফিরিয়ে দাও আমার জীবনের বারোটা বছর!”
তাহলে কী দাঁড়ালো ব্যাপারটা?
ব্যাপার এই যে রাষ্ট্র যখন বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও ত্বরান্বিত করে না তখন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয় কেউ কেউ। ধরুন শাহজালাল রুমি যদি নিয়মতান্ত্রিক পথে বিচারের দিকে হাঁটতেন তাহলে কী দেখতেন? মামলা নেওয়া হতো সময় মতো? গ্রেপ্তার হতেন যৌন নির্যাতনকারী? মামলার কতদিন পর গ্রেপ্তার হতেন? কতদিন পরে আসামি জামিন পেতো?
নিম্ন আদালত, হাই কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে কতদিন ধরে বিচার ঝুলতো?
ভিকারুন্নিসা স্কুলের সেই অভিযুক্ত শিক্ষক যে কি-না ছাত্রীর সাথে তার অনৈতিক কর্মের ভিডিও করে রেখেছিলেন, তুমুল আলোচনার পরও তার রায় হতে লেগেছে দশ বছর। অভিযুক্ত শিক্ষক পরিমলের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। নুসরাতকে ধর্ষণ ও পুড়িয়ে মারার পরে (১৭ই মার্চ, ২০১৯) বিচার পেতে কয় বছর লেগেছে? ১৬ জনের ফাঁসির আদেশ শেষমেষ কয়জনে এসে ঠেকেছে? তনু ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের খবর কী?
যিনি বা যারা বিচার চেয়েছেন কত টাকা তার বা তাদের খরচ হতো? রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কতটা হেনস্তা করতো?
এইসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পেলে সেখান থেকে জন্ম নেয় ‘সিনেম্যাটিক রিয়েলিটি’ বা ছবিময় বাস্তবতা। কন্যা শিশুর মনোবেদনা বা ট্রমা বুঝতে পেরে যে বাবা সবশক্তি দিয়ে নির্যাতনকারীকে চড় মারে, আলেম সমাজের নামে যতই তার বিরোধিতা করা হোক, মানুষের মনে তিনি নায়ক হয়ে জন্ম নেন। বাবা হয়েই জন্ম নেন। বলা হয় এই থাপ্পড় প্রতিবাদের প্রতীক।
বলা হচ্ছে, “কম মারা হয়েছে!”, “এসো থাপ্পড় মারি!”, “সব বাপেরা চড়ের হাত শক্ত করেন”, “এদের গালগুলো ফাটায়া ফেলতে হবে!”
শাহজালাল রুমিকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে সামাজিক মাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল। যতদূর জানা যায় তিনি আত্মগোপনে আছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, “অভিভাবকদের বলবো আমার পাশে থাকুন। আমাকে হেরে যেতে দিয়েন না। আজকে আমি হেরে গেলে মনে রাখবেন আপনারাও হেরে যাবেন। আপনাদের সন্তান হেরে যাবে।”
এই সিনেম্যাটিক রিয়েলিটির শেষ কোথায়? আমরা যে সমাজ বাস্তবতায় বাস করি সেটা রঙিন না। টানাপোড়েন আর সমাজের নিষ্ঠুরতা এখানে প্রকট। নারীদের প্রতি সহিংসতা দিনের পর দিন বাড়ছে। বাড়ছে মাদ্রাসাভিত্তিক অপরাধ ও শিক্ষকদের গ্রেফতারের ঘটনা। সেখানে মেয়ে শিশু নিয়ে বাবাদের চিন্তার অন্ত নেই। প্রতিবাদী বাবারা তাই সহসাই নায়ক বনে যান। কিন্তু অসহায় বাবা বা বোনদের অসহায় ভাইয়ের জন্য ‘সিনেমাটিক রিয়েলিটি’ কেমন?
ওম পুরি ও নাসিরুদ্দীন শাহ অভিনীত আক্রোশ সিনেমার কথা মনে আছে? ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া গোবিন্দ নিহালিনীর এই ছবি তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। লাহান্যা খ্যাত ওম পুরির স্ত্রী গণধর্ষণের শিকার হন এবং তাকে হত্যা করা হয় অথবা তিনি মারা যান। এই অপরাধে লাহান্যাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিনেমার শেষের দিকে লাহান্যার বাবার মৃত্যু হলে তাকে প্যারোলে হাতকড়া পরা অবস্থায় আনা হয় বাবার শেষকৃত্যে মুখাগ্নি করার জন্য।
চিতার আগুন জ্বলার সময় লাহান্যার মনে এক ভাবনার জন্ম হয়। সে ভাবে যে সমাজপতিদের জন্য তার স্ত্রী ধর্ষিতা ও নিহত হয়েছিল, তার অনুপস্থিতিতে তারা তার ছোটবোনকেও বাঁচতে দেবে না। সে তার বোনের ভবিষ্যত ভেবে চিতার পাশে পড়ে থাকা এক কুঠার নিয়ে তার বোনকে খুন করে আকাশের দিকে তাকিয়ে মাতম করা শুরু করে।
অসহায় বাবা বা ভাইদের এই নির্মম বাস্তবতায় শাহজালাল রুমির এই থাপ্পড় আসলে মোক্ষম এক প্রতিবাদের!
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারানোর পরে নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন একটা সামাজিক আন্দোলন শুরু করেছিলেন যার নাম ‘নিরাপদ সড়ক চাই’। এই আন্দোলনের কথা এখন সবাই জানে। শাহজালাল রুমিও এমন একটা আন্দোলন শুরু করতে পারেন। কী নাম হতে পারে সেটা অনেকেই বলে দিতে পারবেন।
তবে এই দেশে এক থাপ্পড়ম্যানের আবির্ভাব ঘটেছিল এটা অনেকেই মনে রাখবেন। ‘সিনেম্যাটিক রিয়েলিটির’ সূত্র ধরে অনেক কন্যার বাবারা অবিচার দেখলে একদিন তারাও শাহজালাল রুমি হতে চাইবেন!
লেখক: রম্যলেখক
[মতামত লেখকের নিজস্ব]



